অষ্টপ্রহর আনাগোনা (৭)

img

অষ্টপ্রহর আনাগোনা
বাবলী হক

রনিতা বলতে পারল না ইভানকে সৌরভের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। এমনকি মৃদুলা যে এত উদ্ভট কান্ড করে বেড়ায় তাকে পর্যন্ত বলা গেল না। সবাই শুনে হাসবে, ভাববে এগুলি তার মনের ভুল। সত্যি তো রনিতা যদি নিজে এসব কথা অন্যের মুখে শুনত তাহলে কি বিশ্বাস করত? মনে হল সে এক গোপন চোরাপথে হাঁটছে। একা। এ পথ শুধু সেই চেনে। আর কাউকে নিয়ে এ পথে হাঁটা যায় না। অথচ শৈশব, কৈশোর থেকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত উঠে আসছে সৌরভ। মাছেদের গান শোনার সময় হাতে হাত রেখে বসে থাকার উষ্ণতা জেগে থাকছে, রনিতাকেও জাগিয়ে রাখছে। স্মৃতি থেকে উঠে আসা সৌরভ নাকি পাশে শুয়ে থাকা ইভানের নিঃশ্বাসের উঠানামা, নাক ডাকার হালকা শব্দ কোনটা বাস্তব? গুলিয়ে ফেলে রনিতা।  
ঘুম আসে না। বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মধ্যরাত। আশেপাশে ফ্ল্যাটগুলিতে নিয়ন আলো নিভে গিয়েছে। নরম কোমল অন্ধকার ঘিরে আছে চারপাশ। রাস্তার পাশে গাছগুলি নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে মৃদু বাতাসে দুলে দুলে। মেঘের আড়ালে ভাঙাচোরা চাঁদ ম্লান দুঃখী মুখ নিয়ে লুকিয়ে আছে। কখনো মেঘ সরে গেলে পূর্ণতায় জেগে ওঠছে আবার হারিয়ে যাচ্ছে। রনিতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে চাঁদ আর মেঘের খেলা। কতদিন সে চাঁদের মুখে হাসি খুঁজেছে, কখনো হাসি দেখতে পায়নি। বরং উল্টাটা মনে হয়েছে। দুখি মুখ যেন সবসময় চেয়ে আছে। ছোটো বেলায় রনিতাও বিশ্বাস করত মানুষ মরে গেলে আকাশে তারা হয়ে যায়। মৃত সব মানুষেরা কয়েকশ কোটি গ্রহ নক্ষত্র হয়ে জেগেত আছে। দূর থেকে সবাইকে দেখতে পায় কিন্ত পৃথিবীতে ফিরতে পারে না। আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে রনিতা বিশ্বাস করতে চায় মা, বাবা, সৌরভ আকাশ থেকে দেখছে তাকে। দূরে, ম্রিয়মান কোনো এক নক্ষত্রের মধ্যে কি সৌরভকে খুঁজে পাওয়া যাবে? আকাশ থেকে নেমে এসে রনিতাকে দেখা দিয়েছে! তাকিয়ে থাকতে থাকতে রনিতার মনে হল, শব্দহীন আকাশ,  বুকে অজস্র নক্ষত্র নিয়ে অনেকটাই নীচে নেমে এসেছে। নক্ষত্রগুলি পাথর হয়ে সাদা ডানা মেলে নামছে, আরো নীচে নামছে। নামতে নামতে সব পাথরগুলি এক ঝাক সাদা পরী হয়ে যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে কি সৌরভও নেমে এসেছিল আজ? সৌরভকে দেখতে চাইলেই সে দেখা দেয় না। ডাক্তারের রুমে, গলির মুখে হুটহাট  এসে দাঁড়ায়। যখন সে দেখা দিতে চায়! অনেকটা সময় আকাশের দিকে চেয়ে থেকে। রনিতার দু-চোখে ঘুম নেমে আসে। ঘরে এসে বিছানায় ইভানের পিঠে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। 

 আজ সকালটা ইভানের জন্য একটু অন্যরকম। এ-কোম্পানিতে জয়েন করার পর এই প্রথম সে একটি সম্পূর্ণ প্রজেক্ট নিজ দায়িত্বে করছে৷ এই ডিলটা সাকসেসফুল হলে প্রমোশন আর আটকায় কে! বলা যায় না, সব ঠিকঠাক থাকলে বস হয়তো কন্ট্রাক্ট সাইন করার সময় তাকে সঙ্গে নিয়ে নেদারল্যান্ডসও যেতে পারেন। তাড়াহুড়ায় ব্রেকফাস্ট শেষ করল। গাড়িতে বসে ষ্টিয়ারিঙে হাত রাখতেই ইভান দেখে,  ঘড়ি ফেলে এসেছে ওয়াশরুমে। গাড়ি থেকে নেমে আবার উপরে এল। দরজা খোলা ছিল। বিরক্ত হল, রনিতা কেন যে দরজা বন্ধ করে নাই! 
ওয়াশরুম বন্ধ। রনিতা একা কথা বলছে। শব্দগুলি বুঝতে পারল না ইভান। বলল, 
-রুনি আমার ঘড়িটা দাও। ফেলে গিয়েছিলাম ওয়াশরুমে। 
রনিতা শুনতে পায়নি। দরজায় নক করে ইভান আবারও বলে,
-আমার ঘড়ি দাও। 
রনিতা ঘড়িটা হাতে নিয়ে দরজা খুলল। ইভানের হাতে দিয়ে বলে,

-আমি দেখলাম তুমি ঘড়ি ফেলে গিয়েছ। 
-হুঁ। কিন্তু তুমি ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করো নাই কেন? অন্য কেউ তো ঢুকে যেতে পারত। 
রনিতা বলে, আমি দেখতে পাই নাই তুমি চলে গিয়েছ।
-যাবার সময় আমি বলে গিয়েছি রুনি!
- আমি শুনতে পাইনি। 
-ঠিক আছে। এবার দরজা আটকে দাও। 

ইভান তাড়াহুড়ায় আছে। গাড়িতে বসে ভাবল কদিন থেকে হরীতকী নামটা শুনছে রনিতার মুখে। কে এই হরীতকী ?   
সকালের অবশ্যম্ভাবী ট্রাফিক ভিড়ে আটকে গেল ইভান। সকাল দশটায় মিটিং রয়েছে। রাস্তায় ট্রাফিকের যে অবস্থা সময়মতো পৌঁছতে পারবে কিনা সন্দেহ হচ্ছে! সাধারণত অফিসে ইভানের দেরি হয় না কখনো। বসের সুদৃষ্টি পাবার জন্য তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকে না। তাই সময়ের আগেই অফিস পৌঁছে যায়। রাত জেগে পুরো রির্পোট লেখা শেষ করেছে। আজ মিটিংয়ে এই প্রজেক্টের ডেমনস্ট্রেশন হবে। সব ঠিক থাকলে এই উইকএন্ডের আগেই টেন্ডার সাবমিট করা হবে।  কিন্ত বস খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। কখনো কোনো রিস্ক নিতে চান না। ইভান জানে বস তার কাজে খুশি থাকেন, তাকে পছন্দ করেন, কাজের দায়িত্ব দিয়েও নিশ্চিন্ত থাকেন, এটা বসের আচরনে বুঝতে পারে। কিন্তু আজ সময় মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারলে সব পরিশ্রম ভেস্তে যাবে। পথে গাড়ি নড়ছে না একটুও। গুরুত্বপূর্ণ দিনে যদি সময়মতো পৌঁছাতে  না পারে তাহলে তো বলতে হয় এই প্রজেক্টের শুরুটাই শুভ হল না। ঘড়ি ফেলে এসেছিল বলে দশ মিনিট পিছিয়ে গেল। ঢাকার রাস্তায় সকাল বেলা এই দশ মিনিট কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইচ্ছে করছে গাড়িটা মাঝরাস্তায় ফেলে  পায়ে হেঁটে অফিসে চলে যায়। দৃশ্যটা কল্পনা করে ইভান বিরক্তির মাঝে চাঙ্গাবোধ করল। ঠিক এখানে গাড়িটা ফেলে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করবে, একবারও  পিছন ফিরে দেখবে না কী হচ্ছে!  তখন  বিচিত্র ধরনের গাড়ির হর্নের শব্দ শুনতে পাবে। সঙ্গে গালাগাল ভেসে আসবে। ইভান দ্রুত আরো দ্রুত হাঁটতে থাকবে৷ পরদিন গাড়ি আনতে যেতে হবে থানায়!  আর ভাবা যায় না!  আজ যদি ড্রাইভার গাড়ি চালাত নির্ঘাত সে গাড়ি থেকে নেমে এই গাড়ির মিছিলকে পিছনে রেখে একটা মোটর বাইকে চড়ে এতক্ষণে অফিসে পৌঁছে যেত।
স্কুল, অফিসে ছুটছে প্রাইভেট কারগুলি! তার মধ্যে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিশাল দেহ নিয়ে পথ আটকে আছে। তার চেয়ে  বিরক্তিকর মোটর বাইক ডান বাম করে পার হয়ে যাচ্ছে পাগলা অশ্বারোহীর মতো। মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে হুমড়ি খেয়ে পড়বে ঘাড়ের ওপর। কখনো সখনো নির্বিকার ভাবে ফুটপাথেও উঠে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে। 
 নাহ্! কাকলী ওভারব্রিজ পার হতেই পচিঁশ মিনিট। আজ আর সময়মতো পৌঁছাতে পারবে না। কিছু একটা গল্প বানিয়ে বলতে হবে অফিসে। ভুলে ঘড়ি ফেলে এসেছিল কিংবা ট্রাফিক জ্যামে আটকে গিয়েছিল, এগুলি সত্যি হলেও গ্রহণযোগ্য কারণ হতে পারে না। জুতসই কোনো একটা কারণ দেখাতে হবে, যা শোনামাত্রই বস ভুলে যাবেন দেরি হওয়ার বিষয়টা।  
যথারিতি দেরিতেই অফিসে ঢুকল গাড়ি। গাড়ি পার্ক করে কনফারেন্স রুমে পৌঁছাতে আরো পাঁচ মিনিট। ইভান পাঁচ সেকেন্ড সময় নিয়ে ভাবল ভিতরে গিয়ে কী বলবে। পরিপাটি চুল বাঁ হাতে খানিকটা ঝাঁকিয়ে নিল। 
সবাই অপেক্ষা করছে উৎসুক হয়ে। বসের চোখে উদ্বিগ্নতা। বস চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে আবার পরলেন। চিন্তিত থাকলে বস বার বার চশমা খোলেন আর পরেন।  সরাসরি ইভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-কী হয়েছিল?
ইভান লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল,
-এ্যাক্সিডেন্ট! 
-কে এ্যাক্সিডেন্ট করেছে, কোথায়?
ইভান অম্লান বদনে বলে গেল,  
-কাকলী ওভারব্রিজের কাছে ঠিক আমার সামনের গাড়িটাকে মেরে দিল একটা বিআরটিসির বাস। অবশ্য কেউ তেমন ব্যথা পায়নি কিন্ত গাড়িটার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। আর সব গাড়ি আটকে গেল। সেই ঝামেলায় আধঘণ্টা নষ্ট হল। আই এ্যাম এ্যাক্সট্রিমলি সরি স্যার৷  
মামুন সাহেবের উদ্বেগ কেটে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রশান্ত চোখে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বললেন, যাক তুমি যে এ্যাক্সিডেন্ট করনি এটাই রক্ষা! এবার কাজ শুরু করা হোক। 
-ইয়েস স্যার। 
ইভান এবার চুলের ওপর বাঁ হাত বুলিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল। 
ইভান  স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক পরিস্হিতি সামাল দিতে পেরেছে আজকের মতো। টিকে থাকতে হলে এসব নির্দোষ মিথ্যা দুঃসময়ে খুব কাজে আসে।

(চলবে)


Bably ahmed

বাবলী হক

লেখক

সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। বর্তমানে অটিষ্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরনো শহরে। সেই স্মৃতির পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস ' আম্বিয়াদাদি ও তার বিড়ালেরা'।

개발 지원 대상