গডেস অব অ্যামনেশিয়া-২২

img

আগের পর্ব

দেখতে দেখতে রমজান চলে আসল আবারও। কিন্তু দাদীর সমস্যার কোন সমাধান হল না। দশ গ্রাম খুঁজেও তার সাথে থাকার মতোন উপযুক্ত কাউকে পাওয়া গেল না। ছেলেরা খোঁজ করেনি এমন না, নিয়েও এসেছিল দুই চার জনকে। দাদীর মনে ধরেনি। আবার কোন ছেলের সংসারে যেতেও রাজি হয়নি সে। রোজার প্রথম দিন থেকেই ভয়াবহ শীত পড়ল সেবার। দাদী সেই হাড়-জমানো শীতের রাতে উঠে একা সেহরির জন্যে ভাত চড়ায়, তরকারি গরম করে। এতো প্রত্যয়ী মানুষটাকে ইদানীং দেখতে কেমন যেন অসহায় লাগে! 
উঠানে সরিষার স্তূপ। ছোট দিন। মা কাজ শেষ করতে পারেন না। তাই ইফতারের পরে উঠানে বেশ উজ্জ্বল আলো জ্বলে। সরিষা মাড়াই, ঝেড়ে পরিস্কার ইত্যাদি কাজ রাত প্রায় নয়টা দশটা পর্যন্ত চলে। আমাকে মা এখন উঠানেই বসিয়ে দেন বই হাতে। আমি পড়তে পারি না যদিও। পাশে আমার ছোট্ট বোন অজানা আনন্দে থেকে থেকে হেসে ওঠে। আমাদের উপরে বিশাল আকাশ। আমরা তারা দেখার ভান করে কোথায় যেন হারিয়ে যাই, আবার ফিরে আসি। 
ততদিনে সেই জারুল গাছের ঘটনার রেশ কেটে গেছে। আমি আবার বিকেল জুড়ে চঞ্চল, উচ্ছ্বল। রোজার প্রথম কয়দিন কোন সূর্যের দেখা নাই। স্তব্ধ বিকেলে ঘুরে ফিরে, ইফতারের ঘণ্টাখানেক আগে ঘরে ফিরি। বোনকে কোলে নিয়ে চুলার পাড়ে বসে থাকতে হয় কিছুক্ষণ। মা তখন ছোলা, ডালের বড়া, চার-পাঁচটা খেজুর আর কয়েক মুঠ মুড়ি একটা স্টিলের ঢাকনাওয়ালা বাটিতে ভরে দেন। হাতে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব হাঁটতে থাকি। বাঁধের একপাশের ঢালে প্রাইমারি স্কুল অন্য পাশে হাট। বসে কেবল রবি আর বৃহস্পতিবার। বাকি কয়দিন ফাঁকা পড়ে থাকে। বাঁধের উপর আট দশটা দোকান। আমি যখন পৌঁছাই, পুব পাশের একেবারে উত্তর কোণার একচালা দোকান ঘরে বাবা তখন হারিকেনের চিমনি খুলে মুছে আবার লাগাচ্ছেন। আমাকে দেখে আমার অতি সুদর্শন বাবা মিষ্টি করে একটু হাসেন। টেবিলের উপর বাটিটা রাখতেই দেখি প্রতিদিনের মতো পাঁচ টাকার একটা নোট রাখা। আমার কথা বলার মতোন সমান হয় না। টাকাটা ছোঁ মেরে নিয়ে ছুটি জিলাপির দোকানে। সারা বাজার খালি থাকলেও এই দোকানে বেশ বড়সড় ভিড় হয়। জিলাপি কিনতে কিনতে প্রায় আজানের সময় হয়ে যায়। খালি হাটের উপরে ততক্ষণে কুয়াশা নেমে আসে। নদীর বুক থেকে উঠে আসে হাড় জমানো ঠাণ্ডা বাতাস। আর কেমন একটা মন মাতানো গন্ধ ভেসে আসে জানিনা কতদূর থেকে। আমি ভাবনায় দেখতে থাকি নদীর ওপারে কোন এক বিশাল ফুলের বন। খয়েরি রঙের অচেনা এক ফুল ফুটে সেখানে ঢেকে গেছে সবুজ পাতা, নীল আকাশ। ভাবতে ভাবতে প্রায় প্রতিদিনই আমার দেরি হয়ে যা্য়। বাড়ি ফেরার মাঝপথেই শুনি মাগরিবের সুরেলা আজান।
রোজা শেষ হয়ে গেলে আমাকে নিয়ে মা আর ছোট চাচা রওনা দিলেন নতুন স্কুলের দিকে। পায়ে হেঁটে চল্লিশ মিনিটের পথ। বাবার দোকান থেকে আরও দূরের একটা বাজার পার হয়ে যেতে হল। বাজারটা নাকি এককালে প্রচণ্ড বিশাল ছিল। জনপ্রিয় একটা সিনেমা হলও ছিল। একসময় আশেপাশের তিরিশ গ্রামের মানুষে বাজার ভরে থাকত প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। একটা ছোটখাট শহর হয়ে উঠেছিল রীতিমতো। কিন্তু বিরানব্বই সালের ভয়াবহ ভাঙনে যমুনা এর দশভাগের নয় ভাগ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন পড়ে আছে  স্মৃতি জাগানিয়া ভগ্নাংশটুকু। বাজার পার হলেই পথের দুইপাশে একটানা সারি সারি তুঁতের গাছ। এখানকার প্রায় সব বাড়িতে রেশমপোকার চাষ। বাড়ির সামনে বাঁশের মাচায় হুলুদ রঙের অসংখ্য গুটি ছড়িয়ে রাখা। কোন কোন জায়গায় মাচার উপর তুঁতের তাজা পাতা বিছানো, তার মধ্যে কিলবিল করছে শত-সহস্র রেশম পোকা। দেখতে দেখতে আমার চোখে হলুদ-সবুজ বিস্ময় লেগে গেল। 
সেই ঘোরলাগা চোখ নিয়েই  পৌঁছে গেলাম নতুন স্কুলে। খুব গরীব একটা স্কুল! একটা মাত্র চৌচালা টিনের ঘর। পাঁচ-ছয়টা কক্ষ। দরজা জানলা কিছু নাই। সামনের মাঠটাও খুব একটা বড় না। আমরা ঢুকলাম অফিস কক্ষে। কেবল এই ঘরটায় দরজা জানলা লাগানো। একটা বড় টেবিলের দুই পাশে গোটা দশেক চেয়ার। এরপর একটা স্টিলের ছোটখাটো আলমারি। দুইটা ক্যালেন্ডার আর একটা বাংলাদেশের মানচিত্র ঝুলছে টিনের বেড়ায়। দক্ষিন-পশ্চিম কোনায় আরেকটা ছোট টেবিল, আর হাতলওয়ালা চেয়ার। শ্যামলা রঙের মোটামুটি তিরিশ বছর বয়েসী একজন লোক, অন্যরকম সুন্দর করে কাটা চুল, আমার মা আর ছোটচাচাকে বেশ সমাদর করে বসালেন। আমি মায়ের চেয়ার ধরে দাঁড়ালাম, মুখে কোন কথা নাই, সর্বোচ্চ মনোযোগে সব দেখছি কেবল।
উনিশশ’ আটানব্বই শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। নতুন স্কুলে আমি এক লাফে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়ে গেলাম, বয়স তখনও আট পুরো হয়নি যদিও। আমি বাদে আর মাত্র চার জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে ক্লাস হয় প্র্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বারোটা। কিন্ডারগার্টেন স্কুল। সব শিক্ষকেরই বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে। সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল ড্রয়িং ক্লাস। আদতে স্কুলে কোন ড্রয়িং টিচার নাই। যিনি অংক শিখান, সেই শিক্ষকই আবার সপ্তাহে দুইদিন আসেন ড্রয়িং শেখাতে। আঁকতে তেমন জানেন না, কিন্তু আঁকার পরামর্শ দিতে পারেন ভালো। স্কুলে এই ক্লাসের তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু আমাকে পেয়ে বসল আঁকার প্রবল নেশা। একটা ছবি আঁকতে বললে আমি দশটা আঁকি। রং পেন্সিল ফুরাতে লাগল দ্রুত। আঁকার খাতা শেষ হলে বাবার দোকান থেকে আনা ওষুধ-কোম্পানির প্যাডে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আঁকতে লাগলাম নানান সব রঙিন ছবি: গ্রামের দৃশ্য, শাপলা, দোয়েল, গোলাপ, ঘুড়ি, লাউ, নৌকা, পতাকা, শহীদ মিনার। 
স্কুলে হেঁটে যেতে বড়জোর চল্লিশ মিনিট লাগত কিন্তু ফিরে আসার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যেতো পথ ফুরাতো না। আমি এই পথ ওই পথ ঘুরে বাড়ি ফিরতাম। বেশিরভাগ দিন স্কুল ছুটির পর সোজা চলে যেতাম নদীভাঙা বাজারের সবচেয়ে পুরানো চায়ের দোকানে। ‘করতোয়া’ নামের চার পৃষ্ঠার একটা দৈনিক পত্রিকা একলা পড়ে থাকতো তখন দোকানের টেবিলে। প্রায় ভর-দুপুর। উপরে টিন আর তিনদিকে বাঁশের চাটাই দিয়ে অর্ধেক ঘেরা ঘরে রোদ ঢুকত এলোমেলো হয়ে। মাঘ মাসের শেষ, কিন্তু দিনের রোদ তখনও খুব মিষ্টি। রোদ পিঠে নিয়ে কোন একটা টেবিলে বসে পত্রিকা পড়তাম খুব মন দিয়ে। কত মানুষের নাম, কত জায়গার কত ঘটনা, কত শত তথ্য যে অবাক করত তার ইয়ত্তা নাই।
প্রথম কিছুদিন আমার আসা যাওয়ার পথ একলা কাটল। পরে ধীরে ধীরে একজন দুইজন করে সঙ্গী বাড়তে লাগল। বাজার পার হয়ে একটা বড় পুকুর পড়ত হাতের বায়ে। পুকুরের ওইপারে গেলাম একদিন আমার চেয়ে দুই ক্লাস উপরে পড়ে এমন একজনের বাড়িতে। আমারা মোট তিনজন ওদের বাড়িতে ঢুকে বেশ ফূর্তি পেলাম। ওর মা-বাবা দুইজনেই চাকরি করে। খালি ঘরে ও নিজে তালা খুলে ঢুকল। বেশ বড়লোক বলে মনে হল। জীবনে ওই প্রথম কারও বাড়িতে রেফ্রিজারেটর দেখলাম। ঠাণ্ডা জল বের করে ও নিজে আমাদের লেবুর শরবত করে খাওয়ালো। একটা বড় রূপালি রঙের ক্যাসেট প্লেয়ার দেখলাম বুক শেল্ফের উপর রাখা। আর কোন ভাই বোন নাই ওর। এই বয়সেই একলা এক ঘরে থাকে। নিজের পছন্দের একটা গান ছেড়ে এসে আমাদের সাথে বসতে না বসতেই আবার উঠে গেল। 

-‘খাড়াও, তোমগো একখান নতুন জিনিস দেখাই। মজা পাইবা।’

আমরা অজানা মজার জিনিসের অপেক্ষা করছি। দুই বছর আগে খুন হয়ে যাওয়া জনপ্রিয়তম ফিল্মস্টারের খুবই সুন্দর একটা পোস্টারে চোখ পড়ে গেল। রাতে তোলা ছবি বোধহয়। চাঁদ দেখা যাচ্ছে এক কোণায়। আরেক কোণায় চাঁদ নিয়ে একটা সিনেম্যাটিক কবিতা লেখা। পাশেই এখনকার প্রধানমন্ত্রীর ছবিওয়ালা একটা লম্বা ক্যালেন্ডার। অনেকগুলো তারিখে গোল চিহ্ন। ছোট ছোট করে কী যেন লেখা। পড়ার চেষ্টা করছি এমন সময় ‘মজার’ বস্তু নিয়ে ও ফিরে এল। আমাদের তিনজনের হাতে তিনটা ছোট্ট প্যাকেট। তাসের গায়ে যেরকম  থাকে,  ওইরকম এক রাজার ছবি। বাংলা আর ইংরেজিতে রাজা লেখা। আমি সবার আগে প্যাকেট ছিঁড়লাম। দেখি একটা বেলুন। কারও দিকে না তাকিয়ে ফুঁ দেয়া শুরু করলাম। বাজে একটা গন্ধ, আর আঠালো কিছু আমার নাকে এসে লাগল। যার বাড়ি সে ততক্ষণে শব্দ তুলে হাসতে শুরু করেছে। কিছু না বুঝতে পেরে হাত থেকে ফেলে দিলাম। ওর হাসি আরও বাড়ল। একসময় বাকিরাও যোগ দিল। এতো হাসির কী হল- বারবার জিজ্ঞেস করেও কোন উত্তর পেলাম না। বোকা হয়ে, অপমান-অভিমান নিয়ে বের হয়ে পুকুর পার হয়ে এক দৌড়ে চলে আসলাম বাড়ি ফেরার পথের উপর। পিছনে  চিৎকার করে ও তখন বলছিল- ‘এই বেলুন হেই বেলুন না, এই বেলুনের অন্য….” -বাকিটা শুনতে পেলাম না।  আমি আর পিছন পিরে তাকাই নাই সেদিন। 
স্কুলটা ছোট হলেও বেশ বড় একটা মায়া তৈরী করে ফেলল মাত্র কয়েক মাসেই। দেখতে দেখতে মাঘ, বসন্ত, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ পার হয়ে বর্ষাকাল চলে এলো। বর্ষার শুরুতেই এক আনন্দ সংবাদ সারা জেলায় মেঘের সাথে সাথে ভাসতে লাগল। মানুষ উৎসাহ আর উল্লাসে দুলতে লাগল পাগলা বাতাসের সাথে। আষাঢ় মাসের নয় তারিখে প্রধানমন্ত্রী আসবেন এই দেশের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে আকাংক্ষার সেতু উদ্বোধন করতে। যমুনা নদীর পূর্ব পশ্চিম মিলিয়ে দেয়া সেতু পাওয়ার উত্তেজনায় হাজার হাজার মানুষ নয় তারিখে ভোরে উঠেই অনুষ্ঠান স্থলের দিকে দলে দলে হাঁটতে লাগল। সকালে স্কুলে গিয়ে শুনলাম ক্লাস হবে না, বরং আমাদের জন্যে অনেকগুলো রিক্সা-ভ্যান প্রস্তুত হয়ে আছে। প্রতিটা ভ্যানের সামনে উড়ছে জাতির পতাকা। আমরাও যাবো উদ্বোধন দেখতে।

আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে শুনলাম সেতুর পুবদিকে ফিতা কেটে দৃপ্ত প্রধানমন্ত্রী ততক্ষণে সেতুর মাঝ বরাবার চলে এসেছেন পায়ে হেঁটে। পশ্চিম পাড়ে তখন মানুষের উল্লাস-ভরা জোয়ার। সেদিন বর্ষার আকাশে একদমই কোন মেঘ ছিল না। টানা রোদে মানুষ ঘেমে ভিজে একাকার। চামড়া পুড়ে যাচ্ছে, তবু অপেক্ষায় কোন ক্লান্তি নেই। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালেন পশ্চিম পাড়ে। নেতা, কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক সবাই স্লোগানে স্লোগানে বরণ করে নিল হাসিমুখে প্রায় তিনি মাইল হেঁটে আসা প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁর দুই পাশে, পেছনে মন্ত্রী, এম পি, চেয়ারম্যান, আমলা – সবার চোখে ক্লান্তির ছাপ, মুখে কৃত্রিম হাসি। কেবল এই শক্তিমান নেত্রীকেই মনে হচ্ছে চির প্রাণবন্ত। হাঁটতে হাঁটতে চশমার কাচ হয়তো ঘামে, তাপে, ধুলায় ঘোলা হয়ে গিয়েছিল। দেশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী মানুষটি হাত তুলে অভিবাদন শেষ করে হঠাৎ চোখের চশমা খুলে আস্তে করে নিজের শাড়ির আঁচলে মুছে নিলেন একবার।

চলবে…


Muktadir Abdullah Al

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

Writer

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের জন্ম সিরাজগঞ্জে। ১৯৯০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে এখন শিক্ষকতা করছেন ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ২০১০ সালে। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান।

개발 지원 대상