মেয়েদের পিরিয়ড ও মন

img

অনেক সময় ছেলেদের বলতে শোনা যায় যে, মেয়েদের বুঝতে পারা অনেক কঠিন, আবার অনেকেই বলে থাকেন স্বয়ং বিধাতাও নারী মন বুঝতে পারে না। অন্যদিকে, মেয়েদের ক্ষেত্রে হয় কি তারা এক মুহূর্তে অনেক উচ্ছ্বাসিত অনুভব করেন, আবার পরমুহূর্তে তাদের মন রাগ আর বিষন্নতায় ভরে উঠে। প্রত্যেকটি নারী প্রায় প্রতি মাসেই এমন রোলার কোস্টার ড্রাইভের মত মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের কারন কি হতে পারে!

এ পরিবর্তনের প্রধান কারণ হরমোন। হরমোনাল পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে নারীর মানসিক পরিবর্তন সমূহকে মূলত কয়েক ভাগে ভাগ করা যায় যেমন, পিউবার্টি, মেন্সট্রুয়েশন, প্রেগন্যান্সি, প্রি-মেনোপোজ বা মেনোপোজ, মেনোপোজ পরবর্তী সময়।

পিউবার্টি বা বয়োসান্ধকালীন সময়ে একজন মেয়ের পিরিয়ড শুরু হয়। সাধারণত ৯-১৪ বছর বয়সের যেকোন সময়ে মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হতে পারে এবং পিরিয়ড শুরুর পর থেকে মেনোপোজের আগ পর্যন্ত সময়কে মেন্সট্রুয়েশনকালীন বা পিরিয়ড চলাকালীন সময় বলা হয়।   

হরমোন হচ্ছে শরীরের একধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা নির্দিষ্ট কিছু গ্রন্থির মাধ্যমে নিঃসৃত হয়ে রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌছে মানবদেহে শারীরিক, মানসিক এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের প্রায় প্রত্যেকটি কাজই বলতে গেলে হরমোন নিয়ন্ত্রিত যেমন, ঘুম, আহার, চিন্তা-চেতনা, বৃদ্ধি, চলাচল, যৌন ক্রিয়া, রেচন ক্রিয়া, কর্ম উদ্দীপনা ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রধাণ তিনটি হরমোন যা নারীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম তা হল- ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্ট্রন, টেস্টোস্টেরন। এই তিনটি হরমোন নারী এবং পুরুষ উভয়ের মধ্যে বর্তমান কিন্তু তন্মধ্যে টেস্টোস্টেরন পুরুষের মধ্যে বেশী এবং নারীদের মধ্যে কম থাকে আর ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্ট্রন নারীদের মধ্যে বেশি কিন্তু পুরুষের মধ্যে কম থাকে।
প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট দিনে ভ্যাজাইনা দিয়ে রক্তের সাথে এন্ডোমেট্রিয়ামের অংশ যাওয়াকে বলা হয় পিরিয়ড বা মেন্সট্রুয়েশন বা রজঃস্রাব। সাধারণত পিরিয়ড ৩-৭ দিন স্থায়ী হয়ে থাকে। নারীভেদে এর স্থায়িত্ব ভিন্ন হয় এবং তা কমপক্ষে ৭ দিন হলে নরমাল বলে ধরে নেয়া হয়। প্রথম পিরিয়ডের শুরু থেকে পরবর্তী পিরিয়ডের আগ পর্যন্ত সময়কালকে রজঃচক্র বা মেন্সট্রুয়াল সাইকেল বলা হয়। রজঃচক্র নারীভেদে ২৮ দিন বা ২৮-৩২ দিনের মধ্যে হতে পারে। হরমোনাল পরিবর্তনের সাথে মানসিক পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে একে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে।

এই হরমোনগুলো একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ওঠা-নামা করে। মানবদেহে এই হরমোনের মাত্রা নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে যেমন চিন্তা-চেতনা, পারিবারিক জীবন, কর্মক্ষমতা, ঘুম, খাবারের প্রতি আগ্রহ, ক্ষুধা, শারীরিক সুস্থতা ইত্যাদি। 

যদি একজন মেয়ের রজঃচক্র ২৮ দিনের হয়ে থাকে তবে সে হিসেবে প্রথম ১-৭ দিনকে ধরে নেয়া হয় স্প্রিং বা বসন্ত অর্থাৎ যে মুহূর্তে পিরিয়ড শুরু হয় বা চলতে থাকে। এই ধাপে ইস্ট্রোজেন এর মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আগে বলে রাখি ইস্ট্রোজেন হরমোনকে ব্রেইনের সার বলা হয়ে থাকে। এটা এমন একটি হরমোন যা আপনার জীবনকে ড্রামাটিক ভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম। পিরিয়ড পূর্বকালীন ব্যথা, ক্লান্তির পর এই ধাপের শুরু হওয়ায় ব্যক্তি অনেক ফুরফুরা ও সতেজ ফিল করেন। এ সময়টাতে মেয়েরা অনেক সাহসী, কর্মক্ষম হয়ে থাকে এবং তারা শপিং করতে, অনেক কথা বলতে, আনন্দ করতে, ঘুরাঘুরি করতে, নতুন কিছু জানতে ও বুঝতে, সাজতে, মেকাপ করতে পছন্দ করে থাকে এমনকি সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও এ হরমোনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এ হরমোনের প্রভাবে কিছুটা ক্ষুধামন্দ হতে দেখা যায় অর্থাৎ খাবার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। 

অন্যদিকে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অধিক বেড়ে যাওয়ায় পুরুষদের প্রতি এট্রাকশনও বেড়ে যায় এবং যৌন মিলনে আগ্রহ বাড়ে। এমনকি এই হরমোনের প্রভাবে হিংসা এবং কম্পিটিটিভ অনুভূতি বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে এই ধাপে মেয়েরা অনেক প্রফুল্ল, সাহসী ও কর্মউদ্দীপ্ত থাকে এবং তাদের মেমোরি শার্প হয় এবং ব্রেইন এক্টিভিটি বৃদ্ধি পায়।  

পরবর্তী ধাপ শুরু হয় অষ্টম দিন থেকে ডিম্বপাত পর্যন্ত অর্থাৎ যদি রজঃচক্র ২৮ দিনের হয়ে থাকে তাহলে ৮-১৪ দিনকে ধরে নেয়া হয় দ্বিতীয় ধাপ। এই সময়টাকে গ্রীষ্মকালীন সময়ের সাথে তুলনা করা হয়। এই ধাপেও ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং বাড়তে বাড়তে ১৪ তম দিনে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌছে। প্রথম ধাপে একজন মেয়ের মধ্যে যেসকল ইতিবাচক দিকগুলো দেখা দিয়েছিল তার সবগুলো এই ধাপেও বজায় থাকে, বরঞ্চ অত্যাধিক মাত্রায় থাকে অর্থাৎ মেয়েরা এই সময়টাতে অত্যাধিক ইতিবাচক অনুভব করে যেমন অত্যাধিক আশাবাদী, আত্মবিশ্বাসী, আলাপমুখর, তীক্ষ্ণ স্বৃতিশক্তি, নিজের প্রতি অতি যত্নশীল, রোমাঞ্চের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষন বোধ করা ইত্যাদি। 

আবার ইস্ট্রোজেন হরমোনের উচ্চ মাত্রার জন্য নিজের বাহ্যিক রূপের প্রতি ঘনঘন নিশ্চিত হওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পায় অর্থাৎ রূপ সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং নিজেকে জনসম্মুক্ষে অত্যাধিক আকর্ষনীয় করার প্রবনতা বেড়ে যেতে দেখা যায়। 

আবার এই উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন ব্রেইনের এন্ডোরফিন হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা পেইন-মাস্কিং হরমোন নামে পরিচিত। অর্থাৎ এই হরমোনের প্রভাবে অনেক গুরুতর ব্যাথাও অনেক সামান্য অনুভূত হবে অন্যান্য ধাপ বা দিনগুলোর তুলনায়।
যেখানে উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন হরমোনের অনেক সুবিধা সেখানে একটা চিন্তার বিষয়ও আছে আর তা হল এর ফলে উদ্বিগ্নতা বৃদ্ধি পায় এবং বড় বা ছোট যেকোন  বিষয়েও একজন ব্যক্তিকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে ফেলে। 

অন্যদিকে দ্বিতীয় ধাপে, টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা শেষ দিকে বেড়ে যায়। যখন এই হরমোন বৃদ্ধি পায় তখন আবেগপ্রবনতা, সাহসিকতা, প্রতিযোগীতামূলক আচরণ বৃদ্ধি পায়। যেহেতু টেস্টস্টেরনকে ছেলেদের হরমোন বলা হয় সেহেতু এই ধাপে মেয়েরা নিজেদেরকে ছেলেদের মত ভাবতে পছন্দ করে যেমন, ছেলেদের মত প্যান্ট, শার্ট পরিধান করা, চুল বয়কাট করা, মোটকথা ছেলেরা যা যা করে সেসকল কাজের প্রতি অধিক আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি এটি যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয় সেই সাথে অল্পতে যৌন তৃপ্তি পেতে সহায়তা করে।  

তৃতীয় ধাপ ধরা হয় ডিম্বপাত থেকে পরবর্তী আট দিন বা ২৮ দিনের চক্রের ১৫-২২ তম দিন পর্যন্ত সময়কে। এই সময়টাকে খরা মৌসুমের সাথে তুলনা করা হয়। এই ধাপের মধ্য দিকে ইস্ট্রোজেন আর টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা আকস্মিকভাবে নিচে নেমে আসে যার ফলে অধিকাংশ নারী এই সময়ে পিএমএস (প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম) এ ভোগে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে এটি প্রি-মেন্সট্রুয়াল ডিস্ফোরিক ডিসর্ডারে (পিএমডিডি)রুপ নেয়। ইস্ট্রোজেন হরমোনের হুট করে পতনের ফলে অনেক অস্বস্থি অনুভব হতে থাকে, সাথে ক্লান্তি, বিষন্নতাবোধ হতে থাকে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে এই ধাপের শেষদিকে আবারও ইস্ট্রোজেন হরমো্নের মাত্রা ক্রমাগত কিছুটা বাড়তে থাকে, ফলে পিরিয়ড পুর্বকালীন উপসর্গসমূহ (পিএমএস) কিছুটা কমে আসে।   

এই ধাপের আরেকটা গুরুত্বপূর্ন হরমোন হচ্ছে প্রোজেস্ট্রন হরমোন যা এ ধাপে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এ হরমোনের প্রভাবে একজন নারী অনেক বেশী ঝিমানী অনুভব করেন অর্থাৎ ঘুম ঘুম ভাব, শান্ত, দিশেহারা অনুভব করা, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা, স্বিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, আবার সবকিছু নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবা ইত্যাদি। অন্যদিকে প্রোজেস্ট্রন হরমোন যৌন আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখে। এই হরমোনের মাত্রা যত বাড়ে তত লবনাক্ত বা অধিক মিষ্টিযুক্ত বা তৈলাক্ত খাবার যেমন, ফাস্ট ফুড, আইসক্রিম, মাংস ইত্যাদির প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। কিছু কিছু নারী এই প্রোজেস্ট্রন হরমোনের প্রতি সংবেদনশীল। যেসকল নারী প্রোজেস্ট্রন হরমোনের প্রতি সংবেদনশীল তারা অনেক বেশী বিষন্নতা বা ব্লু অনুভব করে, কারো কারো ক্ষেত্রে এই বিষন্নতা এতটাই মারাত্বক আকার ধারণ করে যে তাদের মধ্যে সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি দেখা যায়, এমনকি তারা খুনের মত অপরাধও করে বসেন। এই হরমোনের প্রতি সংবেদনশীল হন অর্থাৎ যদি মনে হয় যে আপনার সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি আছে তাহলে অতি সত্তর কোন বিশেষজ্ঞ গাইনীর সাথে যোগাযোগ করা উচিৎ।   
২৮ দিনের চক্রের শেষ ছয় দিন বা ২২-২৮ তম দিন। এসময়টাকে ধরা হয় পাতাঝরা শীত মৌসুমের ন্যায়। যেহেতু এ ধাপে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা আবার নিচের দিকে নেমে আসে অনেক বেশী রাগ রাগ অনুভূতি হয়, মন বিষাদে ভরে উঠে, মন মরা মরা লাগে, অস্বস্থি লাগে। ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্ট্রন উভয় হরমোনের মাত্রা যখন হঠাৎ করেই নিচে নেমে যায় তখন তা কর্টিসোল হরমোন বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় ফলে ঘুমের মাত্রা কমে যেতে পারে বা ইনসোমনিয়া হতে পারে, অমনোযোগীতা বৃদ্ধি পেতে পারে, ক্লান্তিভাব হতে পারে আবার মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথার মাত্রা অসহনীয় হারে বেড়ে যেতে পারে সেই সাথে পিএমএস এর উপসর্গসমূহ এ ধাপে মারাত্বক আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু শুধু যে হরমোনের প্রভাবে এসব হয় তা না, এই হরমোনের সাথে আবার খাবার, স্ট্রেস, ঔষধ, অভ্যাসগত প্রভাবও রয়েছে। যেমন অতিরিক্ত লবনাক্ত খাবার, ক্যাফেইন বা চা পিএমএস এর মাত্রা বহুগুন বাড়িয়ে দিতে পারে। 

এ ধাপে যৌন আকাঙ্ক্ষা আবারও বৃদ্ধি পায়, সাথে ঝিমুনিভাব অনেকটাই কমে যায় যেহেতু প্রোজেস্ট্রনের মাত্রা কমে যায়। অনেক বেশী কর্মউদ্দীপনাও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন শুধু হরমোনই কেবল একা দ্বায়ী নয়। যেহেতু শরীর পিরিয়ডের জন্য প্রস্তুতি নেয় তাই নার্ভ এন্ডিং গুলোও উদ্দীপ্ত হয়ে এধরনের অস্বস্থি অনুভূতি বাড়িয়ে দেয় এবং সাথে স্ট্রেস বা অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনও হরমোনের প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। 

একজন নারী হিসেবে আপনাকে প্রতিটা মাসই এমন চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু পুরোপুরি আশাহত না হয়ে বারবার মনে রাখা জরুরী যে, বসন্ত তো সামনেই।


Eprokash Feature

ফিচার

개발 지원 대상