কনসিল্ড

img

আমার এই কাজটা শুরু হয় মূলত ২০১৪’র শেষের দিকে। ছবি তুলেছি কয়েকমাস, কিন্তু তার আগে ট্রায়াল-এররের ফেজ ছিল একটা, সাথে ছিল ভাবনা, ছিল বিশেষ কিছু অনুপ্রেরণা। আমাদের সবকাজই তো একভাবে অসম্পূর্ণ। তো এই কাজটাও যেহেতু অসম্পূর্ণ, তাই হার্ড ডিস্কের কোনায় এতদিন ফেলে রেখেছিলাম।

নাম Concealed ক্যান?! কঠিন প্রশ্ন! আক্ষরিক অর্থে Concealed শব্দের অর্থ হয় লুকানো, অবগুণ্ঠিত। আমার কাজের বিষয়ের বা ব্যাক্তিদের অবগুণ্ঠন তো খুব স্পষ্ট। তাই এটাই উপযুক্ত নাম মনে হয়েছে। এখনো পর্যন্ত প্রত্যেকটা ছবির আলাদা করে নাম দেয়ার বিষয়টা আমি বিস্তারিত ভাবিনি। কিন্তু এটা আমার মাথায় এসেছে। এবং এই ভাবনাটা নিয়ে খেলতে আমার ভালো লাগে। ভবিষ্যতে হয়তো আলাদা করে নাম দেব ছবির। আমি নিশ্চিত না।

 
আর্ট কি? এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। সত্যি কথা হল এই বিষয়টা নিয়ে আলাপ করতে শিল্পী, কিউরেটরদের মতামত জানতে আমি সব সময়ই খুবই উৎসুক। আমি বেশ আগে এনথ্রোপোলোজির একটা বইতে পড়েছিলাম যে, কোন এক আদিবাসী সমাজের ভাষায় আর্ট শব্দটার কোন সমর্থক শব্দ নেই। এর কাছাকাছি যে শব্দটা আছে তার অর্থ দাড়ায় আনন্দ। ব্যপারটা কিন্তু খুব মজার। যেটা আমাদের কাছে আর্ট সেটা তাদের কাছে আনন্দ। আবার আরেকটা আদিবাসী গোত্রের কথা পড়েছি যারা নিজেদের বানানো তৈজসপত্র যেমন হাঁড়িপাতিল সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে, আমরা যেমন করে একটা ছবি সাজাই। এবং ঐ সাজানো হাড়ি পাতিল তাদের কাছে ধ্রুব কোন বিষয় নয়। গোত্রের অন্যান্য সদস্যের স্বাধীনতা আছে সেই হাড়ি পাতিলের নির্মান নিয়ে মতামত দেয়ার এবং সেই অনুযায়ী সেটাকে নতুন কোন আকার দেয়ার। অর্থাৎ ওদের আর্ট যেটা সেটা সবার অংশগ্রহণমূলক এবং গণতান্ত্রিক। ওদের এই আর্টের ব্যাখ্যা বা ব্যবহার রাজসভার শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে একবার ভাবেন। কি হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে! অনেকে বলেন আর্ট হচ্ছে সেটা যেটার কোন ফাংশনালিটি নেই। এবং এই যুক্তিতে তাদের কাছে আর্কিটেকচার কোন আর্ট না, কারণ একজন প্রকৌশলী নির্মান করেন প্রধানত ফাংশনালিটির কথা মাথায় রেখে। সেই বিবেচনায় তাহলে কুসামার কাজ আর্ট না, কারণ কুসামা তার কাজকে আর্ট থেরাপি বলেন। কারণ তার আর্টের একটা থেরাপিউটিক ফাংশন আছে। আমি মনে করি আর্টের সঙ্গায়ন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণগুলো বেশ কন্টেক্সট স্পেসিফিক, সময় এবং ব্যক্তি নির্ভর এবং এটা হতেই পারে। সত্যি কথা হল আমার কাছে আমার আর্ট আমার বেঁচে থাকার কারণ। আবার একেক সময় আমার ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আর্টের নতুন ব্যাখ্যা করি, আবার ভাঙ্গি।  “Fleeting moment” এর মত আমার কাছে আর্টের ব্যাখ্যারা সব আসছে যাচ্ছে! কোনটাই ঠিক স্থায়ী ব্যাখ্যা না।    

অনেকে আর্টের ভূমিকা, শিল্প, শিল্পীর দায়িত্বের কথা বলেন। আমার এই কথাটা খুবই হাস্যকর লাগে। মনে হয় কোন বিশেষ এক সময়ে, বিশেষ এক আর্ট মুভমেন্টের রিডিং তারা আশেপাশের সকল শিল্পী এবং শিল্পীর কাজের উপর আরোপণ করতে চান। নয়তো তারা একজিস্টিং ওয়ার্ল্ড অর্ডার সম্পর্কে ঠিক ওয়াকিবহাল নন। সমাজ যত ধরনের পেশাজীবীদের নিয়ে তৈরি তাদের মধ্যে শিল্পীদের আমি সবচাইতে নাজুক, সবচাইতে কম ক্ষমতাশালী মনে করি। শিল্পীর, শিল্পর সমাজ পরিবর্তনের ক্ষমতা আমি দেখিনা, এই ক্ষমতা তাদের কোন কালে ছিল কিনা সেটা নিয়েও আমি সন্দিহান। সেই বিবেচনায় আমি বরং রাজনীতিতে বিশ্বাসী, পলিসিতে বিশ্বাসী। এগুলোর ক্ষমতা আছে মানুষের জীবনে সত্যিকার, পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনার। মানুষের জীবনে সত্যিকার, পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনার ভিত্তিতে চিন্তা করলে আর্ট আমার কাছে অনেক কিছুর তুলনায় কম মূল্যবান, অনেক কম প্রভাবশালী মনে হয়। ব্রাহ্মণীয় কায়দায় শিল্প বা শিল্পীর দিকে ঠিক তাকাতে পারিনা সবসময়। একজন শিল্পীর সমাজের প্রতি দায়িত্ব ঠিক ততখানি মনে করি যতখানি আর একজন শিক্ষিত নাগরিকের। কিন্তু একই সাথে আমি আবার বিশ্বাস করি আর্ট মানুষের মহত্তম প্রকাশগুলোর একটা। কিন্তু তারপরও আর্টকে একটা গণতান্ত্রিক বিষয় মনে করি। সবার অধিকার আছে একে ইচ্ছামত চর্চা করার, ইচ্ছামত ব্যবহার করার। তাছাড়াও আমি যে মাধ্যমে কাজ করি, অর্থাৎ ফটোগ্রাফি তার বৈশিষ্ট্য গুনেই আমাকে আসলে আর্টের গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করতে হয়।

আমার কাজের রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলাপের একটা অদ্ভুত উভয়সংকট দেখতে পেলাম। আমি যেহেতু নারীবাদ নিয়ে পড়ি, লিখি; দেখতে পাচ্ছি অনেকেই আমার কাছে আমার কাজের নারীবাদী ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন। এটাও আইডেন্টিটি পলিটিক্সের একটা দিক হয়তো; অতীত কাজের ভিত্তিতে কিছু বিশেষ মানুষ থেকে কিছু বিশেষ বয়ান প্রত্যাশা করা। কিন্তু এই প্রথম ছবির রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সংকীর্ণতা এত গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম। যে মুহুর্তে আমি আমার কাজের রাজনৈতিক দিক বা ব্যক্তিগতভাবে আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে আলাপ করতে বাধ্য হচ্ছি ঠিক সেই মুহুর্তে দেখতে পাচ্ছি সৃষ্টিশীল সত্ত্বা হিসেবে আমার স্ট্রাগল, সৃষ্টির আনন্দ চোখের আড়াল হতে হতে প্রায় অদৃশ্য হতে  যাচ্ছে। যে কোন কিছু সৃষ্টি করাটা কি কেবল আনন্দ পাবার বিষয় হতে পারেনা? একটা ফর্ম, একটা মাধ্যমে ডুবে গিয়ে কিছু সৃষ্টি করার চাইতে আনন্দের আর কি আছে? সেটা কোন বিবেচনায় রাজনৈতিক আলাপের মত গুরুত্বপূর্ণ না? মাঝে মাঝে এই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রত্যাশাটা আমার খুবই আরোপিত বিষয় মনে হয়। আমি বা যে কোন শিল্পী, আলোকচিত্রি বা যেই হন সমাজের বাইরের কেউ নন। আমাদের চারপাশে যা ঘটে সেটা আমাদের নানান মাত্রায় আক্রান্ত করতে বাধ্য। সেটার আক্ষরিক ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করাটা একটা কাজকে সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখা মনে হয়। আমি মোটেও বলছিনা আমার কাজের কোন রাজনৈতিক দিক নাই, দর্শন নাই বরং তার বিপরীতটাই সত্য; কিন্তু একটা কাজকে সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করার অভাব দেখি। কে জানে?! হয়তো সেটা সম্ভবও না সব সময়।


Habiba Nowrose

হাবিবা নওরোজ

ফটোগ্রাফার

পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যান এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে। বর্তমানে ফটোগ্রাফী বিষয়ে পড়াশুনা করছেন। কলাকেন্দ্রে হয় উনার প্রথম একক প্রদর্শনী ‘Concealed’.