দাদা কিভাবে শত বছর বেঁচে রইল !

img

২০১৬ সালের মে মাসে দাদাবাদের ১০০ বছরপূর্তি উপলক্ষে আর্টসি ইডিটোরিয়ালে ক্যারেন কেডমি’র লিখা “দাদা কিভাবে শত বছর বেঁচে রইল!” প্রকাশিত হয়। ইপ্রকাশের পাঠকদের জন্যে লিখাটির ইপ্রকাশ অনুবাদ ফ্যাক্টরির করা তর্জমা প্রকাশিত হল।

 “দাদাবাদ মানুষকে কিভাবে হানাহানি ছেড়ে শান্তির পথে আসার কথা বলে?” প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উগ্র ধ্বংস-যজ্ঞের প্রেক্ষাপটে, ১৯১৬ সালের এক গ্রীষ্মে কবি, গায়ক, এবং নাট্য-প্রযোজক হুগো বল তা বাতলে দিয়েছিলেন। “দাদাতত্ত্ব  কিভাবে মানুষের মনে স্থান পাওয়ার কথা বলে?...সংবাদ-পুলিশ মন, বিবেকের অন্তর্দহন, কেবল সুন্দর ও সত্যের জয়গান, কাঠ-মৌলিকতা, নিয়মের অধীনতা, মনোজগতে ইউরোপ উপনিবেশ, স্বল্পপ্রাণ-নিষ্ঠ চিন্তার সকল রাহু থেকে কিভাবে দাদা  মুক্তি দেয়?” নৈরাজ্যের এই স্পিরিটে, আজ থেকে ১০০ বছর আগে জুরিখ শহরে দাদা নামক একটি নতুন শৈল্পিক এবং সাহিত্যিক আন্দোলনের আবির্ভাব হয়েছিল।

চলতি বছর সারাবিশ্বে দাদাতত্ত্বের শতবর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। ভলতেয়ার হলসহ জুরিখ শহর কর্তৃপক্ষ নগরের বিভিন্ন জায়গায় ১৫০টিরও বেশি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে; হল ভলতেয়ার হুগো বল প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটি দাদা আন্দোলনের জন্মভূমি হিসেবে পরিগণিত হয়। নিওয়র্কে, মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট (MoMA) কবি ও দাদাবাদের কো-ফাউন্ডার, ত্রিস্তান জারা’র অলিখিত কাব্য-সংকলনের উপর মূলত ৪০ জনেরও বেশি আর্টিস্টের কাজ নিয়ে করা “Dadaglobe Reconstructed” নামক একটি একজিবিশনের আয়োজন করে।

এখন প্রশ্ন হল দাদাবাদ আসলে এমন কি জিনিস!

দাদা! কি?

দাদা ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন। এটি তখনই আবির্ভাব হয় যখন জাতীতাবাদী রাজনীতি, দমনমূলক সামাজিক মূল্যবোধ, প্রথাগত রীতি অনুসরণ, এবং অতি কারণ ও যুক্তি নির্ভরতা জর্জরিত আধুনিক সমাজের উপর শিল্প দিয়ে বল, জারা, জিন আর্প, এবং মার্সেল জ্যানকোসহ জুরিখ-কেন্দ্রিক একদল শিল্পী ও কবি  সর্বাত্মকভাবে আঘাত হানেন। তারা মহাদেশ জুড়ে যুদ্ধের বর্বর ধ্বংসজজ্ঞের জন্যে এই সমাজ ব্যবস্থাকে দায়ী করেছিলেন। সমাজের প্রতি এই অভক্তিপূর্ন মনোভাব তাদের আর্ট, পারফর্মেন্স, কবিতা, ম্যানিফেস্টো, এবং তারা আরো যে সকল কাজে যুক্ত ছিলেন সবকিছুর উপরে প্রভাব ফেলে। বল দাবি করেছিলেন “দাদা শিল্পের একটি নতুন প্রবণতা,”। তিনি আরো বলেছিলেন “ এখনো পর্যন্ত, এটা সম্পর্কে কেউই জানে না, এবং ভবিষ্যতে জুরিচখে সবাই এটা নিয়েই আলাপ করবে।”

শিল্পের এই নতুন প্রবণতা জুরিখ থেকে পশ্চিম ইউরোপের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে এবং মার্সেল দুসাম্প এবং ফ্রান্সিস পিকাবিয়ার নেতৃত্বে নিওয়র্কে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পীদের দূর্বল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দাদাবাদ দিয়ে সংঘটিত হয় কেবল স্টাইলের ঐক্যে নয়, বরং অসঙ্গতি, দৈব-ঘটনা, সহজজ্ঞান, অর্থহীনতা, এবং হিউমার নির্ভর কাজের ভিতর দিয়ে মিলিত মতক্যের ভিত্তিতে শিল্প ও সমাজ উভয়ের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। শিল্প আন্দোলনের নামের উপরেও তাদের মতাদর্শের প্রভাব পড়েছিল, যেটি একটি বহুদার্থক নন-সেন্স শব্দ। তাই তো বল লিখেছিলেন, “ ফরাসী অর্থে দাদা মানে “Hobby Horse” (একটি বেবি টয়)। জার্মান অর্থে “Good-by” (বিদায়), ‘সমালোচনা বন্ধ কর’, ‘পরে দেখা হবে’।” দাদা মানে সব অর্থ, এবং কোন অর্থই না আসলে।

দাদাবাদী! কারা ?

দাদাবাদ আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় আর্টিস্ট দুসাম্প শিল্প-বিনির্মাণে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করার পক্ষে সমর্থন দেন যা বিংশ শতকের শিল্পীদের জন্যে পুরোপুরি প্রেরণাদায়ক প্রমাণিত হয়-এবং তা আজতক শিল্পীদের পথ দেখাচ্ছে। তার সব চেয়ে মৌলিক কাজ গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল FOUNTAIN (ফোয়ারা), এটা একটা মূত্রাধারকে(ইউরিনাল) উল্টে রেখে তৈরি করে R. Mutt লিখে সাইন করা এবং ১৯১৭ সাল লিখা। দুসাম্প এধরনের খুঁজে পাওয়া ফেলনা জিনিসপাতিকে ‘রেডিমেড’ নামে দিয়েছিলেন, এগুলোর কনটেক্সটকে মূলত পরিবর্তন করে তিনি  শিল্পে রূপান্তর করতেন। “আমার মূলত আইডিয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল-কেবল চাক্ষুস বস্তুতে নয়।” তিনি একবার প্রথা-বিরোধী মনোভাবে এটি বলেন, যা দাদাবাদের তাত্ত্বিক পূর্ভাবাস দিয়েছিল।

এনডি ওয়ারহল এবং পপ আর্টিস্টদের আবির্ভাবের কয়েকবছর আগে – প্রাত্যাহিক জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রকে তাদের শিল্প-নির্মাণে ব্যবহার করে –দাদাবাদীরা আধুনিকতার সাইন ও সিমবলের সমালোচনা  এবং ভেঙ্গে চুরমার করেছিলেন। হ্যানওভার-ভিত্তিক দাদাবাদী আর্টিস্ট Kurt Schwitters একবার বলেছিলেন “যত যাই না করা হচ্ছিলো তবুও সবই ভেঙ্গে পড়ছিলো এবং ভাঙ্গা অংশ থেকে নতুন কিছু তৈরি করতে হচ্ছিলো।” Kurt Schwitters ফেলে দেয়া কাপড়-কাগজ সেঁটে এবস্ট্রাকট এবং সেমি-এবস্ট্রাকট কোলাজ কম্পোজিশন তৈরি করেছিলেন। বার্লিন-ভিত্তিক আর্টিস্ট Hannah Höch কোলাজ এবং ফটোমন্তাজ তৈরি করেছিলেন, তিনি সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের টেক্সট এবং ইমেজকে ব্যবহার করতেন, Weimar government এর তীব্র উপহাসমূলক সমালোচনা করার জন্যে তিনি “Cut with the Kitchen Knife Dada through the Last Weimar Beer Belly Cultural Epoch of Germany (1919–20)” এ সাজিয়েছিলেন। Höch এর কাজে বার্লিনে দাদার রাজনৈতিক ঝাঁজের বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায়, যার সর্বোচ্চ প্রকাশ পাওয়া যায় ১৯২০ সালের আন্তর্জাতিক দাদাবাদ ফেয়ারে, সেখানে একজন জার্মান কর্মকর্তার প্রতিকৃতিতে শুকরের মাথা সংযোজন করা হয়েছিল।

দাদা! কেন?

১৯২৪ সাল নাগাদ এসে, দাদাবাদ হোঁচট খেল। যদিও এটি স্বল্পকালীন আন্দোলন ছিল, এটির জের ছিল বেঢপ। এটি সুররিয়ালিজমের নিশ্চেতন এবং রহস্যময় পৃষ্ঠপোষকতার পক্ষে জোর দেয়, যেটা পরবর্তীতে দাদা’র পতনে কাজ করে। কিন্তু দাদাবাদের প্রভাব ২১ শতক পর্যন্ত বেশ ভালো ভাবেই বিস্তৃত হয়। তাদের ভাংচুর এবং পরীক্ষণে, দাদাবাদীরা কাজের ধরণ এবং আর্টের ফর্ম যেভাবে তৈরি করছিল তা হয় আভাস দিচ্ছিল অথবা সরাসরি অন্য কোন অধিক আর্টের আগমনী ইশারা দিচ্ছিল।

যেমন, ধরুন, Lorraine O’Grady এর তৈরী করা কাল্পনিক ব্যক্তি Mlle Bourgeoise Noire (1980–83), একজন ১৯৫০ সালীয় প্রচন্ড উত্তেজনাকর বিউটি কুইন ছিলেন, যিনি হয়ত কোন আর্ট গ্যালারীতে সাদা দস্তানার তৈরি গাউন পরে হাজির হয়ে, দাদাসুলভ সাহসীকতা এবং ধর্মবিদ্বেষী ভাব নিয়ে শিল্প জগতের স্থানিক রেসিজম এবং যৌনবৈষম্যের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন।

অথবা, আরো সাম্প্রতিকের, Maurizio Cattelan এর সলিড-স্বর্ণের তৈরি টয়লেট, যেটাGuggenheim মিউজিয়ামের বাথরুমে ব্যবহারের জন্য স্লেট পাথর দিয়ে বানানো হয়েছে। দুসাম্পের সমকালীন উত্তোরাধিকারী হিসেবে ধরা হয় এটিকে, Cattelan টয়লেট কমোডের জাকজমকতা দিয়ে পূর্বসুরী আর্টিস্টের কাজ FOUNTAIN এর স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে তুলেছেন এবং এই কাজটির প্রেক্ষিতে, তিনি বলেন, এই ধরনের চিন্তা থেকেই হয়ত  Picabia লিখেছিলেন, “Art is a pharmaceutical product for idiots.”

মূল লিখাটি পড়তে ক্লিক করুন

ইউটিউবে দাদাবাদ দেখুন  


Arts Feature Desk

ফিচার