সখী, ভালোবাসা কারে কয়!

img

১৪ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস। ভালবাসা শব্দটার অর্থ অনেক ব্যাপক হলেও এই ভালবাসা দিবসটা মূলত প্রেমিক প্রেমিকা যুগলের প্রেমের জন্যই বেশি পরিচিত। জীবনে একবারও প্রেমে পড়ে কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছে হয়নি আজকের দিনে এমন মানুষের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া সত্যি কষ্টসাধ্য। অথচ প্রেমের সংজ্ঞা কি কিংবা সত্যিকার প্রেমের উদাহরণ কোনগুলো অধিকাংশ মানুষের কাছে সেটাই অজানা। । অনেকের কাছে ভালবাসার মানে কাউকে মিস করা বা কারো জন্য কিছু সেক্রিফাইস করা হলেও ভালবাসার মানুষকে নিজের করে আপন করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হল আমার  কাছে  প্রেম। আবার সত্যিকারের প্রেমের উদাহরণ দিতে গেলেই সবাই মোটামুটি লাইলি-মজনু, শিরিন-ফরহাদ কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের মতন উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের প্রেম কাহিনীকে সামনে নিয়ে আসেন। একইভাবে, বাস্তব প্রেম-কাহিনীর কথা বলতে গেলে নিয়ে আসেন প্রশ্নবিদ্ধ শাহজাহান-মমতাজের প্রেমের কাহিনী। যে শাহজাহান মমতাজকে বিয়ে করার জন্য হত্যা করেছিলেন মমতাজের প্রথম স্বামীকে! আবার মমতাজকে বিয়ের ১৫ বছর পর ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যখন মমতাজ বেগমের মৃত্যু হয়, স্বামী শাহজাহান আবার বিয়ে করেন মমতাজের ছোট বোনকে এবং দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ২০০০০ শ্রমিককে দিয়ে মমতাজ বেগমের স্মৃতি রক্ষার্থে পরবর্তিতে বানিয়েছিলেন অনিন্দ্য সুন্দর তাজমহল।

প্রথম উদাহরণটি ভারতের বিহার রাজ্যের দরিদ্র দিনমজুর দশরথ দাস মাঝির। যিনি থাকতেন গেলর গ্রামের একটা পাহাড়ের পাদদেশে, আর কাজ করতেন পাহাড়ের অন্যপাশে। প্রতিদিন দুপুর হলেই তাঁর বউ ফাল্গুনী দেবী স্বামীর জন্য দুপুরের খাবার আর পানি নিয়ে যেতেন পাহাড় ডিংগিয়ে অন্যপাশে। যেই পাহাড়টার জন্য কাছের শহরে এবং হাসপাতালে যেতে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হত। একদিন স্বামীর জন্য খাবার পৌঁছে দিতে যাওয়ার সময় সেই পাহাড়ে হোঁচট খেয়ে নিজের প্রিয়তম স্ত্রী অসুস্থ হয়ে যান। এরপর থেকে স্ত্রীর খাবার আনা নেয়ার কষ্ট লাঘবের জন্য অতি বিশাল পাহাড়টার মাঝখানে কেটে রাস্তা বানানোর কাজ শুরু করেন দশরথ মাঝি। এমন সময় হঠাৎ একদিন ফাল্গুনী দেবী আরো বেশি অসুস্থ হয়ে গেলেও পাহাড়টার কারণে হাসপালের দুরত্ব বেশি হওয়ায় পথিমধ্যেই মারা যান ফাল্গুনী দেবী। সেই থেকে একাই ছেনি, বটি আর কুড়াল দিয়ে টানা ২২ বছর কাজ করে পাহাড়ের মাঝখানে ৩৬০ ফুট লম্বা ৩০ ফুট চওড়া আর ২৫ ফুট উঁচু রাস্তা বানান দশরথ মাঝি। যার ফলে ৫৫ কিলোমিটারের হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তা কমে হয়ে যায় ১৫ কিলোমিটার। তাঁর এই কৃতিত্বের জন্য উনি মাউন্টেইন ম্যান বা পাহাড়-মানব বলে পরিচিত। ২০০৭ সালে গলব্লাডার ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগে দশরথ মাঝি একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা থেকে পাহাড় কাটার কাজটা শুরু করেছিলেন, আর শেষ করেছিলেন সাধারণ জনগনের সুবিধার জন্য।

এবার বলব চীনের জু চাওকিং এবং লিউ গুওজিয়াং দম্পতির কথা। ঘটনার শুরু ১৯২৫ সালে, ১৬ বছর বয়স্ক লিউ গুওজিয়াং প্রেমে পড়েন তার থেকে ১০ বছরের বড় বিধবা নারী জু চাওকিং এর। চীনের তখনকার সমাজব্যবস্থায় এই দুই জনের বিয়েকে মেনে নিচ্ছিল না সমাজপতিরা, তাই বাধ্য হয়ে তারা দুইজনই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান অল্প দূরের একটা পাহাড়ের চূড়ায়। গাছ আর পাথর দিয়ে বানানো একটা বাড়িতেই সুখে শান্তিতেই কেটে যায় তাদের জীবনের প্রায় ৫০ টি বছর। সিঁড়িহীন সুউচ্চ পাহাড়ে উঠা স্ত্রী জু চাওকিং এর জন্য বিপদজনক এবং কষ্টকর হওয়ায় এই ৫০ বছর ধরে কৃষক স্বামী লিউ গুওজিয়াং পাথুড়ে পাহাড় খোদায় করে করে বানিয়েছেন ১৫০০ মিটার উঁচু ৬০০০ টা সিঁড়ি। ২০০১ সালের আগ পর্যন্ত পুরো পৃথিবী জানতই না এই অসাধারণ বাস্তব-প্রেমের কাহিনী। একদল পর্যটক এই ঘটনা জানানোর পর বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারে পুরো বিশ্ব। তার পরপরই এই কাহিনী অবলম্বন করেই বানানো হয় একাধিক সিনেমা। পাহাড়ের উপর পাথর আর গাছ দিয়ে বানানো বাড়িটাতে বানানো হয় ভালবাসার মিউজিয়াম আর ৬০০০ ধাপের সিঁড়িটা পরিচিতি লাভ করে ভালবাসার সিঁড়ি বা love ladder নামে। যা আজ থেকে হাজার হাজার বছর পরও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। 
ভালবাসার এমন বাস্তব গল্প থাকতে কেন শুধু শুধু কল্পনার চরিত্রকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসা?


Prashun Ghosh Roy

প্রসূন ঘোষ রায়

Researcher

১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্ম। বর্তমানে আমেরিকার সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কে রসায়নে পিএইচডি করছেন এবং ন্যানোমেডিসিন ড্রাগ ডেলিভারি নিয়ে গবেষনা করছেন। ২০১৬ -২০১৭ সেশনে "CUNY Science Award " পাওয়া এই লেখকের দুইটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। রাজনীতি , বিজ্ঞান এবং উৎসাহমূলক লেখা লিখতে ভালবাসেন তিনি।