ভিটামিন-সি রেসিস্ট্যান্ট ক্যান্সারে কতটুকু সার্থক?

img

How successful Vitamin C against cancer resistance?

কেমোথেরাপির বিরুদ্ধে ক্যান্সার কোষের প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেন এক নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে! আর সেটাই ওষুধ বিজ্ঞানীদের, বিশেষত ক্যান্সার ওষুধ বিজ্ঞানীদের হাঁপিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ঠ। উপযুক্ত উপায় খুঁজতে গিয়ে ক্যান্সার ওষুধ বিজ্ঞানীগন বর্তমানে শুধু নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কারই নয়, বরং পটেনশিয়াল কম্বিনেশন নিয়েও বেশ ভাবছেন। ইতোমধ্যে পেয়েছেন বেশ কিছু সফলতাও। ভিটামিন-সি (অপর নাম এসকরবিক এসিড) যা প্রতিদিনকার অনেক খাবারই পাওয়া যায়। এটি একটি বহুল পরিচিত এন্টিঅক্সিডেন্ট যা উচ্চমাত্রায় প্রো-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। যে কারণে এটিকে শুধু প্রটেক্টিভ হিসেবেই নয়, বরং ব্যবহার করা হয় সহায়ক অথবা সরাসরি কোষ ধ্বংসের কাজেও। বিশেষ করে এন্টি-ক্যান্সার ঔষধ হিসেবেই! তবে, গবেষণার তথ্য মোতাবেক, এর ব্যবহারেও দেখা দিচ্ছে কিছু বিতর্ক। আসুন জেনে নেয়া যাক রেসিস্ট্যান্ট ক্যান্সারে ভিটামিন সি কতটুকু সফল। 

ইয়ং মাল্টি ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ক্যান্সার (HeLa) কোষ অন্যান্য এন্টি-ক্যান্সার ঔষধে যারা রেসিস্ট্যান্ট ভিটামিন-সি কেও তাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে অক্ষম দেখা গেছে। তবে একিউরড ভিনক্রিস্টিন-রেসিস্ট্যান্ট PC-9/VCR ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে ভিটামিন-সি কে কিছুটা কর্মক্ষম পাওয়া গেছে।  অপরপক্ষে এই ভিটামিনের PC-9 parental কোষের ড্রাগ টলারেন্সের উপর কোন প্রভাব মেলেনি। এক গবেষণায় মানুষের নিউরো-এক্টোডার্মাল কোষ (SK-N-BE(2)) এর উপর ৫৭% কার্যক্ষমতা দেখা গেছে ভিটামিন-সি এর। 

অন্যদিকে, এড্রিয়ামাইসিন-রেসিস্ট্যান্ট মানুষের স্তন ক্যান্সার (MCF-7 ADRR) কোষে ভিটামিন-সি কে প্রটেক্টিভ হিসেবে পাওয়া যায়। অপর এক গবেষণায় U937 কোষ যা কিনা হাইড্রোজেন পারক্সাইড (H2O2) এ রেসিস্ট্যান্ট তাদেরকে ভিটামিন-সি তেও রেসিস্ট্যান্ট দেখা গেছে। মুলত এই ভিটামিন হাইড্রোজেন পারক্সাইড জেনারেশন ও ইন্ডাকশনের মাধ্যমেও সাইটোটক্সিক এক্টিভিটি  দেখায়। তবে ভিটামিন সি ১০২-১০৩ মাইক্রোমোল মাত্রায় কমপ্লিট ডক্সোরুবিসিন ও মধ্যমপন্থি সিসপ্লাটিন রেসিস্ট্যান্ট কিন্তু প্যাক্লিটাক্সেল-সেন্সেটিভ মানুষের স্তন ক্যান্সার (MCF-7 ও MDA-MB-231) কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে সক্ষম। 

ভিটামিন-সি মুলত বহু মেকানিজমে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়ে। সম্প্রতি এক গবেষণায় ১০ জন মেটাস্টাটিক প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীকে ৫, ৩০ ও ৬০ গ্রাম ভিটামিন-সি ৪ সপ্তাহ ধরে ট্রিটমেন্ট করার পর তাদের ফার্মাকোকাইনেটিক ডাটায় তেমন বিশেষ কোন পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। উপরন্তু ফার্স্ট অর্ডার এলিমিনেশন ডাটা বলছে যে – ইনফিউশন থামিয়ে দেয়ার পর ভিটামিন-সি এর সাইটোটক্সিক মাত্রা ধরে রাখা নিতান্তই দুরূহ ব্যাপার, যদিও রোগীর বৃক্ক কার্যকারিতা স্বাভাবিক। ড: কুইপারের মতে, ক্যান্সার কলায় এই ভিটামিনের ডিস্ট্রিবিউশন হেটারোজেনাস, যে কারণে সুপ্রাফিজিওলজিক্যাল প্লাজমা মাত্রা অর্থাৎ ১০০ মাইক্রোমোলের অধিক মাত্রার ভিটামিন সি এর প্রয়োজন অন্তত স্বল্প রক্ত সঞ্চালিত টিউমার কলায়। 

তবে, যে সকল পদার্থ এস্কোরবেটকে ভেঙে এস্কোরবাইল রেডিকেল উৎপন্ন করতে সক্ষম তাদের সাথে ভিটামিন-সি মিলে বেশ ভালো কাজ করার নজির মিলেছে। যে সকল কোষে ফিজিওলজিক্যাল এন্টি-অক্সিডেন্ট, বিশেষত গ্লুটাথায়োন এর মাত্রা বেশী তাদের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি ও এর অন্যান্য এনালগকে খুব সহজেই রেসিস্ট্যান্ট হবার নজির পাওয়া যায়।  মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ বিষয়টাও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে কারন ভিটামিন-সি কে আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিতে দেখা যায় ড্রাগ-রেসিস্ট্যান্ট মাল্টিপল মাইলেমা কোষে, যেখানে গ্লুটাথায়োনের কার্যকারিতাকেও উপেক্ষা করার নজির মিলেছে।

ভিটামিন কে৩ ও ভিটামিন ডি৩ এর সাথে এই ভিটামিনের কম্বিনেশনকে বেশ কিছু কান্সারের বিরুদ্ধে সফলতার সাথে লড়তে দেখা যায়। তার মধ্যে বৃক্ক ক্যান্সার অন্যতম। যদিও THP-1 কোষে প্রটেক্টিভ তবে KCL22/SR কোষে ভিটামিন-সি কে ইমাটিনিব-রেসিস্ট্যান্ট এর বিপক্ষে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়াও ভিটামিন সি কুইনোন ৮-রেসিস্ট্যান্ট মানুষের লিউকেমিয়া (K562) কোষে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। 

এটি শুধু কেমোথেরাপি-রেসিস্ট্যান্ট ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধেই নয় বরং রেডিওথেরাপি -রেসিস্ট্যান্ট ক্যান্সার এর বিরুদ্ধেও লড়তে সক্ষম। এক গবেষণায়- মাত্র ৫ মাইক্রোমোল মাত্রার ভিটামিন-সি কে রেডিয়েশন-ইন্ডিউসড ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়তে দেখা যায়। সার্বিক বিচারে, ক্যান্সার ওষুধ গবেষকগণ এই মর্মে ইতি টেনেছেন যে, ভিটামিন-সি এর কার্যকারিতা মুলত এর মাত্রার উপর নির্ভরশীল কারন স্বল্প মাত্রায় এটি ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে কাজ করতে অক্ষম হলেও উচ্চ মাত্রায় সক্ষম। এমনকি এটি ক্যান্সার রোগীদের ট্রিটমেন্টের পর দীর্ঘ দিন সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকার হারও বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। আর এ বিষয় নিয়ে নিয়মিত গবেষণা তো চলছেই!

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন: Ascorbic acid: still controversial when used against cancer resistance?
Drugs & Therapy Perspectives 2018 Jan 22; 34(2): 81-84


Md. Torequl Islam

মুহাম্মাদ তরিকুল ইসলাম

শিক্ষক ও ঔষধ গবেষক ডঃ মুহাম্মাদ তরিকুল ইসলাম এর জন্ম যশোর জেলায় ১৯৮৫ সালের পহেলা অক্টোবর এ। এই মুহূর্তে তিনি ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট-ডক্টরেট করছেন। তিনি ফার্মেসী নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। গবেষণা করছেন বেশ কিছু বিষয়ের উপর যেমনঃ ক্যান্সার, জেনেটিক্স, মিউটেশন, রেডিয়েশন, নিউরসায়েন্স, ন্যানো-টেকনোলোজি, টক্সিকোলজি, ড্রাগ ডিসকোভারি ইত্যাদি। শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি একজন গীতিকার (প্রেম-সুতা, প্রিয়তমা, এসো ভিজি বৃষ্টিতে)। এছাড়াও তিনি লিখেছেন ছোট গল্প (রবিঃ দখিনা) ও সামাজিক প্রেক্ষাপট (সবুজের ভিতর লালঃ সংবাদপত্র প্রকাশনা) নিয়ে। লিখতে ভালোবাসেন কবিতা, নাটক, টেলিফিল্ম ও সিনেমার স্ক্রিপ্ট।