স্টোরি টেলিং – জনপ্রিয় সিনেমা’র গল্প বলার রীতি

img

 


“আমি মনে করি না চিত্রনাট্য লেখা বলে সত্যিকার কিছু আছে। এ হলো আসলে গল্প বলতে পারা। মহান সাহিত্য লেখার চেয়ে ‘কখন তোমার চাচা হাঁস মারতে গেলো আর পাখিটা পালিয়ে গেলো’ এইসবই চিত্রনাট্যের অনেক বেশী প্রয়োজন হয়ে থাকে। একজন সফল চিত্রনাট্যকার হবার জন্য ভাষার উপর দক্ষতা থাকার দরকার পড়ে না। দরকার হলো ভালো গল্প বলার দক্ষতা রপ্ত করা”। - পল শ্রাডার (চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সমালোচক)

গল্প কি – লৌকিক, অলৌকিক 

সিনেমায় গল্প হল দর্শকের জন্য সত্যিকারের বিনোদন। প্রতিটি গল্পই একটি ধারণা বা আইডিয়া থেকে জন্ম নেয় । যে কোন চলচ্চিত্রের কেন্দ্র বিন্দুতে গিয়ে সেই ভাবনা’র দেখা পাওয়া যায়। চরিত্র ও কাহিনী সমন্বিত এই আয়োজনের ভেতর দিয়ে দর্শকের কাছে ধীরে ধীরে মূল ঘটনার প্রকাশিত হয়। প্রক্রিয়াটি কাকতালীয়ভাবে ঘটে না। প্রতিটি অ্যাকশন, চরিত্রাভিনয় এবং সংলাপের আঙ্গিক,গতিপ্রকৃতি দিয়ে চিত্রনাট্যকার গুরুত্বের সাথে গল্পটি বুনে থাকেন, যা দর্শককে  বিমোহিত করে রাখে। সাহিত্যের বিভিন্ন রূপ যেমন, পুরাণ, রূপকথা, উপকথা, পরীকাহিনী, গল্প গাঁথা, উপন্যাস, কিংবা চিত্রকলার মধ্যে দিয়ে নানা ধরনের কাহিনী আমাদের মনের জগতে স্থান পেয়েছে । এমনকি যা আমরা আপাত অর্থে বিশ্বাস করি না, সেই আষাঢ়ে বা ভূতুড়ে গল্পও আমরা শুনে অভ্যস্ত। ছোটবেলায় দাদু-নানুদের গল্পের ঝুলি থেকে দৈত্য-দানো, ভুত-পেত্নী, কিংবা জীব-জন্তুর মানুষের মতো করে কথা বলার গল্প শুনেছি।  নানা ধরনের  গল্পের এক ধরনের আর্কিটাইপ আমাদের মাথায় থাকে। ফলে যেকোনো আইডিয়া বা ধারণা থেকে তৈরি হওয়া সিনেমার গল্প আমরা বুঝে নিতে পারি। দর্শক সিনেমা হলের দুই-তিন ঘণ্টা সময় ধরে সুখদুঃখ, হাসিকান্না নয়তো উত্তেজনা -ভীতি নিয়ে গল্প শোনা ও দেখার যাত্রা শুরু করে। সভ্যতার ইতিহাসের নানা ধরনের কাহিনী বা গল্পের সম্যক জ্ঞান বা পণ্ডিত হওয়া ব্যতিত চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কার পক্ষে সফল চিত্রনাট্যকার হওয়া সম্ভব নয়। একসময় যেমন হোমার ইলিয়াড ও অডিসির গল্প বলে গেছেন, বাল্মিকি রামায়ন ও মহাভারতের – তেমনি চলিচ্চিত্রকার হলেন আধুনিক সময়ের ‘গল্পবুড়ো’ বা ‘স্টোরি টেলার’। তাই জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী চিত্রনাট্যের গুরুত্ব অপরিসীম।   

“একটি শক্তিশালী চিত্রনাট্য নিয়ে ভাল পরিচালক অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন; একজন সাধারণ পরিচালক একই চিত্রনাট্য থেকে চলনসই ফিল্ম বের করে আনতে সক্ষম হোন। কিন্তু কোনো নিম্ন মানের চিত্রনাট্য থেকে একজন শক্তিশালী চলচ্চিত্রকারের ভাল চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। সত্যিকারের দৃশ্যায়ন ধারন করতে হলে, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের আগুন ও পানিকে অতিক্রম করার ক্ষমতা থাকতে হবে - যেন একটি উন্নত সিনেমা তৈরি হয়। চিত্রনাট্যের সেই ক্ষমতা থাকতে হবে যার জন্য সবাই এককথায় ঝাঁপিয়ে পড়বে”।  - আকিরা কুরোসাওয়া (চলচ্চিত্র পরিচালক) 

গল্প নির্মাণ – কাঠামোগত সুবিধা 

চিত্রনাট্যের হৃৎপিণ্ড হলো গল্প। চলচ্চিত্রে কাহিনী ও নাটকীয়তার মাধ্যমে গল্প বলার  যে ধারা এখন পর্যন্ত যে জনপ্রিয় তা একদিনে তৈরি হয় নি। নানা আন্দোলন এবং শিল্পরীতিতে চলচ্চিত্রের এই আকর্ষণীয় ও মোহনীয় গল্প বলার ধরণকে অনেক চলচ্চিত্রকার চ্যালেঞ্জ করেছেন। কাহিনী ও চরিত্রের মনোজগতের  সমন্বিত  নাটকীয়তাকে বাদ দিয়ে মাধ্যমটির অন্যান্য অনুসঙ্গ  যেমন শব্দ ও দৃশ্যকল্প, গতি ও আঙ্গিকের আবহ ইত্যাদির মাধ্যমে চলচ্চিত্র’কে প্রকাশ করার নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু সেই নন-ন্যারেটিভ চলচ্চিত্রের দর্শক এখনো পৃথিবীতে অল্প। সারা পৃথিবীতে আমরা গল্প ও কাহিনী’র প্রেমে পড়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপভোগ করে থাকি।  

একটি সফল চলচ্চিত্র নির্মাণে গল্প বলার নির্দিষ্ট কোন গঠন কৌশল বা আঙ্গিক নেই। তবে মূল বা জনপ্রিয় ধারা’র চলচ্চিত্র প্রায়শই তিন অঙ্কের (Three Act) কাঠামোটি অনুসরন করে। প্রথম (Set Up) , দ্বিতীয় (Confrontation) ও তৃতীয় (Resolution)  - তিনটি অঙ্কে পুরো গল্পটিকে সাজানো হয়। প্রথম অঙ্কে পটভূমি, চরিত্র পরিচিতি এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা সমূহ তুলে ধরে। এই অংশে (Set Up) দর্শক গল্পের কাহিনী, পাত্র-পাত্রী এবং গল্পের প্রোটাগনিস্ত বা কেন্দ্রীয় চরিত্র কে খুঁজে পায়। এই প্রথম অঙ্কের শেষের প্রান্তে এসে একটি ব্যতিক্রম ঘটনার সুত্রপাত হয়, চিত্রনাট্যের শিক্ষক রবার্ট ম্যাকি’র ব্যাখায় এ হলো উদ্দীপ্ত ঘটনা ( Inciting Incident ) । এই ঘটনার সুত্রপাত নায়কের ( কেন্দ্রীয় চরিত্র ) স্বাভাবিক জীবনকে অকস্মাৎ এলোমেলো করে দেয়। এখান থেকে নায়কের নতুন যাত্রা শুরু হয়, চিত্রনাট্যের ভাষায় একে বলে - বীরের অভিযান (A Hero’s Journey)। এই উদ্দীপ্ত ঘটনা ( Inciting Incident ) কাহিনীর নানা মোড়ে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকে। মেট্রিক্স (১৯৯৯) সিনেমা’র এই উদ্দীপ্ত ঘটনাটি হল, নীও ( কিয়ানু রিভস ) যখন বন্ধুদের মাধ্যমে মেট্রিক্স-এর সুশৃঙ্খল মায়াবী পৃথিবী থেকে বাস্তবতার পৃথিবীতে প্রবেশ করে, যেখানে মানবসভ্যতা সঙ্কটাপন্ন। এজেন্ট’রা তাঁকে ধরার জন্য খুঁজছে। নীও বুঝতে পারে, তার আর ফিরে যাবার উপায় নেই। তাঁকে এই অভিযান শেষ করতে হবে, এরপর তার মুক্তি এবং সে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে। দর্শকও নীও’র এই অভিযানে সঙ্গী হয়। দর্শক জানতে চায়, কি করে সিনেমার নায়ক (নীও) এই পতিত সংকট থেকে মুক্ত হবে। চিত্রনাট্য বিশেষজ্ঞ সীড ফিল্ড এই অংশটিকে বলছেন, ‘প্লট পয়েন্ট ১’ । এখানে থেকে আমরা গল্পের দ্বিতীয় অঙ্কের দিকে এগুতে থাকি। 
 
দ্বিতীয় অঙ্কে পুরো সময়ে নায়ক তার উদ্দীপ্ত ঘটনার কারনে পতিত পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে, পূর্বেকার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবার সংগ্রাম করেন। দ্বিতীয় অঙ্কে (Confrontation) নায়ক নানা ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, বাধা-বিপত্তির ভিতর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে সংকটের কেন্দ্র বিন্দুতে এসে পৌঁছায়, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে শেষ বা চরম ক্লাইমেক্স। এই ধাপটি উত্তেজিত দর্শকের অবস্থান নাড়িয়ে দিতে পারে। ‘A Fistful of Dollars (১৯৬৪) সিনেমায় - এই সময় নায়ক ( ক্লিনট ইস্টউড ) ভিলেন গোষ্ঠীর হাতে ধরা পড়ে মার খায় এবং তাঁকে এক প্রকার নিঃশেষ করে দেয়া হয়। দর্শক ভেবে নিতে পারে, সে বোধহয় আর পারলো না। নির্মাতা গল্পের প্রয়োজনে দর্শকের আবেগ নিয়ে খেলা করেন। দর্শকও এক্ষেত্রে তার আবেগ’কে সিনেমার গল্পের সাথে জুড়ে দিয়ে বিনোদন পান, অপেক্ষা করে।      

তৃতীয় বা শেষ অঙ্কের শুরু হয়, ক্লাইমেক্স এর চূড়ান্ত পর্যায় থেকে। এটা হল ‘প্লট পয়েন্ট ২’ - এখান থেকে দর্শক আবার গল্পে ঢুকে পড়ে, নায়কের সাথে সংগ্রামে জয়লাভ করার আশায় বুক বাধে। এখান থেকেই সিনেমা তার পরিণতির (Resolution) দিকে এগোয়।   জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’ (১৯৭৫) ছবিতে ডাকু গব্বর সিং এর লোকেরা রামগরের এক অন্ধ মৌলানা’র ছেলেকে খুন করে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে লাশ গ্রামে ফেরত পাঠায়। এই নৃশংস ঘটনায় পুরো গ্রাম শোকাহত। এহমেদ মিয়ার মৃত্যু যেন ভীরু নিরীহ মানুষের আশা ও স্বপ্নের মৃত্যু। ভয়ে আতঙ্কে গ্রামবাসী হাল ছেড়ে দিতে চায়, কিন্তু তা হয় না।  সিনেমার এই পর্যায়ে এসে  কাহিনী, চরিত্র ও দর্শক সবাই এক হয়ে যায়। সবার তখন একটাই চাওয়া – ‘ডাকু গব্বর সিং এর ধ্বংস”। এরপরের কাহিনী - গব্বর ধ্বংস হল, জয়দেব বীরের মতো প্রান দিল, ঠাকুরের পরিবার হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হল আর বিরু, তার প্রেমিকা বাসন্তিকে নিয়ে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালো।  গল্পের শেষ অঙ্কে এসে সংকট থেকে কেন্দ্রীয় নায়ক মুক্ত হয়ে পূর্বেকার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় – কিংবা নতুন সুন্দর শৃঙ্খলিত জীবনের পথে এগিয়ে যায়, বাংলা ভাষায় আমাদের গল্প যেমন শেষ হয় – অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল।                                 
গল্পের প্রাপ্তি ও দর্শক – অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি   

সিনেমায় বলা বা দেখা সব গল্প সত্যি হয় না, আবার মিথ্যাও ধরে নেয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে আকিরা কুরোসাওয়া পরিচালিত ‘রশোমন’ (১৯৫০) ছবির গল্পটা নিয়ে বলি। এই ছবিতে কয়েকজন চরিত্র বসে একটি ধর্ষণ ও একটি খুনের ঘটনা নিয়ে আলাপ করছে। দেখা গেলো - পুরোহিত, কাঠুরে, নারী, দস্যু ও মৃত আত্মা সবাই একই ঘটনার ভিন্ন ধরনের বর্ণনা দিয়েছে। সবাই নিজেদের মতো করে গল্পটা বলে গেলো । ঘটনাটা যেভাবে তারা বিশ্বাস করেছে, সেই ভাবে সত্যটা জানালো যদিও সবার একই রকম হলো না। তারা যে মিথ্যে বলেছে তা নয়। কিন্তু একই ঘটনার সত্যতা তাদের কাছে নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এইভাবে, কুরোসাওয়া আসলে সত্যকে প্রশ্ন করেন না, প্রশ্ন করেন বাস্তবতাকে। বাস্তবতা মানুষের শ্রেণী, অবস্থান, সময়, চিন্তা ভেদে ভিন্ন হবেই। চলচ্চিত্রের গল্প ও আমাদের কাছে একই সত্যে’র নানা রূপ নিয়ে আসে। একই আইডিয়া বা ঘটনার নির্মাতাভেদে, আমাদের কাছে নানারূপে হাজির হয়। প্রতিটি গল্পের বুননে থাকে আমাদের জন্য নতুন চমক, নতুন অভিজ্ঞতা; আর সেটাই সিনেমা।                                          

দর্শকের দিকে থেকে ন্যারেটিভ চলচ্চিত্র বা কাহিনীচিত্রের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সিনেমা’র মাধ্যমে নতুন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি । যে সময়কে আমরা দেখিনি, এমনকি যে মানুষের কথা আমরা জানতাম না, চলচ্চিত্র সেই পরিবেশ বা কাহিনীও আমাদের কাছে দেখায়। যে কোন চলচ্চিত্র তা সায়েন্স ফিকশন হোক, ইতিহাসভিত্তিক কিংবা  থ্রিলারধর্মী হোক - আমাদের নতুন এক বাস্তবতা বা পরিবেশের অভিজ্ঞতা দিয়ে থাকে। 

সাধারনভাবে এই অভিজ্ঞতা আমরা তিন-ভাবে পেয়ে থাকি। একটি নতুন, দুর্দান্ত ও অপ্রত্যাশিত কাহিনী বিন্যাসের মাধ্যমে। যেমন - স্টেনলি কুবরিক- এর ‘২০০১, অ্যা স্পেস অডিসি’ (১৯৬৮) কিংবা আব্বাস কিয়ারোস্তামি’র ‘ক্লোজ আপ’ (১৯৯০) চলচ্চিত্র টি। ‘ক্লোজ আপ’ শুধুমাত্র ইরান নয়, পৃথিবীর মানুষের কাছে এই চলচ্চিত্র ছিল তথ্যচিত্র ও কাহিনীচিত্রের সমন্বয়ে একটি নতুন ও অপ্রত্যাশিত গল্প শোনার আয়োজন। এটি জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্র না হলেও, এই চলচ্চিত্র তরুণ ও নানা দেশের সমকালীন চলচ্চিত্রকারদের কাহিনী নির্মাণে অনুপ্রানিত করেছে। 

দ্বিতীয় পর্যায়ে, আমরা  ধারণা করতে পারি এমন কাহিনিচিত্র উপভোগ করতে চাই। কাহিনী দর্শকের কাছে অপ্রত্যাশিত থাকে না। শেষ দৃশ্যে ‘সত্যিকার প্রেমের জয়’ হবে ; ‘ অন্যায় করে কেউ পার পায় না’ কিংবা  ‘খারাপ লোক আর থাকবে না’ – এই ধারণাগুলো  মাথায় নিয়ে দর্শক চলচ্চিত্রটি গ্রহণ করে - যদি সেটা নতুন কোনো গল্প, কাহিনী বা দৃশ্যায়নের  অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দর্শক-কে নিয়ে যেতে পারে। এটা রূপকথাও হতে পারে, আবার এমন কি হালের জনপ্রিয় মাসালা সিনেমাও হলেও, দর্শকের আপত্তি থাকে না। ‘আভেটর’ সিনেমাটি দর্শক নিয়েছে, এমন’না যে কাহিনী সম্পর্কে তাদের কোন প্রত্যাশিত প্রাক-ধারণা ছিল না। সিনেমার শেষে অবশ্যই ভিলেন মরবে। এই ছবির বাণিজ্যিক সফলতা কারণ  - কাহিনীর আইডিয়া, বিন্যাস, দৃশ্যায়ন, ধ্বনি ও ভিজুয়াল স্পেশাল ইফেক্ট - যা দর্শককে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বিস্মিত ও মুগ্ধ করে রেখেছে। যদিও এই কাহিনীর পরিণতি প্রত্যাশিত কিন্তু অভিজ্ঞতাটা একেবারেই নতুন।

আগেই বলেছি – আমাদের মস্তিষ্কে, কল্পনায় বা চিন্তা জগতে  নানা ধরনের গল্প থাকে জমা থাকে। অনেক কাহিনীর বিন্যাস ও পরিণতিও আমরা জানি। যেমন ‘ বেহুলা লখিন্দর’ এর গল্প আমাদের জানা। এই নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলে দর্শক দেখতে চাইবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দর্শক দেখতে বা জানতে চাইবে-  কেমন করে গল্পটা বলা হলো। যেকোনো গল্পই আমাদের কল্পনায় ভিসুয়াল একটি ইমেজ নির্মাণ করে। দর্শক ভেদে অবশ্যই তা ভিন্ন হয়। নির্মাতাকে তখন এমন একটি গল্প ও অভিজ্ঞতা’র আঙ্গিক দর্শককে উপহার দিতে হবে, যা সাধারণভাবে দর্শকের ধারনায় ছিল না। সিনেমায় মানুষ যে কোনো কিছুর পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। নকল বা অনুকরন বা পুরনো অভিজ্ঞতাকেও বার বার দেখতে চায় না। পুরনো আইডিয়া বা গল্প হলেও তার আধুনিক, মননশীল বা আকর্ষণীয় উপস্থাপন না হলে সে গ্রহণ করে না । এক্ষেত্রে, বিশাল ভরদ্বাজ এর শেক্সপিয়ার ট্রিলজি ‘মকবুল’ (২০০৪) , ‘ওমকারা’ (২০০৬) ও ‘হায়দার’ (২০১৪) এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর ট্রাজেডি’র মধ্যে যথাক্রমে মেকবেথ,ওথেলো এবং হ্যামলেট এর কাহিনী গত চারশো বছর ধরে নানা বাস্তবতার নিরিখে সমকালীন হয়ে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। চলচ্চিত্র জগতেও গত একশত বছরে মূল নাটকের অনেক অ্যাডাপটেশন দর্শক উপভোগ করেছে। এর গল্প, আঙ্গিক বা ট্রিটমেন্টের প্রায় অনেক কিছু সিরিয়াস দর্শক মাত্র জানা আছে। গল্প জানা থাকলেও, একবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষের বাস্তবতায় বিশাল ভরদ্বাজ নিবেদিত শেক্সপিয়ারের নাটকের প্রতিটি চলচ্চিত্রায়ন আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা প্রদান করে। একই সুর যেন অন্য কাহিনী, বাস্তবতা আর পরিণতি নিয়ে আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক হয়ে উপস্থাপিত হয়। এটাই নির্মাতার শ্রেষ্ঠত্ব।  

মূলধারা বা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের একটাই উদ্দেশ্য – বিনোদন। বিনোদন পেতে মানুষের কাছে শ্রেষ্ঠ শিল্প মাধ্যম ‘চলচ্চিত্র’। আর এই  বিনোদনের জন্য দৃশ্যধারন, শব্দ, সুর, চরিত্র, স্পেশাল ইফেক্ট, থ্রী-ডি অ্যানিমেশন, নানা ‘মিজ ও সিন’ (Mise En Scene) এর আয়োজনে দর্শকের কাছে যা উপস্থাপন করা হয়, তা হল স্বপ্ন ও বাস্তবতার একটি গল্প। চলচ্চিত্রে এই গল্প বলার ক্ষমতা নিয়ে রবার্ট ম্যাকি বলেন, 
 
‘ভালো গল্প’ হলো এমন কিছু বলা, যা শোনার জন্য পৃথিবী অপেক্ষা করছে। গল্পটি খুঁজে বের করা তোমার একার কাজ...কেবল সমস্ত আবেগ, বীরত্ব বা সৃজনশীল ক্ষমতা দিয়ে দারুন একটি কাহিনী, তার অসাধারণ চরিত্রদের এবং একটি ভুবন নির্মাণ করা – শুধু এটুকু হলেই হবে না। প্রধান লক্ষ্য হতে হবে, সুন্দর গল্পটি যথার্থভাবে বলতে পারা”।


Rafiqul Anowar Russell

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল ১৯৯৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় তার সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, রাসেল ছাত্র থাকা অবস্থা থেকে বিভিন্ন ভূমিকায় চলচ্চিত্র চর্চায় সংযুক্ত। কখনো ফিচার লেখক, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, চিত্রনাট্য, কখনো প্রযোজনায় তিনি সংযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। পরবর্তী সময়ে অডিও ভিশুয়াল প্রতিষ্ঠান ‘অযান্ত্রিক’ গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ নির্মাতা রাসেলের আত্মপ্রকাশ ২০০৮ সালে, ১১ মিনিটের শর্ট ফিকশন ‘হাইজ্যাক’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। এরপর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ এন ব্রাদার্স প্রোডাকশনস থেকে ২০১২ সালে তিনি তৈরি করেন আরেকটি ছোট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ১১ মিনিটের ‘ফান।’ ২০১৪ সালে ‘দ্য অ্যাডভাঞ্চারার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রফিকুল আনোয়ার রাসেল জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। দেশ ব্যাপী নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা - শর্টফিল্ম’ বিভাগে ১ম স্থান লাভ করে। ২০১৫ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর সামুরাই মারুফ পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেসিডোনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা’র মধ্য দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি গল্প, ফিচার, ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালিখির কাজ করে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে বাস করেন।