অষ্টপ্রহর আনাগোনা (৪)

img

[রনিতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যাক বাবা, কিছুক্ষণ সময় পাওয়া গেল।  
পনেরো মিনিট পর ডাক এল।  ডাক্তারের রুমে ঢুকে বিস্ময়ে চমকে উঠল রনিতা]

অষ্টপ্রহর আনাগোনা
বাবলী হক


ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে রনিতা। স্হির অনড় দৃস্টিতে ডাক্তারকে দেখছে আর  মনে বলছে ‘সৌরভ তুই এখানে?’ ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল। নিঃশ্বাসে ইথারের গন্ধ পায়। চেতনা অনেকটা শূন্যতায় আচ্ছন্ন। কতক্ষণ এভাবে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ছিল সে নিজেই জানে না।  
ড: জাফর ফর্সা একটু লম্বাটে চেহারা, চুল পরিপাটি ব্যাকব্রাশ করা। কচি ঘাসরঙয়া শার্টে, সতেজ ভঙ্গি। চোখে গাঢ় বাদামী ফ্রেমের চশমা। রনিতাকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-আসুন!   
রনিতা যেন ঘোর কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। ডাঃ জাফর টেবিলের  পাশের চেয়ারটায় বসতে বলল রনিতাকে। মুখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে,        
-আপনার কোন দাঁতে যন্ত্রণা হচ্ছে?   
রনিতা ডান হাত গালের উপর রেখে বলে,
-ডান দিকে শেষ প্রান্তে মনে হয়।
-মুখটা হাঁ করুন। হাঁ করলে কি ব্যথা লাগে?
-হুঁ। লাগে।
-ঠিক আছে। ফর্ম ফিলাপ করেছেন?  
রনিতা ফর্মটা টেবিলে এগিয়ে দিল।
প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ করে ডাঃ জাফর বলল, 
-আজ আর কিছু করছি না। সাত দিনের অ্যান্টিবায়োটিক ও  পেইনকিলার দিলাম। আর আজকে একটা এক্সরে করে যাবেন।  অ্যান্টিবায়োটিক শেষ হলেই এক্সরে রিপোর্ট নিয়ে চলে আসবেন।  
রনিতা ধন্যবাদ বলে উঠে গেল।
দরোজার কাছাকাছি যেতেই ডাঃ জাফর বলে, 
-এক মিনিট, মিসেস চৌধুরী আপনি প্রথমে এসে আমাকে দেখে চমকে গিয়েছিলেন কেন?  
-ওঃ। আপনাকে ভেবেছিলাম আমার কাজিন সৌরভ।
রনিতা খুব সাবলীল ভঙ্গিতে হেঁটে এসে সরাসরি কাউন্টারে  প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বলে,
-কত দিতে হবে?
রোদের মতো ঝকঝকে রিসেপশনিস্ট মেয়েটি বলল,
-আগে এক্সরে করে আসুন একসঙ্গে বিল করে দিচ্ছি।
পাশে বসা ছেলেটির হাতে এগিয়ে দিল প্রেসক্রিপশন। ছেলেটি রনিতাকে বলে,
-আসুন আমার সঙ্গে।  


রনিতা ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বারোটা পনেরো। এখন কোথায় যাওয়া যায়!  ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। আজ কাজের মেয়েটাও আসবে না। মনে পড়ল,  তিন দিন থেকে  ফোন করে  যাচ্ছে মৃদুলা।  খুব জরুরি, একবার যেন দেখা করে।  মৃদুলা থাকে মহাখালি।  আগে জেনে নিতে হবে ও বাসায় আছে কিনা। একটা রিং বাজতেই ধরল। যেন রনিতার ফোনের অপেক্ষায় ছিল মৃদুলা বলে,
-আসছিস?     
-হুঁ। আসছি। জেনে নিলাম বাড়িতে আছিস কিনা।  
-আয়।  
    ভরদুপুরে রাস্তায় রিক্সা, সিএনজি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দুএকটা প্রাইভেট গাড়ি মেইন রোড পার হয়ে যাচ্ছে। গলিটা শেষ হয়েছে এতটা দূরে যে মানুষ চেনা যায়  না,  কিন্ত তার অবয়ব বোঝা যায়। মনে হল কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে গলির মাথায়। হাঁটতে  থাকে রনিতা। আরো একটু এগোতেই  মনে হল ডাক্তার জাফর দাঁড়িয়ে আছে। নাঃ তা কী করে হয়! এগিয়ে গেল আরো কিছুটা, এ তো সেই ছোটোবেলার সৌরভ। একটু আগেও ডঃ জাফরকে দেখে তার  মনে হয়েছিল সৌরভ। ছোটোবেলা কুমিল্লায় রুপসদী গ্রামে নানাবাড়িতে সামার ভেকেশনে    সবার সঙ্গে দেখা হত । মা কখনো সামার ভেকেশন বলতেন না, বলতেন গরমের ছুটি বা আম কাঁঠালের ছুটি। মাকে শুনে অন্যরাও সবাই গরমের ছুটি বলত। বড়ো  খালা আসতেন সিলেট থেকে বাবলু আর পিংকিকে নিয়ে। খালু আসতেন না, তার ব্যবসার ক্ষতি হবে বলে। বাবলু আর পিংকির সাথে তেমন জমত না কারণ রনিতার চেয়ে তারা বেশ কয়েক বছরের বড়ো ছিল। রনিতার বাবাও যেতে পারতেন না কারণ তার অফিসেও  ছুটি হত না। তবে দু-তিন দিনের ছুটি নিয়ে স্কুল খোলার আগে নানাবাড়ি থেকে আনতে যেতেন। ছোটো মামার ছেলে সৌরভ, রনিতার চেয়ে এক বছরের বড়ো। যত দুষ্টামির ফন্দিফিকির দুজনে মিলে করত।  খুব অদ্ভুতভাবে কথা বলত সৌরভ। বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলে বলত, চল আম বাগানের বৃষ্টিকে  ছুঁই। বৃষ্টি কোথায় লুকিয়ে থাকে জানিস?
রনিতার বয়স তখন দশ কিংবা এগারো হবে। খুব বুদ্ধি করে উত্তর দিত,
-কোথায় আর, মেঘের ভিতর লুকিয়ে থাকে।   
-না রে গাধি, বৃষ্টি থাকে আকাশের তারার মধ্যে লুকিয়ে।
বলে খুব হাসতে থাকত। আম বাগানে বৃষ্টিতে ভিজে চুল, বালিশ বিছানা ভিজিয়ে পরদিন  জ্বর এসে গেল রনিতার। জ্বরের মাঝে সৌরভ এসে নিষ্ঠুর কণ্ঠে বলে গেল,
-তুই আসলেই একটা ছাগল। তোকে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করা যাবে না।
এই শুনে রনিতা আরও একবার চোখের পানিতে  বিছানা বালিশ ভেজায়। 
একদিন এসে বলল- রাত্রি বেলা মাছেদের গান শুনবি?
-যাঃ, মাছ আবার গান গাইতে পারে নাকি?
-শুনতে চাইলে আজ রাতে পুকুরপাড়ে চলে আছিস।
-পুকুরপাড়ে রাতে আমার ভয় করে।
-তুই একটা আস্ত ঘোড়ার ডিম।
-ওটা হবে ভিতুর ডিম। ঘোড়ার ডিম নয়।
-এই একই কথা, ঘোড়ার ডিম আর ভিতুর ডিম। যেতে চাইলে আমি নিয়ে যাব, দেখিস একটুও ভয় করবে না। 
সেদিন পুকুরপাড়ে মধ্য রাতে দুজনে মাছেদের গান শুনতে গিয়েছিল।  
রনিতা বলে,
- কই আমি তো কিছুই শুনতে পাই না।
-চুপ করে থাক কিছুক্ষণ, শুনতে পাবি। আমি তো প্রতিদিন শুনতে পাই।
মাছেদের সঙ্গে কথা বলি, ওরাও আমার সঙ্গে কথা বলে। এরপর মাঝে মাঝে ওরা মাছেদের গান শুনতে যেত। 
 
 নানা মারা যাবার পর আম-কাঁঠালের আড্ডা একটু একটু করে ভেঙে গেল। বড়ো খালার ছেলে বিদেশে পড়তে চলে যায়। এরপর খালা আর আসতেন না। ক্লাস সেভেনে সৌরভও চলে গেল ক্যাডেট কলেজে। 
নানি যতদিন বেঁচে ছিলেন  প্রতি বছর রনিতা মায়ের সঙ্গে যেত নানির কাছে। ছোটো মামাও আসতেন মামিকে নিয়ে। কিন্তু সৌরভ আসতে পারত না। রনিতার এই সময়টা খুব একা লাগত,  ভালো লাগত না। মাঝে মাঝে পুকুরঘাটে গিয়ে একা বসে থেকেছে মাছেদের গান শোনার জন্য। সৌরভের সঙ্গে মাঝে সাঝে দেখা হত কোনো আত্মীয়ের বিয়েতে বা কোনো দাওয়াতে। কখনো ছুটিতে ঢাকায় থাকলে রনিতাদের বাড়ি এসেছে মামার সঙ্গে। তারপর একদিন শুনতে পেল সৌরভ লন্ডন চলে যাচ্ছে পড়াশোনা করতে। যাবার আগে রনিতাদের বাড়ি দেখা করতে এসেছিল কিন্তু সে সময়টায় রনিতা বাড়ি ছিল না।  অনেকদিন সে সৌরভকে দেখে না। জেনেছে লন্ডনে অ্যাকসিডেন্ট করেছে।    
সেই ছোটোবেলার সৌরভ এসে দাঁড়িয়ে আছে গলির মাথায়। দু হাতের দশটা আঙুল জড়ো করে করতলে কী সব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  কিন্ত তার চোখে কোনো চশমা নাই ডাক্তার জাফরের মতো। সৌরভ কি চশমা পরত? 
কাছে এসে রনিতা জিজ্ঞেস করে, 
-সৌরভ তুই এখানে কী করিস? 
-তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
রনিতা খুব অবাক হয়ে বলল,
-আমার জন্য!
কিন্তু বলতে পারল না, তুই তো গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছিস। 
বলল- তোর হাতে এগুলি কী?
-আমার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ।
-কী বলিস? এসব হাতে নিয়ে ঘুরছিস কেন?
-আমার অ্যাকসিডেন্টের পর ডাক্তার এসব খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই আমিই নিয়ে এলাম খুঁজে খুঁজে। 
-কী করবি এখন এগুলি দিয়ে?  
- তোকে দিব। সেই জন্যই তো দাঁড়িয়ে আছি।
-আমাকে কেন দিবি?  
- তুই  আমাকে দেখতে পাস, আর তো কেউ দেখে না।  কিন্তু আজকে দেব না।
-কেন?
-আরো কিছু শরীরের অংশ এখনো খুঁজে পাইনি। সেসব খুঁজতে যাচ্ছি। সব একসঙ্গে দেব।
আর কোনো কথা না  বলে সৌরভ  দ্রুত চলে গেল।  
হতভম্ব রনিতা দাঁড়িয়ে আছে। নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না এসব কী হচ্ছে তার সঙ্গে!
একটা সিএনজি আসতে দেখে হাত তুলে থামাল। কোথায় যাবে ভাবছে। মনে পড়ল তার  মৃদুলার বাড়িতে যাবার কথা ছিল।  
সিএনজিতে উঠে বলল- মহাখালি চলেন।

(চলবে...)


Bably ahmed

বাবলী হক

লেখক

সত্তর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। বর্তমানে অটিষ্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরনো শহরে। সেই স্মৃতির পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস ' আম্বিয়াদাদি ও তার বিড়ালেরা'।