মর মুখপুড়ি: মলয় রায়চৌধুরী

img

ইলাস্ট্রেশনঃ রাজীব দত্ত

 

বিশ শতকের ষাট বা ছয়ের দশক বাংলা কবিতার ইতিহাস যে-কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে, তার মথ্যে হাংরি আন্দোলন অন্যতম, এ-বিষয়ে দ্বিমত নেই । আর এই হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নেতা মলয় রায়চৌধুরী । যিনি আজও সৃজনক্ষম । গদ্যে-পদ্যে যিনি তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনা ও প্রতিবাদ অক্ষয় করে চলেছেন । কারো আনুকুল্য বা হাততালির প্রত্যাশা করেন না । ভুল কি ঠিক, সে-বিচার করবে ইতিহাস বা মহাকাল । পরোয়াহীন এই লেখককে তাঁর নিজস্ব ভাষামুদ্রা ও ভঙ্গির জন্য অভিবাদন জানাতেই হয় । আমরা জানি প্রথাভাঙার স্পর্ধা তখন সরকার মানতে পারেনি । কাব্যে অশ্লীলতার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে গ্রেপতার করা হয় ।

বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পর নতুন সুর শুনিয়েছিলেন তিরিশের কবিরা । চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি আরেক মাত্রা যোগ করেছিল । আত্মকথন ও আত্মরতিকে সম্বল করে অন্যরকম স্বাদ নিয়ে এলেন পঞ্চাশের কবিরা । আর ষাটের কবিরা, বিশেষভাবে 'হাংরি আন্দোলন' আমূল নাড়া দিলো বাংলা কবিতার সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে । কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, স্তবকে তুমুল ভাংচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করে তুলল । বিশেষত মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় যৌনতার সঙ্গে এলো ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিস্ফলতার যন্ত্রণা । কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর কবিতায় আত্মপ্রক্ষেপ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত গিস্পাত হয়ে ওঠেন, তা তাঁর কবিতাগুলি পড়লে টের পাওয়া যায় ।

ডক্টর তরুন মুখোপাধ্যায়,বিভাগীয় প্রধান,
বাংলা বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

( স্বপ্ন পত্রিকার শারদ ১৪১৫ - ইংরেজি ২০০৮ - সংখ্যা থেকে পুনর্মুদ্রিত )

কপিরাইট

অবন্তিকা, অতি-নারী, অধুনান্তিকা
পঞ্চান্ন বছর আগে চৈত্রের কোনারকে
লোডশেডিঙের রাতে হোটেলের ছাদে
ঠোঁটের ওপরে ঠোঁট রেখে বলেছিলি
চুমু প্রিন্ট করে দিচ্ছি সারা নোনা গায়ে
ম্যাজেন্টা-গোলাপি ভিজে লিপ্সটিকে
গুনেগুনে একশোটা, লিমিটেড এডিশান
কপিরাইট উল্লঙ্ঘন করলে চলবে না ।

অবন্তিকা, সাংবাদিকা, অধুনান্তিকা
এ-চুক্তি উভয়েরই ক্ষেত্রে লাগু ছিল
কিন্তু দুজনেই এর-তার কাছে থেকে
শুনেছি কখন কবে কার সাথে শুয়ে 
ভেঙেছি ভঙ্গুর চুক্তি কেননা মজাটা
ঠোঁটের ফাইনপ্রিন্টে লিখেছিলি তুই ।

প্রজাপতি প্রজন্মের নারী তুই চিত্রাঙ্গদা দেব

রবীন্দ্রনাথ, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না।
চিত্রাঙ্গদা বলছিল আপনি প্রতিদিন
ওকে রুকে নিচ্ছেন, আপনাকে সাবান
মাখাবার জন্য, বুড়ো হয়েছেন বলে
আপনি নাকি একা বাথরুমে যেতে
ভয় পান, আর হাতও পৌঁছোয় না
দেহের সর্বত্র, চুলে শ্যাম্পু-ট্যাম্পু করা--
পোশাক খুললে, আসঙ্গ-উন্মুখ নীল
প্রজাপতি ওড়ে ওরই শরীর থেকে
আর তারা আপনার লেখা গান গায় !

এটা আপনি কী করছেন ? আপনার
প্রেমিকারা বুড়ি থুতথুড়ি বলে কেন
আমার প্রেমিকাটিকে ফাঁসাতে চাইছেন !

নাচ মুখপুড়ি

নাচ তুই নাচতে থাক অবন্তিকা
উইখেকো গোরিলার ঢঙে
নাচতে থাক নাচতে থাক নাচ
কী হয় কী যে হয় তালে-তালে
আমি আছি তোর ঘামে নুন হয়ে
হাওয়ার সঙ্গে ট্যাঙ্গো
আলোর সঙ্গে ফক্সট্রট কিংবা
দোলানো পাছায় মাম্বো রুম্বা বুগি
পাসো দোবলে লিকুইড লকিং
বোলেরো জাইভ সুইং সকা
মুনওয়াক ফ্ল্যামেঙ্গো নাচে
কথা বলা বন্ধ রেখে
নিজেকে নাচাতে থাক ডি.জে.
আমি আছি তোর নাভি ফুটো করে
হালকা হলুদ পোখরাজে
অন্তর্বাসে আছি আলতো
সন্মোহিনী কটুগন্ধে
মোদো-ভাপ নিঃশ্বাসে
নখের পুরোনো ময়লায়
চুমুপ্রিয় গালের ফুসকুড়ি হয়ে
তেষ্টা-পাওয়া খসখসে ঠোঁটে
শ্লেষাত্মক হাসি হয়ে আছি
বুঝতে পারবি না মুখপুড়ি
কেননা তুই ঢঙি চিরকাল
কেবলই নেই নেই নেই নেই
নেই নেই নেই নেই করে
নেচে গেলি নেচে গেলি নেচে
ভাষার মাস্টার বোদা
করিয়োগ্রাফারের ইশারায়


পপির ফুল

বোঁটায় তোর গোলাপ রঙ অবন্তিকা
শরীরে তোর সবুজ ঢাকা অবন্তিকা
আঁচড় দিই আঠা বেরোয় অবন্তিকা
চাটতে দিস নেশায় পায় অবন্তিকা
টাটিয়ে যাস পেট খসাস অবন্তিকা

অন্তরটনিক


বিড়ি ফুঁকিস অবন্তিকা
চুমুতে শ্রমের স্বাদ পাই
বাংলা টানিস অবন্তিকা
নিঃশ্বাসে ঘুমের গন্ধ পাই
গুটকা খাস অবন্তিকা
জিভেতে রক্তের ছোঁয়া পাই
মিছিলে যাস অবন্তিকা
ঘামে তোর দিবাস্বপ্ন পাই

তোর বহির্মুখ, মুখপুড়ি

তোর বহির্মুখী দেহ, আদরক্লান্ত ঘামে, মুখপুড়ি মেছোমেয়ে
আলুথালু মরশুমে বেড়ে ও ফিকিরহীন, অপপ্রচারে, বুঝলি
জাহাজ ভাসাতে চাইছে পিম্পদের ঘোড়েল জোয়ারে ।
হাউ সিলি ! নো ? কী বলিস, ডারলিং, সুইটি পাই ?
তোর নাব্য নগ্নতা গ্লসি কাগজের চারু মলাটে হেলান দিয়ে
পুজো সংখ্যার মোটা বেহেডদের পাশে শুয়ে করছেটা কী ?
বল তুই ? তোর কোনো সে নেই ? বোবা না বধির তুই !
অলংকার-টলংকার বেচে খেয়েছিস জানি । বাড়ির কাঠামো
দেখছি ঝুলে গেছে দশ বছর বাদে-বাদে কিস্তি দিতে-দিতে;
হাউ স্যাড । চ্যাংড়া যারা জোটে তারা টেকে না কেন রে ?
বছর না যেতেই কাট মারে ! অথচ বডি তো সরেস আজও
অক্ষরের ধাঁচে জমে একেবারে টানটান আগাপাছতলা
কন্ঠের টিউনিঙও শ্বাসকে ফুরিয়ে ফ্যালে রাত বাসি হলে ।
বেশ্যার আলতামাখা গোড়ালি দেখবো ভাবিনি--- তাও
ব্যালেরিনা জুতোর আবডালে, ডারলিং, ঘামে-ভেজা
প্রণামের খাতিরে তুই কতরকমের ফাঁদ পেতে রেখেছিস !

পরমাপ্রকৃতি

মেঘের রঙ দিয়ে ছুঁয়ে দিস অবন্তিকা
চামড়া বাঘের ডোরা ধরে
হাওয়ার রেশম দিয়ে চুল আঁচড়ে দিস অবন্তিকা
মাথা বেয়ে ওঠে বুনো মহিষের শিং
ঝড়ের মস্তি দিয়ে পাউডার মাখিয়ে দিস অবন্তিকা
গায়ে ফোটে গোখরোর আঁশ
হরিণের নাচ দিয়ে কাতুকুতু দিস অবন্তিকা
ঈগল পাখির ডানা পাই
রোদের আঁশ দিয়ে নখ কেটে দিস অবন্তিকা
গজায় নেকড়ের থাবা হাতে-পায়ে
নদীর ঢেউ দিয়ে ঠোঁটে চুমু খাস অবন্তিকা
কাঁধে পাই রাবণের জ্ঞানীগুণী মাথা
বৃষ্টির ঝাপটা দিয়ে জড়িয়ে ধরিস তুই অবন্তিকা
হুইস্কির বরফ হয়ে যাই
গানের সুর দিয়ে চান করিয়ে দিস অবন্তিকা 
ডুবে যেতে থাকি চোরা ঘূর্ণির টানে

নয়নিমা

ব্যায়াম করিস তুই অবন্তিকা, নরম গোলাপি ম্যাটে শুয়ে, মিহিমিহি
বাজনায় বডি তোর মৃদঙ্গ তালের ঢঙে ফুল-অন উরুকে ফোলায়
পা দুটো ওপরে ওঠে, উলঙ্গ সাঁতারু, আয়নার পারা গুঁড়োগুঁড়ো
ভাসাস সঙ্গীতে ধোয়া উড়ন্ত বকের ডানা, কাকে দিবি বলে
কাঁচা মাটি মাখছিস আঁটো সাঁটো লোভনীয় পাছাকে দুলিয়ে ?

মর মুখপুড়ি

এই বেশ ভাল হল অ্যামি, বিন্দাস জীবন ফেঁদে তাকে
গানে-নাচে মাদকের জুয়ার পূণ্যে অ্যামি, কী বলব বল,
অ্যামি ওয়াইন হাউস, অ্যামি, আমি তো ছিলুম তোর
জানালার কাঁচ ভেঙে 'ল্যাম্ব অফ গড'এর দামামায়
বাজপড়া গিটারের ছেনাল আলোয় চকাচৌঁধ ভাম,
অ্যামি, আমি তো ছিলুম, তুই দেখলি না, হের্শেল টমাসের
শিয়রে বিষের শিশি মাধুকরী লেপের নিঃশ্বাসে, অ্যামি
স্তনের গোলাপি উলকি প্রজাপতি হয়ে কাঁপছি, দেখছিস
লাল রঙে, অ্যামি, অ্যামি ওয়াইন হাউস, মুখপুড়ি
হ্যাশের ঝাপসা নদী কোকেনে দোলানো কোমর, চোখ
থ্যাবড়া কাজলে ঘোলা ঠিক যেন বাবার রিটাচ করা 
খুকিদের নকল গোলাপি ঠোঁট বয়ামে ভাসাচ্ছে হাসি
সাদা কালো, হ্যাঁ, সাদা কালো, ব্যাক টু ব্ল্যাক গাইছিস
বিবিসির ভিড়েল মাচানে কিংবা রকবাজ ঘেমো হুললোড়ে
আরো সব কে কী যেন ভুলে যাচ্ছি ভুলে যাচ্ছি ভুলে...
ওহ হ্যাঁ, মনে পড়ল, ক্রিস্টেন পাফ...জনি ম্যাককুলোস...
রাজকমল চৌধুরী...ফালগুনী রায়...অ্যন্ড্রু উড...
সেক্স পিস্টলের সিড ভিশাস...দার্বি গ্রেস...অ্যান্টন মেইডেন...
সমীর বসু...শামশের আনোয়ার...কে সি কালভার...
হেরোইন ওভারডোজ, ছ্যাঃ, ওভারডোজ কাকে বলে অ্যামি
ওয়াইন হাউস, বল তুই, কী ভাবে জানবে কেউ 
নিজেকে পাবার জন্যে, নিজের সঙ্গে নিজে প্রেমে পড়বার জন্যে...
য়ুকিকো ওকাকার গাইতে গাইতে ছাদ থেকে শীতেল হাওয়ায়
ৱদু হাত মেলে ঝাঁপ দেয়া, কিংবা বেহালা হাতে সিলিঙের হুক থেকে
ঝুলে পড়া আয়ান কার্টিস, কত নাম কত স্মৃতি কিন্তু কারোর
মুখ মনে করা বেশ মুশকিল, তোর মুখও ভুলে যাব
দিনকতক পর, ভুলে গেছি প্রথম প্রেমিকার কচি নাভির সুগন্ধ,
শেষ নারীটির চিঠি, আত্মহত্যার হুমকি-ঠাসা, হ্যাঁ, রিয়্যালি,
নরম-গরম লাশ, হাঃ, স্বর্গ নরক নয়, ঘাসেতে মিনিট পনেরো
যিশুর হোলি গ্রেইল তুলে ধরে থ্রি চিয়ার্স বন্ধুরা-শত্রুরা,
ডারলিং, দেখা হবে অন্ধকার ক্ষণে, উদাসীন খোলা মাই,
দু ঠ্যাং ছড়িয়ে, একোন অজানা মাংস ! অজানারা ছাড়া
আর কিছু জানবার জানাবার বাকি নেই, অ্যামি, সি ইউ...
সি ইউ...সি ইউ...সি ইউ...মিস ইউ অল...

সবুজ দেবকন্যা


ওঃ তুই-ই তাহলে সেই সুন্দরী দেবকন্যা
তুলুজ লত্রেক র্যাঁবো ভেরলেন বদল্যার
ভ্যান গঘ মদিগলিয়ানি আরো কে কে
পড়েছি কৈশোরে, কোমর আঁকড়ে তোর
চলে যেত আলো নেশা আলো আরো মিঠে
ঝলমলে বিভ্রমের মাংস মেজাজি রঙে
বড় বেশি সাজুগুজু-করা মেয়েদের নাচে
স্পন্দনের ছাঁদ ভেঙে আলতো তুলে নিত
মোচড়ানো সংবেদন কাগজে ক্যানভাসে

অ্যামস্টারডম শহরের ভিড়ে-ঠাসা খালপাড়ে
হাঁ করে দেখছি সারা বিশ্ব থেকে এনে তোলা
বিশাল শোকেসে বসে বিলোচ্ছেন হাসি-মুখ
প্রায় ল্যাংটো ফরসা বাদামি কালো যুবতীরা
অন্ধকার ঘরে জ্বলছে ফিকে লাল হ্যালো
এক কিস্তি কুড়ি মিনিট মিশনারি ফুর্তির ঢঙে
পকেটে রেস্ত গুনে পুরোনো বিতর্কে ফিরি
কনটেন্ট নাকি ফর্ম কোনটা বেশি সুখদায়ী
তাছাড়া কী ভাবে আলাদা এই আবসাঁথ ?
যুবতী উত্তর দ্যান, শুয়েই দ্যাখো না নিজে
এই একমাত্র মদ যা বীর্যকে সবুজ করে তোলে।

ম্যালেরিয়া

দেখলি তো অবন্তিকা
মশা বধুরাও তোর
প্রেমিকগুলোর রক্ত চেনে!
মেঝেয় ছড়ানো তোর
গুঁড়ো গুঁড়ো মুখচ্ছবি
উড়িয়ে পড়েছে সটকে
তোর যত পার্টটাইম
সুবেশ ডিউড দল ।
জ্বরদেহ চাইছে রে
জড়িয়ে ধরুক তোর
গা-ময় ছড়ানো শীত
নিভিয়ে ফেলুক কেউ
তাপের স্হানিক নিম
শুকনো ঠোঁটের শ্লেষে
যা তুই চিরটাকাল
আমারই জন্য শুধু
রাখলি ঘুমের ভানে--
এরম ব্যবস্হা ভালো
অন্তত তাহলে শুধু
আমার কাছেই পাবি
জ্বরের বিকল্প রোগ।

শরীর সার্বভৌম

জরায়ুটা বাদ দিয়ে অমন আনন্দ কেন অবন্তিকা
তাও এই গোরস্হানে দাঁড়িয়ে গাইছিস তুই
মৃত যত প্রেমিকের গালমন্দে ঠাসা ডাকনাম
যারা কৈশোরে তোর বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে
ভুতুড়ে কায়দায় ঝুঁকে প্রেম নিবেদন করেছিল ?
তারপর তারা সব একেএকে লাৎ খেয়ে বিদেয় হয়েছে
অন্য যুবতী ফাঁসতে যাদের জরায়ুপথ বীজ শুঁকলেই
কয়েক হপ্তায় ফুলে ওঠে। সেসব মহিলা কিন্তু আনন্দই পেতো
এই মনে করে যে দেহটা তো সার্বভৌম ; মন বা মনন নয়,
মন না চাইলেও দেহে খেলে যায় ওগরানো তরল বিদ্যুত
যা কি না ভালো খারাপের ঊর্ধ্বে। ঠিকই বলেছিস তুইও
শরীরই সার্বভৌম...


প্রিয়াংকা বড়ুয়া

প্রিয়াংকা বড়ুয়া তোর
ঠোঁটের মিহিন আলো
আমাকে দে না একটু

ইলেকট্রিসিটি নেই
বছর কয়েক হল
আমার আঙুলে হাতে

তোর ওই হাসি থেকে 
একটু কি নিভা দিবি
আমার শুকনো ঠোঁটে

যখনি বলবি তুই
কবিতার খাতা থেকে
তুলে দিয়ে দেব তোকে

আগুনও আছে নাকি
তোর দেহে কোনো খাঁজে
চাইতে বিব্রত লাগে

জোনাকির সবুজাভ
আলো থাকলেও চলে
দে না রে একটুখানি

ঠোঁট যে শুকিয়ে গেছে
প্রিয়াংকা বড়ুয়া দ্যাখ
কবিতা লেখাও বন্ধ

তোর দেয়া কবেকার
অন্ধকারে এখনও
হাতের আঙুল ডুবে

উৎসব

তুই কি শ্মশানে গিয়েছিস কখনও অবন্তিকা ? কী বলব তোকে !
ওহ সে কী উৎসব কী আনন্দ, না দেখলে বুঝতে পারবি না--
পাঁজিতে পাবি না খুঁজে এমনই উৎসব এটা । কফিতে চুমুক দিই।
আগুনকে ঘিরে জিন্স-ধুতি-প্যান্ট-গেঞ্জি মেতে আছে ননস্টপ
মিচকে আগুন তেড়ে নাচছে আনন্দ খেয়ে, ধোঁয়ার বাজনা
শুনে কাঁদো-চোখে যারা সব অংশ নিতে এসেছে তারাও মজা
শেষে শেয়ার বাজারে কী উঠল কী নামল আবার ট্যাকসি
ধরে ছোটো নিরামিষ কেনাকাটা পুরুতের দেয়া লিস্টি মেনে--
চলিস শ্মশানে কাঁধে চিপেস্ট পালঙ্কে শুয়ে লিপ্সটিক মেখে...
নিয়ে যাব একদিন সবাই প্রেমিক মিলে কাঁধের ওপরে ডারলিং...

তোর সুগন্ধ, মুখপুড়ি


ঠিকই বলেছিলি, মুখপুড়ি, থাকুন না সঙ্গে সবসময়, কোঁকড়া দুর্গন্ধ হয়ে
দেহের নৌকো জুড়ে, আগাপাশতলা, নোনা বাঁকে মাছেদের অপলকা ঝাঁকে
কোথাও অ্যাড্রেনালিনে নীল তাঁতে বোনা গোড়ালি-গন্ধকে মাখা ভিজে-নাচ
চামড়ায় মরে-যাওয়া জং-ধরা হাঙরের মিষ্টি হাঁ-মুখ ভরা খিলখিল আলো
খুঁজুন না যা চাইছেন, ভিনিগারি ঘামের রোদ্দুর, গ্রন্হিল জ্বরের নিঃশ্বাস
ছানাকাটা দুধেল উত্তাল, তাও হরমোনের তরল বারুদে তিতকুটে
বলেছিলি তুই, প্রেম ? ছ্যাঃ, সুগন্ধ তো বানানো নকল তার সাথে, ডারলিং
মাংসের মেদের মজ্জার আত্মীয়তা নেই। পেতে হলে শুধুই দুর্গন্ধ নিতে হবে
যা তোর একান্ত আপন, বলেছিলি। চারিপাশে বাতাসের নিভাঁজ জারকে
তোর ওই ঘোষণা উড়ছে: সি ইউ... সি ইউ... সি ইউ... সি ইউ...

ফেলে গিয়েছিস তোর লনজারি টপ জিন্স বক্ষবন্ধনী হাইহিল। কই তোর
দুর্গন্ধ কোথাও তো নেই মুখপুড়ি ; ফেলে-যাওয়া কিছুতেই নেই। সবই
ভিনিভিনি খুশবু মাখানো। যতক্ষণ ছিলি, তোর গা থেকেও ওই একই
পারফিউম উড়েছে, বানানো নকল, তোরই মতন মুখপুড়ি, কথার
ফেনানো জালে টোপ বেঁধে যা তুই ফেলেই চলেছিস প্রতিরাত প্রতিদিন।
তাহলে ফালতু তোর সি ইউ...সি ইউ.. ডাক হাতছানি উদোম ইশারা।

শুদ্ধ চেতনার রহস্য

ঠিক আছে, লাফাও
অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম কাচের জানালা খুলে কুড়ি তলা থেকে
বাতাসে ঝাঁপাও তুমি টাঙাইল আঁচল উড়িয়ে
শূন্যে ভাসবে কালো ঢাল এলোকেশ
দু পায়ে আচেনা নাচে পৃথিবীর রঙিন মাটিতে
নেমে এসো তুমি
তখন খামচে দেখো হাওয়ার শরীর কীরকম
খেলবে তোমাকে নিয়ে ওলোট-পালোট
আমার পায়ের কাছে পড়ে তুমি ছত্রখান হও
খণ্ড-বিখণ্ড হাড় থ্যাঁতা মাংস নাড়িভুঁড়ি সব একাকার
ঠোঁট যোনি উরু নাভি পাছা স্তন আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে
সৌন্দর্য বিমূর্ত ক্বাথে মাছির খোরাক হবে তুমি

সব জড়ো করে তবু তুমি নও
তুমি সে-সময়ে রৌদ্রে ভাসমান
বুঝেছিলে মিথ্যে এই প্ররম্ভিক অধঃপতন ।

২১ আষাঢ় ১৩৯২

শিল্পোন্নয়ন

এ কী তুমি এইখানে পাগলাগারদে
পায়েতে শেকলবাঁধা নেয়ারের খাটে
উদোম উলঙ্গ শুয়ে আছো চুলে জট
নোংরা নক বেড়ে গেছে দুচোখে ঢুলুনি
সারাঘর বমি মুত পায়খানা ভরা
ভাতমাখা এনামেল থালা এককোণে
শরীর ধোওনি জলে নেমে কতদিন
চেনাই যায় না এককালে পাঁচতারা
হোটেলে নেচেছ নাভি নিতম্ব কাঁপিয়ে

আরেকবার সুস্হ হও শুভ্রা রায়
নাচব সকলে তুর্কি গাঁজা-ভাঙ টেনে
হাড়িয়া মহুল খেয়ে ফিরিঙি আদলে
উঠে এসো সুর্মা চোখে লুপুঙগুটুতে
বেবাক দুনিয়া যায় জাহান্নমে যাক ।

২১ শ্রাবণ ১৩৯২

বিজ্ঞানসন্মত কীর্তি

ফ্যান টাঙাবার ওই খালি হুক থেকে
কন্ঠে নাইলন দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়ো
কপাট ভেজিয়ে দরোজার চুপিসাড়ে
উঁচুতানে রেডিও চালিয়ে তাড়াতাড়ি
শাড়ি শায়া জামে খুলে টুলের ওপরে
দাঁড়িয়ে গলায় ফাঁস-রশি পরে নিও
সারারাত অন্ধকারে একা ঝুলে থেকো
চোখ ঠিকরিয়ে জিভ বাইরে বেরোনো
দুপাশে বেহঁশ দুই হাত আর স্তন
জমাট ষোড়শি শূন্য পায়ের তলায়
পৃথিবীর ধরাছোঁয়া ছাড়িয়ে যেখানে
বহু পুরুষের ঠোঁটে আদর খেয়েছ
সে-শরীর ছুঁতে ভয় পাবে তারা আজ

দোলো লাশ নামাবার জন্য আছি আমি ।

১৯ শ্রাবণ ১৩৯২

সুফিয়ানা

এ কেমন ক্রিমতোলা বাংলায় কথা কোস তুই
যে ভেলকিবাজ রোদের ভয়ে ঝরে পড়া শিউলিফুলগুলো
পাখিদের রোমান্টিক গানকে নার্ভাস করে তোলে
যেন হাঁ-মুখে নার্সের থার্মোমিটার

দোলের দিন ডেকে-ডেকে হাঁপানি ধরে গেল কোকিলটার
আসলে তোর কেন মতামতহীন হবার আধিকার নেই
একটা হ্যাঁ-এর সঙ্গে একটা না মিশিয়ে তখনই জানা যায়
যখন প্রেমের ক্লাইম্যাক্সে মাটির সঙ্গে আমি যোগাযোগ হারাই
শাঁতার কাটবার মতন তোর গভীর টলটলে সংলাপে
যে-দিন জিরে-জিরে করে কুচোনো বিদ্যুতের সবুজ জোনাকি
ঘোড়াহিন রেসের মাঠে তোকে ঘিরে বেশরম হ্রেষা হয়ে উড়বে
ইরানি হরফে তোকে প্রেমপত্র লিখে রাখবে বটগাছের শেকড় ।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০১

দালাল

এ কী কুলনারী তুমি জাহাজঘাটায় দেহ বেচতে এসেছো
লুঙি-পরা পানখোর দালাল রাখোনি
সাদাপোষাকের কবি শরীর ঝাঁঝরা করে দেবে
শাঁখা-নোয়া খুলে তারা দুহাত হিঁচড়ে টেনে তুলবে লরিতে
লকাপে ল্যাংটো মাঝরাত.....সে-সময়ে গেয়ো তুমি রবীন্দ্রসংগীত

ছিহ কুলখুকি তুমি সবায়ের আদর কুড়োও
যারতার সাথে গিয়ে যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ো
চারিদিকে কটাচোখ ধ্রুপদী জোচ্চোর সব নজর রাখছে মনে রেখো

আমি তো স্ট্রেচারবাহী কিছুই করতে পারব না
হয়তো টিফিনবাক্সে এনে দেব রুটি আর আলুজিরে ভাজা
গান শোনাবার মাঝে ঝুঁকে-ঝুঁকে পয়সা কুড়োবো
ভোর হলে গঙ্গার পাড়ে তুমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বমি কোরো
হাসপাতালেতে পাবে বেডপ্যান গ্লুকোজ বোতলে জল
তালচিটে বিছানায় পাশে শোয়া ঘুমন্ত কুকুর ।

১৭ অঘ্রাণ ১৩৯২

বজ্রমূর্খের তর্ক

আজকে শুক্কুরবার । মইনে পেয়েচি । বোধায় শরতকালের পুন্নিমে ।
পাতলা মেঘের মধ্যে জোসনা খেলচে । মাঝরাত । রাস্তাঘাট ফাঁকা ।
সামান্য টেনিচি তাড়ি । গাইচি গুনগুন করে অতুলপ্রসাদ ।
কোথাও কিচ্ছু নেই হঠাত নেড়ি-কুকুরের দল
ঘেউ ঘেউ করে ওঠে । তাড়া করে । বেঘোরে দৌড়ুতে থাকি ।
বুঝতে পারিনি আগে । রাজপথে এসে হুঁশ হয় ।
মাইনেটা পড়েচে কোথাও হাত থেকে । কী করে ফিরব বাড়ি ?
কেধ তো বিশ্বাস করবে না । ভাববে খেলেচে রেস,
গিয়েচে মাগির বাসা, বন্ধুদের সাথে নিয়ে বেলেল্লা করেচে ।
বন্ধুবান্ধব কেউ নেই । রেসও খেলি না কতকাল ।
অন্য স্ত্রীলোকের খোলা-বুকে হাত শেষ কবে দিয়েচি যে
ভুলে গেচি । জানি না বিশ্বাস করে না কেউ কেন ।
আমার তো মনে হতে থাকে, যা করিনি সেটাই করিচি বুঝি ।
যা কইনি, সেকথা বলিচি । তাহলে এ পুন্নিমের মানে ?
কেন এই মাইনে পাওয়া? কেন গান ? কেন তাড়ি ?

আবার ঢুকতে হবে রামনোংরা গলির ভেতরে । নির্ঘাত কুকুরগুলো
গন্ধ শঁকে টের পাবে । ছেঁকে ধরবে চারিদিক থেকে ।
যা হবার হয়ে যাক । আজ শালা এস্পার কিংবা ওস্পার ।

২৭ আষাঢ় ১৩৯২

প্রিয়তমার নিলাম

বিশল্যকরণী বলে কিছু নই শেষ ওব্দি লক্ষ্মণের লাশ
রাবণের মর্গে পড়ে ভেটকে উঠেছিল
ভিড়ের দড়ির টানে
খর্ব অপুষ্ট জরাক্লিষ্ট মুখে কাঠের জগড়োনাথো ফিরেছে স্বস্হানে
ওরকম মুখ বুজে থাকব বলে আসিনি এখানে আমি
গন্ধমাদন কাউকে ল্যাজ তুলে আনতে হবে না
কেননা ভূমিষ্ঠ হয়েই মাটি কামড়ে ধরেছি কষদাঁতে
শীতকালে কেন ফিকে ন্যাপথালিনের গন্ধ মানুষীর নিশ্চুপ স্তনে
যে-মুখে রেখেছি হুল লেহনে বোটকা স্মৃতি বৃক্কে নেমে যাবে
ফেরারির অগ্নিচোখ অর্জন করেছি শ্রমে
বল্লম ধরার আগে আঙুলের খাঁজ হেজেছিল
বাতাসে বাবরি উড়বে চ্যাঁচাব দুখাঁধ তুলে
বুকের ওপরে দুই হাতা ঘুষি আছড়ে বলব বারবার
অগ্নি সংযোগ করো শান্তিভঙ্গ হোক ছারখার করো
ক্রন্দনরত কারা গুঁড়ি মেরে এলোচুলে ঘোর অন্ধকারে
শানাচ্ছে কুখরির ডগা উল্কাপাথরে ঘষে একটানা সুরে
টিকটিকিদের ল্যাজ আছড়াবার ক্ষীণ শব্দ
ঝড়ের ধুলোয় নাকে জ্বালা ধরে
মুখেতে রুমাল বেঁধে নিঃশব্দে ঘোড়া থেকে নামি

যে-রকম কথাছিল আবার এসেছি আমি নিলামের দাক দিতে
এইবার সবচে বেশি দাম ধরে দেব
মাত্র দু-পাঁচশো নয় কিংবা মাসখানেকের জন্যে ঘানির মজুরি
তুমি ধ্বংসধ্বনি খুকি
ভবিষ্যৎ থকথকে হারামরক্তে ডুবে আছে ।

১১ বৈশাখ ১৩৯২

বাজারিণী

য়িশ বছরের পর এলে তুমি । তোমার আদুরে ভাষা পালটে গিয়েছে
বারবার । জানি তুমি শুভ্রা রায় নও । ওরকমভাবে একঠায়ে
সারাদিন মাথানিচু করে বসে থাকো । আমার চুলেতে পাক 
ধরে গেছে । শেখাও তোমার ভাষা এইবার । দেখি কীরকম
ঠোঁট নড়ে । না্ভি খিল-খিল কেঁপে হেসে কুটি হয় । যুবকেরা
ঘিরে থাকে বহুক্ষণ তোমায় আড়াল করে । কিসের কথা যে এতো হয়
কিছুই বুঝি না । অন্তত কুড়ি বছরের ছোট হবে তুমি ।
জানি না কাদের জন্যে অন্ন আনাজ সংগ্রহে আজ এলোচুলে
নেমেছ বাজারে । লুবাতাসে রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাবে শেষে ।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কী্যাবে বাসায় ফেরো ? ওই যুবকেরা
ছাতা ধরে মাথার ওপরে? বাড়ি ফিরে ভিজে চুল বোধহয় শোকাও একা ।
সকালে কি রান্না করে আসো ? সেগুলোই রাতে খাও?
শরীর খারাপ হলে কারা দ্যাখে? কে কাপড় কাচে?

আমার সন্ত্রাসবাজি রাহাজানি লুটমার থেকে জানি তোমার দুনিয়া
আলাদা একদম । তোমাকে নিজের নাম বলতে পারি না আমি ।
যদি ঘেন্না করো । জেনে যাও কী-কী করি, ভয় পাও ।
কতদিন ইচ্ছে হয় সামান্য ইশারা করে আমার দলের লোকেদের
তোমাকে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিতে বলি ।
দাঁড়াবে আমার সামনে এসে তুমি । বলবে, 'আমাকে যেতে দিন' ।

২৮ আষাঢ় ১৩৯২

বাকদানো

তোদের তো বলিছিলুম বাবা কিন্তু তোরা গা কল্লিনে
তবলা-বাজিয়ের কানে আওয়াজের আগেই য-ভাবে বোল ফোটে
অ্যাগবারে তেমনিই য-দিকে মাথা করে শুই সে-দিকেই কেন সূয্যি ওঠে জানিনা 

আমাদের যুধিষ্ঠির, সেই যে, পাশাখেলার গ্র্যাণ্ডমাস্টার
বেতলা ফরেস্টে দ্রোণাচার্যের সেমিনারে অর্জুনকে ধাতানি দিয়েছিল
'পা নাচিয়ে কক্ষুনো নাচবিনে, সব্বোদা বাতাস নাড়িয়ে নাচবি'

তোদের ওদিকটায় তো সভ্যতা মানেই শহর, কী, ঠিক বলিচি না?
জ্বরের ঘোরে-বলা প্রলাপগুলো খানিক পরেই দেখবি তথ্য হয়ে গেচে---
কাব্যি করে বলতে হয়, 'ওগো এ যে গোঁজবঙ্গের পালতোলা শামুক ভাসিয়েচো'

যখুন দুঃখকষ্ট চেপে যেতে শেখার বয়েসে পৌঁছোলুম, অ্যাঁ
ঘুমন্ত অবস্হায় যে-পাখিটা বিপদে পড়েচে তার মাঝরাতের ডাকে
দেহের বিতর্কিত জায়গায় হাত দিয়ে ফেলার ভয়ে আমি তো থরহরি

বিড়ির শেস-ফুঁকের আয়েস টেনে মেয়েটি যখুন পোনয় নিবেদন কল্লে
একাধটা অঠ্গকে বিশ্বেস করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল রে
তা, সবাই তো আর সবায়ের ব্যথার গন্ধ টের পায় না

এ-বাড়ির ঘড়িগুলোকে দ্যাখ, বড্ড অধীর, সবুর করতে পারে না;
কী করি ? আমি তো পাহাড় থেকে ঝাঁপ-দেয়া ঝর্ণার ফূর্তি দুমুঠোয় পুরে
মৌমাছিদের রানিটাকে নিয়ে বরযাত্রীদের সঠ্গে চুপচাপ কেটে পড়লুম...

১১ আগস্ট ২০০০

পরবর্তী সর্বনাশ

পাহাড়ের বাঁকে ট্রেন দেখা গেছে যাও
এইবালা ঘুমে অচেতন গৃহস্হালি
ফেলে ছোটো মাথা পেতে দিতে রেলপথে
এরপর রাতে আর কোনো ট্রেন নেই
পিষে কেটে ছটুকরো হয়ে যাও তুমি
শাঁখা পলা গুঁড়ো হয়ে মিশুক মাটিতে
তলপেটে রাখা ভ্রুণ নিসর্গে ফিরুক
ত্রেনের পয়ার ছন্দে নিজেকে ভুলিয়ে
তোলপাড় করে দাও সুখের সংসার
ভয় দুঃখ শোক গ্লানি দিয়ে বন্ধ করো
অমল আনন্দ শেষ হোক ভাঙা ঘুমে

দুহাত বাড়িয়ে সারারাত রেলপথ
শিশির উপেক্ষা করে তোমার শরীর
পাবে বলে ঠায় জেগে আছে সন্ধে থেকে

২০ শ্রাবণ ১৩৯২

স্হানিকতা

যে-মানুষীর হনুমানের ঢঙে চার হাতে জড়িয়ে ধরার তল্পিতল্পা ছিল
তার সঙ্গেই তো ধুপকাঠি-গেঁথা পাকা-কলার কুচকুচে পিঁপড়ে পাড়ায়
অন্ধকার দিয়ে নিজের বদূরত্বটুকু বেঁধে রাখতে চাইছিলুম

ওকে পেয়েছিলুম ছোটবেলার চান-করার হল্লায় তৈরি বিয়েবাসরে
মেঘ থেকে বৃঢ়্টিফোঁটা খুঁটেখুঁটে ঘাম জমিয়ে তুলত মুখময়

গৌড়ের সেসব ভুলভাঙা রাজপথ তো এখন অচেনা খেতসবুজ গ্রাম
মিটকি মেরে পড়ে আছে আলোর ঝলকানিতে টোলখাওয়া বিদ্যুতে
কেননা ইতিহাসে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে ঘা খেয়ে ওর মাথা ফেটে গেছে

হয়তো একদিন তিলোত্তমাদের ফেলে দেয়া তিলগুলো জড়ো করে ফেলবে
আর চিতার ওপর হাসতে-হাসতে উঠে বসবে আগুনের মুখোশপরা গৌড় 

কলকাতা ৬ আগস্ট ২০০১

উৎপাদন পদ্ধতি


বিদ্যুতের তার ঝড়ে ছিঁড়ে ঝুলে আছে
এতো কী ভাবছো বাজে সারাদিন ধরে
যাও ছুঁয়ে দাও গিয়ে মাথা ঠিক রেখে
মুঠোর ভেতরে নাও তীব্র জ্যোতিরেখা
একটা ঝলকে স্নেহ রক্তে ঢুকে যাবে
দেখে নাও মাটিতে পা থাকা কত ভুল
মাটি ও তোমার মাঝে দরকার ছিল
হাকুচ আড়াল কোনো হিজড়ে তৈজস
কীরকম জ্বলে ওঠো দেখতে চেয়েছি
শাদা ত্বক এক লহমায় পুড়ে কালো
চোখ থেকে চাউনি উধাও জানুদেশ
থিরথির কেঁপে ছিটকে ঘাসের মধ্যে
পড়ে তুমি বারকয় নড়েচড়ে স্হির
শেষবার তারপর ঝুঁকে চুমু খাবো ।

২১ শ্রাবণ ১৩৯১

ধনতন্ত্রের ক্রমবিকাশ

শেষরাতে পাশ থেকে কখন উঠেছ
চুপচাপ আলমারি ভেঙে কী অ্যাসিড
ঢকঢক করে গিলে মরছ এখন
আলজিভ খসে গেছে দুগালে কোটর
মাড়িদাঁত দেখা যায় কষেতে বইছে
গাঢ় ফেনা হাঁটুতে ধরেছে খিঁচ ব্যথা
চুল আলুথালু বেনারসি শাড়ি শায়া
রক্তে জবজবে মুঠোতে কাজললতা
শোলার মুকুট রক্ত-মাখা একপাশে
কী করে করেছ সহ্য জানতে পারিনি
শুনতে পাইনি কোনো চাপা চীৎকার
তবে কেন সায় দিয়েছিলে ঘাড় নেড়ে
আমি চাই যেকরেই হোক বেঁচে ওঠো
সমগ্র জীবন থাকো কথাহীন হয়ে

২২ শ্রাবণ ১৩৯১


Malay Roychoudhury

মলয় রায়চৌধুরী

Poet

মলয় রায়চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ২৯ শে অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা তিনি সচেতনভাবে পরিহারের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতাটির জন্য মলয় অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং ৩৫ মাসব্যাপী কোর্ট কেস চলে। তার ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১০টি সমালোচনা গ্রন্থ এবং কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৩ সালে অনুবাদ সাহিত্যে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।