আমেরিকার ষাটোর্ধ যুবকেরা

img

আমাদের পি এইচ ডি প্রোগ্রামে প্রতি সেমিস্টারে একটা সেমিনার ডে থাকে , এই দিনে সকল পি এইচ ডির ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিত থাকতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে এবং পি এইচ ডি ডিফেন্সের আগে (মানে ৫ বছরে ) ৪ বার এই সেমিনার ডে তে তাকে তার রিসার্চের অগ্রগতি উপস্থাপন করতে হয়। সাধারনত সেমিনার ডে তে বেশ ভাল খাওয়াদাওয়া হয়, স্যান্ডউইচ থেকে আইস্ক্রিম, কফি থেকে বিভিন্ন ফলের জুস এমনই হরেক রকমের  আইটেমে ভর্তি থাকে সেমিনার রুমের বারান্দা। তাই আমার মতন পি এইচ ডি ছাত্রছাত্রীদের জন্য অন্যের গবেষণার অগ্রগতি জানার থেকেও খাওয়া দাওয়াটা বেশ গুরুত্বপূর্ন হয়ে যায়।  প্রথম সেমিস্টারের সেমিনার ডে তে প্লেইট ভরে খাওয়া দাওয়া নিয়ে সেমিনার রুমের শেষ বেঞ্চে বসে যখন আমি  গবেষণা করছিলাম চিকেন স্যান্ডউইচটা আগে খাব নাকি টুনা স্যন্ডউইচ টা, ঠিক তখন এক ষাটোর্ধ ভারতীয় যুবক উঠলেন তাঁর চতুর্থ ডিফেন্স রিহার্সেল দিতে। বাংলাদেশে সেশন জট পারি দিয়ে মাস্টার্স করতেই আমাদের বয়স পেকে যায় এমনিতেই, তার পর আমি আবার ২ বছর জব ও করেছি দেশে, এরপর আবার আমেরিকায় আমার সেকেন্ড মাস্টার্স করেছি ২ বছর ধরে। তাই পি এইচ ডি শুরু করতেই আমার বয়স হয়ে গিয়েছিল প্রায় ৩০ বছর। আমার ক্লাসে আমার বয়সী আরো দুই তিন জন থাকলে ও অন্য ১৮ জনের বয়স প্রায় ২২ থেকে ২৫ এর মধ্যে। তাই আমার প্রায় দ্বিগুন বয়সী ভারতীয় পিএইচ ডি ছাত্রটিকে দেখে খানিকটা চমকেই গিয়েছিলাম সেদিন আমি। উনাকে দেখে যখন ভাবছিলাম , এই মানুষটা এত বুড়ো বয়সে আই. ই. এল. টি. এস, জিআরই দিয়ে কেমনে আসলো এই দেশে? যেখানে আমার বয়সী আমার বন্ধুরাই বয়স বেশি হয়েছে বলে এখন আর জি আর ই দিতে চাইনা! তখনই উনার প্রেজেন্টেশনের ফাঁকে উনি বললেন আমি এসেছি ভারত থেকে এইটা আমার পি এইচ ডির ষষ্ঠ বছর এবং আগামী মে তেই আমি ডিফেন্স দিব । এই প্রোগ্রামে যখন আমি জয়েন করি আমার বয়স ছিল ৫৯ । আমি খাওয়া দাওয়া ফেলে মনে মনে ৫৯ এর সাথেে ৬ যোগ করে হিসেব মিলালাম, উনার বয়স এখন ৬৫ বছর ! 

আমেরিকার পিএইচডি গবেষকদের যে টাকা দেওয়া হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে  তার কিছু অংশ আসে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে। সেই টাকা( ফেলোশীপ) পাওয়ার জন্য আমাকে প্রতি সেমিস্টারেই একটা ৪ ক্রেডিটের কোর্স পড়াতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স লেভেলের ছাত্রছাত্রীদেরকে। ২য় সেমিস্টারের প্রথম ক্লাসে গিয়ে আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার কচি কাচা টাইপ ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে কারো একজনের বাবা ল্যাবে এসে বসে আছেন। আমার ল্যাব এসিস্ট্যান্ট এসে আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন , কিন্তু তার পর ও ঐ ছাত্র বা ছাত্রীর বাবা টা ক্লাস ছেড়ে গেলনা, আমি ভাবলাম এই বাবাটা ক্লাস থেকে বের হলেই আমি আমার লেকচার শুরু করব। তাই বেকার এদিক সেদিক তাকিয়েই ৫ মিনিট শেষ করে দিলাম। কিন্তু না, উনার ক্লাস থেকে বের হওয়ার কোন নাম গন্ধই নাই। তাই বাধ্য হয়েই আমার নিজের ইন্ট্রোডাকশন দেওয়ার পর ছাত্রছাত্রীদের ইন্ট্রোডাকশন নেওয়া শুরু করলাম। পরে দেখলাম ষাটোর্ধ ঐ ভদ্রলোক ও নিজের পরিচয় দিলেন, আমি জোসেফ , ৩৩ বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে চাকরী শুরু করেছিলাম , ২৭ বছর সেনাবাহিনীকে সেবা দিয়ে, আমার অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করতে এসেছি । কথাটা শুনে আমি বোকার মতন হাতে একটু তালি দিলাম , আমাকে দেখে আমার ছাত্রছাত্রীরা ও শব্দহীন হাত তালিতে স্বাগত জানালো আমার থেকে দ্বিগুন বয়সী আর তাদের থেকে প্রায় চারগুন বয়সী আমার  ছাত্র জোসেফ কে। ব্যাপার টা এইখানে বেশ সহজ হলেও আমাদের দেশে প্রায় ভাবনার অতীত। শিক্ষার কোন বয়স নাই বলে প্রচার করে আমরা যেই শিক্ষা ব্যবস্থাটা চালায় সেটা মূলত বয়ষ্ক শিক্ষা, আঠারো বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোন ছেলের সাথে ষাটোর্ধ কাউকে এক সাথে ক্লাস করতে দেখা প্রায় অসম্ভব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

ব্যাপারটা যে এইখানে  শুধু  পড়াশোনাতেই  সীমাবদ্ধ তা না, এইখানের জিমে গেলেই দেখা যায় ৭০ -৮০ বছরের বৃদ্ধ বৃদ্ধারা ও  ব্যায়াম করে চলেছে তরুন তরুনীদের সাথে। যে বয়সে আমাদের দেশের বৃদ্ধ বৃদ্ধারা নাতী নাতনীদের সাথে সময় কাটাই , কিংবা কোমরের ব্যাথায় ভিক্স মাখলে ভাল হবে নাকি মুভ মাখলে ভাল হবে বলে গবেষণা করেন, সেই বয়সের অনেক বুরো বুড়ি এইখানে কোমরের ব্যাথা সারেন  ব্যামাগারে ব্যায়াম করে। আমি এদের দেখি আর বয়স হয়েছে এমন দোহাই দিয়ে ব্যায়াম করতে অনিহা প্রকাশ করা আমার মা বাবা মাসি পিসি আত্মীয় স্বজন পরিচিতদের কথা ভাবি।

প্রতি বছর আমার বাসার পাশেই শ্রী চিন্ময় সেন্টারের উদ্যেগে ৩১০০ মাইল (৫০০০ কিলোমিটার দৌঁড় প্রতিযোগিতা হয়। যেটা পৃথিবীর দীর্ঘতম দৌঁড় প্রতিযোগিতার স্বীকৃতি পেয়েছে ইতোমধ্যে। একটা নির্দিষ্ট সার্কেলকে (যেটা ০.৫৪৮৮ মাইল বা ৮৮৩ মিটার) ৫২ দিনের মধ্যে ৫৬৪৯ বার প্রদক্ষীণ করলেই ৩১০০ মাইল দৌড় প্রতিযোগীতাটা শেষ হয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র ফিনিশিং লাইন টাচ করার জন্যই একজনকে ৫২ দিন দৌড়াতে হবে গড়ে ৯৬ কিলোমিটার করে।এই প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নামকরা দৌড়বিদরা এসে ভিড় জমায় জ্যামাইকার কুইন্সে। গত বছর আগস্টে এই প্রতিযোগিতা শুরু হলে আমিও গিয়েছিলাম পৃথিবী বিখ্যাত সেসব দৌড়বিদদের দেখতে। যেতে যেতে ভাবছিলাম যারা প্রতিদিন ৯৬ কিলোমিটারের রাস্তা দৌড়ে পারি দিবে, না জানি তারা কত ইয়াং আর শক্তি সামর্থ্য। কিন্তু  এগারো বারো জনের সেই ভীড় দেখে আমি যার পর নাই হতবাক। প্রায় সবার বয়স পয়তাল্লিশের বেশি অংশগ্রহনকারীদের গড় বয়স ৪৮ এর বেশি  ।দুই একজনকে দেখে তো মনে হচ্ছিল ৩১০০ মাইল দূরের কথা এদেরকে তো বাসাতেই পৌঁছে দিতে হবে হুইল চেয়ারে করে। সেবার মানে ২০১৭ সালে যে চ্যাম্পিয়ন হয় তার বয়স ও ৪৯। এক মহিলা দৌড়বিদ ইয়োলান্ডা হোল্ডাের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয় তখন, যার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। পরে জানতে পারি এই মহিলা ২০১৫ সালে অর্থাৎ ৫৭ বছর বয়সে একবছরে সবথেকে বেশি সংখ্যক (১২০ টা) আল্ট্রা ম্যারাথন রানিং শেষ করে নিজের গড়া গিনেজ ওরাল্ড রেকর্ড নিজেই ভাঙ্গেন। ২০১৬ এর জানুয়ারী মাসে ছয় দিনে ৪১০ মাইল দৌড়ে সব থেকে দ্রুত দৌড়ের রেকর্ডও নিজের করে নেন এই মহিলা।  My Journey to Guinness বইয়ের  লেখিকা চিপচিপে শরীরের হোল্ডার বলেন "আমি নিজেকে সবসময় মডেলের মতন দেখতেই ভালবাসি, সেটা আমার ২৬ বছর বয়সে হোক কিংবা ৬২ বছর বয়সে, সেটা পাঁচ মাইল হাঁটার পর হোক কিংবা একশ মাইল ।"  তাই কঠিন কিছুকে অতিক্রম করতে শরীরের বয়স কোন বাঁধা না, মনের বার্ধক্যকে অতিক্রম করতে পারলেই Impossible শব্দটাও হয়ে যায়  I M possible।


Prashun Ghosh Roy

প্রসূন ঘোষ রায়

Researcher

১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্ম। বর্তমানে আমেরিকার সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কে রসায়নে পিএইচডি করছেন এবং ন্যানোমেডিসিন ড্রাগ ডেলিভারি নিয়ে গবেষনা করছেন। ২০১৬ -২০১৭ সেশনে "CUNY Science Award " পাওয়া এই লেখকের দুইটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। রাজনীতি , বিজ্ঞান এবং উৎসাহমূলক লেখা লিখতে ভালবাসেন তিনি।