কাব্যিক বাস্তবতাবাদের উন্মেষ।। ইরানি চলচ্চিত্রের আলোকপাত ও দুটি সাম্প্রতিক সিনেমা

img

একটি প্যারাডক্স হিসেবে ইরানি চলচ্চিত্রের বিশ্বজনীনতার সত্যিকারের উন্মেষ হয় নব্বুই এর গোড়ার দিকে। পশ্চিমা গনমাধ্যম তখন বিপ্লবোত্তর ইরানি চলচ্চিত্রের রুপরেখাকে ধুয়ে ফেলতে ব্যস্ত। তারা ইরানি জীবন এবং তার উৎসার, চলচ্চিত্র মাধ্যমকে মোল্লাতন্ত্রের বাক্সবন্দি হিসেবে চিত্রায়িত করে (বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট বুশ জামানায় যখন ইরানকে মৌলবাদ,বোমাবাজ এবং তথাকথিত অগনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত করার হিড়িক পরে যায়) কিন্তু এতোকিছুর পড়েও ইরানি চলচ্চিত্র এমন একটি ইমেজ তৈরি করে যা শিশুতোষ সৌন্দর্যময়তা, গ্রামীণ দীগন্ত বিস্তারকারী রুপয়তায় যেকোন সিনেমাপ্রেমিককে মুগ্ধ করে। এইসব নান্দনিক চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই নিষ্পাপ গ্রামীণ পটভূমি যা কিনা ভিন্নতর কাব্যিক চিত্ররূপ হয়ে ইরানি চলচ্চিত্রকে পৃথিবীতে একটি অনন্য স্থান দেয় এবং পশ্চিমা অপবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাবের প্রেক্ষাপট রচনা করে।

চলচ্চিত্রের এই নতুন চিন্তা রাষ্ট্র ইরানের মহাকাব্যিক বিবেকবোধের দৃশ্যায়ন হয়ে ওঠে। বিপ্লবোত্তর ইরানি চলচ্চিত্রের এই নবতিতম চিন্তা বিশ্বচলচ্চিত্রে "কাব্যিক বাস্তবতাবাদ" নামে নিজের উত্থান ঘোষনা করে। খোমেনী শাষন আর তার চুরান্ত বিধিনিষেধের কারনে প্রতিভাধর নবীন চলচ্চিত্রকারেরা ইরানি গণমানুষের না বলা কথাগুলো বলতে চাইলেন ভিন্নতর সৃষ্টিশীল উপায়ে। তাই তাঁরা চলচ্চিত্রে শিশুদের প্রাধান্য দিতে লাগলেন আর নারীদের উপস্থাপন করলেন প্রকৃত সত্য এবং না বলা অপ্রকাশিত জীবন উন্মোচনের প্রতীক হিসেবে। নিষ্কলুষ আবহের মাধ্যমে রাষ্ট্রীক বৈষম্য, পশ্চিমা নিন্দাবাদ আর সাম্রাজ্যবাদী কূপমণ্ডূকতাকে আঘাত করতে লাগলেন শিল্পিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে সিনেমা বোদ্ধারা জেনে গেলো ইরান সম্পর্কে সাম্রাজ্যবাদী ধারণার দেউলেপনাকে।

কিন্তু এতকিছুর পরেও সমালোচনা থেমে থাকেনি। নাক উঁচু পশ্চিমারা ইরানি চলচ্চিত্রের এই নবতর ধারণাকে আশি সালের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সেন্সরসিপের ফলশ্রুতি হিসেবে চিহ্নিত করলেন। তারা হা-হুতাশ করলেন। নারী,যৌনতা এবং ভালোবাসা দূরে সরে গেলো অয়াতুল্লাহ্ খোমেনীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের খপ্পরে পড়ে ! তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন আর রুপকময় যা ইরানি চলচ্চিত্রকারেরা সিনেমার একটি নতুন ভাষায় রুপ দিলেন এবং এইসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমা সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে সিনেমা শিল্পের একটি ধ্রুপদী আখ্যান রচনা করলেন যা কিনা বিশ্বচলচ্চিত্রে ইরানি নিউ-ওয়েভ নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

ইরানি চলচ্চিত্র  (Pre-Revolution)

ইরানিয়ান শিল্পিত চলচ্চিত্রের জন্ম হয় বাষট্টি (1962) সালে। Forough Farrokhzad তৈরি করলেন "House is Black"। এই ডকুমেন্টারি ছবিটি তিনি তৈরি করেন কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত একটি কলোনীর গলিত জীবনকে নিয়ে আর এটি হয়ে যায় ইরানিয়ান নান্দনিক সিনেমার পথিকৃৎ। একজন নারী হিসেবে Farrokhzad হয়ে গেলেন কিংবদন্তি। নারীবাদী এবং খ্যাতিমান কবি ফররুখ্জাদ্ কাব্যিকতাকে রেজা শাহে্র অমানবিক শাষনযন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার কন্ঠে পরিনত করেন। সাতষট্টি সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান কিন্তু রেখে যান ভবিষ্যতের ইরানি চলচ্চিত্রের প্রকৃত আওয়াজ এবং অনন্ত প্রেরণা। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়ে যায়, অসামান্য প্রতিভার অধিকারী একদল চলচ্চিত্রকার যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দারায়ুস মেহেরজুই, সোহরাব সালেস্ এবং আব্বাস কিয়েরোস্তামি।
দারায়ুস মেহেরজুয়ের "The cow" ছবিটি এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখ্য ছিল। অন্ধকার এবং রুপকের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জীবনকে এমনভাবে দেখালেন যেখানে একদিকে দারিদ্র্যের গ্লানিবোধ এবং অন্যদিকে শাহ্ আর তার তোসাখানার চাটুকারদের প্রমোদ। রেজা শাহের উন্নয়নের অলিক স্বপ্ন। এই ছবিটি শোষক শ্রেনীর বিরুদ্ধে সৃষ্টি করে নবধারার রাজনৈতিক চেতনার। দারায়ুস মেহেরজুয়ের উপমাসমৃদ্ধ বাস্তববাদী ধারার চলচ্চিত্র রুপকে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারেরা সানন্দে গ্রহণ করেন। সিনেমার নান্দনিকতায় নিজেদের আবিষ্কার করেন সোহরাব সালেস্ এবং আব্বাস কিয়েরোস্তামি। যদিও এইসব ছোট ছোট কিছু তাৎপর্যবাহী উদাহারন বাদ দিলে আধুনিকতার মুগ্ধতা ছড়ানো রেজা শাহ্ আমলের ইরানি চলচ্চিত্র খুব একটা গতিময় ছিলোনা যেহেতু 'উত্তপ্ত এবং ঠান্ডা' সেন্সরশিপের কবলে পরে অনেক ছবি নির্মিত হলেও মনে রাখার মতো ছবি ছিলো খুবই অপ্রতুল

ইরানি চলচ্চিত্র (Post-Revolution)

ইসলামি বিপ্লবের পরে আলী আয়াতুল্লাহ খোমেনী তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় ভাষণে চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করলেন যা অনেককেই অবাক করে দেয়। আয়াতুল্লাহ্ তাঁর বক্তব্যে জনগনকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বলেন। তিনি চলচ্চিত্র শিল্পকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার কথা বললেন এবং সমস্ত রকম পশ্চিমা মূল্যবোধকে হটিয়ে নতুন ধারা তৈরি করার ওপরগুরুত্ব দেন। তিনি দৃঢ়তম আত্মনির্ভরতার কথা বলেন আর সাবধান করেন মূল্যবোধহীন ইরানি চলচ্চিত্রকে। তিনি ঘোষনা দিলেন এইসব চলচ্চিত্র অগ্রহণযোগ্য এবং বেআইনি। তাঁর মতে সেইসব চলচ্চিত্রই রাষ্ট্রিক সুবিধা ভোগ করবে যা ইরানি শিক্ষা এবং সামাজিক মুল্যবোধকে ধারণ করতে সক্ষম। খোমেনী সিনেমার গতিপথকে অনুধাবন করলেন আর বুঝতে পারলেন এটি এমন এক শৈল্পিক ইমেজ যার মাধ্যমে তিনি তাঁর মতো সুবিধা আদায় করতে পারবেন।
এরই প্রেক্ষাপটে ইরানিয়ান মিনিস্ট্রি অব কালচার, কঠোরতম সেন্সরশিপের খোলশে বেঁধে ফেললো সিনেমা শিল্পকে আর এতে করেই চলচ্চিত্রের পুনরুত্থান এতোই শ্লথ হয়ে গেলো যে অনেকে এর মৃত্যু ঘোষনা করলেন। তবে আশির দশক ছিল ভিন্য আবহের যেহেতু এই সময়ে ইরানি চলচ্চিত্র খুজে পেয়েছিল নতুন দিশা এবং বেশ কয়েকজন প্রতিভাধর চলচ্চিত্রকার। প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্রকারেরা তাঁদের সিনেমাতে শিশুদের প্রধান চরিত্রে রেখে এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে লাগলেন যা সমস্ত বিধিনিষেধের জাল ছিন্ন করতে সাহায্য করলো এবং ইরান রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা শিশুদের মুখ দিয়ে বলিয়ে দেয়া হলো। এর প্রকৃত উদাহরণ ছিল আব্বাস কিয়েরোস্তামির 'where is my friends house(1987)'। এই চলচ্চিত্রটি দেখালো পারিবারিক সমস্যাগুলো কীভাবে রাষ্ট্রিয় আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে একীভূত হয়ে যায়। সিনেমার কিশোর চরিত্রগুলো প্রতিদিনকার জীবন সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রিক বৈষম্যকে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ রুপক হিসেবে কাজ করে।
এর অব্যবহিত পরেই কিয়েরোস্তামি কাব্যিক বাস্তবতাবাদী ধারার ইরানি নিউ-ওয়েভ চলচ্চিত্রকে অন্যমাত্রা দিলেন তাঁর "Through the olive Trees (1994) " চলচ্চিত্রে। এই সিনেমায় কিয়েরোস্তামি চরিত্রে অভিনয় করলেন ভিন্ন একজন আর তাকে পরিচালিত করলেন কিয়েরোস্তামি নিজে ! আগুনে পোড়া ভূমিকম্প বিদ্ধস্ত গ্রামে চলচ্চিত্রায়িত ছবিটি সমস্ত রকম ঝাপসা বাস্তবতা ও কল্পনাপ্রবণ চলচ্চিত্রের অস্পষ্টতাকে আঘাত করে এবং উন্মেষ ঘটায় এমন একটি ধারার যা সিনেমার ডকুফিকশন মাধ্যমকে নতুন মাত্রা দেয় কিংবা জন্ম দেয় কাব্যিক বাস্তবতাবাদের প্রকৃত ধারনাকে যার দ্বারা মোহসেন মাকমালবাফ প্রভাবিত হয়েছিলেন তাঁর ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে সামনে রেখে।
এরই মধ্যে ইরান বিশ্ব পুঁজিবাদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এটি বিশেষ ভাবে দেখা যায় "Gabbeh (পারসিয়ান কাপে'টের একটি প্রকার)" চলচ্চিত্রে। ফরাসি ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানি এই চলচ্চিত্রেরমাধ্যমে যতসামান্য অর্থ লগ্নি করলেও এই ছবিটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। পঁচানব্বুই (1995) সালে মোহসেন মাকমালবাফ এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে সমাদ্রিত হন। ইরানি চলচ্চিত্রের বাজার আরো উৎকর্ষ অজর্ন করে যখন মোহাম্মদ খাতামি ক্ষমতাই আসেন। নবনির্বাচিত খাতামি ইরানি চলচ্চিত্রের বাজারকে বিশ্ব পুঁজির সাথে মেলবন্ধন ঘটান এবং সিনেমা শিল্পকে ইরানের ভিন্ন জীবনবোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানি চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত হয় যার ফলে আব্বাস কিয়েরোস্তামি, মাকমালবাফ এবং জাফর পানাহীরা বিশ্বে অগ্রগণ্য চলচ্চিত্রকার হিসেবে পরিগণিত হন। ইরান ঘরে তুলতে থাকে বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র পুরষ্কার।

ইরানি চলচ্চিত্রের বর্তমানকাল

নব্বুই দশক ছিলো উত্তাল। সমগ্র ইরান জুড়ে তখন মুক্তমনা গণতন্ত্রের হাওয়া। সামিরা মাকমালবাফ এই উত্তাল সময়কে উপজীব্য করে নির্মাণ করেন "The Apple(1998)"। গনতন্ত্রের গণদাবীতে আলোরিত হন মাকমালবাফ কন্যা। মাত্র সতেরো বছর বয়েসে উপলব্দি করেন ইরানি নারীদের দুঃখগাথা। "The Apple"- এ সামিরা দেখান এগারো বছরের একটি মেয়েকে যে কিনা তার জীবনের অধিকাংশ সময় নিজ গৃহে বন্দী জীবন কাটায় আর ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে থাকে বাইরের জগৎ থেকে। এই ছবিটি কাব্যিক মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণকে নিপূন নির্মাণশৈলীতে প্রকাশ করে। সামিরা মাকমালবাফ হয়ে যান ফররুখজাদের মতন ইরানি নারীদের আলোকবর্তিকা। সামিরার ছিলো খ্যাতিমান পিতার প্রভাব তবুও নিজ প্রতিভান্বিত গুনে তিনি ইরানি নারীদের জীবনকে দেখতে চান অন্যভাবে। তাঁর চলচ্চিত্রে তাই আমরা দেখতে পাই সামগ্রিক সামাজিক অবস্থান যা প্রকারান্তরে জেন্ডার সাম্যের সূচনা করে।

সাম্প্রতিক সময়ের চলচ্চিত্রগুলোতে পূর্ববর্তী ইরানি চলচ্চিত্রের ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করে আর তৈরি করে নিজস্ব চেতনাবোধ যা ইরানের চলমান নারী জাগরণ এবং সংস্কারবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে। চলমান ইরানি রাজনীতিতে তাই ঘুরেফিরেই আলোচনায় চলে আসেন জাফর পানাহি, ইসমাইল তাবরেজি। জেল জুলুম চলতে থাকে কিন্তু থামেনা শিল্পের প্রতি অদম্য নিষ্ঠা। নির্মিত হতে থাকে উল্লেখযোগ্য সব সিনেমা। আমরা দেখতে পায়, কিয়েরোস্তামির 'The Ten(2002)', পানাহির 'The crimson Gold' এবং তাবরেজির 'The Lizard '। শিল্প তার উন্মুক্ত জোয়ারে ভাসিয়ে দেয় জাতীয়তার উগ্রতা। শিল্প বাধা মানেনা তাই সামান্য দুটি DV ক্যামেরাও আব্বাস কিয়েরোস্তামির হাতে হয়ে ওঠে শিল্প সৃষ্টকারী অনন্য হাতিয়ার। ইরানি চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী। প্রত্যাঘাত করেন শ্রে্ণী সম্পর্কের দৈনতাকে। নির্মাণ করেন কাব্যিক বাস্তবতাবাদ।।

কাছিমের উড়ে যাওয়া....

"সমস্ত অন্যায়, ভাগ্যহত জীবন এবং কষ্টের অবসান হলো। আমরা তোমাদের বন্ধু এবং ভাই। যারা আমাদের বিরুদ্ধে তারা আমাদের শত্রু। আমরা এ দেশকে বেহেশতে পরিনত করবো। আমরা এখানে এসেছি তোমাদের সব কষ্ট দুর করতে। আমরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। "-হাজার জনতার উপর দিয়ে উড়ে গেল আমেরিকান হেলিকপ্টার। আকাশে ছড়িয়ে পড়ল অসংখ্য লিফলেট। বাহমান গোবাদী দেখলেন কাছিমের উড়ে যাওয়া আর আমরা দেখলাম ভেসে যাওয়া অগুনতি প্রাণ। বেহেশতের আতশবাজি আশায় উড়ে যাওয়া সভ্যতা। প্রাচীন মেসোপটেমীয় উত্তরাধিকার। সূদুর ইরাক আর তার ধ্বস্ত ভূমি।
তবুও বেচে থাকার কী ভিষন আকুতি ! রিফিউজি অধ্যুষিত গ্রাম। যুদ্ধ শুরু হয়েছে কী ? বিচ্ছিন ইরাকি গ্রামে সংবাদের জন্য হাহাকার। বালক স্যাটেলাইট আর তার প্রেম। আগ্রিনের কোলে যুদ্ধের উপহার ! নিষ্ঠুর পৃথিবীতে টিকে থেকে কি এমন ভালো হবে বালিকা আগ্রিনের !???

যুদ্ধ ক্লান্ত ইরাকের ছুটে চলা জীবনকে এভাবেই দেখাতে চান বাহমান গোবাদী যেহেতু তিনি দেখেছেন কাছিমকে উড়ে যেতে আর আমাদের দেখিয়েছেন উড়ে যাওয়া ধ্বস্ত সভ্যতা !!

No one knows about Persean cat's 

সঙ্গীত,রাজনীতি ও উন্মাদের শহর।
চলচ্চিত্রকার বাহামান গোবাদী'র কাব্যিক অভিযাত্রা।

ঊনআশি সালে বিপ্লব হয়ে গেলো। ইসলামি বিপ্লব ! যুক্তরাষ্ট্র এবং তার একনিষ্ট মিত্র রেজা সাহ্ পাহলবী সহ ডুবে গেলো প্রাচীন সাম্রাজ্য। ধ্বসে পড়লো পশ্চিমা সংস্কৃতি। কিন্তু এতকিছুর পরেও ইরান কি মুক্ত হতে পেরেছিল ? পুরাতন হয়তো বিদায় নিয়েছিলো তার সমস্ত আত্নগড়িমা নিয়ে কিন্তু যে নতুন এলো তা কি সত্যিই নতুন ছিলো ? ইরানের বহুপ্রচলিত ইতিহাস বলে দেয় এর উত্তর। পুরাতন আগ্রাসী মৌলবাদ ফিরে এলো নতুন রুপে। ফিরে এলেন আলী আয়াতুল্লাহ খোমেনী। সাথে নিয়ে এলেন অন্ধকার ! নিষেধাজ্ঞা, বিধিবিধানের সম্ভার ! ইরানের গৌরবময় ইতিহাসে পড়ানো হলো শেকল। ইরান বিভক্ত হলো। বিচ্ছিন্ন এবং ধ্বংস হলো হাজার বছরের পারসিয়ান সভ্যতা। মৌলবাদ এবং সেকুলার বিশ্বাসের মধ্যে শুরু হলো দ্বন্দ্ব।
এরই ধারাবাহিতায় আশির দশক ছিল ইরানি চলচ্চিত্রের অন্যতম সংকটকাল। যদিও বেশ কয়েকজন প্রতিভাধর চলচ্চিত্রকার সে সময় বহু বাধাবিপত্তির মধ্যেও চলচ্চিত্রের এক নবতন ধারনার উন্মেষ ঘটালেন। কাব্যিক বাস্তবতাবাদ নামে একটি অভিনব চিন্তার উদ্ভব হলো ইরানি চলচ্চিত্রে। এই নতুন ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে তারা একের পর এক নির্মাণ করতে লাগলেন অসামান্য সব ধ্রুপদী চলচ্চিত্র। জেল জুলুম চললো অনেক। দেশান্তরিত হলেন অনেকে। এদের মধ্যে কুর্দিস্তান ইরানিয়ান চলচ্চিত্রকার বাহামান গোবাদী ছিলেন অন্যতম। ইরানের নবীনতম চলচ্চিত্র শিল্পী হিসেবে তিনি হয়ে গেলেন কাব্যিক বাস্তববাদী ধারনার চলচ্চিত্রের পুরোধা।

শুরুটা খুব সহজ ছিলোনা তাঁর জন্য। প্রায় সাতটি ছোট ছবি বানানোর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন শিল্পের সহজাত দিক। বিশেষ করে "Life in the Fog"- এ কুয়াশাচ্ছন্নতার মধ্যে দেখলেন কুর্দি জীবন। দেখলেন মানবতার ইতিহাস। Barline চলচ্চিত্র উৎসবে এটি জিতে নিল, বিশেষ সম্মাননা। এ যেন, অন্ধকার কুয়াশায় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প। গোবাদী আবিষ্কার করলেন নিজেকে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়েরোস্তামির,"The wind will carry us" ছবিতে সহকারীর কাজ করলেন। তবে সত্যিকার আত্নপ্রকাশ করলেন, "A time for Drunken Horses" দিয়ে। দেখালেন কাব্যিক বাস্তবতাবাদ। এভাবেই একে একে নির্মাণ করলেন, 'Maroond in Iraq' এবং বিশ্বনন্দিত, 'Turtles can fly'। প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রে গোবাদী নতুন ভাবে দেখালেন চলচ্চিত্রের কাব্যময়তা। তার ছবিতে ঘুরেফিরেই চলে আসে কুরদিস জীবন। কুর্দি জনগনের দুঃখ, বেদনার গল্প। সাধারনের জীবন যেন নতুনভাবে দেখা দিলো গোবাদি'র চলচ্চিত্রে।
তবে একেবারেই ভিন্নত্ব নিয়ে তৈরি করলেন, 'No one knows about Parisian cat's'। অনেকটা Docufiction ঢং-এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি ইরানের প্রগতি আন্দোলন তথা বিদ্রোহ, আর পতিত শহরকে দেখালেন আত্মগত ধারনায়। তেহরান যেন নতুনভাবে দেখা হলো গোবাদি'র চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রের কাহিনী এগিয়ে যায়, আশকান সেহেঞ্জাদ এবং নীগার আসকাগী নামের দুই বিদ্রোহী শিল্পীর জীবনের গল্পকে কেন্দ্র করে। তারা সদ্য জেল ফেরত গীতিকার এবং গায়ক। একটি গোপন ব্যান্ড দল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তেহরানের অলিগলি ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু অন্যরা ভয়ে আসতে চায়না তাদের দলে। আশকান, নীগার হতাশ হয় তবে দমে যায়না। লন্ডন রক মিউজিক ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে তারা ভিসাপ্রাপ্তির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়। তারা বুঝে গেলো রাষ্ট্র ইরান তাদের আর চায়না। আবার কোথাও যেতেও দেয়না। একদিন তাদের দেখা হয় নাদের নামের এক গান পাগল প্রযোজকের সাথে। নাদের, তাদের কথা দেয় একদিন না একদিন, সে তাদের লন্ডন ফ্যাস্টিব্যালে পাঠাবেই। পুলিশি অত্যাচার, রাষ্ট্রিক নিপিড়ন চলতেই থাকে। পুলিশি রাষ্ট্র ইরান গান ভালোবাসেনা। শুধু বাধ্য করে এক প্রহেলিকাময় খোদা কে মানতে। নাদের পারেনা তার কথা রাখতে। পুলিশে হাত থেকে জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনটাই দিতে হয় তরুন আশকানকে। আমরা জেনে যায় আশকান, নীগারের পরিনতি। তারা হারিয়ে যায় রাষ্ট্রীয় বুটের তলায়।
বাহামান গোবাদী দেখাতে চেয়েছেন অমানবিক রাষ্ট্রকে। দেখাতে চেয়েছেন তেহরান। তাই বিদ্রোহী গোবাদী তার চলচ্চিত্রে গানের মধ্যেই জানিয়ে দেন, "হে আল্লাহ তুমি জেগে ওঠো, আর দেখো, তেহরান বুনো কুকুরের তেহরান...
হে আল্লাহ জেগে ওঠো,দেখো...এখানে শিশুরা খেলতে চায় এতিমের সাথে, কিন্তু পিতার রক্তচক্ষু তাদের খেলতে দেয়না।


Sujan Bhattacharjee

সুজন ভট্টাচার্য

চলচ্চিত্র সমালোচক