আবীর সোমের ইন্টারভিউ

img

ইপ্রকাশে চলছে আবীর সোমের সলো অনলাইন একজিবিশন 'নষ্ট আত্মার টেলিভিশন'। এই বিষয়ে আলাপ হয় আর্টিস্টের সাথে। আসুন পড়ি একজিবিশন ও আর্ট বিষয়ে 'আবীর সোমের ইন্টারভিউ'।

ইপ্রকাশ আর্টস: একজিবিশনের নাম ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিশন’ রেখেছেন কেন?

আবীর সোম: ২০১৫ সালের দিকে চাকরিসূত্রে কবি ইউসুফ বান্নার সাথে আমার পরিচয় হয়। তখন তার সাথে আর্ট-লিটারেচার নিয়ে অনেক আলোচনা করতাম। তার আগে আমি প্রায় দেড়-দুইবছর কোন ছবি আঁকি নাই, কিন্তু অন্য মিডিয়ায় কাজ করেছি। আমার ব্লক চলতেছিল। বান্না ভাই আমার ইমাজিনেশন বাড়ানোর জন্যে আমাকে অনেক কবিতার রেফারেন্স দিত। আমি সেগুলা ফাঁকে ফাঁকে পড়তাম। এভাবে হাংরি জেনারেশনও একদিন সামনে আসে। ফাল্গুনি রায়ের ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিশন’ কাব্যগ্রন্থটা পড়ার পর আমার মাথার টেলিভিশনের যা যা আসছে আমি তাই আঁকা শুরু করি। এভাবেই আস্তে আস্তে সিরিজটা দাঁড়ায়। এর জন্যেই শো’এর নাম রাখলাম ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিশন’।

ইপ্রকাশ আর্টস:  কাজগুলো কখনকার করা?

আবীর সোম: কাজগুলো ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের বিভিন্ন সময়ে করা।

ইপ্রকাশ আর্টস:  একজিবিশনে আপনার একটা কাজের নাম “নষ্ট আত্মার টেলিভিসন ("ওই শোন সমস্বরে বলিছে হেথায় নাহি বিলাপের স্থান ।")। এমন নামকরণের পিছনে কোন কারণ আছে?

আবীর সোম: তেমন কোন কারণ নাই...একটা কারণ তোহ অবশ্যই যে নামটা ছবির সাথে যায়...("ওই শোন সমস্বরে বলিছে হেথায় নাহি বিলাপের স্থান ।" এই লাইনটা নবারূনের হারবার্ট থেকে নেয়া। যখন যেটা ভালো লাগে সেটা বসায় দেই। কারণ যেমন আছে, তেমন আবার কারণ নাইও।

ইপ্রকাশ আর্টস:  আপনার কাছে আর্ট কি? বা আপনি আর্ট কেন করেন?

আবীর সোম: আমার কাছে ‘আর্ট’ একজিনিস, সেটার সাথে সামগ্রিক আর্টের মিল নাও থাকতে পারে। আমার কাছে Art is a ‘Mere Activity’. আমি আর্ট করি কারণ আমারে অনেকেই আর্টিস্ট মনে করে, এমনকি আমি নিজেও তাই মনে করি। এই আর্টিস্ট ইমেজটা মেনটেন করতে আমার আর্ট করতে হয়। আমি শুদ্ধবাদী না। এছাড়াও আর্টের মাধ্যমে আমি রিএক্ট করি আমার রাষ্ট্রের সাথে, সোসাইটির সাথে, আর্ট সিনের সাথে। অন্যের আর্ট দেখে ভালো লাগা বা জেলাস হয়েও আর্ট করি। আর আমি বহুবার আর্ট থেকে সরে যেতে চাইছি, কিন্তু কিছুদিন পর পর আবার ফিরি, তাই হয়তো আর্ট করি। আমার বাবা একজন আর্টিস্ট, আমার শিল্পী হওয়ার পিছনে সেই সবচেয়ে বড় কারণ। ছোটবেলা থেকে আমি তাকে এবং তার আর্টিস্ট বন্ধু-বান্ধবদের অনুকরণ করতাম। আর্টিস্টদের কর্ডের প্যান্ট পড়া, চুল বড় রাখা, হাতে রং এর দাগ, গা দিয়ে সিগারেট এর গন্ধ আসা , এগুলা ছোট বেলায় আমাকে আকৃষ্ট করত। আমার আর্টিস্টদের অনেক ভালো লাগে, এজন্যেই আমি আর্টিস্ট হইতে চাইছি। এর পিছে তেমন কোন সিরিয়াস কারণ ছিল না, আমি আর্টিস্ট না হতে পারলেও আমার মনে হয় দেশ ও জাতির কোন ক্ষতি হত না। 

Untitled, Ink applied with Syringe on Paper

ইপ্রকাশ আর্টস:  বর্তমানে বাংলাদেশের কার কার কাজ আপনার ভালো লাগে?

আবীর সোম: মুস্তাফা জামান, রফিকুল শুভ, রনি আহম্মেদ, রাজীব দত্ত, ঢালি আল মামুন, দিলারা বেগম জলি, মাহবুবুর রহমান, মুন রহমান, এ, আর, রহমান, সঞ্জয় চক্রবর্তী, প্রমতেষ পুলক, নাজমুন নাহার কেয়া, অতীশ সাহা, তৌফিকুর রহমান অনিক, তৈয়বা লিপি, মিজানুর রহমান সাকিব, আনিসুজ্জামান সোহেল, কামরুজ্জামান স্বাধীন, হাদি উদ্দিন, পিশাচ, সালমা আবেদিন পৃথী, মনির মৃত্তিক, জিহান করিম, আফ্রিদা তানজিম, পলাশ ভট্টাচার্য্য, সৈয়দ আরেফিন, ঈশিতা মিত্র তন্বী, সামসুল আলম হেলাল, সানজিদ মাহমুদ, সনদ বিশ্বাস, এম, এ, রায়হান... অনেকের নাম হয়তো এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। নামের বানান ভূল হলে দুঃখিত।

ইপ্রকাশ আর্টস:  আপনার আর্টওয়ার্ক এবং মিডিয়া উভয়ের মধ্যেই বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব আছে। যেমন গ্রাফ পেপার, সিরিঞ্জে ইংক ব্যবহার ইত্যাদি। এসবের ব্যাপারে বলুন।

আবীর সোম: আমি চেষ্টা করি আমার মত করে, নতুন নাকি পুরাতন এটা আমার কাছে মূখ্য না। মূখ্য আমি করে নিজে মজা পাচ্ছি নাকি। এগুলা নতুন না পুরান, এটা দর্শক ডিসাইড করবে। আমি এটা নিয়ে এত ভাবিনা।

ইপ্রকাশ আর্টস: আপনার আর্টওয়ার্ক সৃষ্টি-প্রদর্শনে একরকমের এন্টি-স্টাবলিশমেন্ট প্রবণতা আছে। এরকম কেউ কেউ বলেন। আপনার কি মনে হয়?

আবীর সোম: আমি ছোট আর্টিস্ট, আমি বা আমার মত যারা সমসাময়িক শিল্পী, তারা যদি এন্টি-এস্টাবলিশড না হয় তাহলে তোহ আর হইলো না। এস্টাবলিশড ল্যাঙ্গুয়েজের সাথে দ্বন্ধে না জড়াইলে নতুন ল্যাঙ্গুয়েজ কেমনে হবে? আমি যদি আসলেই এন্টি-এসটাবলিশড হয়ে থাকি তাহলে এটাও একদিন এস্টাবলিশ ফর্ম হবে। তখন নতুনরা এটাকেও উড়াই দিবে বা অলরেডি উড়াই দিচ্ছে। এইটাই মজার। শিল্পীর যেমন শুরু আছে শেষও আছে। মেনে নেয়া কঠিন হলেও এটাই সত্য, এটাই সুন্দর। আমাদের দেশের অনেক শিল্পী এখনও টাকা বা মেইনস্ট্রিম আর্ট মার্কেটের সাথে তাদের আর্টকে মেশান নাই। তারাই প্রকৃত বিপ্লবী এবং আমি তাদের জন্য গর্ববোধ করি।

ইপ্রকাশ আর্টস: আমাদের তরুণদের কাজে পশ্চিমা শিল্পের প্রভাব, এ বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?

আবীর সোম: ভালো ভাবেই দেখি... পশ্চিমা কাপড় পড়লে ছেলে-মেয়েদের অনেক মানুষ বাঁকা চোখে দেখে বা টিজ করে, আমি তাদের বিপক্ষে। আমার যেমন পশ্চিমা কাপড়ে কোন সমস্যা নাই, তেমন পশ্চিমা শিল্পের প্রভাব আর্টে পড়লেও সমস্যা নাই। কারণ আমি এমন কেউ না। আমার কিসে সমস্যা, আর কিসে সমস্যা না তাতে কিছু যায় আসে না। প্রভাব পরবেই, তা প্রাচ্য হোক আর পশ্চিমা হোক। কোন ভাষায় কথা বলছে সেটা জরুরী না... পশ্চিমের অনেকের মধ্যেও প্রাচ্যের প্রভাব আছে। কি বলছে সেটা জরুরী, অন্তত আমার কাছে।

ইপ্রকাশ আর্টস: আর্টওয়ার্কের নাম, আর্টে ইংলিশ টেকস্ট ইউজ এসব বিষয়কে কিভাবে নেন? এটাকে কলোনিয়াল হ্যাংওভারও বলেন কেউ কেউ। মানে তারা বিষয়টাকে রাজনৈতিকভাবে দেখেন। আপনি?

আবীর সোম: আমরা যে আর্টটা করছি সেই আর্টের রুট তো বিদেশি-ই। বাংলার আর্ট তোহ ফোক আর্ট, আমরা শহরের বেশিরভাগ আর্টিস্টরা তো তা করিনা। গ্রাম বাংলার দৃশ্য-সম্বলিত ওয়াটার কালার ল্যান্ডস্কেপ শো'এর কাজের নামও তো বেশির ভাগ শিল্পীরা ইংলিশেই দেয়, যেমন, 'Beauty of Nature' বা 'Serene Beauty of Bengal'. এটা যদি কলোনিয়াল হ্যাংওভার হয় অবশ্যই আমিও তাতে আক্রান্ত। আমার থেকেও বেশি আক্রান্ত আমাদের আর্ট একাডেমি, যারা এখনও কলোনিয়াল টাইমের শেখানো আর্ট মিডিয়াম ও স্টাইল দিয়ে তাদের শিল্প-ভাব প্রকাশ করে। যাদের স্টুডেন্টদের  বা আমরা যখন স্টুডেন্ট ছিলাম আমাদের কাজ দেখলে মনে হত এখনো কলোনিয়াল পিরিয়ডই চলছে। আমি সকল বিষয়কেই রাজনৈতিকভাবে দেখি, আমার চাহিদা, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমার লোভ, সবই রাজনৈতিক। আমি ABCD টাইপ ইংরেজি ব্যবহার করি, যা দূরবোধ্য না, আমি ইংরেজি ভাষাকেও ক্রিটিক করি, ভুল ইংরেজি লিখি। আমার একটা টেক্সট বেইজড কাজে আমি লিখছি 'Hard English  Everywhere'. ফাল্গুনী রায়ের একটা  কবিতার নাম 'আমার রাইফেল আমার বাইবেল', এখন এই ইমোশনটা কি বাংলা না ইংলিশ? আমার প্রিয় শিল্পী Mladen Stilinović এর একটা কাজ আছে 'An Artist Who Cannot Speak English Is No Artist'। এটা দেখলে আশা করি সবাই বুঝতে পারবেন আমি কি বলতে চাচ্ছি।আমাদের শিল্পে রসবোধের অভাব বড়ই কম। সবাই সব কিছু 'লিটারেলি' নেয়, যেইটা একটা বিরাট সমস্যা বলে আমি মনে করি।

An Artist Who Cannot Speak English Is No Artist, Mladen Stilinović

ইপ্রকাশ আর্টস: আর্ট ও পলিটিকসের দ্বন্ধ পুরানো। কীভাবে মোকাবিলা করেন?

আবীর সোম: আর্ট এবং পলিটিকস দুই-ই খুব সাবধানে মোকাবেলা করি। আটকায় গেলে  অন্য শিল্পীদের কাজের কাছে দ্বারস্থ হই। আমাদের দেশে আর্ট করা এত সহজ না। আমাদের দেশের শিল্পীরা এমনেই অনেক পলিটিক্যাল, এটা ন্যাচারালি ডেভেলপ হইছে সোসাইটির কারণে, এটা ভালো গুণ।

ইপ্রকাশ আর্টস: সাহিত্য পড়েন? সমসাময়িক সাহিত্য? বা সিনেমা?

আবীর সোম: পড়ি বাট আবার এমনও না যে ফাটাইয়া পড়ি। সিনেমার লিস্ট বিশাল। আগে প্রচুর দেখতাম, এখন অনেক কমে গেছে, সময়ের অভাবে।

ইপ্রকাশ আর্টস: কার কার কাজ থেকে আপনি ইন্সপায়ার্ড হন?

আবীর সোম: সকলের। আমি একজন 'Mediocre Artist'. আমার নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কম। আমি আমার সারাউন্ডিং আর্টিস্ট এন্ড পছন্দের আর্টিস্টের উপর ডিপেন্ডেন্ট। তারাই আমাকে আমার কাজের 'Key' দেয়। আমি অথেনটিসিটি তে বিশ্বাস করিনা এবং আমার সেই ক্ষমতাও নাই। আমি পৃথিবীর সকল শিল্পী ও মানুশের কাছ থেকে চুরি করি। নাম বলে শেষ করা যাবেনা। রিসেন্টলি দেশে মুস্তাফা জামান, রাজীব দত্ত, সঞ্জয় চক্রবর্তী, আর বিদেশে Mladen Stilinović দ্বারা ব্যপক ইন্সপায়ার্ড হয়েছি।

ইপ্রকাশ আর্টস: বাংলাদেশের আর্ট প্র্যাকটিসের লিমিটেশনগুলো কি কি?

আবীর সোম: সমস্যা পয়সার। ইয়ং ও আনকনভেনশনাল শিল্পীদেরকে ফিন্যান্সিয়ালি সাপোর্ট করা বা তার শো স্পন্সর করার লোক এবং প্রতিষ্ঠানের অভাব। আছে, কিন্তু আরও বেশি থাকলে হয়তো ভালো হত। অনেকেরই সংসার চালাতে শেষে গিয়ে আর্ট বিসর্জন দিতে হয়। এটা দেশ ও জাতির এমনকি শিল্পী সমাজের সবার জন্যই লজ্জার। আমাদের দেশে প্রচুর ভালো আর্টিস্ট আছে। আমাদেরকেও  ভবিষ্যতের শিল্পীদের জন্য কিছু করতে হবে। না করতে পারলে এটা আমাদেরই দায়। অতীশ সাহা যেমন নিজ উদ্যোগে 'তাসের দেশ' করলো, এমন আরো শো হওয়া দরকার। যারা এমন শো আগেও করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে তাদের ফিনান্সিয়ালি সাপোর্ট করাও দরকার। আমাদের দেশে এত কিছু আছে, কিন্তু কোন আর্ট মিউজিয়াম নাই। যাদুঘরের ফাইন আর্ট সেকশন অনেক পুওরলি মেইনটেড। অনেক ভালো কাজ নষ্ট হচ্ছে সেখানে 'রিস্টোরেশন' এর ফান্ডিং নাই এই কারণে। এমন কেনো হবে? আমার কাজ মিউজিয়ামে থাকবে এমন আমি চাইনা। দর্শক হিসেবে চাইতে দোষ কি?

আবীর সোমের অনলাইন একজিবিশনটি দেখতে ক্লিক করুন


Eprokash Feature

ফিচার

개발 지원 대상