অষ্টপ্রহর আনাগোনা ( ৫)

img

[একটা সিএনজি আসতে দেখে হাত তুলে থামাল। কোথায় যাবে ভাবছে। মনে পড়ল তার মৃদুলার বাড়িতে যাবার কথা ছিল।   

সিএনজিতে উঠে বলল- মহাখালী চলেন] 

অষ্টপ্রহর আনাগোনা 

মহাখালী এসে রাস্তার নাম্বার বলেতেই বাড়ির কাছাকাছি চলে  আসে সিএনজি। অনেকদিন পর এলেও রনিতার এই বাড়িটাকে  আত্মীয়-বন্ধুর মতো চেনা লাগে, সেই কলেজ জীবন থেকে। মৃদুলার  দাদার আমলের বাড়ি। মৃদুলা তখন থাকত দোতলায় বাবাকে  নিয়ে। একতলায় ভাড়াটিয়া থাকত দাদার মৃত্যুর পর থেকে। মৃদুলার যখন তিন বছর বয়স, মা মারা গেলে বাবা আর বিয়ে করেননি। দু বছর হয় মৃদুলার বাবাও হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। 

উপরে তিনতলা ও চারতলায় থাকে দুই চাচা। পাঁচতলার ছাদে দুইটা রুম করা হয়েছিল বাড়ি করার সময়। বাবা চলে যাবার পর মৃদুলা সেখানে উঠে যেতে চাইলে চাচারাই ঘর দুটাকে ঠিক-ঠাক করে দেয়। শোবার ঘরের সঙ্গে একটা বাথরুম আর ছোটো একটা  রান্নাঘর করে দিয়ে বলল,

-তিনতলা ভাড়া দিয়ে তোর খরচ চালাতে পারবি। মৃদুলা নিজে এখন হিউম্যান রিসোর্সে চাকরি করছে। যদিও চাকরি  আর প্রেমিক দু তিন বছর পর পর তার না বদলালে চলে না।  

রনিতা বলত,

-বল তো, তোর এই মৃদুলা নামটা কে রেখেছিল?  তোর নাম হওয়া উচিৎ ছিল ঝটিকা কিংবা বুনোহাঁস।   

-কী করব?  জন্মের পর নিজের নাম রাখার সুযোগ তো আমাকে  দেয়া হয়নি। আমার নামটা অবশ্য দাদু রেখেছিলেন। বদলে ফেলতে পারি কিন্তু এই বয়সে আর এসব ঝামেলায় যেতে চাই না।

দুই বন্ধু এসব বলে খুব হাসে।   

মৃদুলার ছাদের ঘর-সংসার যেন একটি আগোছালো বাগান।  ফ্লাটের দরোজা খুলেই চোখে পড়ে দুটা আরামদায়ক বেতের চেয়ার, মাঝে ছোটো একটা টেবিল আর সেই টেবিলে জড়ো করা ঘরের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন কাঁচি, প্লায়ার, স্কচটেপ, সুঁই সুতা থেকে শুরু করে প্রায় আট দশটি সামগ্রী। মৃদুলা বলে এভাবে রাখলে সব হাতের কাছে পাওয়া যায়। তারপর ঘরের অনেকটা জায়গা ফাঁকা,    মেঝেটা  ঝকঝকে মোজাইক করা। দেয়ালের সঙ্গে লাগানো বেশ বড়োসড়ো একটা ডিভান, ওপরে অনেকগুলি কুশন ছড়ানো। ঘরের চার কোণায় চারটা ল্যাম্প। দিনের বেলায়ও রনিতা দেখেছে একটা  দুটা ল্যাম্প জ্বলতে থাকে কারণ মৃদুলা বাতি নিভাতে প্রায় ভুলে  যায়। জানালা দুটাতে ভারী পর্দা ঝুলানো থাকে বলে ঘরটা বেশ অন্ধকারও থাকে।  

রনিতা এই ঘরে কখনো বসে না। কারণ দুই-বন্ধু শোবার ঘরেই শুয়ে বসে গল্প করে। ছাদের-ঘর বলে আলো বাতাসের অভাব নাই। শোবার ঘরে রোদের আলো আর চাঁদের আলোর অবাধ আনাগোনা। কখনো কখনো বিছানায় খবরের কাগজ পেতে খাওয়া দাওয়া চলে। নইলে বড়োসড়ো একটা ট্রলি হচ্ছে মৃদুলার ডাইনিং টেবিল। শোবার ঘর জুড়ে দাদার আমলের কালো মেহগনি কাঠের  কারুকাজ করা বড়ো এক পালঙ্ক। যেখানে পুরো পরিবার নিয়ে শোয়া যায়। মৃদুলা একা থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। 

ঘরের এক কোণে জানালার পাশে একটা পড়ার টেবিল ও চেয়ার। আর কোনো আসবাব নাই। আছে অবশ্য একটি লুক্কায়িত ছোটো  দড়ির খাটিয়া। একগাদা বই, একটা চাদর দিয়ে ঢাকা। খাটিয়ার অবস্থান পালঙ্কের নীচে। কখনো কেউ দেখে জিজ্ঞেস করলে মৃদুলা তীব্র কণ্ঠে বলে,

-নাঃ ওটাতে হাত দেবে না। ওখানে আমার আমার খুব দামি  

জিনিস আছে। মৃদুলাকে বিয়ে করার কথা বললে বলে,

-কেন, বিয়ে করে কী এমন রাজ্য উদ্ধার হবে শুনি? বেশ আছি। শুধু শুধু এক বিশেষ মানুষের সঙ্গ পাওয়ার জন্য স্যাক্রিফাইস, কম্প্রোমাইজ, মানিয়ে চলা এসবই তো।  ধুশ শালা, এসব আমাকে দিয়ে হবে না। এই যে তোরা বিয়ে করেছিস, বল আমার চেয়ে  ভালো আছিস?  

দরোজা খোলাই ছিল। রনিতা শোবার ঘরে এসে দেখে বিছানায় বালিশ বুকে চেপে মৃদুলা শুয়ে আছে। ঘরে মৃদু সুরে বাজছে কিশোরী আমানকার...একই...হতে যো হামকো... 

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে রনিতা জিজ্ঞেস করে, 

-কী হল বুনোহাঁসের? এতো জরুরি তলব? 

-অনেক কথা, খুব মজার! সেই জন্যই জরুরি।  

পালঙ্কের উপর উঠে বসতে গিয়ে রনিতার চোখে পড়ল ঘরের এককোণে বিশাল এক ফুলের তোড়া পড়ে আছে। অনেকগুলি ফুল শুকিয়েও গেছে। রনিতা জিজ্ঞেস করে,  

-এত ফুল কে পাঠাল? নতুন প্রেমিক? 

-হুঁ। তবে ছয় মাস হয়ে গিয়েছে। 

-কী বলিস, আগেরটা কেন বাদ দিলি? 

-বাদ দেব না? এক বছর প্রেম করার পর আমাকে বলে   ‘জানটুশ’! এইটা কোনো প্রেমের সম্বোধন হল?    

-কী করে বাদ দিলি? 

-কল ধরলাম না, মেসেজের উত্তর দিলাম না। কয়েকদিন খুব চেষ্টা করল যোগাযোগের, কিন্তু আমার সাড়া না পেয়ে কেটে পড়েছে।  

- আর এইটা জুটল কী করে? 

-অফিসে এসেছিল কাজে। ফোন নাম্বার চাইল, দিলাম। 

-নাম কী ? 

-খুব পচা নাম। আমি ওকে মেষপালক বলি। 

-তা এইটা কতদিন টিকবে?  

মৃদুলা হাসে, জানি না। সে রকম পুরুষ আজও পেলাম না। চুমু খেতে গেলে আফটার শেফ নাহয় নিকোটিনের গন্ধ পাই।

রনিতা বলে, 

-তাহলে তোর কী রকম চাই, দমকল?  

-হ্যাঁ। ঠিক, যেন এক প্রচণ্ড ফোর্স আমাকে ভাসিয়ে নেবে। এসব ন্যাকা-ন্যাকা পুতু-পুতু ছেলে অসহ্য! চুমু খেলে মনে হবে ঝরনা জলে ভেসে যাচ্ছি। বুকে মাথা রাখলে মনে হবে রেইন ফরেস্টের স্যাঁতসেঁতে পাতায় মুখ গুঁজে আছি।                                                                     -ওঃ তুই পারিসও বটে! এইটা কি তোর জরুরি বিষয়? মৃদুলা শোয়া থেকে উঠে বসল। ওর শরীরের ভঙ্গিতে চঞ্চলতা সারাক্ষণ। কখনো স্থির বসে থাকে না। বলে, 

-আরে দূর! এসব কোনো বিষয় হল! তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব। ভাবতে পারবি না কী অসাধারণ জায়গা!

-কোথায়?

-আশ্রমে।  

রনিতা অবাক হয়ে জানতে চায়, 

-আশ্রম? কোথায়? 

-পূর্বাচল। ঢাকার খুব কাছেই। মেষপালক একদিন আমাকে নিয়ে গেল। খুব শান্তি লাগে ওখানে গিয়ে বসে থাকতে।   

রনিতা বলে,

-এটা কি পণ্ডচেরির শ্রীঅরবিন্দু আশ্রমের মতো?  

-না, একেবারেই না। পণ্ডচেরির আশ্রমে আমি গিয়েছি, ওটার মতো একেবারেই না। এটা আসলে একটা ইয়োগা সেন্টার। আতিয়া সিদ্দিক নামে একজন মহিলা, বয়স প্রায় সত্তরের ওপরে। ওখানে বিশাল এলাকা নিয়ে একটা ইয়োগা সেন্টার করেছেন। অনেক সম্পত্তি রেখে স্বামী মারা গিয়েছেন। কোনো ছেলেমেয়েও নাই। উনি  নিজেও থাকেন ওখানে। তোকে নিয়ে যাব, দেখিস ভালো লাগবে।  

-তুই তোর মেষপালককে নিয়ে যাস ওখানে?  

মৃদুলা বলে,

- আরে দূর, না! একদিন মেষপালক আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।   বললাম, খুব ভালো লেগেছে। শুনে খুশি হয়ে বলে, চলো আবার যাব। আমার মাথা খারাপ হয়েছে ওকে নিয়ে আর  ওখানে যাই! বলি, দেখি যদি সময় করতে পারি। তারপর আমি একা একা আরো দুদিন গিয়েছি। এখনো ভর্তি হইনি। সপ্তাহে ছয়দিন কিংবা তিনদিন করেও যাওয়া যায়। তোকেও আমি শুধু একদিন চিনিয়ে দেব। ভালো লাগলে তুই একা একা যাবি।  

রনিতা বলে,

- একা একা কেন? তুই আমার সঙ্গে যাবি না? 

-ওখানে গেলেই বুঝতে পারবি। একাই ভালো লাগে। তোর সঙ্গে গেলে থোড়াই ইয়োগা হবে। এটা সেটা মনে পড়বে আর শুধু গল্পই হবে।

রনিতা বলে, 

-আচ্ছা একদিন তোর সঙ্গে যাব। এখন খুব খিদে পেয়েছে রে। তোর এখানে কী রান্না হয়েছে আজ?                                  -আমার কাজের মেয়েটা আসেই নাই এখনো। তুই না এলেও  ভাবছিলাম বাইরে গিয়ে খাব। অফিসেও ডে-অফ ছিল। চল যাই।  কী খাবি? 

-যা কিছু, ভাত-মাছ ছাড়া। বাড়ির বাইরে আমার ভাত-মাছ খেতে ভালো লাগে না।  

-আচ্ছা চল থাই খাব। আমি একটু চেঞ্জ করে আসি।   

রনিতা বলে, ঠিক আছে। 

এই ঠিক আছে শোনার সময় নাই মৃদুলার। তার আগেই চেঞ্জ করতে চলে গেল। ফোনে কথা বলার সময়ও নিজের বলা হয়ে গেলে ওমনি ‘আচ্ছা রাখি’ বলে রেখে দেবে।  

জিন্সের ওপর একটা নীলাভ ভেজিটেবল ডাইয়ের ফতুয়া আর লাল চুনরি ওড়না গলায় ঝুলিয়ে এসে বলল, চল বেরোই। 

 বিছানার ওপর রাখা কালো রঙের চামড়ার ব্যাগটা অনায়াস ভঙ্গিতে কাঁধে ঝুলিয়ে দরোজা টেনে বন্ধ করে দিল।  

রনিতা হাসল মৃদুলার দিকে তাকিয়ে। 

-হাসছিস কেন?

-তুই তেমনি রয়ে গেলি, একটুও বদলালি না। আমি বেরোতে  গিয়ে কতবার ব্যাগ চেক করি, সব কিছু ঠিক-মতো নিয়েছি কিনা দুবার ভাবি, তারপরও কিছু ভুলে যাই।  

-আমার ভোলার কোনো অবকাশ নাই, কারণ এই ব্যাগেই আমার  সব থাকে। তারপর ব্যাগটা ছিঁড়ে গেলে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কিনে নেই। তোদের মতো এত ফ্যাশন করি না।  

দুজনে খেয়ে যখন বের হল, ক্লান্ত রোদ, পড়ন্ত দুপুর। মৃদুলা জিজ্ঞেস করে,

-কোথায় যাবি রনি? 

-বাড়ি ফিরব। ইভানেরও ফেরার সময় হয়ে এল। তুই কোথায় যাবি? 

-মেষপালক অপেক্ষা করছে বাংলা বাজার বইয়ের দোকানে। তারপর কোথাও যাব, ঠিক নাই। তুই কিন্তু আগে থাকতেই আমাকে জানাবি কবে যাবি আশ্রমে। একটা রিক্সা দেখতেই কিছু না বলে উঠে পড়ে। চলন্ত রিক্সা থেকে  হাত তুলে রনিতাকে বাই করল। 

রনিতা আজ অদ্ভুত একটা দিন কাটাল। সৌরভকে মাথা থেকে  বের করতেই পারছে না। সত্যি কি সে সৌরভকে দেখেছে, কথা বলেছে! একবার ভেবেছিল মৃদুলাকে সৌরভের কথা বলবে। কিন্তু মনে হল, হয়তো বিশ্বাস করবে না। ইভানও বিশ্বাস করবে না। কিন্তু একজন বিশ্বাস করবে।

রনিতা ফেরার কিছুক্ষণ পরে ইভান অফিস থেকে ফিরল। চা খাবার পর রনিতা ওয়াশরুমে চলে এল হরিতকীকে পুরো ঘটনাটা বলতে। হরিতকী সেখানেই আছে, একটুও জায়গা বদলায়নি। শুধু   রনিতার কথা শুনতে শুনতে দুই বাহু একটু বাড়িয়ে দিল।      শোবার ঘরে ঢোকার সময় ইভান রনিতার গলার আওয়াজ পেল। মনে হচ্ছে, রনিতা যেন কারোর সঙ্গে কথা বলছে। অথচ ইভানের হাতে রনিতার মোবাইল। খাবার টেবিলে ফেলে এসেছিল। অবাক ইভান ওয়াশ্রুমের বন্ধ দরোজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,  

-রনি তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?  

- নক্ষত্রের সঙ্গে। 

- কী?  

রনিতা আবারও বলে,  নক্ষত্রের সঙ্গে। 

 

(চলবে)


Bably ahmed

বাবলী হক

লেখক

সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। বর্তমানে অটিষ্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরনো শহরে। সেই স্মৃতির পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস ' আম্বিয়াদাদি ও তার বিড়ালেরা'।