ঔষধের উপর খাবারের প্রভাব

img

কেবল এক ঔষধের কার্যকারিতায় যে অন্য ঔষধ প্রভাব ফেলতে পারে তা নয়, বরং খাবারও অধিকাংশ ঔষধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা এই যে, যেহেতু অধিকাংশ খাবার প্রাকৃতিকভাবে চাষাবাদের মাধ্যমে পাওয়া যায়, সেহেতু এসকল খাবারে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ইন্টারেকশন বা ক্ষতি নেই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়টা তেমন নয়। ফল, শাক-সবজিসহ প্রায় সব প্রাকৃতিক খাবারই ঔষধের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে থাকেন বয়স্ক রোগী বা সিনিয়র সিটিজেনরা। কেননা তাদের ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, উচ্চ-রক্তচাপ, উদ্বিগ্নতা, অধিক কোলেস্টেরল, পারকিনসন রোগ সহ একাধিক সমস্যায় বেশ কয়েকটি ঔষধ একসাথে গ্রহণ করতে হয়। আবার যেসকল রোগীর লিভার, কিডনী বা পাচনতন্ত্রে সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ড্রাগ-ফুড ইন্টারেকশন বেশ বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে থাকে। ঔষধ মুখে সেবন করার পর যেভাবে তা পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে, একইভাবে খাবারও পরিপাকতন্ত্রেই প্রবেশ করে। খাবার এবং ঔষধ একইসাথে খেলে হয় খাবার ঔষধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে, নাহয় ঔষধ খাবারের শোষণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঔষধ মূলত চারটি ধাপে কাজ করে। প্রথমত, পাকস্থলীতে ঔষধ গ্রহণ করার মত আকারে দ্রবীভূত হয়। দ্বিতীয়ত, তা রক্তে শোষিত হয়ে রক্তের মাধ্যমে টার্গেটেড সাইটে পৌছায়। তৃতীয়ত, শরীর ঔষধের প্রতি সাড়া দেয়, আর এভাবেই ঔষধের কার্যকারিতা শুরু হয়। চতুর্থত, ঔষধ শরীর থেকে কিডনী ও লিভার বা উভয় দ্বারা শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই চার ধাপের যেকোন ধাপেই খাবার প্রভাব ফেলে যেকোন ঔষধের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই বলে সব খাবারই যে সব ঔষধের উপর প্রভাব ফেলে তা কিন্তু নয়। যদিও এ নিয়ে খুব কম গবেষণাই হয়েছে, তবুও কিছু অতি-পরিচিত খাবার আছে যেগুলো ঔষধের উপর লক্ষনীয় প্রভাব ফেলতে পারে। 

দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার যেমন, পনির, ইয়োগার্ট, দই, মাখন ইত্যাদি বেশ কিছু ঔষধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক। দুধের উপস্থিতিতে রক্তে টেট্রাসাইক্লিনের শোষণ ৬৫% কমে যায়। যদিও ডক্সিসাইক্লিন, মিনোসাইক্লিনের উপর দুধের কোন প্রভাব নেই বলা হয়ে থাকে, কিন্তু এক গবেষণায় ২৫-৩০% শোষণ কম হয় বলে উল্লেখ করা হয়। দুধ বা দুগ্ধ জাতীয় খাবার সিপ্রোফ্লোক্সাসিন, নরফ্লোক্সাসিন নামক এন্টিবায়োটিকের বায়োএভেইলেবিলিটি কমিয়ে দেয়। দুধে উপস্থিত ক্যালসিয়াম এর জন্য দায়ী বলা হয়ে থাকে। এজন্য এসকল এন্টিবায়োটিক দুধ খাওয়ার ২ ঘন্টা আগে বা ২ ঘন্টা পরে খাওয়া উচিৎ, যাতে ক্যালসিয়ামের সাথে কোন ইন্টারেকশন করার সুযোগ না থাকে। অন্যদিকে, স্ট্রোনশিয়াম ঔষধের ক্ষেত্রে দুধের উপস্থিতি এর বায়োএভেইলেবিলিটি ৬০-৭০% কমিয়ে দেয়, এমনকি খাবার খাওয়ার ৩ ঘন্টা পর হলেও। তাই স্ট্রোনশিয়াম কমপক্ষে খাওয়ার ২-৩ ঘন্টা পরে রাতে ঘুমানোর আগে সেবন করতে বলা হয়ে থাকে।

মাল্টা কিছু কিছু ঔষধের শোষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে অথবা কিছু কিছু ঔষধের অস্বাভাবিক বিপাকের মাধ্যমে রক্তে উক্ত ঔষধের স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটাতে পারে। মাল্টাতে রয়েছে ফিউরানোকূমারিন্স(furanocoumarin) নামক রাসায়নিক উপাদান, যা অন্য ঔষধের রাসায়নিক উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে ঔষধের গুনগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন আনতে পারে। কমলা বা অন্যান্য সাইট্রাস ফলে এই উপাদান নেই, কিন্তু জাম্বুরা ও মোসাম্বিতে(Seville oranges)কিছু পরিমাণ থাকে। এছাড়াও মাল্টায় নারিঞ্জিন, নারিঞ্জিনিন, বারগেপ্টেন(5-methoxypsoralen) এবং ফ্লেভনয়েডস নামক রাসয়নিক উপাদান থাকে।

মাল্টা অন্ত্রের সাইটোক্রোম P450 এবং  IA2 (CYP3A4 এবং CYP1A2)  নামক কিছু এনজাইমের কার্যকরিতায় বাধা প্রদানের মাধ্যমে ঔষধের মেটাবলিজমে তারতম্য ঘটাতে পারে। ফলস্বরূপ রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই কিছু ঔষধ, যেমন- উচ্চ-রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী বা অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন রিজেকশন  প্রতিহত করার জন্য প্রেসক্রাইব করা সাইক্লোস্পোরিনের সাথে মাল্টা বা এর জুস খাওয়া উচিৎ না। মাল্টা কিছু কিছু ঔষধের মাত্রা রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে যার ফলে ঘটতে পারে নানা বিপদ যেমন এন্টি-এংজাইটিক ড্রাগ বাসপিরোন( buspirone), এন্টি-মেলেরিয়াল ড্রাগ কুইনিন, ইনসমনিয়ার ঔষধ ট্রায়াজোলাম। অতিরিক্ত মাল্টা বা মাল্টার জুস পানের ফলে কার্ডিওভাস্কুলার ড্রাগ লোভাস্টেটিন, এটোরভাস্টেটিন, সিম্ভাস্টেটিন নামক ঔষধের বায়োএভেইলেবিলিটি যথাক্রমে ১৪০০, ২০০ এবং ১৫০০% বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ড্রাগ একুমুলেশন অর্থাৎ শরীরে ঔষধ জমে থেকে শরীরের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়াও মাল্টা ক্যালসিয়াম চ্যানেল এন্টাগোনিস্ট, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম মডুলেটর, এইচ এম জি- কোএ রিডাক্টেজ, ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট, এন্টিভাইরাল, ফসফোডাইএস্টারেজ-৫ ইনহিবিটর, এন্টিহিস্টামিন,এন্টিবায়োটিক, থায়রয়েড রিপ্লেসমেন্ট ড্রাগ, জন্ম-নিয়ন্ত্রক বড়ি, গ্যস্ট্রিকের ঔষধ, কাশির ঔষধ ডেক্সট্রোমেথোরফেন ইত্যাদি ঔষধের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

মাল্টার সাথে এসকল ঔষধ না খাওয়াই ভালো। একান্তই যদি খেতেই হয় তবে ঔষধ খাওয়ার দুই ঘন্টা পরে খাওয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি মাল্টার জুস প্রাত্যাহিক খাদ্য তালিকায় রাখতে চান তবে ডাক্তার অথবা অভিজ্ঞ ফার্মাসিস্টদের সাথে আলোচনা করে নেয়াই ভালো।

ভিটামিনের সাথে অন্য কোন ঔষধ একসাথে খাওয়া উচিৎ না, কেননা ভিটামিন অন্যান্য মিনারেলের সাথে ইন্টারেকশন করতে পারে।

প্রায় সব ধরনের ঔষধের সাথেই এলকোহল রিএকশন করে। ঔষধ খাওয়ার পূর্বে বা ঔষধের সাথে বা ঔষধ খাওয়ার পর এলকোহল বা এলকোহল আছে এমন কিছু খেলে তা ঔষধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। ঔষধের সাথে এলকোহল পানে দু’ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি ঘটতে দেখা যায়: এক, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ডিপ্রেশন, আর অন্যটি, ফ্লাশিং রিএকশন। এম্ফেটামিন, ব্যথার ঔষধ, মৃগী রোগীর ঔষধ, এলার্জির ঔষধ, মানসিক রোগীর ঔষধ, ক্ষুধা নিবারনকারী, উদ্বিগ্নতা রোধকারী ঔষধ, আইসোনিয়াজাইড(বিশেষ করে যক্ষা রোগের এন্টিবায়োটিক), লিথিয়াম, ম্যাপ্রোটেলিন, মেটোক্লোপ্র্যামিড, মিয়ান্সেরিন, সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিয়াপ্টেক ইনহিবিটরস(SSRIs), ট্রাইসাইক্লিক এন্টিডিপ্রেসেন্ট এসকল ঔষধের আগে, সাথে বা পরে এলকোহল পান করলে রোগী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ অনেক বেশী ঝিমুনী অনুভব করা, দুর্বল বা ক্লান্তি লাগা, কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার মত উপসর্গের মধ্য দিয়ে যান অর্থাৎ সিএনএস ডিপ্রেশনের উপসর্গ সমূহ দেখা যায়। এই অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন- গাড়ি চালানো বা অতিরিক্ত এক্টিভ কাজ না করাই ভালো। দ্বিতীয়ত যে সমস্যাটি দেখা যায় তা হল ফ্লাশিং রিএকশন, যা ডাইসালফিরাম (Disulfiram) রিএকশন নামেও পরিচিত। ডাইসালফিরাম (Disulfiram) হচ্ছে একধরনের রাসয়নিক উপাদান বা ঔষধ যা এলকোহল এডিকশন দূর করতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাধারণত এলকোহল লিভারের এলকোহল ডিহাইড্রোজিনেজ এনজাইমের প্রভাবে এসিটাইল্ডিহাইডে রুপান্তরিত হয় এবং তা এসিটাইল্ডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ এনজাইমের প্রভাবে এসিটিক এসিডে পরিণত হয়, যা ক্ষতি করে না। কিন্তু একত্রে ডাইসালফিরাম আর এলকোহল সেবনে, ডাইসালফিরাম এসিটাইল্ডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ এনজাইমকে বাধা দান করে, ফলে এসিটিক এসিড গঠণ করতে দেয় না। আর এভাবেই রক্তনালীতে এসিটাইল্ডিহাইড জমতে থাকে এবং ফ্ল্যাশ রিএকশন হয় অর্থাৎ হঠাৎ খুব গরম লাগা, মাথা এবং ঘাড়ে কম্পন অনুভূত হওয়া, মাথা ঘোরা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, বমি বমি ভাব, ঘাম হওয়া, পিপাসা লাগা, বুকে ব্যাথা, হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া, বুক ধুক ধুক করা, নিম্ন রক্তচাপ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, হার্ট এটাক, অচেতনতা, খিচুনী এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এধরনের রিএকশন ১০ মিনিট থেকে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সেকারণে বলা হয়ে থাকে ডাইসালফিরাম সেবনের ১২ ঘন্টা পর্যন্ত এলকোহল সেবন করা যাবে না। একই ধরনের রিএকশন ঘটতে পারে এমন ঔষধসমূহ হচ্ছে, এজোল(ফাংগাস বিরোধী ঔষধ), এন্টিবায়োটিক সেফালোস্পোরিন, ফিউরাজলিডন, গ্রাইসিওফুল্ভিন, মেট্রোনিডাজোল ইত্যাদি। এলকোহল লিভারের জন্য ক্ষতিকর ঔষধ যেমন, প্যারাসিট্যামল, মেথোট্রেক্সেট, লেফ্লুনামাইড এবং ফেনিটোইন ইত্যাদির সাথে পান করা উচিৎ না। 

পারকিনসন রোগী যাদেরকে লেভোডোপা পেসক্রাইব করা হয়ে থাকে তাদের জন্য প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া ঠিক না। কেননা অ্যামাইনো এসিড মেথিওনিনের প্রভাবে লেভোডোপার কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়, অন্যদিকে অ্যামাইনো এসিড ট্রিপ্টোফেনের উপস্থিতিতে রক্তে লেভোডোপার মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় হ্রাস পায়। তাই প্রাত্যাহিক প্রোটিন গ্রহনের মাত্রা ৮০০ মিলিগ্রাম/কেজি বডি ওয়েট নির্ধারন করে দেয়া হয় পারকিনসন রোগীর ক্ষেত্রে।

ক্রেনবেরি (cranberry) আমাদের দেশে যদিও এইফলটি অতটা দেখা যায় না, তবে আজকাল কিছু কিছু ফলের দোকানে দেখতে পাওয়া যায়। অনেকেই একে লাল আংগুর ভেবে ভুল করে থাকে। এই ফল দেখতে লাল, গোল আংগুরের মত। দেখতে আংগুরের মত হলেও এটি আংগুর নয়, এর নাম ক্রেনবেরি। এন্টি-অক্সিডেন্ট প্রোপার্টি থাকায় এবং ইউরিনারী ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) কমায় বলে বিগত বছরগুলোতে এই ফল বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যের কমিটি অন সেফটি অব মেডিসিনস (CSM) এবং মেডিসিন এন্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটোরি এজেন্সি (MHRA)এর মতে, যেসকল রোগী ওয়ারফেরিন (রক্ত জমাট না বাধার ঔষধ) সেবন করছেন তাদের ক্রেনবেরি এড়িয়ে চলা বা কম খাওয়া উচিৎ। কেননা ক্রেনবেরি ওয়ারফেরিনের রক্ত জমাট বাধার ক্ষমতা দ্বিগুন বাড়িয়ে দেয় ফলে রোগীর রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে বা ইন্টারনেশনাল নরমালাইজড রেসিও (INR) কমে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে।

সবচেয়ে বেশী ফুড এন্ড ড্রাগ ইন্টারেকশন ঘটতে দেখা যায় অ্যামাইনো এসিড টাইরামিনের সাথে মাও ইনিহিবিটরস (MAOIs) গ্রুপের ঔষধের সাথে। টাইরামিন পরোক্ষভাবে সিম্পেথোমাইমেটিক হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ সিম্পেথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করতে পারে, তাই যখন টাইরামিনের মেটাবোলিজম দমন হয় (MAOIs দ্বারা),তখন লক্ষনীয় মাত্রায় নরএপিনেফ্রিন রিলিজ হয়, ফলে রক্তচাপ যায় বেড়ে, কার্ডিয়াক এরিথমিয়া, হাইপারথারমিয়া, সেরেব্রাল হেমোরেজের মত ঘটনা ঘটতে পারে। গবেষণায় প্রমানিত যে, সামান্য ৬ মিলিগ্রাম টাইরামিন রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম এবং ১০-২৫ মিলিগ্রাম সিরিয়াস হাইপারটেন্সিভ রি-একশন করাতে সক্ষম। চিজ, সালামি, সসেজ, স্মোকড মিটস, ইস্টযুক্ত খাবার, আচার, চকোলেট, ড্রিঙ্কস যেমন- বিয়ার, মদ, ওয়াইন ইত্যাদি টাইরামিন সমৃদ্ধ খাবার।  

ওয়ারফেরিনের কাজ হচ্ছে রক্ত জমাট বাধানো, কিন্তু ভিটামিন-কে এর উপস্থিতিতে তা কাজ করতে পারে না। সবুজ শাক-সবজি যেগুলোতে প্রচুর ভিটামিন-কে রয়েছে ওয়ারফেরিনের সাথে একত্রে তা খেলে ওয়ারফেরিনের কার্যকারিতায় বাধা হয়ে দাড়াতে পারে।

প্রাকৃতিক উপাদান মুলেঠি বা কালো যষ্ঠিমধু শরীর থেকে পটাশিয়াম বের করে দিয়ে সোডিয়ামের সঞ্চয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে হার্টের রোগীর জন্য প্রেসক্রাইব করা ডিজোক্সিন নামক ঔষধের কার্যকারিতায় তা প্রভাব ফেলে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রেসক্রাইব করা ঔষধের কার্যকারিতার উপরও যষ্ঠিমধুর প্রভাব লক্ষনীয়। এন্টিকোয়াগুলেন্ট ওয়ারফেরিনের কাজে বাধা প্রদান করে। তাই এসকল ঔষধ সেবনকালীন সময় যষ্ঠিমধু না খাওয়াই ভালো।

যেসকল রোগী ডিজোক্সিন বা এস ইনহিবিটরস (ACE inhibitors) সেবন করছেন তাদের লবনের প্রতি সতর্ক হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে লবনের পরিমান কমানো যেতে পারে। সাথে কিডনীর সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের সাথে এব্যাপারে পরামর্শ করে নেয়া যেতে পারে।

আম CYP1A2, CYP1A1, CYP3A1, CYP2C6, CYP2E1 এনজাইম গুলোকে বাধা দান করে। তাই পি-গ্লাইকোপ্রোটিন, মিডাজোলাম, ডাইক্লোফেনাক, ক্লোরযোক্সাজোন, ভেরাপামিল ঔষধসমূহর সাথে আম না খাওয়া ভালো। একান্তই খেতে হলে ঔষধ সেবণের ২-৩ ঘন্টা আগে বা পরে খাওয়া যায়।

আপেলের সাথে ফেক্সোফেনাডিন খাওয়া উচিৎ না, এটি CYP1A1, OATP family এনজইমকে বাধা দান করে ঔষধের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়।

ক্যাফেইন একজাতীয় মিথাইল জেন্থিন ডেরিভেটিভস যা চা, কফি, চকোলেট জাতীয় খাবারে অধিক পরিমানে থাকে। এটা প্রমানিত যে সামান্য পরিমান ক্যাফেইন সেবনও এথলেটসদের মেন্টালি উজ্জীবিত করে তাদের পারফর্মেন্স বহুগুন বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। বোঝাই যাচ্ছ ক্যাফেইন আছে এমন খাবার স্নায়ুকে উত্তেজিত করে ঘুম কমিয়ে দেয়, এমনকি ইনসোমনিয়াও হতে পারে। যেসকল রোগী এন্টি-এরিথমক ঔষধ সেবন করছেন তাদের ক্যাফেইন ত্যাগ করা উচিৎ, কেননা তা রোগীর হার্ট বিট বাড়িয়ে দিতে পারে। অ্যাজমা এবং ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারী ডিজিজ (COPD) রোগীদের থিয়োফাইলিন নামক ঔষধ প্রেসক্রাইব করা হয়, যা নিজেও একটি স্টিমুলেন্ট এবং জেন্থিন ডেরিভেটিভস। সুতরাং একত্রে থিয়োফাইলিন এবং ক্যাফেইন গ্রহনে ক্ষতি হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রার ক্যাফেইন সিজার থ্রেশোল্ড কমিয়ে দেয়। ফলে কার্বামেজিপাইন, ফেনোবারবিটোন, ফেনিটোইন, ভেলপ্রোয়েট ইত্যাদি ঔষধের খিচুনী প্রতিরোধকারী ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অন্যান্য স্টিমুলেন্ট প্রোডাক্ট যেমন, গিনসেং, গুয়ারানা, সিউডোএফিড্রিন, এফেড্রা ইত্যাদির সাথে ক্যফেইন সেবন না করার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। ক্যফেইন এবং এফেড্রা একত্রে সেবনে মৃত্যু ঘটেছে এমনও দেখা গেছে। 

সুস্থ দেহ, সুস্থ মনের জন্য খাবার এবং ঔষধ উভয়েরই প্রয়োজন আছে। কিন্তু একসাথে খেলে অনেক সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্মুক্ষীন হতে হয়। তাই কোন খাবার কোন ঔষধের সাথে ইন্টারেকশন করতে পারে তা জানা জরুরি। সেই সাথে ফুড এন্ড ড্রাগ ইন্টারেকশন নিয়ে আরো বেশি বেশি গবেষণার দরকার আছে।


Jahanara Akhter Josna

জাহানারা আক্তার জোছনা

Pharmacist

বাংলাদেশ ফার্মেসী কাউন্সিল কর্তৃক রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট (Reg no. A9539)। বর্তমানে ইপ্রকাশ থেরাপিউটিকসের সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। ঔষধ বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখেন। এছাড়াও, তিনি ড্রাগ ইন্টারেকশন, ঔষধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ঔষধের মাত্রা ও সেবনের নিয়ম সংক্রান্ত বিষয়ে কনসালটেন্সি করেন।