যদ্যপি আমার গুরু

img

যদ্যপি আমার গুরু

১.
বহু বহুকাল আগে, একদিন গাজী সানাউল্লাহ আমারে ফোন দিয়ে বলেন, ‘তুমি যে কাজটা করছো কেফায়েত বলছে ওইটা সুন্দর হইছে’। সম্ভবত গাজীর একটা টিভি প্রোগ্রামের বা কোনো পত্রিকার প্রমোশনাল লিফলেট টাইপের কোনো ডিজাইন ছিল সেটা। তখন ডিজাইনের প্রাইমেরি অবস্থাতে আমি, কেফায়েত ভাই সুন্দর বলছে তা শুনে আনন্দে মন আমার দোলা দিছিল। হু ইস কেফায়েত?
একদিন একজন আমারে বলছিলেন, পৃথিবীতে যদি দ্বিতীয় কোনো রবীন্দ্রনাথ আসার সম্ভাবনা থাকতো, তাইলে সেটা হইত হামীম কেফায়েত।
হামীম কেফায়েতের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে একেবারে শিশুকালে। আমাদের বাড়িতে বিশাল বিশাল দুই-দুইটা আলমারিভর্তি মাসিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক আর দৈনিকের যে কারখানা, সেই আলমারির ভিতরে অইসব পুস্তক-পত্রিকার পাতায় পাতায় আমি আবিষ্কার করি আর্টিস্ট হামীম কেফায়েতকে। কখনও তাঁরে ছুঁইতে পারি না তেমন ক্যালিগ্রাফার, তেমন এক শিল্পী তিনি।

২.
একদিন তো আমি ঢাকায় আসলাম, সাপ্তাহিক লিখনীতে ডিজাইন করি ১০হাজার টাকা বেতনে। পুরানা পল্টন জামে মসজিদের পাশে পল্টন প্লাজায় লিখনীর অফিস। বহুদিন থেকে থেকে বন্ধ হয়ে যাবার পথে পত্রিকা। বেতনের কোনো খবর নাই এমনই এক সময় হামীম কেফায়েত আমারে একদিন ফেসবুকে মেসেজ দিলেন লিখনী ছাইড়া দিলে আমি তার অফিসে চাকরি করব কি না, আমার সম্মতিতে আমারে তার অফিসে একদিন যাইতে বলেন। তার অফিস, অর্থাৎ ‘গালা’ তখন পল্টন টাওয়ারের পিছনের গলিতে। 
কোনো এক বিকালে আমি আমার ছোটবেলার কল্পনার শিল্পীর সহিত দেখা করতে যাই গালায়, কী দুর্দান্ত লাইটিং, ক্যালিগ্রাফী, পেইন্টিং আর শিল্পে শিল্পায়িত একটা অফিস গালা। গালায় গিয়ে প্রথমে কেফায়েত ভাইয়ের কথায় আমি মুগ্ধ হই। এই মুগ্ধতা থেকে আমি লিখনে ছাইড়া গালায় যুক্ত হই। গালায় আমার বেতন ধরা হইল দশ নাকি পনেরো মনে নাই। লিখনী থেকে আমি গালায় আসার কয়দিন পর সাজাভাইও চলে আসে গালায়। এর কয়দিন পর তানভীর এনায়েতও চলে আসলো গালায়। লিখনীর অর্ধেক টিম এখন গালার। গালা ক্রিয়েটিভ এজেন্সি। কেফায়েত ভাই আর মাহবুব ভাই (মাহবুব মুর্শিদ) গালা পরিচালনা করেন। কর্পোরেট জায়গা থেকে কাজ আসে আর আমরা সেই কাজগুলা করি। খুবই কম কাজ, একেবারেই কম। কাজ করার পরিবর্তে আমরা যা করতাম, রাতভর মুভি দেখতাম, ইন্টারনেটে কোন দেশের কোন গায়িকা ভালো গান গেয়ে ফেলছে এইগুলা আবিষ্কার করতাম, কোন জায়গার কোন অজানা অচেনা একটা বিষয় হঠাৎ আবিষ্কার করে আমাদের দেখাইতো কেফায়েত ভাই।
বসের চেয়ার বলতে যেটাকে বুঝাইতো, রাতের ১টা বাজে সেই চেয়ারে বসে পা দুইটা টেবিলের উপর উঠে দিয়ে আধশোয়া হয়ে আমি মুভি দেখি, কেফায়েত ভাই অর্থাৎ আমার বস পানি গরম করে আদা আর লেবু মিশ্রিত রং চা নিয়ে আমার পাশে এসে বলে, স্যার চা খান। আশ্চর্য একটা পরিবার গড়ে উঠে গালায়। বস বলতে কিছু না, সকলেই সকলের সহযোগী। গালার কাজকর্ম যেহেতু প্রায় নাই পর্যায়ে, তো বেতন আমি কিভাবে পাবো? গালায় ঢুকার প্রথম সপ্তাতেই আমি বুঝে নিছি এবং মেনে নিছি এইখানে আমি বেতনের উদ্দেশ্যে চাকরি করি না। খাওনের যে টাকা, ওইটার জন্য আমি আমার ব্যক্তিগত কাজগুলা করি, আমার পার্সোনাল কাজগুলা যেন আরামে করতে পারি তাই কেফায়েত ভাই আমারে বলেন তুমি অই গ্লাস দেয়া রুমটারে নিজের মত কইরা গোছায় নেও, ওইটা তোমার পার্সোনাল অফিস। ওই রুমে, অর্থাৎ গালায় আমি গালার কাজ যদি করে থাকি দুই টাকার, আমার পার্সোনাল কাজ করি ২হাজার টাকার। আমরা দুপুরবেলা ভাত খাইতে যাই হোটেল জালালাবাদে, পকেটে যার যখন টাকা থাকে তার টাকা দিয়ে আমরা খাইতাম দুপুরে, রাতে। 
কেফায়েত ভাই কি আমারে ডিজাইন শিখাইছেন?, তিনি কি আমার শিক্ষক? না। আমি কারও কাছ থেকে কাজ শিখি নাই, যদি ডিজাইনের অ-আ শিখে থাকি সেটা আমার বড়ভাই আবুল কালামের কাছে দেখে দেখে। কেফায়েত ভাইয়ের কাছে আমি যেটা শিখছি সেটার বিবরণ দেয়া কঠিন। ধরা যাক আকাশটা নীল, তিনরকম নীল, অল্প নীল, মধ্যম নীল, গাঢ় নীল। প্রকৃত পক্ষে কোন নীলটা সুন্দর? আমি বলতে পারি প্রকৃত সুন্দর কোনটা। প্রকৃত সুন্দরের দৃষ্টি আমি কেফায়েত ভাইয়ের কাছ থেকে পাইছি। 
গালায় তখন সাদও আসতো। ভিজিটিং কার্ডে অপর পিঠে মিনিয়েচার পেইন্টিং শিখায়ে দিল কেফায়েত ভাই। আর আমি, সাদ, উবায়দা, তানভীর ভাই, এবং আরও যারা গালায় রেগুলার আসত তারা ভিজিটিং কার্ডে অপর পিঠে মিনিয়েচার আাঁকা শুরু করে দিলাম। এখনকার যে সাদ রহমান, এখনকার যে তানভীর এনায়েত এবং এখনকার যে আমি, তার পেছনে গালা এবং কেফায়েত ভাইয়ের অনেক বড় অবদান। বলা যায় গালা আর হামীম কেফায়েতের সহচার্যে আমাদের সৃষ্টি। আমরা বহুদিন গালায় একটা সোনালী পরিবারের মত জীবন-যাপন করছি।

৩.
আজ (Aaj) নামক একটা অনলাইন পোর্টাল শুরু করে কেফায়েত ভাই, বিশাল আয়োজন করে টিএসসিতে উদ্বোধন হয় আজ টুয়েন্টিফোর ডটকম। আজের অফিস বাংলামটর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাশের বিল্ডিং হ্যাপী রহমান প্লাজায়। যেটা হয়, ‘আজ’ শুরু করে কেফায়েত ভাই যে বাংলমটর অফিসে যায়, আর আসে না গালায়। মাহবুব ভাইও অনেকদিন ধরে দেশের বাড়িতে। এর ভিতরেই সাজাভাই চলে যায় গ্রামে, তানভীর ভাইও। সাদ পুরো সময় আজ-এ। আর আমি অর্ধেক আজ-এ, অর্ধেক গালায়। এইভাবেই গালা বন্ধ হয়ে যায়। আমি আজ-এর ফটোসাংবাদিক হয়ে কাজ করি, এবং আমার কাজগুলা করি। তখন একটা ঘটনা ঘটে, সেটা অন্য কোনোদিন বলব হয়ত। কেফায়েত ভাইয়ের লগে আমার মনোমালিন্য হয়, মনোমালিন্যের দিন থেকে আর আমি আজ-এ যাই না। 
আমি আমার মতো গোছায় নিতেছিলাম নিজেরে। পল্টন কালভার্ট রোডে ‘কাজীরকাজ’ শুরু করে দেই। কাজীরকাজের অবস্থান চাঙ্গা হইতে থাকে ধীরে ধীরে, টাকা আসতেছে, নাম হইতেছে। পল্টন ছাইড়া কি কারণে যেন আমি যাত্রাবাড়ী চলে যাই। বিশাল এক ফ্ল্যাট নিয়ে আমি একা কাজীর কাজ করি আর নিঃসঙ্গ ব্যাচেলর জীবনরে যাপন করি। গালার কারো সঙ্গে যোগাযোগ নাই, আজ-এ কি অবস্থায় সে খবরও আমার কাছে আসে না। এরপর অনেকদিন গেলে, আজও নিভু নিভু হতে থাকে, কেফায়েত ভাইয়ের উপর অভিযোগ তোলে আজ-এর স্পন্সরদাতারা। ঘটনাগুলি আমার জানা নাই অত। কেফায়েত ভাই আজ ছেড়ে দেয়। কোথায় থাকে জানি না। অনেকদিন নিখোঁজ থাকার পর একদিন আমার যাত্রাবাড়ীর ফ্ল্যাটে কেফায়েত ভাইয়ের আগমন ঘটে।
দেশের অবস্থা তখন খারাপ। চারদিকে ইস্যু শুধু জঙ্গী। ঢাকা তখন প্রতিটা ব্যাচেলরের জীবন হুমকির মুখে। আমার বাসায় পুলিশ আসে দুইবার। এই ধরনের পরিস্থিতে একা জীবন যাপন করা পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়ে গেছে জীবন। এমন পরিস্থিতেই কেফায়েত ভাই আমার এখানে এবং আমার জীবনের আরেকটা মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। আমারে বাংলাবাজার চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আমি যে কাজগুলি করি, তার ইচ্ছামত করা যাবে বাংলাবাজার গেলে, এইসব বলেন। এবং এর পরের মাস থেকেই আমি বাংলাবাজার দোকান নিই কাজীরকাজের। বাংলাবাজারে বসে বিস্তর করা যাচ্ছে। কেফায়েত ভাই কিছুই করে না, কামরাঙ্গীরচর থেকে প্রতিদিন বাংলাবাজার আসে, একসাথে চা-টা খেয়ে চলে যায়। আবারও একত্রিত হইলাম। প্রতিদিন বিকালে আমরা আর্যু (অস্ট্রিক আর্যু) ভাইয়ের দোকানে বসে আড্ডা দেই, চা খাই, বিড়ি খাই। থাকতে থাকতে বাংলাবাজার আমার কাছে জন্মভূমির মত আপন হইয়া গেল। চাকরিতে জয়েন করার সময় বাংলাবাজার ছাইড়া যাওয়া আমার কষ্টকর ছিল। চাকরিতে জয়েন করব কি না এই পরামর্শও কেফায়েত ভাইয়ের কাছ থেকে নিই। বাংলাবাজার থেকে চাইতে চাকরি করা কেন ভালো এর যথাযথ যুক্তি কেফায়েত ভাই আমারে দেয়, আর তারপর আমার শুরু হয় চাকরিজীবন। এখনও, দুইদিন, তিনদিন পরপর আমি বাংলাবাজার যাই, কেফায়েত ভাইয়ের লগে চা খাব এই উদ্দেশ্যে। 
আহমদ ছফার কাছে আবদুর রাজ্জাক যেমন, হামীম কেফায়েতের কাছে এসএম সুলতান যেমন, আমার কাছে কেফায়েত ভাই তেমনই এক মহাসাগরের নাম।


Kazi Jubair Mahmud

কাজী যুবাইর মাহমুদ

আর্টিস্ট ও গদ্যকার

কাজী যুবাইর মাহমুদের শেকড় ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে, বর্তমান আবাস ঢাকা।