ইনশাল্লাহ, ফুটবল - কাশ্মীরি তারুণ্যের স্বপ্নগাথা

img

"নব্বই দশকেও কাশ্মীরের তরুন প্রজন্ম চে গিভারা বা মেলকম এক্স সম্পর্কে বেশি 
কিছু জানত না, যুদ্ধ পরিস্থিত রাস্তায় বিদ্রোহী হয়ে ঘুরে বেড়ানো ছিল ফ্যাশন" - 
বাশারাত পীর (কারফিউ রাত্রি'র লেখক) 

সিগারেটের ধোঁয়া টেনে বশির ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছিল, "আমি ভয় পেয়েছিলাম সে হয়তো ক্ষেপে যাবে, আর হতাশায় একদিন আমার মতো একজন জঙ্গি হবার রাস্তায় চলে যাবে"। বশির বাবা ছিলেন নব্বই দশকের কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদিনের একজন সশস্ত্র বিদ্রোহী, এখন সব ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ব্যবসা করেন। তিনি যখন গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে বাড়ি ছেড়ে পাকিস্তানে ট্রেনিং নিতে যান, তখন তার সন্তান বাশারাতের বয়স দুই মাস।

বাশারাত বাবা বর্তমান কাশ্মীরের তরুন প্রজন্ম, বেড়ে উঠেছে ভারতীয় সেনা অধ্যুষিত কাশ্মীর ভ্যালী'তে নিয়ত ঠাণ্ডা যুদ্ধের ভিতর দিয়ে। প্রতিদিনের সাংঘর্ষিক, অস্থিরতা, নিয়ন্ত্রন ও অস্বাভাবিক জীবনের মধ্যেও তার প্যাশন এবং লক্ষ্য ফুটবল খেলা। সে একজন প্রতিভাবান স্ট্রাইকার, শ্রীনগরের একটি ক্লাবের ক্যাপ্টেন।  গত তিন বছর ধরে ফিফা মনোনীত আর্জেন্টাইন ফুটবল কোচ জুয়ান মারকোস ত্রয়া এবং তার স্ত্রী প্রিসিলা, বাশারাতসহ আরো অনেক তরুণকে কাশ্মীরের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাঠ থেকে ফুটবলের মাঠে নতুন স্বপ্নে বিভোর রেখেছে। তাদের স্বপ্নের সেই চারণ ভূমির নাম ISAT (International Sports Academy Trust) ফুটবল একাডেমী।  মারকোস প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ব্রাজিলের নানা ক্লাবে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে। বাশারাত ব্রাজিলের পেলের ফুটবল ক্লাব 'সান্তোস এফসি'তে প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। কিন্তু বাশারাতের স্বপ্ন থমকে যায়, যখন ভারত সরকার তাকে একজন পুরনো বিদ্রোহীর সন্তান হবার অপরাধে তাকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

আশ্বিন কুমার নির্মিত 'ইনশাল্লাহ, ফুটবল' (নির্মাণকাল-২০১০) সাত দশক ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী অস্থিতিশীল কাশ্মীরের প্রেক্ষাপটে একজন সাবেক বিদ্রোহী পিতা, একজন তরুন ফুটবলার এবং একজন ফুটবল কোচ ও তার পরিবারের স্মৃতি, স্বপ্ন ও স্বপ্নপুরনের জবানবন্দী।

১৯৪৭ সালের ভারত পাকিস্তান বিভাজনের সময় ব্রিটিশ সরকার কাশ্মীর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্তি অমীমাংসিত রেখে দেয়। জনসংখ্যার দিকে থেকে মুসলিমরা  সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হিন্দু মহারাজা হরি সিং।  তাঁর পূর্বসূরিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে কাশ্মীর কিনে নিয়েছিলেন। পার্টিশানের সময় তিনি তাঁর রাজ্যের হিন্দু মুসলিম উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে ভারত ও পাকিস্তানের সাথে একত্রীভূত না হয়ে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কারণে পাকিস্তানের আগ্রাসন আশঙ্কায় তিনি ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করলে ভারত সংঘের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রবেশের নির্দেশ দেন। এই অবস্থায়, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বছরব্যাপী যুদ্ধের শেষে পাকিস্তান ও ভারতের উভয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের অঞ্চল অধিকৃত করে নেয়। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নাম হয়, ' আজাদ কাশ্মীর' এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নাম হয় ' জম্মু কাশ্মীর'।  উভয় পাশে কাশ্মীরের জনগনের উপর নেমে আসে সেনাশাসন। উভয় সরকারের পক্ষ থেকে কাশ্মীরের ভাগ্য তাঁর নিজ জনগণের উপর ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, গত সত্তর বছরে তা কোনদিন রক্ষা করা হয় নাই।  এর মাঝে রাজনৈতিক টানা-পোড়েনে কাশ্মীরের আবহাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। নানাপন্থী লোকজন কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে নামে। কেউ পাকিস্তানের সহযোগিতায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে  কাশ্মীর থেকে ভারতকে তাড়াতে চায়। আবার অনেকে থাকতে চায়, পাকিস্তানের উসকানি ও মৌলবাদী আগ্রাসন'কে হটিয়ে দিয়ে। স্বাধীন হবার স্বপ্নে  কাশ্মীরের জনগনের সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আর জনগনের উপর নেমে আসে সীমাহীন নির্যাতন।  অত্যাচার, গুম, হত্যা, কারানিবাস, নির্বাসন, অপমান, জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি – এসব নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে কাশ্মীরের জনগনের কাছে। সাত দশকের সংগ্রামী ইতিহাসে কাশ্মীরের জনগণ হাজার হাজার স্বজন হারানোর বেদনায় সিক্ত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে চাইলেও যেন হতে পারে না। বিদ্রোহী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সরকারি -বেসরকারি সবাই যেন কাশ্মীরকে স্থিতিশীল দেখতে ইচ্ছুক নয়।  বছরের পর বছর ধরে তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের 'ভূস্বর্গ' বলে পরিচিত কাশ্মীর মানুষের সৃষ্ট 'ভু-নরক' - এ পরিণত হয়ে গেছে।      
       
তথ্যচিত্রে কাশ্মীরের ঐতিহাসিক সাংঘির্ষক প্রেক্ষাপট উঠে আসে বশিরের সাক্ষাতকারের মধ্যে দিয়ে।  ১৯৮৭ সালের নির্বাচনকে কাশ্মীরবাসী মেনে নেয় না। তাদের মতে, এটি ছিল ভারত সরকারের কারসাজি করা নির্বাচন, যার মাধ্যমে তাদের পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়।  ফলে, সংক্ষুব্ধ কাশ্মীরি তরুণরা দলে দলে পাকিস্তান গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। যাতে তারা ফিরে এসে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ভারত থেকে কাশ্মীরকে স্বাধীন করতে পারে।  বাসির আহমেদ বাবা তেমনই এক তরুণ।  নয় মাসের পাকিস্তানের প্রশিক্ষণ শেষে সে ফিরে আসে মাতৃভূমি মুক্ত করার প্রতিজ্ঞায়।  নব্বই দশকের এক সকালে সে ধরা পড়ে সামরিক বাহিনীর হাতে।  তার মনে হয়েছিল, আধ ঘণ্টার মধ্যে তাকে হয়তো আর অনেকের মতো মেরে ফেলবে।  বিএসএফ অফিসার বিকাশ তাকে জানায়, তুমি ভাগ্যবান, তুমি নিজ ঘরে ধরা পড়েছো।' । তখনকার কাশ্মীরের লোকদের কাছে বিকাশ ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। তার জন্য অপেক্ষা করে সীমাহীন নির্যাতন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ । তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাপা-২ নামে এক জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে, যেখানে তার মতো শত বন্দী রাখা আছে।  সেনাবাহিনী অনেকগুলো নির্যাতনকেন্দ্র তথা জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র নির্মাণ করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কময় ছিল এই পাপা-২। প্রতিদিন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলে, উত্তরের অপেক্ষায় চলে নির্যাতন।  বশীর জানায়, থার্ড ডিগ্রী টর্চারে শরীরের কোন অংশই নির্যাতন থেকে রেহায় পায় না। অনেককে মেরে ফেলে নদিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ঝিলম নদী লাশে লাশে ভরে থাকে। আপনজনেরা গুম বা নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া আপনজনকে পুলিশ, আর্মি, প্রশাসন কারো কাছে খুঁজে না পেলে ঝিলম নদীর তীরে অপেক্ষায় থাকে, যদি লাশ পাওয়া যায়। পুরো কাশ্মীর যেন এক নীরব বন্দিশালা। নিরুদ্দেশ বা গুম হয়ে যাওয়াদের নারীরা 'আধা বিধবা' নামে পরিচিতি পায়।সমাজে তারা এক যন্ত্রণাময় জীবন কাটায়। 

'ইনশাল্লাহ, ফুটবল' এর কেন্দ্রীয় চরিত্র বাশারাত বাসার আজকের কাশ্মীরের তরুণ সমাজেরই একজন। শত শত যুবক কিশোররা প্রশাসনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত। কেউ অস্ত্র নিয়ে, কেউ লাঠি-পাথর নিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতার নেশায় ভারতীয় বাহিনীর সাথে ঘাট প্রতিঘাতে জড়িয়ে আছে।  সেই সব যুবকদের মতো সে সংগ্রামী পথ বেছে নেয়নি।  তার নেশা ফুটবল। কিন্তু প্রশাসন তার পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করলে সে মুষড়ে পড়ে।  সরকারী কর্মকর্তা জানতে চায়, তাঁর পরিবারের বিষয়ে কোন খারাপ রেকর্ড আছে কিনা।  তার বাবা বিদ্রোহী ছিল জানতে পেরে কর্মকর্তাটি জানায়, এটাই তার পাসপোর্ট প্রাপ্তির একমাত্র বাধা।  কাশ্মীরের কোর্ট তার প্রতি ন্যায় বিচার করবে এই আশায় সে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের  বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যায়।  তার উকিল ব্যাখ্যা করে, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী তার পাসপোর্ট পেতে কোন বাধা নেই।  বাশারাত বুঝতে পারে না, তার জন্মের আগের পিতাকৃত  অপরাধের জন্য তার ভবিষ্যৎ কেন রুখে যাবে।  কাশ্মীরের প্রবীণ সমাজেরও একই প্রশ্ন থাকে।  তাহলে আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হল কোথায় ? জনগণের তো ন্যায় বিচার, নাগরিক অধিকার আর সামাজিক মর্যাদা প্রত্যাশা ছিল ভারত সরকারের প্রতি।  

বশির নির্মাতা'কে পাপা-২  নির্যাতন কেন্দ্রে চৌদ্দ বছরের এক বালকের কাহিনী বলে।  বশির তাকে চিনতো, সাধারণ  স্কুল পড়ুয়া ছাত্র , কোন জঙ্গি বা সন্ত্রাসী ছিল না।  কিন্তু নির্যাতনে সেনাবাহিনী তাকে দিয়ে জবানবন্দী নেয় - সে পাকিস্তানে অস্ত্র ট্রেনিং নিয়েছে।  বশির পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, সে আর মার সহ্য করতে পারছিল না, তাই মিথ্যে হলেও  সাক্ষ্য দিয়ে সে রেহাই পেতে চেয়েছে।
 
নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মিছিল মিটিং সারাক্ষণ জনপদ উত্তপ্ত করে রাখে।  আজাদি'র নেশায় জনগণ প্রতিবাদী। এসবের বাইরে থেকে তরুণ বাশারাত জিনস পড়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়।  মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করে।  তার নিজের দুজন মেয়ে বন্ধু আছে। নানা কথায় সে জানায়, সে চায় তার মেয়ে বন্ধু'রা হিজাব পরুক, তার মায়ের মতো। জিন্স বা অন্যকিছু পড়লে সমস্যা নাই। কিন্তু হিজাব পড়তে হবে।  বাশারাতের সাধারণ জীবনযাপনে কোন কট্টরতা নেই,  কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতা থেকে সে বের হতে পারে না। সে নির্মাতা আশ্বিনকে আরেকজন পরিচিত বন্ধুর কাছে নিয়ে যায়।  বন্ধুটিও তার বাবা জঙ্গি হবার কারণে পাসপোর্ট পাচ্ছে না । সে কোর্টের আদেশ পেয়েছে। আশ্বিন প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে সে জানায় - তার বাবার কিছু ব্যবসায়ী শত্রু  ছিল।  তারা কিছু প্রশাসনিক ভাড়াটে খুনিকে টাকা দিয়ে দলে নেয়।  এদের বলা হয় 'ইখ্বানি' [এরা মূলত ধরা পড়া জঙ্গি থেকে পরবর্তীতে প্রশাসনের ভাড়াটে লোকে পরিণত হয়, গুপ্তচর হিসেবে কাজ  করে নানা লোককে ধরিয়ে দিতো প্রশাসনের কাছে ]  তারা তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং বিদ্রোহী বলে ধরিয়ে দেয়।  পরবর্তীতে তাকে জঙ্গি লেবেল লাগিয়ে প্রহসনমূলক এনকাউনটারে হত্যা করা হয়। বন্ধু'টি জানায়, যখন তার বাবার লাশ তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়, সেটা অনেক খণ্ডে খণ্ডিত ছিল। তাঁর শরীরে একটি মাইন বেঁধে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।                   

তথ্যচিত্রে কাশ্মীরে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের অবস্থা তুলে ধরা হয়।  নব্বই দশকে সশস্ত্র হিজবুল্লাহ মুজাহিদিন কর্তৃক কিছু হিন্দু সম্প্রদায়, যাদের 'কাশ্মীরি পণ্ডিত' বলা হয়, নিহত ও অপহৃত হয়।  তারা সন্ত্রাস, অপহরণ আর হত্যাকাণ্ডের ভয়ে নিজেদের আবাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ।  আইনসভার সদস্য প্রবীণ খেমলতা অয়াক্লু তেমনি অপহৃত পরিবারের একজন। বাশারাতের সাক্ষাতে তিনি বিদ্রোহী'দের দ্বারা হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেন।  তারা প্রশ্ন করেন, যত্রতত্র হত্যা ও সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে কিসের স্বাধীনতা চাইছে এইসব উগ্রপন্থী বিদ্রোহী'রা। তিনি জানান যে, তারা ঘৃণা করে এই সব বিদ্রোহী আর তাদের প্রহসনমূলক স্বাধীনতার আদর্শকে। বাশারাত নিজের সম্প্রদায়ের লোকদের কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উপর এই আক্রমণের ব্যাখ্যা চাইলে, তারা বলে এসব কাহিনী মূলত মিথ্যা বানোয়াট অপপ্রচার। তারা বাশারাতকে নিজ এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছে নিয়ে এই বিষয়ে মিথ্যাচার বিষয়ে প্রমাণ দেয়। হিন্দু পরিবারটি জানায়, বিদ্রোহীদের ভয়ে তারা কোথাও যায় নি, কারণ তারা তাদের সন্ত্রস্ত করেনি, এমনকি তাদের কোথাও যেতে বলেনি। বরংচ, সেনাবাহিনী এসে  বার বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, বিদ্রোহীরা তাদের চলে যেতে বলার পরেও তারা যায় নি কেন।  কারণ তারা নিজেরাও কাশ্মীরের আজাদি প্রত্যাশী। কিন্তু এটা ঠিক, মুসলিম উগ্রপন্থীদের দ্বারা হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিতাড়িত হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যপকভাবে উঠে এলে তৎকালীন ভারত সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।  ফলে, কাশ্মীর এলাকা নিয়ন্ত্রণে  ও বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনাবাহিনী শাসন আরও তীব্র করা হয়।  কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের নতুন মাত্রা  যোগ হয়।   ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে দেশভাগের আগে সম্প্রীতির মধ্যে বসবাসকারী দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে, যা এখনো বেড়েই  চলেছে। 
              
মার্কোসের কাহিনী আমাদের আরেক কাশ্মীরের অভিজ্ঞতা দেয়। সুদূর লাতিন আমেরিকা থেকে এই ফুটবল প্রেমী  খেলোয়াড়টি কাশ্মীরে হতাশাগ্রস্থ তরুণদের মনে নতুন আশা জাগাতে বৈরি পরিবেশে অক্লান্ত সংগ্রাম করে যায়।  সে এবং তাঁর স্ত্রী নিজের খরচে এই ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে, যাতে কাশ্মীরের নতুন প্রজন্ম সশস্ত্র পথ পরিহার করে স্বাভাবিক স্বপ্নে লালিত হয়।  তার মতে, পৃথিবীতে একজন পেলে বা মারাদোনা আছে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ যুবক পেলে বা মারাদোনা হবার স্বপ্ন নিয়ে চলে। কাশ্মীরে যদি একজন তেমন এক বিশ্বখ্যাত ফুটবলার জন্মায়, তাহলে তরুণ সংঘাতময় পথ ছেড়ে সবাই তাকে অনুসরণ করবে। মার্কোস তাই কাশ্মীরের জনগণের মাঝে বাস করে একজন মারাদোনা সৃষ্টির আশায়।  স্ত্রী আর দুই কন্যা নিয়ে তার পরিবার । তার ক্লাবের তরুণদেরও তার পরিবারের সন্তানের মতোই তারা দেখাশুনা করে, সময় কাটায়।  স্ত্রী প্রিসিলা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। দেখতে পরীর মতো সন্তানগুলো বেড়ে ওঠে শ্রীনগরের নাগরিক বাস্তবতায় । তবু ফুটবলকে ঘিরে এই পরিবার, কাশ্মীরের তরুণদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়।  ভিন্নধর্মী এই শিশুরা ফুটবল ক্লাবের তরুণদের ভাই মনে করে বড় হয়। মার্কোসরা নিজেরাও কাশ্মীরের সংঘাতময়  অস্থির রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না।  ভারত সরকার তাদের নিরাপত্তা বিষয়ক অজুহাত তুলে তাদের ভিসা বাড়াতে অস্বীকৃতি জানায়।  তারা মার্কোসের কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক চলতে দিতে নারাজ।  যেন কাশ্মীরের তরুণরা জঙ্গিবাদ বিদ্রোহ ছেড়ে স্বাভাবিক অন্যকিছুতে মনযোগী হউক, এটা কাম্য নয়।  সরকার চায়, সেনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে মুম্বাই ফিল্ম আর ভারত ক্রিকেটের আগ্রাসনে কাশ্মীরের তরুণ আসক্ত হয়ে উঠুক দিন দিন। আবার যে জনগোষ্ঠীর সন্তানদের নতুন আশার আলো ছড়াতে মার্কোস ও প্রিসিলা নিজেদের সন্তানদের নিয়ে এই সংঘাতময় পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছে, সেই মুসলিম জনগোষ্ঠীও সর্বতভাবে তাদের সন্দেহ করে চলে। মার্কোস হাসতে হাসতে জানায়, মাঠে খেলার আগে বা পড়ে ছেলেরা যখন ক্লাবের নাম 'ISAT', 'ISAT' বলে ধ্বনি দেয় তখন আশপাশের রক্ষণশীল মুসলিম'রা মনে করে তারা নবী ঈসা -এর নাম নিচ্ছে। তারা অভিযোগ করে বিধর্মী  মার্কোস তাদের সন্তানদের খেলার নাম দিয়ে খ্রিস্টান বানানোর ষড়যন্ত্র করছে। প্রিসিলার অসুস্থতার রিপোর্ট মার্কোস স্বাভাবিকভাবে নিলেও মুষড়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য সে বড় শহরে যাবার কথা ভাবে।  কিন্তু তাদের সেই আশা স্তব্ধ হয়ে যায় যখন ভারত সরকার তাদের ব্রাজিল ফিরে যাবার শেষ সময় বেঁধে দেয়। প্রিসিলা জানায়, ' ভারত তাদের চলে যেতে বলছে' - এটা মেনে নেওয়া ছিল কষ্টকর।  তাদের শিশুরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে যেন তাদের এই অঞ্চল ছেড়ে যেতে না হয়।  কারণ তারা এইখানে জন্মেছে , বেড়ে উঠেছে।  তারা এটাকেই নিজের ঘরবাড়ি মনে করে এসেছে।  নিজ ঘর, এলাকা, কর্মস্থল, আপনজন , বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে এমন এক দেশে (জন্ম দেশ হলেও) তাদের যেতে হবে যেখানে তাদের কেউ নেই।  তারা ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকে। 

নিজেদের  নবনির্মিত সুপার মলে'র  বসির বাবা জানায়,  জেল থেকে বেরিয়ে কিছুদিন পর তিনি আবার পাপা-২ এর ভিকাস সাহেবের কাছে যান এবং জানতে চান যে, টানা দুই বছরের নির্যাতন করে অফিসারের উপলব্ধি কি? প্রতিদিনের নিত্য সেই একই ধরপাকড়, অভিযান, টর্চার, এনকাউণ্টার, মারধোর, জিজ্ঞাসাবাদ - সব মিলিয়ে কি পেয়েছেন ভিকাস সাহেব ?  তিনি জবাব দেন, সব কিছুর ক্লান্তি আছে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বশীর বিশ্বাস করেন, কর্নেল সাহেব কথাগুলো অন্তর থেকে বলেছিলেন।  তার মতে, আসলে ভারত সরকার নিজেদের শক্তিশালী প্রমাণ করার জন্য এই অবস্থা করেনি। এই হলো  প্রতিশোধের যুদ্ধ। 'তুমি একজন মারবে তো আমি তোমার চারজনকে শেষ করে দিবো'।  বছরের পর বছর জুড়ে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার সংঘাতে জর্জরিত কাশ্মীর উপত্যকা।  বশীর বাবা খুঁজে পেয়ে সেই অফিসারকে আবার ফোন করেন। তিনি এখন কোলকাতায় পোস্টিং। পরিবারের কুশল জিজ্ঞেস করেন।  এবং ধন্যবাদ দিয়ে জানান "আপনি যেদিন আমাকে বলেছিলেন, বশীর তুমি ধরা পড়েছো বলে বেঁচে গেছো, তক্ষুনি আমি বুঝেছিলাম যে আমি হয়তো মা্রা পড়বো না।  আপনার সেই কথাটি আমাকে আশা জাগিয়েছিল। ...ইনশাল্লাহ, বেঁচে থাকলে দেখা হবে।" 

প্রায় পঁচাশি মিনিটের এই তথ্যচিত্র কাশ্মীরের জনগণের দুঃসহ নিরাশার অভিজ্ঞতার মধ্যে শেষপর্যন্ত আশার কথা বলে। কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ'র সুপারিশে একসময় বাশারাতের পাসপোর্টের অনুমোদন হয়। পুরো শহরে যেন আনন্দ বয়ে যায়। বশীর বাবা ছেলের এই সংবাদের জন্য বিরাট আপ্যায়নের আয়োজন করেন।  প্রিসিলা ব্রাজিলের একটি জার্সি উপহার দেয় বাশারাত কে যেখানে লেখা থাকে 'জন্ম ফুটবলের জন্য'  যা ব্রাজিল দলের শ্লোগান।  প্রিসিলার মাতৃতুল্য ভালবাসায় বাশারাত আনন্দে কেঁদে ফেলে। প্রিসিলা জানায়, এটাই ছিল মার্কোস আর তার স্বপ্ন, সমস্ত কাশ্মীরের তরুণ যেন তার নিজের স্বপ্নের কাছে পৌঁছুতে পারে। এ যেন বাশারাতের জয় নয়, কাশ্মীর উপত্যকার হাজারো তরুণের দুঃসময়ের ক্রান্তিকাল পেরিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার জয়। বাশারাত ব্রাজিলের ভিসা'র জন্য অপেক্ষা করে। এদিকে মার্কোস ও প্রিসিলা আরও এক বছর থাকার অনুমতি পায়।  তারা আবার মাঠে ফিরে যায়, নতুন কোন বাশারাতের স্বপ্ন পুরনের পথ নির্মাণ করতে। কিন্তু সংকট কাটিয়ে সমগ্র কাশ্মীর কি নতুন আশায় উঠে দাঁড়াতে পারবে, ভবিষ্যতে? প্রশ্ন তবু থেকে যায়।   

লেখক: রফিকুল আনোয়ার (রাসেল)
খণ্ডকালীন শিক্ষক, 
ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

(লিখাটি পূর্বে জুম ইনের দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল)  


Rafiqul Anowar Russell

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল ১৯৯৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় তার সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, রাসেল ছাত্র থাকা অবস্থা থেকে বিভিন্ন ভূমিকায় চলচ্চিত্র চর্চায় সংযুক্ত। কখনো ফিচার লেখক, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, চিত্রনাট্য, কখনো প্রযোজনায় তিনি সংযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। পরবর্তী সময়ে অডিও ভিশুয়াল প্রতিষ্ঠান ‘অযান্ত্রিক’ গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ নির্মাতা রাসেলের আত্মপ্রকাশ ২০০৮ সালে, ১১ মিনিটের শর্ট ফিকশন ‘হাইজ্যাক’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। এরপর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ এন ব্রাদার্স প্রোডাকশনস থেকে ২০১২ সালে তিনি তৈরি করেন আরেকটি ছোট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ১১ মিনিটের ‘ফান।’ ২০১৪ সালে ‘দ্য অ্যাডভাঞ্চারার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রফিকুল আনোয়ার রাসেল জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। দেশ ব্যাপী নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা - শর্টফিল্ম’ বিভাগে ১ম স্থান লাভ করে। ২০১৫ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর সামুরাই মারুফ পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেসিডোনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা’র মধ্য দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি গল্প, ফিচার, ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালিখির কাজ করে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে বাস করেন।