অতীশ সাহা’র মুখোমুখি

img

তাসের দেশ। একটি প্রদর্শনী। আরামবাগে। না কোন গ্যালারীতে নয়। পরিপাটি কোন স্পেসেও নয়। গার্মেন্টস-ছাপাখানা-স্টোররুমের স্পেসে। অইরকম পরিবেশে। অন্যরকম এক শো। বিভিন্ন জেনারেশনের-বিভিন্ন মিডিয়ার-ভিন্ন মাত্রার ২৫ জন শিল্পী-কবিদের নিয়ে এই প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম এর কিউরেটর অতীশ সাহার । নিচে আমাদের প্রশ্ন, তাঁর উত্তর।
উল্লেখ্য, প্রদর্শনীটি ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। আরামবাগের দেওয়ানবাগ শরীফের সাথে লাগোয়া চানমিয়া ভবনে।

ইপ্রকাশ আর্টস:  প্রদর্শনীর  নাম ‘তাসের দেশ’ কেন?

অতীশ সাহা: অনেক নাম মাথায় ছিলো, ভারী একটা নামও ছিলো, প্রায় ঠিক হয়ে গেছিল, কিন্তু শো'টাকে সিরিয়াস মোড়কে প্রেজেন্ট করতে চাই নাই। হাতে বানানো খেলনার মতো একটা ব্যাপার রাখতে চেয়েছিলাম। নাম খুঁজতে অনেক রেফারেন্স ঘাটছিলাম, কাছের আর্টিস্টদের কাছে জানতে চাইছিলাম কি নাম হতে পারে। এরপর একদিন হঠাত Alice in wonderland থেকে তাসের দেশে ঠেকল। শো’এর যে মূল ভাবনা বা আর্টিস্টদের আইডি কার্ডের ব্যবহার সব কেমন জানি খাপে খাপে মিলে গেছে। সেভাবেই এলো তাসের দেশ নামটা। কেন ভালো হয়নি নামটা ?

ইপ্রকাশ আর্টস: নামটা ভালো বা খারাপ এমন না। রবীন্দ্রনাথ থেকে নিলেন তো। আর নামটার একরকম পলিটিক্যাল আসপেক্টও আছে। আপনি বললেন, আইডি কার্ডের ব্যবহারের সাথেও রিলেট করছে নামটা।কাইন্ডলি আরেকটু ডিটেইলস বলবেন?

 অতীশ সাহা: ত্রাসের দেশ বা আমের দেশ, অনেকেই অনেকভাবে নামটা পড়ছেন, আসলে ঘটনা হল, সবগুলা একই অর্থ দেয়। আমরা একটা নড়বড়ে সময়ে আছি, চারদিকে ভীষণ ভাঙ্গনের শব্দ আসতেছে, এমন সময়ে তাসের দেশ নামটা যথার্থ মনে হয়েছে আমার কাছে। আর তাসের দেশের শিল্পীদের আইডি কার্ড দ্বারা পরিচিত করানোও স্বাভাবিক লেগেছে আমার।

ইপ্রকাশ আর্টস: শো'টা আরামবাগে কেন? মানে এরকম স্পেস পছন্দের পিছনে কারণ কি?

অতীশ সাহা: শো'টা আপনি চাইলে সাতক্ষীরায়ও হতে পারতো, স্পেস নিয়ে তেমন একটা গুরুত্ব ছিলো না, এখন হয়তো বলব white cube এর বাইরে, কিন্তু আর্টিস্টরা অনেকেই white cube পছন্দ করে, আবার অনেকেই করে না। আমি জানি না আমি কি পছন্দ করি। আসলে কিছুই পছন্দ করি কিনা তাও জানি না। শো'টা স্পেস থেকে মুক্ত। যে স্পেস যেভাবে সে স্পেস এর রুপ নিতে পারবে কিন্তু একটুও ফ্যাট কমবে না। আসলে আমি স্পেস পছন্দ করিনাই, স্পেসটাই আমাকে পছন্দ করেছে। একজন আর্টিস্ট ফ্রি তে ম্যানেজ করে দিয়েছেন উনার পরিবার থেকে। অন্য গ্যালারিতে গিয়েছিলাম কিন্তু স্পেস ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সা ছিলো না। স্পেস ভাড়ার পয়সাটা সেজন্য ইন্সটলেশনে খরচ করতে পারছি একদম মন মতো। 

ইপ্রকাশ আর্টস: শিল্পী নির্বাচনটা কিভাবে ঘটেছে?

অতীশ সাহা: Nepotism তো ছিলোই, আর থাকবে না কেন, যাদের সাথে নিয়মিত দেখা হয় কথা হয় তাদের কাজও ভালো লাগে আর চোখ বন্ধ করলেও তাদের কথাই মনে আসে, অনেক মানুষই তো আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট, আমিও এর ব্যতিক্রম নই। কিন্তু তাই বলে কোন আর্টিস্টের কাজের মেরিট একদম ফেলনা না বরং কিছু ক্ষেত্রে আমার এক্সপেক্টেশন থেকে অনেক বেশি মজার। 
একটা ভয় কাজ করছিল যে নানা জেনারেশনের শিল্পীদের বলব, কিন্তু অনেকে যদি না করে দেয়! কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র দুইজন দেয়নাই। এরমধ্যে একজন সরাসরি মানা করে দিছে, এবং একজন বলছে পরে জানাবে। আর জানায় নাই। উনাদের কাজ রাখতে পারলে ভালো হইতো, মজা আছে উনাদের কাজে, শো'টা অনেক মজার হইতো। 
এই ধরেন, যে আর্টিস্ট আমাকে স্পেসটা দিছে, ওর কাজ যেমন আছে আবার যার সঙ্গে এলাকায় দেখা হয় তার কাজও আছে। আমার রুমম্যাটের আছে, যার কাজ আমার ভাল লাগে তার আছে এবং যাদের কাজ সবসময় আগাগোড়া জানি তদের কাজও আছে। তবে কাজের ব্যাপারে একদমই আপোষ নাই, কারও কাজই খারাপ হয়নি, হতে পারে কারো কারো কাজ একটু বেশি ভালো হয়ে গেছে, অথবা অনেকের কারো কারো কাজ বেশি পছন্দ।  

ইপ্রকাশ আর্টস: এজ এ কিউরেটর প্রথম কিউরেটিংয়ের অভিজ্ঞতা কি? 

অতীশ সাহা: ভালো-খারাপ দুইটাই সত্য। কিছু কিছু কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে, কিছু কিছু আর্টিস্টদের থেকে সাপোর্ট পাই নাই একদম। কিছু আর্টিস্ট আবার বেশ সাপোর্ট করেছেন।তাই দিন শেষে ম্যানেজ হয়ে গেছে। লোকে বলে সবসময় আসলে এরকমই হয়। 
একটা একটা কাজ দেয়ালে উঠে আর গর্বে বুক বড় হয়ে যায়, যে ফিলিংস আগে কখনোই পাই নাই। বলতে পারেন কাজটা করে অনেক মজা পাইছি। দিনের পর দিন টানা কাজ করতে পারছি, আর আবীর সোমের নানা ধরণের হেল্প- ফন্টটা ঠিক করে দেয়া, পোস্টারটা করে দেয়া, জো’এর GIF গুলো করে দেয়া এরকম নানাভাবে নানা আর্টিস্ট নানা ধরনের হেল্প করেছে। 

ইপ্রকাশ আর্টস: কি কি সমস্যা ফেস করেছেন এ স্পেসকে প্রর্দশনীর উপযোগী করে নিতে? বাংলাদেশে কিউরেটিং প্র্যাকটিসের চর্চা কেমন?

অতীশ সাহা: আমি এর আগে কোনদিনই খেয়াল করে দেখিনি কি করে ওপেনিং প্রোগ্রামটা সাজাইতে হয়। ফলে, ওপেনিং টা সেরকম গুছানো হয়নি, একদমই পরিকল্পনা ছাড়া হইছে। তবে যা হইছে ভালো হইছে। বেশি ঝামেলা হয়নাই কোন কিছুতে। আমার তো কোন ভলান্টিয়ার বা হেল্পিং হ্যান্ড ছিলো না, কিন্তু তাও মনে হয় ছিলো। রাব্বী নানা ধরনের হেল্প করেছে, রাজীব আছে , যে বিল্ডিংটাতে জব করে সেও নানাভাবে হেল্প করেছে, অনেকেই হেল্প করেছে। 
শুনতে পাই এখন নানা ধরনের কিউরেটিং প্রোগ্রাম হয়, কিন্তু আমরা কখনো কোনটাতে যাওয়া হয়নি, তাই বলতে পারব না। তবে আমাদের দেশে এখন বেশি কিউরেটেড শো হচ্ছে সেটা খুব ভালো। আমার মনে হয় কিউরেশন কাজের ডাইভারসিটি নিয়ে আসে। 

ইপ্রকাশ আর্টস: কোন প্রতিষ্ঠান কি শো’টাকে  স্পন্সর করেছে ? 

অতীশ সাহা: না, কোন স্পন্সর ছিলো না, আমার ব্যক্তিগত পয়সা এবং আমার বন্ধুদের মুদ্রা এবং শিল্পীরা সবাই তাদের কাজ নিজেরা প্রোডিউস করেছেন নিজেদের অর্থ দিয়ে।

ইপ্রকাশ আর্টস:  শিল্পীদের কাজের আলাদা আলাদা করে নাম ছিল না কোন। এটাও কি কিউরেটিংয়ের অংশ ছিল নাকি শিল্পীদের অনীহা? 

অতীশ সাহা: শিল্পীদের কোন অনীহা ছিলো না, বরং কিছু শিল্পী দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি দিতে চাইনাই, আসলেই যেভাবে আমরা কাজের পাশে টেক্সট ইউজ করে অবশ্য তা অনেক বেশী রিজিড এবং একাডেমিক এবং বোরিং। কিন্তু আমি মানছি  দরকারি অনেক, অনেক কাজের ক্ষেত্রে, কিন্তু এই শো’তে অনেক কাজের জন্য টেক্সট এমনিতেও দরকারি ছিলো না, দুয়েকটা কাজের জন্য হয়তো দরকার ছিলো, কিন্তু সেটাও দিন শেষে উতরে গেছে টেক্সট ছাড়াই। টেক্সট ছাড়াই কাজটা নিজে নিজে আরো বেশী ইন্টারএকটিভ স্পেস ক্রিয়েট করতে পারে দর্শকদের মনে। যদি কাজটায় দম থাকে। এক্সিবিশনের মূল বডি টেক্সটটাও এক্সিবিশন বিল্ডিং এর বাইরে ছিলো বিপরীত দিকের একটা দেয়ালে। 

ইপ্রকাশ আর্টস: শিল্পীদের ভোটার আইডি কার্ডের ইউজের পিছনের কারণটা কী? 

অতীশ সাহা: আজকাল তো এমন এক সময়ে আছি, ফোন কোম্পানিতেও আমাদের যাবতীয় ডিটেইলস দিতে হয়, বাড়ি ভাড়া নিতে গেলেও নানা রকম তথ্য দিতে হয়, নি:শ্বাস নিতে আইডি কার্ড লাগবে কিনা আপনি শিওর করে বলতে পারবেন না। হা হা 

ইপ্রকাশ আর্টস: এ শো’কে নিয়ে নেকস্ট কোনো প্ল্যান আছে? আর কোথাও করা বা অন্য রকম কিছু? 

অতীশ সাহা: চিটাগাং নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান আছে, আলোচনা চলতেছে। 

ইপ্রকাশ আর্টস:  বেশ কয়েকজন আর্টিস্টের কাজ স্পেস রিলেটেড। ধরা যাক: জাকির ভাইয়ের কাজটা বা দিলারা বেগম জলির কাজটা। আর্টিস্টের সাথে স্পেসের এই ইন্টারেকশনটা কিভাবে ঘটেছে?

অতীশ সাহা: জলি আপা বহুদিন ধরে উনার কাজের বিষয়বস্তুতে রেখেছেন পোশাক শ্রমিক, বিশেষ করে নারীদের নানা রকম মনোজগত, সুতারাং বিল্ডিংটা একটা গার্মেন্টস স্পেস হওয়ার কারণে জলি আপার কাজের জন্য একটা অটো স্পেস ক্রিয়েট হয়েছে ।  আর জাকির ভাইয়ের কাজের বিষয় যদিও কোন বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে না, তারপরও উনিও একটা গার্মেন্টস কক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন। একটা ফ্ল্যাট কাজের পরিবেশকে উনি জ্যামিতিক নানা ফর্ম আর রঙের দ্বারা কক্ষটিকে প্লেফুল করেছেন। আরবান টিউব লাইটের নোংরা আলো থেকে যেন কিছু জ্যামিতিক বর্ণিল সূর্যমুখী ফুল ফুটেছে।  


Eprokash Feature

ফিচার

개발 지원 대상