রেড সিটি

img

নগরে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা কখনো কখনো মনে দাগ ফেলে যায়। এমনিতে আমি কারো সাথে খুব একটা মিশি না। বন্ধ– বান্ধবও খুব সীমিত, বলতে গেলে নেইই। শিল্পমনস্ক ওভার সেনসিটিভ মানুষ আমি। তাই আমার বন্ধ– খুঁজে পাওয়াও দুর্লভ। সেক্ষেত্রে আমি একা থাকাটাই শ্রেয় মনে করি। কিছুদিন হলো আমার অখন্ড অবসর। স¤প্রতি আমি আমার কর্মস্থল থেকে রিজাইন করেছি। লালমুখো ফরাসী বসদের সঙ্গে আমার কিছুতেই বনিবনা হচ্ছিল না। তাই চাকরি ছেড়ে চলে এলাম। আমার তিন বছরের চাকরি জীবনে এই নিয়ে তৃতীয়বার চাকরি ছাড়া। তখন হুট করে চাকরি ছেড়ে এসে কিছুদিন অবসর উপভোগ করলাম। ব্যক্তিগত কিছু কাজ জমে ছিল সেগুলো শেষ করার পর এখন আর কোনোই কাজ নেই। প্রতিদিন সকালে যখন চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় বসি তখন খবরের কাগজ পেরিয়ে মাঝে মাঝে আমার চোখ চলে যায় পাশের ফ্লাটে। যাওয়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই, তারপরও..। 
প্রতিদিন ঐ সময় ১২/১৩ বছর বয়সি সুন্দর দেখতে রোগামত একটা ছেলে খুব দ্রুত বারান্দায় এসে তোয়ালেটা মেলে দেয়। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় ছেলেটা গাড়ি করে কোথায় যেন যাচ্ছে। কখনো কখনো বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ২২/২৩ বছর বয়সী এক অস¤ভব সুন্দরী তরুণী। আর্টিফিসিয়াল কার্ল করা গাঢ় বাদামী ল¤বা চুল। তার ফর্সা রঙের সাথে চুলটা বেশ মানানসই। মেয়েটাকে প্রায়ই দেখা যায় বারান্দার গ্রীল ধরে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এত সুন্দরী আর এ বয়সি একটা মেয়ের এমন উদাস ভাবটা ঠিক যেন মানায় না। কী এতো দুঃখ তার! ওদের ফ্ল্যাটটা আর আমার বারান্দা এতটাই লাগোয়া যে, ওদের বাড়ির প্রায় সবই বোঝা যায়। যতদূর মনে হলো ও বাড়িতে আর কেউ থাকে না। তাহলে ঐ ছেলে-মেয়ে দুটোর বাবা মা কোথায়? হবে হয়তো বিদেশে-টিদেশে কোথাও। এ নিয়ে আর ভাবতে চাই না। তারপরও মেয়েটার অমন উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, মনে হয় যেন কি বলতে চাইছে আকাশের কাছে। আবার মাঝে মাঝে উগ্র সাজ-পোষাকে বাইরে যাওয়া এই দুটো যেন কিছুতেই মেলাতে পারি না। আমাকে ভাবতে বাধ্য করে। তার পরও কী দরকার! নাগরিক জীবনে যেচে অন্যের খোঁজ নিতে যাওয়াই বিড়ম্বনা। নাগরিক বিশ্বাস, নাগরিক সংস্কার ডেকে বলে পাশের বাড়ির দিকে তাকিও না। তাতে ব্যক্তিগত জীবন যাপন ব্যাহত হয়। 
সেদিন বিকেলে ফুলের টবে পানি দিচ্ছিলাম এমন সময় পারফিউমের মিষ্টি অথচ তীব্র ঘ্রাণ অনুসরণ করে দেখলাম, সেই মেয়েটা। কালো স্লিভলেস ব্লাউজ এর সাথে কালো মসলিনে ফিরোজা এপ্লিক কাজ করা শাড়ী পরে প্রায় ছুটে উঠল মভ্ কালার একটা গাড়ীতে। প্রসাধনের বাড়াবাড়ি ঢেকে দিয়েছে তার সব মলিনতা, সরল সৌন্দর্য্য। পাতলা মসলিনে দেহ বল্লরীর প্রতিটি বাঁক দৃশ্যমান হয়ে ফুটে আছে। লোকাট ব্লাউজে ঈষত স্ফিত বক্ষরেখা, মেদহীন কোমরে গভীর নাভী। গাড়িটা নিমেষে ধুসর ধোয়ায় নগরীর বাতাসে শীষা ছড়িয়ে দিয়ে গেট পেরিয়ে চলে গেল । 
অনেকদিন মেডিটেশন করা হয় না, তাই সেদিন সকালে ইয়োগার স্পেল অন করে দিয়ে ধ্যান করার চেষ্টা করছি কিন্তু পুরো ধ্যানস্ত হতে পারছি না। এরই মধ্যে বাইরে তীব্র চিৎকারের শব্দ পেয়ে ছুটে বারান্দায় চলে আসি। কি হলো আবার! আগুন লাগল কোথাও? তাহলে গ্যারাজ থেকে গাড়িটা সরাতে হবে চট করে। সেদিন সামনের ফ্লাটের গ্যারাজে আগুন লেগেছিল। কিন্তু না! দেখলাম ল¤বা সুদর্শন এক তরুণ আমার পার্ক করে রাখা কালো নোয়াহ মাইক্রোবাসটার গায়ে তীব্র ভাবে চপেটাঘাত করছে আর চিৎকার করে জানতে চাইছে, এই গাড়ি কার! এই গাড়িটা কার ? 
ভাবলাম আমার গাড়ি আবার কি দোষ করল! গ্যারাজে দাঁড়িয়ে থেকে থেকেই এ্যাকসিডেণ্ট ঘটিয়ে দিল ব্যাটা! তবে গাড়িটাকে তো বাঁচাতে হবে তাই বিরক্ত হয়েই হাক ছাড়লাম, হেই হোয়াটস্ আপ? কি হচ্ছে কি ওখানে? গাড়ি আমার, কি দরকার? শব্দ পেয়ে গাড়ির ড্রাইভারও ছুটে এসেছে কোত্থেকে যেন। 
প্লিজ প্লিজ হেল্প মি! প্লিজ...! কথা শেষ না করেই ছেলেটা ছুটে ঐ বাড়িটাতে ঢুকে গেল এবং চোখের নিমেষে সে পাঁজা কোলা করে যাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো, দেখে আমি হতবাক। হাতের ওপর উপবিষ্ঠ সেই মেয়ে। রেড মেরুণ প্রিণ্টেড ডিপ কাট স্যালোয়ার কামিজে উকি দিচ্ছে কাঞ্চন জঙ্ঘা! ফর্সা মুখে তীক্ষ্ম নাক, বন্ধ চোখ, মুখটা যেন প্রার্থণা করছে আকাশের কাছে- যেখানে বিশাল শুন্যতা। সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাইছে যেন। ছেলেটা ওভাবেই অনুনয়ের ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল। 
চোখ দিয়ে সম্মতি দিলাম ড্রাইভারকে, নিয়ে যেতে বললাম। আর অস্ফুটে জানতে চাইলাম, কি হয়েছে ওর? যেন উত্তরটা শুনতে চাই আবার ভেতর থেকে কেউ তীব্র ভাবে বলছে শুনো না। কি হবে শুনে! 
ছেলেটা তেমনি ভাবেই আর্তনাদ করে ড্রাইভারকে বলছে, ওপেন দা ডোর, ওপেন দা ডোর প্লিজ! বিষ খেয়েছে! 
গাড়িটা হুস করে বেরিয়ে গেলে আমার নিজের অজান্তেই ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, এ যেন জানাই ছিল। 


মেয়েটার নাম রেবতী। মা নেই, ভাইয়ের জন্মের পর তিনি না-না শারিরীক জটিলতায় পৃথিবী ছেড়েছেন। বাবা, চার বোন আর এক ভাই নিয়ে ওদের সংসার। এ যুগে এতোগুলো ভাইবোন সাধারণত কারো থাকে না কিন্তু ওর আছে। আর কারণটা খুবই স্পষ্ট হয়ে জ্বল জ্বল করছে, পুরুষ শাসিত সমাজে একটা পুত্র সন্তানের আশাতেই অনাকাক্সিক্ষতভাবে ঢুকে পড়েছে আরো তিনটা মেয়ে। বোনেদের মধ্যে রেবতীর সিরিয়াল নাম্বার তিন অর্থাৎ চুড়ান্তভাবেই অনাকাক্সিক্ষতদের তালিকায় তার স্থান। তার সে জন্য কোনো দুঃখ নেই। সে বরং মাঝে মাঝে তার ভাই’র প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ ওর জন্যই সে পৃথিবীর মুখ দেখতে পারল। নইলেতো, এত্তো সুন্দর পৃথিবী! আর এই সুন্দর পৃথিবীতে সে এত সুন্দরী একটা মেয়ে। তাকে দেখলে মানুষের চোখ ট্যারা হয়ে যায়। ক্ষণকালের জন্য থমকে যায় তাদের হার্টবিট। রেবতী এ সব কিছুই উপভোগ করে। বোনেদের সঙ্গে খুনসুটি, ওদের আদর ভালোবাসা সব কিছু তীব্রভাবে উপভোগ করে সে। কারণ ঐ ভাবনা - তার হয়ত পৃথিবীতে আসাই হতো না! তবে রেবতির একটু দুঃখও আছে। ওর বাবার খুব টাকা পয়সা নাই। এই ছোট্ট জেলা শহরে ছোট্ট একটা ডিপার্টমেণ্টাল স্টোর ওদের। কোনো রকমে সংসার চলে। টিভিতে স্টারপ্লাস-এ কত সুন্দর সুন্দর অর্নামেন্ট, স্যালোয়ার কামিজ পরে মেয়েরা, সে চাইলেও ওসব পরতে পারে না। ওদের ক্লাসের পলি কী সুন্দর একটা গাড়ীতে চড়ে আসে। সে কোনোদিন ঐ রকম গাড়ীতে চড়তে পারবে বলে মনে হয় না। অথচ পলির তুলনায় ও কত সুন্দর দেখতে। গাড়ীটাতো ওদেরই থাকার কথা। ওদের একটা গাড়ী থাকলে ও নিজেই ড্রাইভ করত। বড় বোন রুপালী বলে, ভালো করে লেখাপড়া কর, গাড়ী তোরও থাকবে। 
নাহ লেখা পড়া না। আমি অত জিনিয়াস না আপা, যে লেখাপড়া করে একটা গাড়ি কিনে ফেলতে পারব। আমি মডেলিং করবো, ফিল্মে ক্যারিয়ার গড়বো - গাড়ী আমারও থাকবে। 
আচ্ছা আপা তোমরা কেন আমাকে কখনো বলনা যে, ঘোড়ায় চড়ে একজন রাজকুমার আসবে। আর সে আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে যেখানে কোনো অন্ধকার নাই, আছে আলো আর আনন্দ! এটাতো কখনো আমাকে বলনা আপা! 
আরে বলব কি! আজকালকার রাজপুত্রেরা অনেক চালাক, তারা সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে না। পারলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে বিদেশিনী খোঁজে। 
এই যে, এতো কঠিন বাস্তবে নিয়ে আসো বারবার। 
আমাদের জীবনটাই যে বড় বাস্তব রে সোনা! 
হ্যাঁ, সেখানে উচ্চাকাঙ্খা আছে কিন্তু আশ্বাস নাই। অভিমানে গাল ফোলায় রেবতী । সে নিজেকে মডেল ও অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে। টেপ রেকর্ডার ছেড়ে দিয়ে ক্যাট ওয়াক করা। আয়নার সামনে দাড়িয়ে অভিনয়, আবৃত্তি শেখা ইত্যাদি। তার গান আর আবৃত্তি শুনতে শুনতে বাড়িতে সবার কান ঝালা পালা। এ ছাড়া আছে মুখে শসা, গাজর. টমেটো, মুলতানি মাটি মেখে বসে থাকা, চুলে টক দই, তেতুলের ক্কাথ, ত্রিফলা, মেথি কিছুই বাদ যায় না। একটা সৌন্দর্য সাবানের ট্রেডমার্ক সুন্দরী হতে পারলেই মডেলিং ও অভিনয় জগতের দ্বার খুলে যাবে তার সামনে। সে এবার নাম লেখাবেই, সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। 


সব কিছু ঠিক ঠাক এমন সময় সব কিছু এলোমেলো করে দিয়ে ওদের ভাই রণন অসুস্থ হয়ে পড়ল। শুরুতে জ্বর হয়েছিল এরপর ঠোঁটের ওপরে একটা বিচি যেটা ক্রমান্বয়ে ঘা-এ পরিণত হলো। জিহ্বায় ঘা কিছুই খেতে পারে না। স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হয়েছে দুজন। তারা দুজনই রোগিকে দ্রুত ঢাকায় পিজি হাসপতালে নিয়ে যেতে বলেছেন। পিজি হাসপতালের ডাক্তাররা সব কিছু চেক আপ করে জানাল সেই দুঃসংবাদ যা রেবতীদের জীবন ধারা বদলে দিল। লিউকোমিয়া...! 
রণনের লিউকোমিয়া ধরা পড়েছে। তবে ভাগ্য ভালো যে, এখন ফার্স্ট স্টেজে আছে তিন বছর চিকিৎসা করলে এখন ব্লাড ক্যান্সার এদেশেই ভালো হয়ে যায়। আর সে জন্য গোটা এক বছর ঢাকায় হসপিটালে আন্ডার ট্রিটমেণ্টে থাকতে হবে। বোনেদের মধ্যে রেবতীই ভালো সেবা সুশ্রুষা করতে পারে। তাই তাকে ঢাকায় নেয়া হলো। 
এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে তাকে কখনো ঢাকায় যেতে হবে এটা তার কল্পনাতেই ছিল না। ওর বাবার তখন দিশেহারা অবস্থা, তাকে সান্তণা দিতে ঢাকায় তাদের যত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই আসতে লাগলেন হসপিটালে। এরই মধ্যে একদিন এলেন বশির সাহেব। রেবতীর বাবার ছোটবেলার বন্ধু। স্কুল কলেজে পড়বার সময় দুজনের সামাজিক অবস্থান একই রকম থাকলেও এখন তিনি বিশাল শিল্পপতি। কয়েকটা ছোটবড় ইন্ডাষ্ট্রি তার। তার সন্তানরা বিদেশে পড়ে স্ত্রীও বেশিরভাগ সময় বিদেশেই থাকেন। ৫৮ বছর বয়সি এই শিল্পপতির আগমনে কেমন একটু সোরগোল পড়ে গেল। সবার মাঝে চাপা গুঞ্জন, সমীহের ভাব। 
এই বশির সাহেবের চোখে পড়ে গেল রেবতী । তিনি প্রায়ই বিচিত্র সব ফলের ঝুড়ি নিয়ে হসপিটালে উপস্থিত হন সঙ্গে ইম্পোর্টেড ফুলের বুকে। এত চমৎকার সব বিদেশি ফুল দেখে রেবতি বিমুগ্ধ হয়ে যায়। বশির আসাতে রেবতির বাবা কবিরেরও অনেক উপকার হয়। গাড়িটা নিয়ে এখানে সেখানে ছুটোছুটি করতে পারেন। অনেক সময় অনেক ইনজেকশান ওষুধ বশিরও কিনে নিয়ে আসে। টাকা নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বাবা বাইরে গেলে বশির সাহেব রেবতির সঙ্গে গল্প করেন। বেডে শুয়ে থাকা ভাইয়ের শরীরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে কেমো থেরাপি আর বাইরে রেবতি বশির সাহেবকে শোনায় তার স্বপ্নের কথা। বশির সে কথা শুনে যারপরনাই উৎফুল্ল হন। বলেন, ভালোতো! হাত রাখেন রেবতীর কাঁধে। মৃদু চাপ দিয়ে আশ্বাসের ভঙ্গিতে বলেন, ডোন্ট ওরি আমি সব অ্যারেঞ্জ করছি। ইউ আর আওয়ার এমার্জিং সুপার মডেল এন্ড এ্যাক্টর অলসো! 
রেবতীর মন খুশিতে নেচে ওঠে। এইতো, রণন একটু সুস্থ হয়ে উঠলেই শুরু হবে তার পথচলা। সমস্যা কি, এখনো অনেক সময় পড়ে আছে তার সামনে সবে সে মাত্র অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। 
বাবা টাকা জোগাড় করতে দুদিনের জন্য বাড়িতে গেলে সেদিন রেবতী বশির সাহেবকে নিয়ে সিএমএইচ-এ যাচ্ছিল রণনের রিপোর্টগুলো আনার জন্যে। যাবার সময় গল্পের ছলে রেবতির প্রায় গা ঘেসে বসেন তিনি। রেবতি একটু সরে যায়।
আচ্ছা, তোমরা মেয়েরা আঙ্গুলের নখ এমন ল¤বা করে রাখো কেন বলত? 
দেখতে সুন্দর লাগে তাই! 
নাহ্ এরমধ্যে একটা যৌনতার ব্যাপার আছে। সালমান রুশদি যে উপন্যাসটা লিখেছেন মুঘল এম্পায়ার নিয়ে। কি যেন নাম! নামটা ভুলে গেছি। সম্ভবত ইনহেরেন্স অব ফ্লোরেন্স। ওখানে যোধা ও আকবরের সেক্সুয়াল লাইফে এসছে এমন একটা কথা ‘পিকক মার্ক’- সে ব্যাপারে আমি তোমাকে পরে বুঝিরে বলব। এখন না। 
বাঁচল রেবতী! আমি ওঁর মিডনাইট চিলড্রেন নিয়ে একটা সিনেমা হয়েছে ওটা ছাড়া দেখেছি,  কিছু পড়ি নাই। 
ওহ্ ওটাতো পুরোপুরি বাস্তবে পৌছায় নাই। 
পুরো বাস্তব যে খুব নির্মম হয়! মনে মনে বলল রেবতী। 
কিছুক্ষণ বাদে গায়ে রোদ লাগছে এমন ভান করে আরও গা ঘেসে বসেন বশির সাহেব। বলেন, তুমি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অন্তর্মহল’ দেখেছ নিশ্চই! 
দেখেছে, কিন্তু এখন বলল, না। কারণ না জানি কি বিষয় টেনে আনেন তিনি। 
হর্ষদত্তের প্রদক্ষিণ! পড় নাই? 
জ্বিনা। 
রেবতীর কাঁধে আবার হাত রেখে বলেন, ওখানে উনি দেখিয়েছেন প্রেমের ক্ষেত্রে বয়সটা ব্যারিয়ার না। 
রেবতী নিরুপায় তাকে আধবুড়োটার কাছ থেকে এসব শুনে যেতে হয়। তার চোখে যে স্বপ্নের ঘোর এখন! তাই সে এসব গা করতে চায় না। তবে সে বশিরকে খুব একটা পছন্দও করতে পারে না। তার কানে কানে কেউ এসে বলে যায়, ‘বি অ্যাওয়ার অফ ফিফটি প্লাস ম্যান’। কিন্তু কী করবে সে!
হসপিটালে তখন শুধু রেবতি আর রণন। রণন হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। প্রেসক্রিপশন হাতে নার্স তাগাদা দেয়, ভেঙ্কেস্টিং ইনজেকশান কুইক! কেমো থেরাপিটা এখনই শুরুকরতে হবে। 
রেবু ছোটে নীচতলায় ওষুধের দোকানে। 
কোথায় যাওয়া হচ্ছে, রেবতী? 
চমকে পেছনে তাকায় সে। 
ওহ্ আপনি, ইনজেকশান আনতে যাচ্ছি নিচে। 
চলো আমিও যাই তোমার সাথে। 
না, লাগবে না, আমি একাই যেতে পারব। 
আরে না, একা যাবে কি! রাত হয়ে এলো তার ওপরে এত সুন্দরী মেয়ে! 
রেবতি উল্টো দিকে হাটতে শুরু করে।
ওদিকে কেন যাচ্ছো, সিড়ি তো ঐ সামনের দিকেও একটা আছে। 
নাহ্ এই পেছনেরটা দিয়েই যাই ওদিকে আলো কম। 
ভয় কি, আমি আছি তো! 
তুমি আছ সেটাইতো ভয়, মনে মনে বলল সে। লোকটা সুন্দর কথা বললেও অনেক জ্ঞানী আর ধনী হলেও এই লোকটাকে তার বিশ্বাস নাই। রাত আটটা বাজতেই হসপিটালের ওপাশটা ফাঁকা হয়ে যায়। লম্বা করিডোর ধরে এ মাথা থেকে ওমাথা হেটে যাওয়া যায় অনায়াসে। ও মাথার সিড়ি দিয়ে নামলেই বরং ডিপপেন্সারি কাছে কিন্তু সে এখন ও পথে যাবে না। এদিককার সিড়ি দিয়ে নামবার জন্য সে প্রায় সংগ্রাম করতে থাকে। নাহ ঐ শুনশান করিডোর পেরিয়ে এই প্রায়অন্ধকারে যাওয়া যাবে না। তার সাথে থাকা এই পুরুষটিকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নাই। সে তার সাথে এর আগে একাকী কখনো এমন কোনো সৌজন্যপূর্ণ ভদ্র আচরণ করে নাই যে জন্য তাকে বিশ্বাস করা যায়। লোকটা উচ্চ শিক্ষিত, শিল্প সাহিত্য স¤পর্কে বিস্তর জ্ঞান রাখে তারপরও মেয়েদের প্রতি এমন অসৌজন্যপূর্ণ অচরণ! রেবতি এর আগে লক্ষ করেছে যে তার পাশাপাশি বসলেই লোকটা গা ঘেঁসে বসবে, পিঠে হাত রাখবে। সেই হাত নামতে নামতে ব্রা’র স্ট্রাপে গিয়ে থামবে। লোকটা কী চায় তার কাছে! এতো এক ধরণের নির্যাতন! কিন্তু রেবতী উপায়হীন। তাকে তার কাছে যেতেই হবে, আর এসব অত্যাচারও সহ্য করতেই হবে। কারণ সে যে জীবনে বড় হতে চায়। একলা মেয়ের বড় হতে চাওয়া যে ভীষণ অন্যায় এ সমাজে। 


গ্রামের বাড়িতে ধানি জমি প্রায় সবই বিক্রি হয়ে গেছে। রণনের শারিরিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে দিন দিন। যে সময়  সবাই চাইছিল রণন বেঁচে উঠুক ঠিক সেই সময়ে বাবার টাকা পয়সা সব ফুরিয়ে গেল। বাকি আছে শুধু দোকান, বসত বাড়িটাও বন্ধক রেখেছেন। এ দুটোও গেলে যে পথে বসতে হবে! এখনো হাসপাতালে লাগাতার থাকতে হবে ছয় মাস। তারপর আরো দুবছর ট্রিটমেণ্ট চলবে। ২য় বছর প্রতি ১৫ দিন অন্তর এসে কেমো থেরাপি দিতে হবে এবং তৃতীয় বছরে প্রতি ১মাস অন্তর অন্তর কেমো থেরাপি দিতে হবে। এই দীর্ঘ ও ব্যায়বহুল চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা যখন বাবার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই পাশে এসে দাড়ালেন বশির সাহেব। 
তিনি ঢাকার অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করলেন। সেখানে রেবতি ও রণনের থাকবার জন্য দামি ফার্নিসার-পর্দা-এসি ও যাবতীয় ইলেক্ট্রনিক্স গুড্সে ভরে ফেললেন ঘর। তার মহানুভবতায় সবাই বিনীত হলো একমাত্র রেবতী ছাড়া। কারণ এ সব কিছুর বিনিময়ে তাকে দিতে হয়েছে জীবনের চরম মূল্য। তার সব স^প্নের চিতার ওপরে একটি বিকৃত পুরুষের রিরংসায় মন্থিত হয় সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে পিশাচ। 
ঐ মুহূর্তেও হুস হারায় না বশির, খিচিয়ে ওঠে, ‘কে পিশাচ? তুমি যেখানে সুন্দরীর আনুষ্ঠানিক খেতাব পেতে যাবা তারাও কি তোমাকে বিশুদ্ধ রাখবে? না কি খেতাবের বিনিময়ে ওই সম্ভোগটাকে তোমার কাছে বৈধ মনে হবে তখন! অথচ তোমার একমাত্র ভাইয়ের জীবনের বিনিময়ে তোমার কনট্রিবিউশনকে মনে করছ জোর বা নিপীড়ন। পৃথিবীতে স্বার্থ ছাড়া কে চলে বলতো? যত্তসব ফালতু মিডলক্লাস সেন্টিমেন্ট’! 
হাইক্লাস সোসাইটি গার্লদের এসব মিডলক্লাস সেন্টিমেন্ট থাকতে নেই। তাইতো মাঝে মাঝেই বিভিন্ন বিজনেস পার্টিতে মি. বশিরের সাথে উগ্র সাজের স^ল্পবসনা হয়ে তাকে যেতে হয় ডেলিগেটদের মনোরঞ্জন করতে। পালিশ করা শরীরে ননপলিশড যৌন আবেদন ঢেলে দিয়ে, ঠোঁটে কৃত্রিম রংয়ের সাথে দোলাতে হয় কৃত্রিম হাসি। ।  
আর রেবতী প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষায় থাকে তিন বছর পূর্ণ হবার। ডেকে বলে জীবনকে, আর কত? জীবন তখন নিষ্টুরের মতো দাঁত বের করে হাসে। মনে হয় যেন ভেঙচি কাটছে। সব কিছু থেকে মুক্তি পেতে চাইলেও জীবন এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার নয়, তার ওপরে নির্ভর করে থাকা সবগুলো মুখ করুণ আকুতি হয়ে দাঁড়ায় তার সামনে। 


এই পৃথিবীর সব রঙ রুপ যখন ঝলসে গেছে ঠিক তখনই একদিন তার ফেসবুকে পরিচয় হয় নীলের সাথে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে নীল ভালোবেসে ফেলে রেবতীকে।  রেবতীও নীলকে উপেক্ষা করতে পারে না। নীলের মাঝে ও আশ্রয় খুঁজে পায় - তপ্ত ক্ষরদহে এক পশলা বৃষ্টির মতো। নীল তাকে এই জীবনের গারদ থেকে নিয়ে যায় নদীর ধারে যেখানে হাওয়ায় দোল খায় শুভ্র কাশবন। শত বছরের পুরানো অশ্বথ গাছ দেখাতে নিয়ে যায় তাকে। চোখ বন্ধ করে গাছের বাকল শুকে বলে দেখ, ‘আদীম সৌরভ’ শুকে দেখ! 
রেবতী গভীর আগ্রহে ঘ্রাণ নেয়। কিন্তু আঁৎকে ওঠে সে, গাছের বাকল শুকে পায় মর্গের আধপচা বেওয়ারিশ লাশের গন্ধ! ছুটে পালাতে  চায় সে। 
আলতো করে রেবতির হাত ধরে নীল, যেও না; পালিয়ে কোথায় যাবা বল? কোথায় ই-বা যাওয়া যায়! দেখ শত বছর ধরে কত ঝড় ঝঞ্জা, যুদ্ধ ও ইতিহাস বদলের শাক্ষি হয়ে দাড়িয়ে আছে এই গাছ। এখনো শীতল ছায়া দিচ্ছে আমাদের, আশ্রয় দিচ্ছে পাখিদের। দেখ, ওপেন ইওর আইজ রেবা! চোখ খোল পি¬জ, দেখ ওপারে অস্তগামী সূর্য; কী অদ্ভূত লালিমা ছড়িয়ে দিয়েছে চারদিকে। 
রেবতী চোখ মেলে, দেখে যেন আগুণ ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। আতঙ্কে নীলের হাত চেপে ধরে বলে চলো, চলো এখান থেকে। 
শান্ত হও রেবা, রেবতীর দুচোখে আলতো করে চুমু খায় নীল। চোখ মেলে দেখো! ডুবন্ত সূর্যের চারপাশে সুরমা ছড়িয়ে দিয়েছে যেন কেউ। কী অপার্থিব সুন্দর! বল, এই  পথিবীতে অনেকদিন বেঁচে থাকতে মন চায় না এখন। 
রেবতি নিজের অজান্তেই অজানা আবেশে কেঁদে ফেলে। কিছু বলে না। 
এরপর নীল রেবতিকে বলে সেই কথাটা। যে কথাটা শোনার জন্য প্রতিটি প্রেমিকা উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করে। সেই কথাটা, রেবতী আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তোমার ভেতরে আমি বুনে দিতে চাই আমাদের উত্তরাধিকার!  
রেবতী তীব্রভাবে নীলকে চাইলেও মুখে বলল, না। আমি চাই না। নীল তুমি জানো, নীল আকাশে কখনো রেবতীকে দেখা যায় না! সে জন্য রাতের কালো আকাশ চাই। কিন্তু আমি যে আমার নীলকে কালো হতে দিতে চাই না।
কী বলছ তুমি এসব! তোমার আত্মাটা যে এখনো বিশুদ্ধ সেখানে অবগাহন করে আমার, আমাদের ভেতরের সব কালিমা ধুতে দাও রেবতী! আর শরীর, সে তো নশ্বর। 
ওসব আবেগের কথা। সত্যটা হলো, ... ‘not the portico of a temple but shelter in grave!’ ধীরে অথচ স্পষ্ট উচ্চারণে বলে যায় সে। 
না আবেগ না, যদিও অমন শোনায়, বাট দিস ইজ রিয়েলিটি। কিন্তু তুমি, তুমি এ কবিতা কেন বলতেছ রেবতী ? না। দেখো, এভরিথিং উইল বি ওকে। আমি আসব, আমি আসব সেদিন।
“র্যাহিয়ে আব্ এ্যয়সি জাগা চল্কর যাহাঁ কোয়ি না হো,
হাম্-সুখন কোয়ি না হো অওর হাম-যুবাঁ কোয়ি না হো।”
এর মানে কি? 
এটা মীর্জা গালিবের একটা কবিতার লাইন- যার মানে হলো,
“এবার সেই বিজনে হারাই যেখানে নেই কেউ, 
কেউ রবে না সমদর্শী, সমভাষী কেউ সেখানে..”
তার মানে কি? তুমি এসব কেন বলছ! কেন বল তুমি? তুমি আমাকে বিশ্বাস কর না? আমি আসব, দেখো আমি আসব।

সেদিন তৃতীয় বছরের শেষ লগ্নে যখন রেবতির তথাকথিত মুক্তির ক্ষণ, ঠিক তখনই যখন নীল এসেছিল ওকে নিয়ে যেতে। 

কিন্তু নীল ওকে নিয়ে যেতে পেরেছে কি? এটাই তখন আমি ভাবছিলাম ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের ভেণ্টিলেটর ধরে বিভৎষ হয়ে ঝুলে থাকা পরিত্যক্ত কণ্ট্রাসেপটিভের দিকে তাকিয়ে, এটাই তখন ভাবছিলাম আমি। 


Gazi Tanzia

গাজী তানজিয়া

Creative Writer

জন্ম ১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৭। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় থেকে স্নাতক ও আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতোকত্তোর শেষে দুটো বহুজাতিক ক¤পানিতে স^ল্পকালীন কাজ করেন। বর্তমানে লেখালেখিকেই তিনি একমাত্র প্রকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জাতীয় দৈনিকে রাজনৈতিক নিবন্ধ রচনার মধ্যদিয়ে তাঁর লেখালিখির শুরু। একই সাথে লিখে চলেছেন গল্প, উপন্যাস ও শিশু সাহিত্য। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক পটভূমিকায় লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘জাতিস্মর’ আনন্দআলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১০-এ ভূষিত হয়। প্রকাশিত গ্রন্থ: জাতিস্মর (উপন্যাস) পৃথিবীলোক (উপন্যাস) বায়বীয় রঙ (উপন্যাস) কালের নায়ক (উপন্যাস) আন্ডারগ্রউন্ড (উপন্যাস) সবুজঘাসে মুক্তবেশে ( কিশোর গল্প সংকলন) অরক্ষিত দেশে অবরুদ্ধ সময়ে ( নিবন্ধ সংকলন)।