গডেস অব অ্যামনেশিয়া (২০)

img

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

বছর একই থাকল, উনিশশ’ ছিয়ানব্বই, কিন্তু চারিদিকে সবকিছু এক দীর্ঘ যুগের সমান বদলে গেল! নতুন প্রধানমন্ত্রীর দেশে টেলিভিশনের লোগো-গান, রে্ডিওর নাম–খবর, সবকিছুর ভিন্ন রূপ। সেই বদলের ঢেউয়েই হবে হয়তো- আমার জীবনও অন্য রকম হয়ে গেল। ভাদ্র মাসে হঠাৎ একদিন বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। 

সারা গ্রামে একটাই স্কুল, স্কুলেও একটা মাত্র দালান। বিশাল বড় মাঠের পশ্চিম পাড়ে একটা দৈত্য-মতোন তেঁতুল গাছ। যতদূর গাছের ছায়া, ঠিক ততদূর ইট বিছানো। মাঝখানে বেতের মোড়া পেতে একজন শিক্ষক বসে আছেন। আর তাকে ঘিরে আছে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন আমার বয়েসী শিশু। এই তাদের ক্লাস। এই গাছের তলেই তাদের শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হচ্ছে। আমাকে সেই শিক্ষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন বাবা। উনি আমার নাম লিখে নিলেন হাতের লম্বা রুলটানা খাতায়। এরপর ওই ছোট্ট ভিড়ের মধ্যে একলা অসহায় বসিয়ে দিয়ে বাবা চলে গেলেন…

রোদহীন দিনে শেষ বিকেল আর সন্ধ্যার রঙ প্রায় একই হয়। 

আমার গল্পের এই পর্যায়ে এসে সারা নদী অন্ধকারে ছেয়ে গেল। আমি ফিরে এলাম বর্তমানে। দুই হাজার সতেরোর সুদীর্ঘ বর্ষাকাল চলছে এখন। যার মুখোমুখি বসে গল্প শুরু করেছিলাম সে কোন এক সময় মুখ নামিয়ে নিয়েছে, আমি টের পাইনি। হয়তো ক্লান্ত সে। হয়তো অজানা অচেনা  মানুষে ভরা যুগ-পুরাতন এই সমস্ত গল্প শোনার আগ্রহ সে হারিয়ে ফেলেছে। 

বৃষ্টিও আর নাই, তাই চাইলেই উঠে চলে যাওয়া যায় যে যার ঠিকানায়। আবার কোন একদিন এমন সারাদিন বন্ধ করে বৃষ্টি হবে। সারা শহরের কাজ-পাগল মানুষ সেদিন আরও একবার থেমে থাকবে সকাল-সন্ধ্যা। এই রেলের কলোনী- লাল ইটের পোস্টাফিস- সব ভিজে পড়ে থাকবে নদীর মুখে। আমি একলা হেঁটে আসব, একলা বসতে চাই বলে। হয়তো সেদিনও কেউ না কেউ আগে থেকেই লোহার বেঞ্চি দখল করে বসে থাকবে। নতুন কেউ? নাকি আজকের এই গাঢ় চোখওয়ালা গভীর মানুষটাই? যেখানে এসে থেমে গেলাম সেখান থেকেই আবার বলে যাবো আমার গল্প? নতুন মানুষ হলে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে বোধহয়।

সে তখন দেখা যাবে। আমার গল্প আপাতত বন্ধ থাকুক। 

অন্ধকারে প্রায় ছায়ামূর্তি হয়ে সামনে যে বসে আছে তার চোখ পড়া যাচ্ছে না আর- সেখানে আগ্রহের কিছু অবশিষ্ট রয়ে গেল কিনা বোঝার উপায় নাই। আমি বহুক্ষণ তাই থেমে রইলাম। আমার শ্রোতা তবু ঘোর নির্বিকার। জমে পাথর হয়ে আছে যেন। বাতাসে কেবল এলোমেলো চুল উড়ছে। তাকে এমন স্তব্ধ দেখে আমি বেশ বিব্রত বোধ করলাম। আদৌ এতক্ষণ এতো যত্ন করে নিজের গল্প বলা উচিত হয়েছে কিনা- চিন্তায় পড়ে গেলাম। বুক ভরা অনুতাপ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ‘দু:খিত’ আর ‘বিদায়’ বলে নদীর কোল ঘেষে হাঁটছি, একা। সারা মন, মগজ ডুবে আছে তীব্র গন্ধভরা অতীতে। বৃষ্টির বিরতির পর আবার জমে ওঠা শহরের দিকে হাঁটছি- কিন্তু মনের মধ্যে কেবল প্রথম স্কুল, তেঁতুল গাছের ছায়া, প্রথম বন্ধু। যেই গল্পগুলো বলা হলো না তারা নদীর মাঝ-স্রোতে ভেসে আছে যেন। তাদের অপেক্ষার অভিমানী ঢেউ গুণতে গুণতে আমি এগিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে হল কেউ একজন ঠিক আমার পেছনে হাঁটছে- একই সময়ে- একই সমান পায়ের মাপে। আমার রহস্য-ধর্মী একান্ত শ্রোতা, নির্বাক, নিশ্চুপ – আমার গল্পের রেশ ধরে আমার মতোই শহরমুখী। 

স্টেশনের সামনের রাস্তা খানাখন্দে ভরা। একটু পর পর পানি জমে আছে। লাল স্টেশনের গলিতে ঢুকতেই হাতের ডানে একটা পুরির দোকান। খুই ছোট সাইজের দোকান, প্রচণ্ড ঝাল দেয়া পুরি পাওয়া যায় এখানে। সন্ধ্যা হলেই প্রতিদিন ভিড় জমে থাকে দোকানের চারপাশে। আজকে সেইসব ক্রেতাদের কেউ নাই। শুন্য দোকানে গিয়ে বসলাম। চুলায় দিনের প্রথম পুরি জ্বলছে। আমরা দুইজন এইবার পাশাপাশি বসে আছি। তার চোখ-ভর্তি অনাগ্রহ দেখলে খুব হতাশ হওয়ার ভয়েই বোধহয় – আমি তার দিকে একবারেই তাকাচ্ছি না। 

-‘আপনার গল্প কেমন যেন! মানুষ আছে কিন্তু তাদের কোন শরীর নাই!’

দেখা হওয়ার এতো এতো ঘণ্টা পরে এই প্রথম তার কণ্ঠ শুনতে পেলাম! এইবার আমাকে তাকাতেই হল। তার চোখগুলো এখনও গল্প শোনার তুমুল আগ্রহ নিয়ে জ্বলে আছে। তারা এখনই আরও অনেক কিছু শুনতে চায়। আবার কোন একদিন এমন বৃষ্টি হবে- এই অপেক্ষা করার ধৈর্য্য নাই। অধীর অস্থির চোখ ক্রমাগত অভিযোগ করছে –গল্প থেকে বহু গল্প বলার সময় হারিয়ে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে, সেইসব খসে পড়ে যাওয়া গল্পও তাদের জানাতে হবে। 

-‘আপনি বরং এইবার জীবনের মধ্যখান থেকে শুরু করেন। শুরু করে সামনে পেছনে যেদিক ইচ্ছা বলতে থাকেন।’

জীবনের ‘মধ্যখান’ কোথায়, কোন বছর, কোন্ মাসে- আমি খুঁজে পাচ্ছিনা। আমার মুখে, চোখে, কণ্ঠস্বরে অসহায় অভিব্যক্তি। আমার শ্রোতা বিজ্ঞ বন্ধুর মতোন সব বুঝতে পেরে মুখ টিপে হাসছে। 

-‘আমি আপনাকে সহজ করে দেই। একটা প্রশ্ন করি, আপনি উত্তর দিয়ে আপনার গল্পে ঢুকে যাবেন। যেইদিন, যেই মুহূর্ত থেকে আপনি উত্তর শুরু করবেন- সেই দিন, সেই সময়ই আপনার জীবনের ‘মধ্যখান’ বলে আমি আপনি ধরে নেব, তা যে বয়সই হোক না কেন।’

প্রশ্ন কেমন হতে পারে আমি আন্দাজ করতে পারছি না। জীবনের ‘মধ্যখান’ থেকে কেন শুনতে হবে- কী কারণ? যে সমস্ত মানুষের জলজ্যান্ত জীবনের গল্প এতোক্ষণ ধরে বলেছি, তাদের শরীর নাই বলে তার মনে হল কেন? কী অদ্ভুত!

-‘আপনি এই সাতাইশ বছরের জীবনে প্রথম কবে অন্য কারও শরীরকে নিজের শরীর বলে মনে করেছেন? সেই প্রথম শরীরের ঘ্রাণ আপনার এখনও মনে পড়ে?’ 


দুই হাজার পনেরো মনে পড়ে গেল সবচেয়ে আগে। মার্চ মাসের দুই তারিখ। কোন দিন দেখা হয় নাই এমন একজন মানুষের অপেক্ষায় ছিলাম সারাদিন। শহরে তখন বসন্ত। জানলা জুড়ে হাসনাহেনা ফুটে থাকা একটা ঘর। সেই ঘরে  সন্ধ্যারাতে আমাদের প্রথম দেখা। চারিদিকে তখন ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ওই একবারই দেখা হয়েছিল তার সাথে। সারারাত ধরে মনে হলো একজনের শরীরের আগুনে আরেকজন পুড়ছে। অন্ধকার ঘরে কেবল শরীর পোড়া গন্ধ। এতো তীব্র, এতো ঘোরলাগা- এখনও কোথাও কোন হাসনা হেনা ফুটলে, ফুল ছাপিয়ে আমার নাকে সেই একবার-মাত্র-দেখা-হওয়া মানুষের শরীর পোড়া ঘ্রাণ ভেসে আসে।

কিন্তু প্রথম কোন্ মানুষের শরীরকে আমার নিজের বলে মনে হয়েছে এই মুহূর্তে মনে করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। দুই হাজার তিন হবে হয়তো। মাত্র তেরো বছর বয়স। জীবনে তখন অষ্টম শ্রেণি চলে। একটা দরজা জানলা ছাড়া ঘর। খুব ভোরবেলা। গ্রামের রাস্তায় মানুষ বের হয় নাই কোন। লম্বা স্কুল ঘরটার একপাশে  সরিষার ক্ষেত। ভেজা হলুদ ফুলগুলো কুয়াশায় ডুবে আছে। ক্ষেতের কিনার ধরে  একলা হেঁটে, খোলা জানলা টপকে আমি ঘরে ঢুকে দেখলাম সে বসে আছে। খুব অবাক হলাম। এই সময় এইখানে কারও থাকার কথা না। স্কুলের প্রথম ক্লাস শুরু হতে আরও প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি।  সামনের উঁচু বেঞ্চটায় রাখা ব্যাগে মুখ গুঁজে সে গান শুনছে। ব্যাগের পাশে একটা ওয়াকম্যান, দুই তিনটা ক্যাসেট। আমি গিয়ে পাশে বসলাম। সে মুখ তুলল না। কোন রকমে একবার তাকিয়েই হেডফোনটা খুলে আমার হাতে দিল। এই গান আগে কোনদিন শুনি নাই। শীতের সকালে গানটা শুনতে শুনতে পাশে বসে থাকা অতি চেনা মানুষটাকে অচেনা মনে হতে লাগল। প্রায় সমান বয়েসী মানুষটাকে মনে হল অনেক দূরের কেউ, দগ্ধ আর প্রাচীণ। 


‘দেখবে আমাদের ভালবাসা হয়ে গেছে কখন যেন
পদ্ম পাতার জল’

আমি পদ্ম পাতা দেখি নাই কখনও। কিন্তু মনে হল আমরা একজন পদ্মপাতা, আরেকজন জল। ভালোবাসার মতোন অস্থির কিছু অনুভব শরীরে টের পেলাম। ওই প্রথম দু:খকে ভীষণ আকর্ষণীয় মনে হলো। ব্যাগে গুঁজে রাখা মুখ তুলল যখন, কিছুক্ষণ টানা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সেইখানে বিষাদ জমে আছে। এইরকম চোখ আমার জীবনে নতুন। বিষণ্ণতা আবিস্কারে এতো আনন্দ আমি আগে জানতাম না। ওয়াকম্যানের হেডফোন খুলে দিলাম। কুয়াশা, শিশির, ভোর- রাঙিয়ে দিয়ে আমাদের চারপাশে তখন গান বাজছে। 

‘চেয়ে দেখো উঠেছে নতুন সূর্য
পথে পথে রাজপথে চেয়ে দেখো রঙের খেলা
ঘরে বসে থেকে লাভ কি বলো
এসো চুল খুলে পথে নামি
এসো উল্লাস করি’

আমার খোলা ঘাড়ে তার ঘন নি:শ্বাস। তার চুলের গন্ধে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। আমাদের জিভ, ঠোঁট, কান, বুকের শব্দ, হাতের উপর হাত- ‘পদ্মপাতার জল’-দুইজন যেন গড়িয়ে পড়ছি গহীন কোন দীঘির কোলে। আমরা কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলাম জানি না। হঠাৎ গান ফুরিয়ে গেল। চোখ খুলে- দমকা বাতাসের মতোন চমকে উঠে এক দৌড়ে বাইরে চলে গেলাম। ক্ষেতের উপর ততক্ষণে হালকা রোদ এসে পড়েছে। আমি শব্দহীন হাসতে লাগলাম। চোখে সরিষার ফুল। সেই ফুল থেকে আজ অন্য রকম এক গন্ধ ছড়াচ্ছে- নিজের বলে মনে হওয়া অন্য কারও শরীরের পাগল করা ঘ্রাণ।

…চলবে


Muktadir Abdullah Al

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

Writer

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের জন্ম সিরাজগঞ্জে। ১৯৯০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে এখন শিক্ষকতা করছেন ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ২০১০ সালে। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান।