ইলমাজ গু’নে: জীবন ও চলচ্চিত্র

img

 “বেদনা’র অনেক রূপ ;
ফুলের মতো, পাখিদের যেমন
কিংবা বাতাসেরা।
আমি তাই-ই বলতে চেয়েছি
আমার কিছু বন্ধুদের দিয়ে।
একান্ত ঐ বন্ধু’রা
জেনেছিল দুঃখ কাকে বলে;
ভালোবাসা আর কষ্টের -
সে কত গভীর রূপ !
যদিও মনে  হতো
কারো পক্ষে তা অভাবনীয়,
কারো কাছে তা ধারনার অতীত।”
---- ইলমাজ গু'নে।

চিত্রসমালোচক জে.হোবারম্যন একবার তুরস্কের খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গু'নে সম্পর্কে বলেছিলেন, "Something like Clint Eastwood, James Dean , and Che Guevara combined". তুরস্কের রুপালী পর্দার জনপ্রিয় এই তারকা সত্তর দশকে একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানবিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করলেন। মার্ক্সীয় রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সুপারস্টার ইমেজ, ব্যক্তিগত জীবনে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামী আবার সার্থক সংগ্রামী চলচ্চিত্র নির্মাতা - ইলমাজ গু’নে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। 

ইলমাজ গু’নে ( জন্মকালীন নাম;  ইলমাজ পুতুন ) জন্মগ্রহন করেন ১ এপ্রিল, ১৯৩৭ সালে ; আদানা’ শহরের দক্ষিনের ইনিস নামক গ্রামের কুর্দি জাতিভূক্ত ভূমিহীন কৃষক পরিবারে। ছোটবেলা থেকে তুর্কী গ্রামের শ্রমজীবি দরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রামের সাথে বেড়ে ওঠা পরবর্তীতে তার কাজের প্রেক্ষাপট এর ভিত্তি তৈরী করে দেয় । আঙ্কারা ও ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আইন ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশুনা করেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি তুরস্কের চলচ্চিত্র মাধ্যমের সাথে যুক্ত হোন। আধুনিক তুরস্কের চলচ্চিত্র ধারার একজন শক্তিশালী অভিনেতা এবং নায়ক তিনি দারুন জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সদুর্শন অভিব্যক্তি, অভিনয়  শিল্প এবং চরিত্রায়নে অসামান্য দক্ষতার কারনে তাকে রুপালী পর্দার ‘দুবৃর্ত্ত রাজা’ (Ugly King) হিসেবে স্ক্রীন আইডল এ পরিনত করে। কিন্ত গু'নে যেন এরচেয়েও একধাপ এগিয়ে - তুর্কী গনমানুষের জীবন, ঐতিহ্য, মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামী একজন তুর্কী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চান । 

১৯৬০ সালে তুরস্কের রাজনৈতিক পটভূমিতে পরিবর্তন এল। আধুনিক তুরস্কের জাতির পিতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক - এর আদর্শ রাষ্ট্র কাঠামোতে সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলো। রাজনৈতিক শুদ্ধবাদী অভিযানে তারা নির্বাচিত সরকার কে উচ্ছেদ করে এবং প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনদেরেস্-কে অন্যান্য কয়েকজন মন্ত্রীসহ ফাঁসি দেয়া হয়। রাজনীতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপর নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর পর্যবেক্ষন শুরু হয়।  

‘কমিউনিষ্ট’ উপন্যাস লেখার কারনে গু'নে’র আঠারো মাসের জেল হলো। তিনি ছিলেন Türkiye Halk Kurtuluş Partisi-Cephesi (THKP-C) (Turkish People's Liberation Party-Front, TPLP-F)  সংগঠনটির একজন সক্রিয় সদস্য। পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামরিক অভ্যূত্থান, শোষনমূলক শাসন, সামরিক শাসন ব্যবস্থাপনার কারনে গু'নে’র সাথে কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক আরো চরম হয়ে পড়লো। ১৯৬৫ সালে শেষে গু'নে নিজেই তার প্রযোজনা সংস্থা Güney Filmcilik খুললেন এবং স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজ শুরু করলেন। পরবর্তী সময়ে গু’নের চলচ্চিত্রগুলোতে প্রতিফলিত হলো তুরস্কের সাধারন জনগনের জীবন ও সমাজ কাঠামোর মূল্যায়ন। 
১৯৭০ সালে নির্মিত 'Umut' (আশা) ছবিতে একজন দুর্ভাগ্য পীড়িত ঘোড়ার গাড়ীচালক ‘জব্বার’ । জীর্ন দুটি ঘোড়াকে অবলম্বন করে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে সে তার পাঁচ সন্তান, বৃদ্ধা মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে শহরের নোংরা বস্তিতে দিনাতিপাত করেন। তার একটা ঘোড়া দুর্ঘটনায় মারা গেলে অন্য ঘোড়াটি ও দেনাদারদের দখলে চলে যায়। উপায়হীন জব্বার তার বোহেমিয়ান বন্ধু হাসান-এর পরামর্শে এক হোজ্জার কাছে যায়। সে দৈবভাবে এক গুপ্তধনের সন্ধান বলে। জব্বার তার সর্বস্ব বিকিয়ে এবার সেই গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। কুসংস্কারচ্ছন্ন , অশিক্ষিত, বেপরোয়া জব্বার গুপ্তধনের বিভিন্ন রুপ আকার ও মায়ায় বিভ্রান্ত হতে থাকে। এবং একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘উমুত’ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ইতালীয় নিওরিয়ালিজম ধারার  শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রায়ন ‘বাইসাইকেল থীভ’ - এর সমকক্ষে উমুত্-কে স্থান দেয়া হয। নয়াবাস্তবাদী ধারায় অনুপ্রানিত সার্থক উপস্থাপন ‘উমুত’ , যেখানে তৃতীয় বিশ্বের অসহায় জীর্ন মানুষের জীবন ও নিয়তি তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।

কিন্তু তুরস্কের সরকারী ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে’র কোনভাবেই যেন স্থিরতা আসে না। আভ্যন্তরীন সামরিক সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতন ; আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি ; আন্তজার্তিক সীমারেখায় গ্রীস ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ও বিরোধ ; ক্রমবর্ধমান ধনিক ও বুর্জোয়া শ্রেনীর উত্থান - সেই সাথে গ্যংস্টার-মাফিয়া চক্রের আধিপত্য ; আদিবাসী কুর্দীদের সাথে সংঘাত ও শোষন, জনগনের হতাশা ও দারিদ্রতা - সবমিলিয়ে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়ে সাধারন মানুষ যেন কোন আশা রাখতে পারে না। ইলমাজ গু'নে তাই নিজেকে এর থেকে দুরে রাখতে পারলেন না । দুর্দশা পীড়িত মানুষের দারিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে নিয়ে তার নির্মিত চলচ্চিত্র Aci (বেদনা),Umutsuzlar (হতাশাবাদী), Baba(পিতা)  ১৯৭১ সালে এবং Agit (শোকগাঁথা) ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় ।  

১৯৭২ সালে একজন বিদ্রোহী ছাত্রকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে গু’ণে আবার ২৬ মাসের জন্য জেলবাসী হলেন। গু’ণের অনুপস্থিতিতে তার সহযোগী পরিচালক সেরিফ গোরেন ও আতিফ ইলমাজ এর তত্ত্বাবধানে তার অসমাপ্ত কাজ Endsize(উদ্বেগ) ১৯৭৫ সালে;  Zavallilar(হতভাগ্য) ও Arkadas(বন্ধু) ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায়। গু’ণের পরবর্তী চলচ্চিত্র সমূহে কোন না কোনভাবে জেকি অকতেন কিংবা সেরিফ গোরেন- এর পরিচালনায় নির্মাণ কাজ শেষ হতো। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ইলমাজ গু’ণে আবারো গ্রেফতার হলেন। শুটিং চলাকালীন সময়ে কোন এক রেস্টুরেন্টে গু’ণে বাক-বিতন্ডায় একজন ডানপন্থী বিচারককে গুলি করেন। এবার সাজা হয় উনিশ বছরের। কিন্তু গুনে’র চলচ্চিত্র নির্মাণ থেমে থাকে না। জেলে বসে তিনি স্ক্রিপ্ট লিখেন, বাইরের পরিচালককে নির্দেশ দেন শ্যুট করার এবং নিজেই সেই ছবির রাশ দেখে চিত্রায়ন ঠিকঠাক আছে কিনা দেখভাল করেন। 

এতসব পেরিয়ে ইলমাজ গু’ণে তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি Sürü ( পাল ) ১৯৭৮ সালে এবং  Düsman ( শত্র“ ) ১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্রের দর্শকদের জন্য নিয়ে এলেন। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জেকি অক্তেন। জেলে বসে গুনে’ এই ছবিগুলো’র চিত্রনাট্য লেখেন। সু’রু একটি ব্যতিক্রমধর্মী ভালোবাসায় গল্প; সাথে সত্তর দশকে তুরস্কের সামন্তসমাজ, নগরায়ন,  অসম ব্যবস্থাপনা, রাজনীতি, দুনীতিবাজ প্রশাসন, দারিদ্রতা এবং এসবের মধ্যে অসহায় মানুয়ের সংগ্রাম এবং পরাজয়। গল্পের শুরু হয় তুরস্কের দক্ষিন-পূর্ব অঞ্চলে কুর্দী পাহাড়ী এলাকায় এবং শেষ হয় আঙ্কারা শহরে। ’দুশ্মান’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইসমাইল একজন  শ্রমিক। তার পরিবার সন্তান-স্ত্রী ও মাকে নিযে সে বেচেঁ থাকতে চায় শহরে। কিন্ত শ্রম বাজারের দুঃসহ অবস্থা দেখে সে আশাহত হয়। তার স্ত্রী অভিজাত ভোগবাদী সমাজের প্রতি বিমোহিত এবং  স্বামী’র অর্থর্নেতিক অবস্থায় সুখী নন। ইসমাইল স্ত্রীকে ভালোবাসে, কিন্তু মনষ্যত্ব বিকিয়ে সে অসৎ পথে ধনী হতে জানে না। ধীরে ধীরে তার কাছে ধনবাদী সমাজের সত্যিকারের চেহারা প্রকাশ পায়। দরিদ্র মানুষ,  তা যে দেশের বা জাতির হোক না কেন, সবসময় শোষকের হাতে নিপীড়িত এবং নিষ্পেষিত। ইসমাইলের লোভী স্ত্রী তাই ব্যভিচারিনী হতে বাধ্য হয়, স্বামী-সন্তানকে ফেলে ভোগবাদী সমাজে নিজেকে বিক্রি করে হারিয়ে যায়।  হতাশাগ্রস্থ ইসমাইল একমাত্র অবলম্বন কন্যাকে সমাজে সুন্দরভারে গড়ে তোলার আশায়। 

দু'টো ছবিতেই গু'নে তার স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে দুটো ভিন্ন গল্পে ধারন করে দেখালেন, অর্থনৈতিক কাঠামোর কাছে সবই অসহায়। সর্বহারা শ্রমজীবি মানুষের জীবন, ভালোবাসা, পরিবার, বেঁচে থাকা সবই যেন অসম্ভবভাবে কঠিন এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়।   

১৯৮০ সালে আবারো তুরস্কে সামরিক অভ্যূত্থান ঘটে। ডান ও বামপন্থী নের্তৃত্বের দ্বন্দ্ব দেশকে গৃহযুদ্ধে’র দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বিবাদমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এর মধ্যকার দ্বন্দ্বে’র স্থিরতা আনতে ও আফগানিস্তানে চলমান সোভিয়েত যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রন করার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  তুরস্কের সামরিক সরকারকে সমর্থন দেয়। অভ্যূত্থানের নেতা ‘কেনান ইভরান’ নিজেকে রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত করে সাংবিধানিকভাবে সামরিক ক্ষমাতায়নকে নিশ্চিত করেন। ফলে গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা বিপর্যস্ত হয়। সামরিক সরকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতা কর্মী, সামাজিক নের্তৃত্ববৃন্দ, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী-গায়ক-চলচ্চিত্রকর্মী, বিভিন্ন পর্যায়ের গনমাধ্যম ও মুক্তচিন্তার লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর নেমে আসে গ্রেফতার, জেলবাস, দেশত্যাগ, নাগরিকত্বহীনতা, হয়রানী, আমানবিক নির্যাতন, এমন কি অনেককে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা পর্যন্ত করা হয়।  

১৯৮১ সালে ইলমাজ গু’নে জেল থেকে পালাতে সক্ষম হোন এবং ফ্রান্সে আশ্রয় গ্রহন করেন। সেরিফ গোরেন তখন গু'নের পরবর্তী ছবি’র চিত্রায়ন সমাপ্ত করেন। সুইজারল্যান্ডে তিনি ‘ইয়ল’ ছবির সম্পাদনার কাজ শেষ করেন। গু’নের বিশ্বস্ত সহযোগী সেরিফ গোরেন এর পরিচালনায় 'Yol'(যাত্রা)  মুক্তি পায় ১৯৮২ সালে।  কাহিনীকার 

ইলমাজ গু’নে এবার জেল হতে স্বল্পকালীন মেয়াদে মুক্ত কয়েকজন কয়েদি’র গল্প বলেন। সেইয়্যিত আলী বাড়ীতে গিয়ে জানতে পারেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী তার অনুপস্থিতিতে পতিতালয়ে পালিয়ে যায়, স্বামী-সন্তান কিংবা বংশের সম্মানের কথা না ভেবে। মেহমেত্ সেলিহ গ্রেফতার হয়েছিল তার শ্যালকের সাথে অপরাধে যুক্ত থাকার সন্দেহে; যাকে সে পুলিশের তাড়া খেয়ে মরার আগে গাড়িতে তুলতে চায় নি। আরেকজন কয়েদী ওমর ফিরে আসে তার গ্রামে । তুরস্কের সীমান্তবর্তী কুর্দী অঞ্চলে তার গ্রাম । ফলে চোরকারবারী, বিদ্রোহী কর্মকান্ড, রাজর্নৈতিক পলায়ন - সব মিলিয়ে বিগ্রহ সীমান্তরক্ষীদের সংঘাত সাথে লেগেই আছে। প্রতিদিনই সেনাবাহিনীর গুলিতে গ্রামের কেউ না  কেউ গ্রেফতার হচ্ছে, নইলে মারা পড়ছে নির্দয়ভাবে। পুরো ছবিতে কোন চরিত্রের শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তি নেই ।  জেল বা জেলের বাইরে সবখানে তাদের জীবন যেন শেষ হয়ে গেছে তাদের কারাবাস তাদের বাইরের পৃথিবীতে ফিরে যাবার অযোগ্য করে তুলেছে। যদিও তারা সবাই স্বপ্ন দেখেছিল জেল থেতে বেরিয়ে সব গুছিয়ে নিয়ে সুন্দর একটি ভবিষ্যতের।

১৯৮২ সালে ‘ কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে’ 'Yol' (যাত্রা)  প্রদর্শিত হয় এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হয়। শোনা যায়, চলচ্চিত্র উৎসবে সেনা বাহিনীর দেহরক্ষী নিয়ে তিনি হাজিন হোন তুর্কী গুপ্তচর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। ইন্টারপোল-এর হুলিয়া থাকার কারনে পুরষ্কার লাভের পর পরক্ষনই তিনি কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান।  

অনেকদিন নিজ হাতে পরিচালনা থেকে দুরে থাকলেও ১৯৮৩ সালে ফ্রান্স সরকারে সহযোগিতায় গু'নে তার Düvar (দেয়াল) চলচ্চিত্রের নির্মান কাজ শেষ করেন। ইলমাজ গু’নে পরিচালিত সর্বশেষ এই ছবিতে সামরিক সরকারে আমলে জেলখানা’র বিভিন্ন বন্দীসহ, কিশোর বন্দীদের স্বপ্ন, বাস্তবতা এবং তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের বিভৎস চিত্র উঠে আসে। 

ফ্রান্সে নির্মিত ‘Düvar (দেয়াল)' ইলমাজ গু'নে পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র। নিজ দেশে কারাগারের তিক্ত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে দুভার নির্মিত । জেলখানার অভ্যন্তরে বিভিন্ন ডরমেটরীতে থাকা বিভিন্ন বয়সী পরুষ, নারী ও কিশোরদের স্বপ্ন, জীবন ও বাস্তবতার নির্মম চিত্র উঠে আসে এই ছবিতে। কাহিনীতে মূল চরিত্র বলতে কেই নেই। সবারই গল্প যেন অতীত বিহীন, কিন্তু ভবিষ্যত নিশ্চিত নিপীড়ন। সরকারে প্রতিনিধি’রা জেলের ছেলেবুড়ো, নারী পুরুষ সবাইকে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখে। তাদের যেন কোন শ্রেনীগত পার্থক্য নেই। খুনী, ডাকাত, শিক্ষক, শিল্পী, নাস্তিক, রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্ন মতাবলম্বী - কারোরই যেন সামাজিকভাবে আলাদা কোন মর্যাদা নেই। কারা পরিদর্শক কোনভাবে কয়েদীদের কোন অভিযোগ শুনতে রাজী নন। তার বক্তব্য স্পষ্ট, কাউকে এখানে দাওয়াত করে আনা হয়নি যে সকল সুযোগ সুবিধা দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য। সামরিক সরকার জনসাধারনের সামজিক কোন অন্যায় বা অপরাধকে মানবিকভাবে দেখতে রাজী নয়। বরংচ নিজেদের চরম নৈরাজ্য ও স্বৈরাচারিতাকে রক্ষা করতে তারা সাধারন জনগনের যেকোন আচরনের প্রতি কঠোর ও অনমনীয়। তুরস্কের জাতির পিতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক - এর জন্ম দিবসেও তারা কাউকে মানবিক ক্ষমা (Clemency)  দিতে রাজী নন। 

পুরো ছবিতে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও অমানবিক অত্যাচারের দৃশ্যায়ন বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল, শিল্পসম্মত ধারার দর্শকদের পক্ষে সত্যিই সহ্য করা মুশকিল। এ ছবিতে গু'নেকে অনেক বেশি কঠোর এবং তীব্র মনে হতে পারে। পরিচালক তার দৃশ্য বিন্যাসে দর্শকের গ্রহনযোগ্যতাকে কোনভাবে আমলে নেন না। ছবিতে মানবিকতার অনেক ছোঁয়া থাকলেও গু'নের সার্বজনীন দর্শকদের ‘দুভার’ এর ভয়াবহতা কিছুটা হতাশ করে। তথাপি পরিচালকের শেষ শক্তিশালী চলচ্চিত্র এবং তৎকালীন তুরস্ক সামরিক সরকারের নিপীড়নমূলক মনোভাবের কঠোর সমালোচনা হিসেবে ‘দুভার’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রশংসিত থাকবে। 

১৯৮৪ সালে ৯ সেপ্টেম্বর দেশত্যাগী অবস্থায় ফ্রান্সের প্যারিস শহরে দুরারোগ্য পাকস্থলী’র ক্যন্সারে ইলমাজ গু’নে মৃর্ত্যুবরন করেন।   

সামরিক সরকারের সময়ে ইলমাজ গুনে’র নামটায় উচ্চারিত হতো না তার নিজ দেশে। তার পরিচালিত এবং অভিনীত ১১ টি চলচ্চিত্র কর্তৃপক্ষের রিপোর্ট অনযায়ী ধ্বংস করা হয়। সামরিক প্রশাসক কর্তৃক তার নাগরিকত্ব বাতিল হয়। এমন কি তার লিখিত কিছু পড়া এবং প্রকাশও ছিল নিষিদ্ধ । যদিও তার ছবিতে বিপ্লবী চলচ্চিত্র ধারার মতো রাজনৈতিক, মতাদর্শিক কোন প্রপাগোন্ডা নেই। বাম রাজনীতি’র সাথে আদর্শগতভাবে যুক্ত থাকলেও গুনে’র চলচ্চিত্রসমূহে কোন তুখোর রাজনৈতিক চরিত্র বা বক্তব্য নেই। তথাপি ইলমাজ গুনে'র চলচ্চিত্র প্রবলভাবে রাজনৈতিক। তুরষ্কে’র সামরিক সরকারে ক্ষমতায়ন, নিয়ন্ত্রন এবং শোষন বিভিন্ন ছবিতে উপস্থিত। সামরিক সরকারকে সমালোচনা এবং তাদের নির্যাতনকে বিশ্ববাসী’র কাছে তুলতে কোনরকমা আপোষ করেননি তিনি। সামরিক লোকেরা যে মানবিক কোন কিছু বোঝাপড়া’র অতীত। কিন্তু তারা কোন দুর্নীতি, অন্যায় রোধে, বৈষম্য ও দারিদ্রতা নিরুপনে কিংবা শেষ পর্যন্ত সাধারন মানুষের কোন মঙ্গল বা উপকারে আসে না । বরংচ, জনগনের স্বপ্ন ও স্বাধীনতা'কে হরন করেন তাদের খেয়াল খুশী মতো। তুরস্কে বুর্জোয়া উত্থান, ব্যবসায়ী সমাজ, মাফিয়া গোষ্ঠীর রাজত্ব , হত্যা-সন্ত্রাস এবং এসবের বেড়াজালে বন্দী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও অসহায়ত্ব। 

তার শেষ দু’টি ‘ইয়ল’ এবং ‘দুভার’ এর জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের দর্শক সমাজে সমাদৃত হলেও বলতে হয় - ইলমাজ গু’নে তুরস্কের খেটে খাওয়া মানুষের একান্ত আপন চলচ্চিত্রকার। নিজেকে সারাজীবন একজন ‘শোষিত কুর্দী’ (assimilited kurd) ভাবলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সমগ্র পৃথিবীর সাধারন শ্রমজীবি মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং অসহায়ত্বকে সার্বজনীনভাবে চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন।

প্রধান সহায়ক তথ্যাবলী:
1) Yílmaz Güney by Bilge Ebiri, © Senses of Cinema 1999-2009
2) Yılmaz Güney - Wikipedia, the free encyclopedia
3) Yílmaz Güney, Revolutionary cinema in Turkey by Dennis Giles and Haluk Sahin
    from Jump Cut, no. 27, July 1982
4) http://www.worldscinema.com
5) Turkey - Wikipedia, the free encyclopedia
6) Kurdistan Turkey: Yilmaz Guney's last Film. (The Middle East magazine, Juanuary 1983) 
7) The history of Turkey: from 1919 to 1990

(কালি ও কলম এপ্রিল, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত)


Rafiqul Anowar Russell

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল ১৯৯৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় তার সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, রাসেল ছাত্র থাকা অবস্থা থেকে বিভিন্ন ভূমিকায় চলচ্চিত্র চর্চায় সংযুক্ত। কখনো ফিচার লেখক, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, চিত্রনাট্য, কখনো প্রযোজনায় তিনি সংযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। পরবর্তী সময়ে অডিও ভিশুয়াল প্রতিষ্ঠান ‘অযান্ত্রিক’ গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ নির্মাতা রাসেলের আত্মপ্রকাশ ২০০৮ সালে, ১১ মিনিটের শর্ট ফিকশন ‘হাইজ্যাক’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। এরপর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ এন ব্রাদার্স প্রোডাকশনস থেকে ২০১২ সালে তিনি তৈরি করেন আরেকটি ছোট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ১১ মিনিটের ‘ফান।’ ২০১৪ সালে ‘দ্য অ্যাডভাঞ্চারার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রফিকুল আনোয়ার রাসেল জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। দেশ ব্যাপী নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা - শর্টফিল্ম’ বিভাগে ১ম স্থান লাভ করে। ২০১৫ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর সামুরাই মারুফ পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেসিডোনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা’র মধ্য দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি গল্প, ফিচার, ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালিখির কাজ করে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে বাস করেন।