পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ নাম গ্রহণে সংশয়গ্রস্থরা ছুপা-ফ্যাসিস্ট

img

অবদমিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অর্থোডক্স হওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। এমন কী তাদের মধ্যে প্রবল ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির উপস্থিতিও অনভিপ্রেত নয়।  সম্প্রতি এর উদাহরণ পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের 'বাংলা' নাম গ্রহণেচ্ছায় বাংলাদেশের কিছু মানুষের সংশয় ও তাচ্ছিল্য প্রকাশের মধ্যে।  তারা বলছে, এতে বাংলাদেশের জাতীয় সংঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বা ‘জয়বাংলা’ ইত্যাদি ধ্বনিসমূহ নাকি আত্মসংকটে পড়বে; বাংলা নাম গ্রহণ করলেও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।  প্যাটেন্টগত বাণিজ্যিক বিপদের কথাও বলছেন কেউ কেউ।

ঐতিহাসিক সৌভাগ্যবশত পূর্ববঙ্গের মানুষ ‘বাংলা’র অর্ধেক ভূখণ্ড নিয়ে ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামে রাষ্ট্র গঠন করে।  এখন, পঞ্চাশ বছর পর বাকি অর্ধেক ‘বাংলা’ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের প্রদেশের নাম ‘বাংলা’ রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।  ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিধানসভায় প্রথম এই প্রস্তাব পাস করে।  কিন্তু আপাতভাবে নিরীহ, নাম পরিবর্তনের এই ইচ্ছাকে দুরভিসন্ধি হিসেবে দেখে তা বাতিল করে দেয় তৎকালের কেন্দ্রীয় সরকার।  কেন্দ্রীয় সরকারের ভয়, 'বাংলা' নামকরণে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে পারে।  বাঙালিদের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্র সরকারের কাছে তাদের চাহিদা বেড়ে যাবে।  তাই বাংলাদেশের সাথে মিলে যায় এ অজুহাতে পশ্চিমবঙ্গের নাম 'বাংলা' রাখার প্রস্তাব খারিজ করা হয়।  ভারতের যেকোনো আঞ্চলিক-চেতনা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের’ কাছে অচ্ছুৎ ও হুমকি স্বরূপ, কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের কোনো কোনো চিন্তা-মহলের কাছেও পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

১৯৭১ সালে রাষ্ট্রগঠনের সুযোগ পেয়ে ‘পূর্ববঙ্গ’ বা ‘পূর্ববাংলা’ নামের বদলে ‘বাংলাদেশ’ নামগ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষ চরম অবিচার করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ রাখার এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের (কিছু মানুষের) আপত্তি, ব্যঙ্গ, ভয়, সংকট বা দুরভিসন্ধি খোঁজা প্রকৃতপক্ষে একটি অগণতান্ত্রিক ইচ্ছা।  এই ঘরাণার চিন্তাবিদেরা আদতে তাদের ‘বাংলাচিন্তা’ প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়ে দেওয়ার মতো কবিরা গুনাহ করছে।  তাদের আচরণে মনে হয়, বাংলা যেন তাদের একার, বাকি পশ্চিমবঙ্গ বেওয়ারিশ! বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির গর্বিত-ভাব থেকেই মূলত তারা এই আচরণ করছে।  অর্থাৎ, পূর্ববঙ্গের মানুষ পহেলা রাষ্ট্র গঠন করতে পেরেছে বলে বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সাথে তারা এই খবরদারি করতে চাচ্ছে।  পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাংলা’র ন্যায্য স্বত্বাধিকারের অংশ থেকে বঞ্চিত করার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্ব  হলো-   এক,  পশ্চিমবঙ্গের আধিবাসীরা এখনো প্রদেশ রয়ে গেছে, রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হয়নি।   দুই, তারা লোকাল সাম্রাজ্যবাদ ভারতের অংশ।  এর বাইরে তৃতীয় যে কারণের কথা বলা হয় তা হলো- বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভাবের সংকট, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কপিরাইট ফয়সালার সমস্যা।  

প্রথমত, বাংলাদেশের মনোজটিলতার দায় পশ্চিমবঙ্গের ওপর চাপানো যাবে না।  দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভাব ও প্যাটেন্টগত ক্রাইসিসের কারণে পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ নাম গ্রহণের গণতান্ত্রিক ন্যায্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। বরঞ্চ, পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরা তাদের প্রদেশের নাম শুধু ‘বাংলা’ না করে ‘বাংলাপ্রদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ করলো না কেন, এই প্রশ্ন তোলা যায়।  পশ্চিমবঙ্গের নাম ’বাংলাপ্রদেশ’/ ‘বাংলাদেশ’ রাখার স্পর্ধা করতে না পারাটাই বরং তাদের বিরাট সীমাবদ্ধতা।  রাষ্ট্রের নামের ক্ষেত্রে একই-নাম রাখা ওয়েব-দুনিয়ার ডোমেইনগত অসুবিধার মতো হতে পারে, কিন্তু প্রদেশ বা রাজ্যের নাম ’বাংলাপ্রদেশ’/ ‘বাংলাদেশ’ রাখার সে সমস্যা নেই।  কলোনি ভারতের সবচেয়ে অগ্রসর অঞ্চল হয়েও নিজেদের রাষ্ট্র গঠন করতে না পারার ব্যর্থতা থেকেই তারা এই সাহস দেখাতে পারেনি।  বাংলাপ্রদেশের বদলে কেবল বাংলা নামে সন্তুষ্টি তাদের ঐতিহাসিক হীনমন্যতা বা পরাজয় মানসিকতার উদাহরণ।  শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অগ্রজাধিকারের কথা বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই বঞ্চনা মেনে নিয়েছে।  বরং, ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রগঠনের সুযোগ পেয়ে ‘পূর্ববঙ্গ’ বা ‘পূর্ববাংলা’ নামের বদলে ‘বাংলাদেশ’ নামগ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি পূর্ববঙ্গের মানুষ চরম অবিচার করেছে।  তাই, কেবল ‘বাংলা’ নামটুকু গ্রহণ করায় তাদের ধন্যবাদ দেওয়ার বদলে, বিরূপ সমালোচনা বা আপত্তি তোলাটা পূর্ববঙ্গের কিছু মানুষের হীনমন্যতাজাত লুক্কায়িত ভারত-জুজুপ্রীতির বেশি কিছু না।  এই চিন্তার অনুসারীরা যে মোড়কেই থাকুক, তারা প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদী কূপমণ্ডুক, লুক্কায়িত ফ্যাসিস্ট।

পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাংলা’র ন্যায্য স্বত্বাধিকারের অংশ থেকে বঞ্চিত করার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্ব  হলো-   এক,  পশ্চিমবঙ্গের আধিবাসীরা এখনো প্রদেশ রয়ে গেছে, রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হয়নি।   দুই, তারা লোকাল সাম্রাজ্যবাদ ভারতের অংশ।  

খেয়াল করলে দেখা যায়, যারা এসব আপত্তি তুলছে, তারা ঢাকার প্রতি কলকাতার কর্তৃত্ববাদের সমালোচক, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের প্রভুত্বগিরির বিরুদ্ধে সোচ্চার; সর্বোপরি বাংলা-ভাবে গর্বিত, উচ্চকিতজন। এহেন মানবিক ও দেশপ্রেমিকেরাই পশ্চিমবঙ্গকে তার ন্যায্য স্বত্বাধিকারের অংশ দিতে কুণ্ঠিত।  এই হলো ঢাকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের ফ্যাসিস্ট চেহারার সম্প্রসার।এই আপত্তি-ওয়ালারা বাংলা মৌলবাদী।

এই আপত্তি নিয়ে যদি রাষ্ট্রসংঘের দারস্থ হওয়ার উপায় থাকে, তাহলে ন্যায়ত বাংলাদেশকে ‘পূর্ববঙ্গ' বা ‘পূর্ববাংলা’ আর নতুন বাংলাকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ বা ‘পশ্চিমবাংলা’ নামে ফিরে যেতে হবে।  কেননা,  অর্ধেক বাংলা নিয়ে 'বাংলাদেশ'  নাম গ্রহণ করাটাই বেআইনি বলে বিবেচিত হবে।  পুরো ভূখণ্ড নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হলেই কেবল তার নাম 'বাংলাদেশ' হতে পারে।  তার আগে আপনি কেবলই পূর্ববঙ্গ, আপনি পশ্চিমবঙ্গই আসলে।


Alamgir Nishad

আলমগীর নিষাদ

কবি ও সাংবাদিক