গডেস অব অ্যামনেশিয়া (১৯)

img

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দাদী এখন আর কথা বলে না। চারপাশে ব্যস্ত দুনিয়া ঘুরপাক খায়; মানুষের মুখে থেকে কথার অসংখ্য বাতাস এসে তার ঘর ভরে যায়, দাদী তবু সকাল দুপুর রাত নির্বিবাদ, নিশ্চুপ। বিছানার বাঁয়ে তার পানের ডালি পড়ে আছে - শুকনা পানের পাতা, জীর্ণ সুপারি, পিতল রঙের সুপারি কাটার যাঁতি, গোটা তিন জর্দার কৌটা।

কথাহীন দিনগুলো তার চোখ দু’টোকে অন্যরকম দৃষ্টি এনে দিয়েছে। তার চেয়ে থাকা এখন এতো তীক্ষ্ণ, এতো গভীর- যেন ঘর, ঘর জুড়ে ছড়িযে থাকা আসবাব-তৈজস, উত্তরের খোলা জানলা সমস্ত কিছুর ভিতর-বাহির বদলে গেছে। দাদীর চোখে তাদের এখন একেবারেই ভিন্ন রূপ, ভিন্ন রঙ। 

ঘরের বাইরে তখনও হেমন্ত, কিন্তু গত রাত থেকে একটানা পৌষের বাতাস বইছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা- কম করে হলেও চল্লিশজন তাকে দেখে গেছে; কিন্তু দাদী একজনকেও চিনতে পারে নাই। সবার চোখ, মুখ, কণ্ঠস্বর ভীষণ স্পষ্ট কিন্তু সুদূর-অচেনা।

দুই হাজার সতেরো সন এখন। এই যে দীর্ঘ-দীর্ঘ জীবন- সমস্ত ভুলে নির্ভার দাদী এখন শয্যাশায়ী। ডান পা, ডান হাত অবশ হয়ে পড়ে আছে। প্রায় পঁচাশি বছর বয়সী শরীর মন- ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ- কত কত স্মৃতি জমেছিল! কত জীবিত ও মৃত মানুষের মুখ, নাম, পরিচয়, তাদের গল্প, সুখ, যন্ত্রণা, উদ্বেগ, উল্লাস – দাদীর স্মৃতি ভরে উপচে পড়ছিল! দিন পনেরো আগের এক বিকালে সব কোথা্য় কোন বাতাসে নিরুদ্দেশ উড়ে গেল।

এই ঘর, উঠান যেন আজীবন অদেখা। অচেনা মানুষগুলো নানান বেশে আসে, বসে, আবার চলে যায়। দাদীর ভীষণ বিরক্ত লাগে। তারা কাঁদে, কথা বলে, মাথায় হাত রাখে, হাত ধরে বসে থাকে- কিন্তু দাদী কেবল একলা থাকতে চায়। সবাই চলে গেলে তার এক ধরণের আরাম লাগে। সন্ধ্যার পরে এই এক রত্তি উঠান সুনশান পড়ে থাকে। কেবল দুইজন চল্লিশ পার হওয়া নারী-পুরুষ রয়ে যায় প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা। তারা এই ওই ঘর করে। শব্দ তুলে কাজ করে। আলো জ্বালে, আলো নেভায়। 

এদের দুইজনকে দেখলে দাদীর খুবই অদ্ভুত অনুভূতি হয়। দুইজনই তাকে আপ্রাণ যত্ন করে। বিছানা-ঘর পরিষ্কার করে, খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়- সবকিছু। দাদী তাদের কারও নাম জানে না- তবু এই একজোড়া মানুষকে খুব আপন লাগে, মনে হয় সারা দুনিয়ায় এই্ দুইজন কেবল তার পরিচিত, কাছের মানুষ। ভুলে যাওয়া স্মৃতি খুঁড়ে দাদী তাদের নাম-পরিচয় খুঁজতে থাকে- কিছুতেই খুঁজে পায় না যখন, দাদীর প্রচণ্ড কষ্ট হয়- খুব অসহায় লাগে । 

আজকের মধ্যরাতে আরও একজন অচিন মানুষ এলো দাদীর ঘরে। একলা একটা বাতি তখনও ঘরময় জ্বলছে। যে এলো তার পরনে ঘন সবুজ রঙের পশমি চাদর। চুল থেকে হাসনাহেনার ঘ্রাণ, চোখ থেকে বিজলী বাতির ছটা- মন-ভুলানো রূপ। ধীরে এসে সে ঘরের দুয়ারে বসল। যেন পথ ভুলে এসেছে- উচাটন হয়ে এদিক ওদিক চাইল কিছুক্ষণ। বাইরের অন্ধকার তখন বেশ গাঢ়, কুয়াশায় জমে চারিদিক স্তব্ধ হয়ে আছে। 

দাদী কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতোন একটানা চেয়ে রইল- দুই সপ্তাহ পর এই প্রথম দাদীর কারও সাথে  কথা বলতে মন চাইল। কিন্তু মেয়েটি তখনও বাইরে  তাকিয়ে-তার হাসনা-হেনা চুল কেবল ঘরের দিকে ছড়ানো। দাদী হয়তো মৃদু শব্দ করে ডাকল। হয়তো সেই ডাক শুনেই বিজলী-বাতি চোখ মেলে দাদীর চোখে চাইল সুন্দরী। দু’জনেই হয়তো হাসল। একসাথে, এক সুরে। কিন্তু তাদের কথা হলোনা কোন। 

স্মৃতি ছাড়া কি কোনদিন কোন আলাপ হয়? একজনতো আট দশকের বিশাল জীবন ভুলে পড়ে আছে, আরেকজন সব ভুলে যাওয়ার দেবী- নিজের নাম পর্যন্ত মনে করতে পারেন না। 

দাদীর ঘরের মতোন দেবীর ঘরেও উত্তরদিকে জানলা। সেই বয়েসহীন সূর্যমুখী ঘরে দেবীর অপেক্ষায় দাদীর স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছে- এই বাড়ির প্রথম ফিলিপস বাতি, বাক্সরূপী প্যানাসনিক রেডিও আর একটা সাদাকালো  টেলিভিশন । তাদের অভিমান, অনুযোগ দেখার কেউ নাই। কত দিন, কত রাত তাদের এমন অপেক্ষায় কাটবে তারও কোন হিসাব নাই। তারাও যদি দাদীর মতোন, দেবীর মতোন সব ভুলে যাওয়ার অমন দৃঢ় শক্তি পেতো! যদি তাদের মন থেকেও তিরিশ-পয়ত্রিশ বছরের স্মৃতিগুলো সব মুছে যেত! তারাও যদি ভুলতে পারত নাম, ঠিকানা, যুগ, মানুষ, পরিচয় ইত্যাদি! 

এই্ ফিলিপস বাতির হলুদ আলো ঘিরে কোন এক কালে প্রতি সন্ধ্যায় কেমন উৎসব হতো দাদীর ঘরে! সব মনে আছে তার- তার আলোর নিচে ঘটে যাওয়া প্রতিটি হাসির শব্দ, প্রতিটি কান্নার ঘ্রাণ, প্রতিটা স্পর্শের সুর – সবকিছু! সেই ঘরে যত মানুষ আসত, যত কাগজে খবর এসে পৌঁছাত, যত কালো অক্ষর ছিল সেই সব মলিন পাতা জুড়ে- আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। সেই ঘর আজ নেই, একটা লম্বা উঠান ভেঙে আট টুকরো হয়ে এখন যে যার মতোন আলাদা। ঘরের মালিক সব ভুলে আজ ভাষাহীন পড়ে আছে অন্য উঠানে, অন্য ঘরে। 

এই যে নবওয়ালা এক বেতার বাক্স- সুরহীন, কণ্ঠহীন হয়ে পড়ে আছে দেবীর সীমানাহীন ঘরে- অথচ এককালে কত দূর শহর, দেশ, বিদেশ থেকে সে খবর বয়ে আনত। উঠান জুড়ে কত গান, কত কণ্ঠ তার বুক চিড়ে ভেসে বেড়াত! সবার কান জুড়ে সে প্রেমের মতোন বিঁধে থাকত এককালে! দাদীর ঘরের নতুন মেয়েটাকে মনে পড়ে খুব। সে নাকি অকালে অযত্নে মরে গেছে। রেডিওটার প্রতি সবচেয়ে বেশি আদর ছিল তারই। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কত যত্নে তাকে মুছে, ঢেকে, তুলে রাখত। ওই বাড়িতে একটা সোনালি-সাদা কুকুর ছিল তখন। যখন রেডিওতে কোন গান বাজত- বুঝতো কিনা কে জানে- সেই কুকুরও খুব উদাস হয়ে যেত। পেয়ারা গাছের তলে কান খুলে চোখ বুজে পড়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা! 

আর কত সহস্র চোখ কত লক্ষবার যে ভক্তি ভরে, মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকত নিপ্পন টিভির ছোট্ট পর্দা বরাবর, তার ইয়ত্তা নাই! আশেপাশের দুইতিন গ্রাম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ আসত সপ্তাহের কোন কোনদিন। সারা উঠান ভরে মানুষ তাকে দেখত আর দেখত! ওই বাড়িতে নব্বই সনে জন্ম নেয়া এক শিশুর প্রতি তার এতো মায়া জন্মেছিল! সে এখন অনেক বড় চাকরি করে – কোন এক দূর শহরে বাস। ছোটবেলায় তার ধ্যান জ্ঞান জুড়ে ছিল এই টিভি। থেকে থেকে কী সব পাগলামি করতো! সবুজ, অবুঝ সেই বাচ্চা- মাঝে মাঝে টিভি রাখার টেবিলের নিচে বসে থাকত। সবাই যখন টিভির পর্দায় মগ্ন- সে বহুক্ষণ সব দর্শকের চোখের দিকে চেয়ে কাটাত, তাদের মুগ্ধতা দেখে বার বার মুগ্ধ হতো! 

দাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর কোনদিন কোনকিছু খাবে না সে! কে খাওয়ায়, কী খাওয়ায়, কেন খাওয়ায়- এসবের উত্তর তার জানা নাই, তাই খাওয়ার কোন মানে হয়না। দুয়ারের মেয়েটাকে সে এই কথাগুলো বলতে চায়। হয়তো বলেছেও এরই মধ্যে। মেয়েটি হযতো উত্তরও দিয়েছে। সবুজ পশমি চাদর খুলে মেয়েটি একসময় এসে হঠাৎ দাদীর ডান হাত ধরে বিছানার এক কোণায় বসল। কী উষ্ণ সেই স্পর্শ, কী তীব্র রক্ত-স্রোত সেই হাত জুড়ে বইছে! দাদীর মনে হলো তার শরীর আবার আগের মতোন সুস্থ হয়ে গেছে। পঞ্চাশ বছর আগের শরীর ফেরত পেয়ে দাদী হয়তো – এই অপরূপ দেবীর হাত ধরে তখনই চলল নদীর দিকে। 

অন্ধকার পথ, জোনাকি, ডজন খানেক শেয়ালের সমস্বর আর্তনাদ। আর তারা দুইজন জীবন ভুলে যমুনায়।

নদীর বুকে এখন অনেকখানি চর। উত্তর থেকে আসা শীতের কড়া বাতাসে যমুনার বুকের বালু এলোমেলো উড়ছে। দাদী আর দেবী- সব ভুলে পৃথিবীর সবচেয়ে গাঢ় আনন্দ নিয়ে চেয়ে আছে অনেক দূরের ঢেউয়ের দিকে। যমুনার জল অনেক অনেক পথ ঘুরে যে সমুদ্রে গিয়ে পড়বে – তার থেকেও বহু দূরে এই দু’জনের স্মরণ-সমুদ্র। সেখানে পৌঁছানোর কোন ইচ্ছা তাদের নাই। ভোরের আলো জ্বলার আগেই যে যার ঘরে ফিরে যাবে। দাদীর বয়স আবারও পঁচাশি, আবারও জরা-রোগ-শূন্যতায় বন্দী জীবন! দেবীর শরীরে চিরকাল যৌবন- কিন্তু যৌবনের স্বাদ কোনদিন কোনভাবে তাঁর মনে পড়ে না! 


…চলবে


Muktadir Abdullah Al

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

Writer

আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের জন্ম সিরাজগঞ্জে। ১৯৯০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে এখন শিক্ষকতা করছেন ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ২০১০ সালে। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান।