অষ্টপ্রহর আনাগোনা (৬)

img

অষ্টপ্রহর আনাগোনা
বাবলী হক

বর্ষার মেঘ আর গাড়ির ধোঁয়ার ষড়যন্ত্রে ঢাকার আকাশে বেলা থাকতেই সন্ধ্যা নেমে এল। রনিতা যখন ফিরল তখন প্রায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। 

ইভান ফিরে এসেছে অফিস থেকে। চা খাবার পর রনিতা ওয়াশরুমে চলে এল হরিতকীকে পুরো ঘটনা বলতে। রনিতা জানে হরিতকী এই অবিশ্বাস্য কথা শুনে বিশ্বাস করবে। রনিতা দেখল তার কথা শুনতে শুনতে হরিতকী দুই বাহু একটু বাড়িয়ে দিল, এই প্রথম একটু নড়ল।  

 শোবার ঘরে ঢোকার সময় ইভান শুনতে পেল  রনিতা কথা বলছে ওয়াশরুমে। কার সঙ্গে কথা বলছে!  মোবাইলে বলছে না কারণ রনিতার মোবাইল ইভানের হাতে। খাবার টেবিলে ফেলে এসেছিল। ইভান ওয়াশরুমের বন্ধ দরোজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,  

-রুনি তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?  

-নক্ষত্রের সঙ্গে।

-কী?  

রনিতা আবারও বলে,  নক্ষত্রের সঙ্গে। 

মাঝে মাঝে কী সব অদ্ভুত কথা বলে রনিতা, ইভান বুঝে উঠতে পারে না। মুচকি হেসে মাথা ঝাকিয়ে বিছানায় ল্যাপটপ খুলে বসে। আজ রাতে তাকে প্রজেক্ট রিপোর্টটা শেষ করতেই হবে৷     

রনিতা ফ্রিজার থেকে চিকেন বের করল। রাইস কুকারে ভাত চাপিয়ে  সবজি কাটে, পাঁচফোড়ন দিয়ে নিরামিষ করবে।

মাথার ভিতর জটিল অঙ্কের মতো ঘুরছে সৌরভ। ভাবনার গ্রন্থি খুলছে না। এক বছর আগে সৌরভ অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল। শুনেছে, হাইওয়েতে নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি খাদে পড়ে গিয়েছিল। 

   অনেকদিন ছোটো মামার সঙ্গে কথা হয় না, দেখাও হয় না। সৌরভের এ্যাক্সিডেন্ট কবে ঘটেছিল তারিখটা ঠিক মনে নেই। এই মুহূর্তে  মামাকে ফোন করতে খুব ইচ্ছে করছে। মোবাইল টিপে সময় দেখল। নাহ্ বেশ রাত হয়ে গিয়েছে, এখন মামা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালেই ফোন করবে।        

রনিতা যেদিন সৌরভের খবরটা শুনেছিল, খুব কেঁদেছিল। মাছেদের গান শোনার সময়  রনিতার হাতের ওপর হাত রেখে বসে থাকত সৌরভ। আজ এতদিন পর আবার সৌরভকে দেখতে পেয়ে রনিতা হাতে সেই স্পর্শ অনুভব করল। নানা বাড়িতে সৌরভের সঙ্গে শেষবার যখন দেখা হয়েছিল,  রনিতা সে সময় মায়ের সঙ্গে রংপুর থেকে গিয়েছিল। বাবার পোস্টিং ছিল রংপুর জেলার ঝুমঝুমপুরে।     

 মামা, মামি আর সৌরভ দুদিন আগেই গ্রামে পৌঁছে গিয়েছে। রনিতার সঙ্গে দেখা হতেই সৌরভের প্রথম কথা ছিল,           -তুই কোন গ্রহ থেকে এলি শুনি, এত যে দেরি হল আসতে?

-ঝুমঝুমপুর থেকে।

-কী! এই নামে কোনো গ্রহ আছে নাকি, জানা ছিল না তো!  

-উঃ! ঝুমঝুমপুর গ্রহ হতে যাবে কেন! ঝুমঝুমপুর পল্লী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাবার এখন পোস্টিং।   

-ওঃ তাই বল, আমি ভাবলাম তুই বানিয়ে একটা সুন্দর নাম বলে দিলি।

-সবাইকে নিজের মতো ভাবিস কেন? বানিয়ে বানিয়ে কথা বলা  তোর অভ্যাস। মাছেদের সঙ্গে কথা বলা, রাতের বেলা ছাতিম তলায় ভূতের নাচ দেখা, এগুলি তুই বলিস।    

-ওঃ! এগুলি আমি বানিয়ে বলি? তোকে আমি মাছেদের গান  শুনাইনি? ছাতিমতলায় ভূতের নাচ দেখাইনি?

-তখন তুই যেভাবে বলেছিস, যেভাবে দেখিয়েছিস আমি বিশ্বাস করেছি!  

-আর এখন বিশ্বাস করিস না, না? সৌরভ রনিতার লম্বা বেণিতে একটা টান দিয়ে রাগ দেখিয়ে চলে গেল।   

রনিতা তখন সবে ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পরা ধরেছে। হাবভাব একটু বড়োসড়ো। সৌরভ বলল,

-গাছে চড়তে পারিস?    

-না।

-কী পারিস তুই? চল তোকে গাছে চড়া শেখাব আজ।

 নানাবাড়ির সদর দরোজার বাইরে একটা বয়স্ক পেয়ারা গাছ ছিল। পেয়ারা খুব একটা হত না। কিন্তু ডালপালা মেলে পথের পাশে গাছটির অবস্থান বেশ রাজকীয়।    

সৌরভ বলল, পেয়ারা গাছে উঠা সব চাইতে সহজ। আর ওটা বাড়ির বাইরে, কেউ দেখত পাবে না। চল।  

সৌরভ নিজে প্রথমে উঠল, তারপর রনিতার হাত ধরে ধরে এক ডাল থেকে আরেক ডাল, এভাবে বেশ উপরে উঠে গেল দুজনে। রনিতার বিশ্বাস হচ্ছিল না, প্রথমবার কী করে সে একটা গাছের এতটা উপরে উঠে গেল।   

কিন্তু একটু পরেই ওদের আনন্দ, চরম বিষাদে পরিণত হল। বাড়ির কাজের মেয়েটা ওদের দুজনকে গাছে উঠতে দেখে ফেলেছে।  বাড়ির ভিতরে খবর হতেই গাছ থেকে তখুনি নেমে আসতে হল দুজনকে। মামি রনিতাকে কিছু না বলে সৌরভের হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে গালে কষে একটা চড় লাগাল। আর রনিতাকে বাড়ির বড়োরা প্রায় সবাই একবার করে বকাঝকা করে গেল। এত বড়ো ধিঙ্গি মেয়ে হয়ে কী করে গাছে উঠল, এই প্রশ্নটাই মুখ্য ছিল। রনিতা বুঝতে পারছিল না গাছে উঠা কী করে এতো বড়ো এক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে গেল! আর ধিঙ্গি বলতে সবাই কী বুঝাতে চাইছে তাও বুঝতে পারছিল না। শুধু নানা ঠোঁট টিপে টিপে হাসছিল।    

কান্নাকাটির পর্ব শেষ হলে নানাকে একা পেয়ে রনিতা জিজ্ঞেস করে,

-গাছে উঠা কি খুব খারাপ কাজ নানাভাই?  

-না, একেবারেই না।

-তাহলে সবাই মিলে আমাকে এত বকাবকি করল কেন? সৌরভকে মামি সবার সামনে চড় মারল। আর ধিঙ্গি মানে কী নানাভাই?

নানা উচ্চস্বরে হেসে বলল,

-তোকে কী বলে সবাই বকাবকি করল  তুই সেটার অর্থই বুঝতে পারলি ন!

-না তো!

-আচ্ছা যা আমার ঘর থেকে বাংলা অভিধান নিয়ে আয়।

নানা গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। অবসর নেবার পরও মাস্টারি ছাড়তে পারেন নাই। ছোটোবেলা থেকে  নানার কাছেই অভিধানে শব্দ খোঁজা শিখেছে রনিতা। কোনো শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করলেই নানা বলতেন, অভিধান নিয়ে আয়।     

নানার শোবার ঘরে একটা কাচের আলমিরা ভর্তি বই। রনিতা জানে প্রথম তাকে ডান পাশে লাল শালুর মলাটের উপর লেখা ‘বাংলা অভিধান’ বইটি আছে।   

নানা অভিধান হাতে নিয়ে আবার রনিতাকে ফেরত দিয়ে  বলল,

-এবার নিজেই খুঁজে দেখ ধিঙ্গি শব্দের অর্থের কী!  

রনিতার সৌরভের সঙ্গে খুনসুটির দিনগুলি আজ নিমিষেই যেন দেখতে পেল। এতদিন এই স্মৃতিগুলি একবারও মনে পড়েনি। আজ যেন সৌরভের সঙ্গে দেখা হতেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে সব।       

 

 সৌরভ বলছিল ওকে আর এখন কেউ দেখতে পায় না। তাহলে রনিতা কী করে দেখে! রনিতা যে সৌরভকে দেখতে পায় এ কথা  কাউকে বিশ্বাস করানোও যাবে না।  ইলেকট্রিক আভেনের রড লাল হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে রনিতার মনে হল সৌরভের রক্তাক্ত শরীরটাকে যখন গাড়ি থেকে বের করছিল তখন কি ও বেঁচে ছিল? রান্না করা চিকেন গরম হয়ে গিয়েছে। আভেন থেকে বের করতে গিয়ে ডান হাতের তর্জনীতে ছ্যাঁকা লেগে গেল। রনিতা উঃ বলে  তাড়াতাড়ি ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে আঙুলের ওপর চেপে ধরে। ইভান তখনই কিচেনে ঢুকছিল, হাতে বরফ দিতে দেখে বলে,

-তুমি টুয়েন্টি ফোর সেভেন কী এত ভাব বলো তো? হাতটা  পোড়ালে কী করে? দেখি দেখি!

-তেমন কিছু নয়, একটু লেগেছে। 

-আমায় ডাকলে না কেন?

- আহা আমি কী জানতাম লেগে যাবে। কিছু হবে না ওষুধ লাগিয়ে নেব। রান্না হয়ে গিয়েছে, তুমি প্লেট লাগাও টেবিলে, আমি খাবার নিয়ে আসছি।                        

 তারপর দুজনে নিজেদের জগতে গভীর মগ্নতায় থেকে খাবার শেষ করল। 

 খাবার শেষে ইভান আবার ল্যাপটপ খুলে বসে। রনিতা লিভিংরুমে এসে টিভি ছাড়ল। স্টার  মুভিতে টাইটানিক দেখাচ্ছে। টিভির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, চাইলেই কি এখন সে  সৌরভকে দেখতে পাবে। চোখ বন্ধ করেও  একবার দেখার চেষ্টা করল। দেখতে পেল না।    

 সিনেমা শেষ হলে, রনিতা ওয়াশরুমে দাঁত ব্রাশ করতে করতে হরিতকীকে ফিসফিস করে বলে,

-সৌরভের  কথা ভেবে ভেবে আঙুল পোড়ালাম। তুই বিশ্বাস করিস তো আজ আমার সঙ্গে সৌরভের যে দেখা হয়েছে!   

হরিতকীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনে হল ওকে আজ একটু যেন ফোলা ফোলা মনে হচ্ছে। ওর পেটের রেশম থলেতে কি ডিম জমিয়ে রেখেছে? রনিতা হরিতকীর সঙ্গীটিকে একদিনও দেখতে  পেল না যে।হঠাৎ ব্যথায় দাঁত টনটন করে উঠল।এতক্ষণে রনিতার মনে পড়ল ওষুধ কিনতে ভুলে গিয়েছে।আজ রাতে আর হবে না, সকাল থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করতে হবে। ইভান শুয়ে পড়েছে। রনিতা পাশে শুয়ে ইভানের বুকের ওপর হাত রাখে। বলে,

-তোমার মনে আছে গত বছর সৌরভ লন্ডনে রোড অ্যাক্সিডেন্ট  করেছিল?                                                                             

ইভানের মনে থাকার কথা নয়। সৌরভের সঙ্গে তার কখনো দেখাও হয়নি। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

-কোন সৌরভ?

-আমার ছোটো মামার ছেলে। তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। তোমাকে বলেছিলাম লন্ডনে ওর অ্যাক্সিডেন্টের কথা।   

-হুঁ। বলেছিলে, রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল।  

-আজ হঠাৎ তার মতো একজনকে দেখলাম।

-হতে পারে। অনেকের চেহারায় মিল থাকে অন্যের সঙ্গে।  কোথায় দেখলে?  

-এই তো পথে।

রনিতা কথা এড়িয়ে গেল। জানে ইভান তার কথা বিশ্বাস করবে না।

(চলবে)


Bably ahmed

বাবলী হক

লেখক

সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। বর্তমানে অটিষ্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরনো শহরে। সেই স্মৃতির পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস ' আম্বিয়াদাদি ও তার বিড়ালেরা'।

개발 지원 대상