স্ট্রেস ও স্ট্রেস-সম্পর্কিত জটিলতায় কর্টিসল ও সরল শর্করার ভুমিকা

img

The role of cortisol and simple carbohydrates in stress and stress-related complications

কর্টিসল গ্লুকোকর্টিকয়েড শ্রেণীর একটি স্টেরয়েড হরমোন যা এড্রেনাল কর্টেক্সের জোনা  ফ্যাসিকুলাটায় উৎপন্ন হয় এবং স্ট্রেস ও কম গ্লুকোজ এর প্রতিক্রিয়ায় নিঃসৃত হয়। এটি স্ট্রেস ও ত্বরিত পক্বতার জন্য দ্বায়ী।  দীর্ঘমেয়াদী উচ্চমাত্রায় কর্টিসল অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে যাতে ডিএনএ ও আরএনএ ক্ষতির সম্মুখীন হয়; কোষাঙ্গানু এমনকি পরিশেষে পুরো কোষটাও মারা যেতে পারে। উপবাসের প্রথম পর্যায়ে কর্টিসল গ্লুকোনিওজেনেসিস (শর্করা ব্যথিত অন্য কোন উৎস যেমন- অ্যামিনো এসিড, লিপিড থেকে গ্লুকোজ উৎপন্ন হওয়ার পন্থা) প্রথাকে ত্বরান্বিত করে এবং এ সময় এটি স্ট্রেস ও প্রদাহ বিরোধী কাজ করে থাকে। এছাড়াও কর্টিসল যকৃত ও পেশী কলায় গ্লাইকোজেনোলাইসিস (গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজ এ পরিনত করার পন্থা) ঘটিয়ে থাকে। তবে উপবাস পরবর্তী পর্যায়ে কর্টিসল সীমান্তবর্তী কোষের অব্যবহৃত গ্লুকোজকে  যকৃতে গ্লাইকোজেনেসিস (গ্লুকোজ থেকে গ্লাইকোজেন তৈরির পন্থা) ঘটায়, যা কিনা ইন্সুলিনের কার্যকারিতাকে নিবারন ও নিরধোন করতে পারে।  শেষোক্ত ক্ষেত্রে কর্টিসল গ্লুকোজ ট্রান্সপোর্টার GLUT4 কে ট্রান্সলোকেশন করার মাধ্যমে ঘটিয়ে থাকে।

আমাদের মস্তিস্কের প্রধান খাদ্য মুলত দুটো – গ্লুকোজ আর অক্সিজেন। মস্তিস্কে নিরবিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্লুকোজ অত্যন্ত জরুরী। শারীরিক ও মানসিক উভয় কর্মকান্ডে আমরা সর্বদা যে এটিপি (এডিনোসিন-ট্রাই-ফসফেট) ব্যবহার করি তা মুলত গ্লুকোজ মেটাবোলিজমের মাধ্যমেই আসে। গ্লুকোজ ঘাটতি ক্লান্তি, মাথাধরা, কম স্মরণ করার প্রবনতা--- সহ বহু জটিলতার কারন। ইদানীং বাজারে বহু পণ্য পাওয়া যায় যা সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে শরীরে তাৎক্ষণিক গ্লুকোজ বা এই জাতীয় সরল শর্করা যোগান দেয়। গবেষণার তথ্য মোতাবেক যদিও সরল ও জটিল (যা ভাঙলে ২ বা ততোধিক সরল শর্করা পাওয়া যায়) উভয় শর্করারই উপকারী ও ক্ষতিকর দিক মেলে, তবে দ্বিতীয়টির চেয়ে ক্ষতিকর দিক কিন্তু প্রথমটিরই বেশী। আসুন, স্বল্প পরিসরে দেখে নেয়া যাক সরল শর্করার কি ভুমিকা রয়েছে স্ট্রেস ও স্ট্রেস-সম্পর্কিত জটিলতায়। উল্লেখ্য সরল শর্করা হিসেবে সাধারণত আমরা গ্লুকোজ (ও এর কিছু ডেরিভেটিভ) এবং ফ্রূক্টোজ এগুলোই বেশী ব্যবহার করে থাকি; তাই এদুটোর উপর গুরুত্বআরোপ করেই লেখাটি উপস্থাপন করা হল।  

গ্লুকোজ মুলত GLUT1 ও GLUT4 এর মাধ্যমে স্নায়ুকোষে প্রবেশ করে। আমাদের শরীরে গ্লাইকোজেন তৈরি হওয়ার ও ভাঙার উভয় সময়ই স্ট্রেসের উদ্ভব ঘটে থাকে। হাইপারগ্লাইসেমিয়া (স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী মাত্রায় গ্লুকোজ থাকলে) রিয়াক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস (ROS) যেমন সুপারক্সাইড রেডিকেল (O2●) উৎপন্ন করে যা কলা, কোষে ক্ষত এমনকি বংশগতির বাহক (ডিএনএ ও আরএনএ) এর বিশেষ ক্ষতিসাধন করে থাকে। এছাড়াও শারীরিক এন্টি-অক্সিডেন্ট (যেমন - গ্লুটাথায়োন, সুপার অক্সাইডডিসমিউটেস, ক্যাটালেস) ও রিপেয়ারিং সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা কমানো সহ তাদের কার্যাবলী নস্যাৎও করে থাকে। অ্যামিনো এসিড, যেমন- গ্লাইসিন ও এল-আর্জিনিন এগুলো সাধারণত আমাদের শরীরের বহু অঙ্গকে সুরক্ষা করে থাকে। সুতরাং গ্লাইকেটেড প্রোডাক্ট, বিশেষ করে প্রটিনের (গ্লুকোজ-প্রোটিন যৌগ) সাথে শুধুমাত্র গ্লুকোনিওজেনেসিসের উপরই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তা নয় অ্যামিনো এসিডের অঙ্গ সুরক্ষা কার্যক্রমেও বাঁধা দিয়ে থাকে। তাছাড়া এই গ্লাইকেটেড প্রোডাক্টগুলো পক্বতা সহ আরও নানান রোগ যেমন মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, অ্যাথারোস্ক্লেরোসিস, হৃদরোগ, স্নায়বিক রোগ এর জন্ম দিয়ে থাকে। হাইপারগ্লাইসেমিয়া যে রিয়াক্টিভ স্পেসিস (অক্সিজেন/নাইট্রজেন) উৎপন্ন করে তা বহু ফ্যাটি এসিডের অক্সিডেশন ঘটায় যা কিনা গ্লুকোনিওজেনেসিসের উপরই সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

পলিওল পন্থায় অতিরিক্ত গ্লুকোজ সরবিটলে রূপান্তরিত হয় যা ফ্রূক্টোজ  উৎপন্ন সহ ভাস্কুলার টিস্যুর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।  তাছাড়া ফ্রূক্টোজ  রিয়াক্টিভ স্পেসিস উৎপন্ন করার সাথে সাথে অধিক মাত্রায় সাইটোকাইন উৎপন্ন করে যা প্রদাহের আবির্ভাব ঘটায়। অধিকমাত্রায় রিয়াক্টিভ স্পেসিস সিগন্যাল ট্রান্সডাকশনে ব্যাঘাত ঘটানো ছাড়াও ইনসুলিন নিরোধনে মুখ্য ভুমিকা রাখে। অপরদিকে, অধিকমাত্রায় সরবিটল নাইট্রিক অক্সাইড সিন্থেস (iNOS) কে স্টিমুলেট করে যা নাইট্রোসাটিভ (রিয়াক্টিভ নাইট্রজেন স্পিসিস দ্বারা উৎপন্ন স্ট্রেস) প্রভাব ফেলে শরীরের এন্টি-অক্সিডেন্টের কার্যকারিতা নষ্ট সহ উপকারী লিপিড অনুকে পারক্সিডেশন করে থাকে। 

অন্যদিকে মিথাইলগ্লাইঅক্সাইল ইনসুলিন নিরোধন সহ উচ্চরক্তচাপের আবির্ভাব ঘটায় যা বেশী মাত্রায় ইউরিক এসিড নিঃসরণ করতে সাহায্য করে থাকে। উল্লেখ্য অধিক মাত্রায় ইউরিক এসিড, এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ না করে বরং নিকোটিনামাইড এডেনিন ডাই-নিউক্লিওটাইড ফসফেট অক্সিডেস এর কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয় যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে।

একথায় – সরল শর্করা সরাসরি ও দ্রুততার সহিত রক্তে পৌছায়। যা কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও সরল শর্করা থেকে জটিল যৌগ উৎপন্ন হওয়ার সময়, কিংবা রুপান্তর ও মেটাবোলিজমের সময় উৎপন্ন হয় বহু স্ট্রেস সৃষ্টিকারী স্পিসিস। বহু গবেষণার তথ্য মোতাবেক – ২-ডিঅক্সি-ডি-গ্লুকোজ একটি গ্লাইকোলাইসি-স্ট্যাবল সরল শর্করা যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে কোষ ধংস করে থাকে। সুতরাং প্রয়োজনীয় মাত্রা নির্ধারণ না করে আন্দাজে কিংবা অধিকমাত্রায় সরল শর্করা নেয়া কতটুকু যুক্তিসংগত সেটাই এখন ভাবার বিষয়! 

উৎস: Muhammad Torequl Islam. Elevated cortisol and/or simple carbohydrates in stress and stress related diseases. Current Trends in Clinical & Medical Imaging 2017 Dec 01; 2(2): 001-002. [ISSN: 2573-2609; doi: 10.19080/CTCMI.2017.02.555583]


Md. Torequl Islam

মুহাম্মাদ তরিকুল ইসলাম

শিক্ষক ও ঔষধ গবেষক ডঃ মুহাম্মাদ তরিকুল ইসলাম এর জন্ম যশোর জেলায় ১৯৮৫ সালের পহেলা অক্টোবর এ। এই মুহূর্তে তিনি ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট-ডক্টরেট করছেন। তিনি ফার্মেসী নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। গবেষণা করছেন বেশ কিছু বিষয়ের উপর যেমনঃ ক্যান্সার, জেনেটিক্স, মিউটেশন, রেডিয়েশন, নিউরসায়েন্স, ন্যানো-টেকনোলোজি, টক্সিকোলজি, ড্রাগ ডিসকোভারি ইত্যাদি। শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি একজন গীতিকার (প্রেম-সুতা, প্রিয়তমা, এসো ভিজি বৃষ্টিতে)। এছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোট গল্প (রবিঃ দখিনা) ও সামাজিক প্রেক্ষাপট (সবুজের ভিতর লালঃ সংবাদপত্র প্রকাশনা) নিয়ে। লিখতে ভালোবাসেন কবিতা, নাটক, টেলিফিল্ম ও সিনেমার স্ক্রিপ্ট।