রিফাত হাসানের সাথে আলাপ (২য় পর্বের শেষ কিস্তি)

img

শাহবাগের আজান নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব

মাসুদ জাকারিয়া: কিন্তু আওয়ামী লীগ মানেই খারাপ, সে যখন মোর ইসলামাইজড হয়ে যাবে তখন সেটাকে টুলস হিশেবে নিবে, এই মতামতের রুটস কী? জামাতের সাথে আচরণের প্রেক্ষিতে এ কথা তো বলা যায়না। সে তো শাসক। শাসককে তো একোমোডেটিভ হতেই হয়।

রিফাত হাসান: রাইট।

স্বরূপ সুপান্থ: এখানে বেসিক্যালি যে কথাটা আসতেছে, শাহবাগ জামাতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার পথ হিশেবে ব্যবহার হইছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির যে ক্ষমতাবলয় ও সংস্কৃতি, এখানে জামাত তো আওয়ামীলীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা না। প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা বিএনপির। তাইলে, আওয়ামী লীগের কনসার্নের বিষয় বিএনপি না হয়ে জামাত কেন?

রিফাত হাসান: এইটা আপনি কী মনে করেন? আসেন এই কথাটা আপনার কাছ থেকেও একটু শুনি। বিস্তারিতভাবেই বলেন।

স্বরূপ সুপান্থ: হা হা। এই আলাপটা তো আপনার বইরে কেন্দ্র করেই। আপনি কী মনে করেন, তার আলাপ হলে ভাল হত। তাও, ঠিক আছে। আমি বলার চেষ্টা করছি। ব্যক্তিগতভাবে, শাহবাগের আন্দোলনটা যখন শুরু হল, এই ব্যাপারে আমারও অবস্থান ছিল ঘূর্ণায়মান। এইটা বোধ হয় কম লোকের হইছে, যারা একটু চিন্তা-টিন্তা করে, তাদের প্রায় একই রকম অবস্থা। তবে সাধারণ মানুষের অবজারভেশন অন্য রকম থাকতে পারে।

রিফাত হাসান: আমার বইরে কেন্দ্র করে হলেও, এই আলাপের প্রকৃতি আড্ডা। সাক্ষাৎকার গোছের কিছু না। এই কয়েক পর্বের আলাপেও বুঝেন নাই? হাওএভার, আপনি যে বললেন, প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা বিএনপির, কিন্তু কেন জামাত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলো? এই ব্যাপারে আপনার কী ধারণা, বললেন না তো।

স্বরূপ সুপান্থ: সাধারণভাবে, ক্ষমতায় যাওয়ার, ভোটের যে রাজনীতি, তাতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের জন্য সাপোর্টিং র্পাট হিশেবে জাতীয় পার্টিকে নিছে, তেমনই বিএনপির সার্পোটিং পার্ট জামাত। এই অংশটার ভোট আমি ভাবি সর্বসাকুল্যে পাঁচ প্লাস পাঁচ দশ পারসেন্ট। তো এক্ষেত্রে মূল প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগ পাঁচ পারসেন্ট এর পিছনে কেন লেগে আছে?

মাসুদ জাকারিয়া: আমার মনে হয়না, আওয়ামী লীগ ভোট কেন্দ্রিক চিন্তা করে এটা করেছে। আমার মনে হয় কালচারাল জায়গায় একটা প্রবলেম আছে।

রিফাত হাসান: কথাটা একটু স্বরূপকে বলতে দাও। কারণ এই বিষয়ে তোমার বা আমার একটা কমন আন্ডারস্টেন্ডিং বন্ধুত্ব বা নিয়মিত আলাপ হেতু আছে, স্বরূপের আলাপটা তার বাইরের হওয়াই সম্ভব। শোনা দরকার।

স্বরূপ সুপান্থ: আমার মনে হইছে, এর কারণ দুই হাজার একের নির্বাচন। তখন বিএনপি-জামাত জোট আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ওরা অবজারভ করে- জামাতের যে ইন্সটিটিউশনাল পাওয়ার, আর্থিক প্রতিষ্টান, তার আদর্শকেন্দ্রিক যে রাজনীতি, তার যে ডেডিকেশন এবং চর্চা সেটা তাদের জন্য র্হামফুল। এবং তারা এটাও ভয় পেতে শুরু করে, যদি বিএনপি আর জামাত এলাই করে চলে তাহলে একসময় জামাত বিএনপিকে ডোমিনেইট করা শুরু করবে রাজনীতিতে। দুই হাজার একের পরে এর আভাসও পাওয়া যাচ্ছিল, জামাতের নেতা-কর্মীদের শারীরিক ভাষা বদলে যাচ্ছিল। আমার চাক্ষুষ দেখা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ছাত্র থাকাকালীন সময়ে শুরুর দিকে জামাতের যে ছাত্র সংগঠন, আর দুই হাজার একের পরে যে ছাত্র সংগঠন, তার আকাশ পাতাল তফাত। ক্ষমতার যে প্রভাব, তা চোখে মুখে, আচরণে ও ঔদ্ধত্যে দেখা যাচ্ছিল। তারপর, দুই হাজার ছয় কি সাত সালে বাংলাদেশে যখন নির্বাচন কেন্দ্রিক তোড়জোড়-গন্ডগোল এসব শুরু হয়, এর ফলাফল দেখা গেল। আপনি দেখবেন, অক্টোবরের কোন এক তারিখে স্রেফ পিটিয়ে জামাত শিবিরের কয়েকজনকে রাজপথে মেরে ফেলা হল, সেই শোরগোলের ভেতরে।

রিফাত হাসান: আচ্ছা, তার মানে এইসব জায়গা থেকেও, শাহবাগ এর শুরু বলতে চান?

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ।

রিফাত হাসান: মানে, জামাতের যে ক্ষমতায়ন হলো, যেইটারে আপনি ঔদ্ধত্য বললেন, ধরেন, জামাত নেতা বা স্বাধীনতা বিরোধীরা জাতীয় পতাকা নিয়ে গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এইসবের প্রতিক্রিয়ায় হইছে?

ক্ষমতার ক্রিটিক তো গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজে মনে করি, আমার এই বইয়ের একটা কাজ হল, ক্ষমতার ক্রিটিক। এবং ক্ষমতার বিপরীতে, বাংলাদেশে চলমান অসহিষ্ণুতার, ইনটলারেনসের ভেতরে একটা আলাপের অবস্থা তৈরী করা। তারপরে আমি একটি গণমুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, সেটা হচ্ছে এই জায়গাটা, এখানে ওইরকম কোন চেতনা বা জাতীয়তাবাদের কোন ফেসিনেশন নেই।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ। এরও প্রভাব তো আছেই। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্ন তো আগে ছিলই, বিশেষত কাদের মোল্লার ফাঁসির প্রশ্ন আসল যখন, এইটা তৈরী হবার সুযোগ পেল। এইটা একটা টার্নিং পয়েন্ট। এর পরে তো ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শাহাবাগ আর হেফাজত এই দুইটা ঘটনা প্রভাব ফেলবে আগামি চল্লিশ পঞ্চাশ বছর। তো শাহবাগ নিয়ে আমার অবস্থানটা আরেকটু পরিষ্কার করি। সাধারণ মানুষ হিশেবে।

মাসুদ জাকারিয়া: সাধারণ বুদ্ধিজীবী হিশেবে।

স্বরূপ সুপান্থ: হা হা। আচ্ছা যাই হোক। বুদ্ধিজীবীরাও তো সাধারণ মানুষই আসলে। যখন প্রথম শাহবাগে মানুষের জড়ো হওয়া দেখি তখন আমিও প্রাণিত হলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে সাধারণ যে ভাব, তা আমার মধ্যে ছিল। এর বেশি কিছু না। মজা লাগছিলো ব্যাপারটা। এতগুলো মানুষ জড়ো হলো, মোমবাতি জ্বালাইছে, ফটোগ্রাফ, লাইভ ভিডিও, এর একটা আছর আছে তো। তো, এখানে আন্দোলনের যে শুরুটা হল, ব্যক্তিগতভাবে, আমি একদম সরাসরি বলি, আমি, আমার আর এক বন্ধু আছে প্রান্ত, প্রান্তসহ আমরা বসে বললাম ওরা ঢাকায় এগুলো করতেছে আমরা চট্টগ্রামেও করি। স্রেফ এটুকুই। ব্যাপারটা খেয়াল করেন। আসলে জাজমেন্টের জায়গায় গিয়ে যে এই জিনিশটা শুরু করার ব্যাপারটা আসছিল তা কিন্তু না। ওরা ঢাকায় করতেছে, আমরাও এখানে করি না কেন। ও দুয়েকজনের সাথে কথা বলল। এইভাবে শুরু হল। চিটাগাঙে তো আর ঢাকার মত সারারাত থাকার অবস্থা নেই। রাতের একটা অংশ পর্যন্ত থাকার ব্যবস্থা করা যায়। এইভাবে শুরু করার পরে আমি একদিন ওখানে বইসাই মনে হল, এইটা ঠিক আমার না। এইটা আমি অনেক ভাবছি তারপরে। আমি কিন্তু ওই সময়ে, মানে প্রায় শুরুতেই একটা কাগজ প্রকাশ করছিলাম। এবং এই কাগজটা যেদিন শুরু হইছিল তার পরদিনই আমরা রাতারাতি লেখা সংগ্রহ করি, লিখি ও ছাপাই।

রিফাত হাসান: বাহ। সলিম খানদের সর্বজন খেয়াল করছিলেন?

স্বরূপ সুপান্থ: ঐটা খেয়াল করেছি। কয়েকটা কপি আমার কাছে আছেও। হাওএভার, এইটা আমরা এভাবে শুরু করলাম। কয়েকদিন রেগুলার আসার পর হঠাৎ আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন আসে। এর পর থেকে আমি যাওয়া বন্ধ করে দিই।

রিফাত হাসান: কেন? ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি পাইলেন?

স্বরূপ সুপান্থ: না। ঠিক তা নয়। চট্টগ্রাম শহরে আমি তো বিশ-বাইশ বছর ধরে আছি, তো এই শহরে কারা কী করে, তা তো সব মোটামুটি মুখস্ত হইছে। এখানে কারা আসছে? আমার প্রায় চেহারাই পরিচিত। তো এখানে দেখলাম, একপাশে আওয়ামী পন্থী ছেলেরা আর অন্যপাশে বামরা গ্রুপিং করতেছে। মানে, এইটাই ঘটনা, ট্রেডিশনাল গ্রুপিং। এখানে নতুন কিছু ঘটে যাচ্ছে না। তখন আমি বুঝলাম যে, আমি এদের লোক না। আমি আবার হেফাজতেরও লোক না। শাহবাগবিরোধীদেরও লোকও না। পরে আমি একদিন রিক্সায় করে যাচ্ছিলাম, আমার সাথে এক বন্ধু ছিলো, এরা এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতো, ওকে বলছিলাম, এখানে আর কী আন্দোলন হবে? এইটা তো এই দুই গ্রুপের আখড়া হইছে। পরে দেখলাম, আমি যে কাগজটার মূল উদ্যেক্তা, পরদিন ওই কাগজ থেকে আমারেই বাদ দেওয়া হল। ঐ যে বাম ও আওয়ামীলীগ নিয়ে কথা বলায়। তো, আমি শাহবাগ নিয়ে কনক্রিট জায়গায় পৌঁছাতে পারি নাই এখনো, অনেকটা আনরিসলভড। কারণ, প্রথম দিকে আমাকে এটা খুব উদ্বেল করেছিলো। যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই এটার চেয়েও, আমাতে উদ্বেল করেছিলো একটা জোয়ারের মুগ্ধতা। কারণ আমরা গণঅভ্যুত্থান দেখিনি।

মাসুদ জাকারিয়া: আরব স্প্রিং তো দেখছো।

স্বরূপ সুপান্থ: হুম দেখছি, তবে এটার ক্ষেত্রে আমরা দূরতম প্রবাসী। আর আরব স্প্রিং আমাদের এই জাতীয় আন্দোলনও না।

রিফাত হাসান: আরব স্প্রিং কিন্তু শাহবাগের গণজাগরণের জন্য মডেল ছিলো, অনুপ্রেরণাও ছিলো।

স্বরূপ সুপান্থ: ছিলো?

রিফাত হাসান: হাঁ। দুই হাজার দশ সালের দিকে এই নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, এই বইতে আছে। লিবিয়া, এক এগার এবং বাংলাদেশে অনলাইন ভার্চুয়াল তরুণদের লড়াই। এতে আমি বলেছি, রেজা যেই ইভেন্টগুলোর কথা বলতেছিলেন, এই যে তারা কথায় কথায় রাস্তায় নাইমা যেতে চাচ্ছে, এই রক্তদান, এই বন্যার ত্রাণ সহায়তা, আরো আরো ছোটখাট ইস্যু, আমি এর মোটিভ নিয়ে ভাবতেছিলাম। আমার মনে হইছে তারা অরাজনৈতিক থাকতে চায়, আবার একই সাথে তাদের মোটিভটা পলিটিক্যাল। তাদের পলিটিক্যাল হওয়াটারে গুরুত্ব দিতাম আমি। আরব স্প্রিং দ্বারা অনুপ্রাণিত, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের ও চরিত্রের বাংলাদেশের অনলাইন সাইবার তরুণদের জন্য এইটারে ক্রিটিক্যাল সময় বলছিলাম আমি। এই যে দ্বন্দ্ব ও আকাক্সক্ষা, আর আপলিটিক্যাল থাইকা যেতে চাওয়া তরুণেরা, শেষ পর্যন্ত এইটার চুড়ান্ত পরিণতি হইছে শাহবাগে গিয়ে।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ, আপনি তো বেশ গভীর জায়গা থেকে দেখছেন। আমি অভিজ্ঞতার জায়াগাটা বলছিলাম। ঐ যে বললাম, পরবর্তীতে আমি আর আসি নাই। শুক্রবারে সাধারণত বাতিঘরের দিকে আসি, তখন দূর থেকে দেখি, মানুষজন কী করছে? পরবর্তীতে শাহবাগ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হইছে। কয়েকটা বইও বের হয়ছে, শাহাদুজ্জামান, আমাদের জাহাঙ্গির ভাই এরও একটা উপন্যাস ছিল। আরো কারো কারো লেখা। আমার ভেতরে এইগুলা কোন আলোড়ন তুলতে পারে নাই। রিফাত ভাইয়ের এই বইটা তো বেশ আলোচিত, এইটারে যদিও রিফাত ভাই শাহবাগ বিষয়ে না বলে মনে করেন, এই বইয়ের প্রায় লেখাগুলো আমার পড়া। এইটার অবজারবেশনগুলোরে আমার বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হইছে।

মাসুদ জাকারিয়া: আলাদাভাবে কেন এইটারে গুরুত্বপূর্ণ মনে হল?

স্বরূপ সুপান্থ: কারণ রিফাত ভাইয়ের এই বই হুজুগের আলাপে গা ভাসায় নাই। আমার অবজারবেশনের সাথে মিলে, অনেক ক্ষেত্রেই আমি একমত হতে পারছি। তখন যেটা মনে হচ্ছিলো, শাহবাগ ব্যাপারটা বাঙালির যে চিরায়ত স্বভাব, হুজুগে, তারই আরেকটা নির্দশন। যেটারে ইউজ করছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপিও এখানে প্রাথমিক দিকে আসছিল। পরে যখন তারা বুঝতে পারলো যে, এটা তাদের সাথে যায় না, আস্তে আস্তে সরে পড়লো। এরপর আওয়ামী লীগ এটাকে শুষে যতটুকু ইন্টারেস্ট নেয়ার, নিয়ে, ছুড়ে ফেলে দিলো। একদম ছোট থাকতে, কুতুবদিয়ায়, ক্লাস ফোরে কি থ্রিতে পড়তাম, বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়া শিশুতোষ কিছু অভিজ্ঞতা হইছিল। তখন অসহযোগ আন্দোলন টাইপের কিছু চলতেছিলো এরশাদের বিরুদ্ধে। দ্বীপ এলাকা। ওখানে তো কোন গাড়ি পাওয়া যাওয়ার কথা না। মাঝে মাঝে কয়েকটা জিপ দেখা যাইতো। আর বাকি সব রিকসা। নব্বই সালের ঘটনা। তখন রিকসা পর্যন্ত চালাইতে দিতো না যারা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করতেছিলো। তো, আমরাও ইন্টারেস্টেড হয়ে, এই কাজে যোগ দিই। একটা রিকসা আসতেছিলো, ওইটারে কাদার মধ্যে ফেলে দিই। এখানে আমরাও হাসছি, যে রিকসা চালক, সেও হাসছে। সামটাইমস আমার মনে হয়েছে, এই যে শাহবাগ আন্দোলন, ওখানে যারা গেছে, তারা খুব গভীরভাবে রাজনৈতিক ভাবনা থেকে ওখানে গেছে তা কিন্তু না। আমার কাছে মনে হইছে, এটা সময়ের একটা সম্মিলিত ফেনা, ঐ যে রিকসা ফেলে দেওয়া আমার মত। ভাত যখন ফুটে তখন পানি যেমন উৎরায়, ঠিক একই রকম ঘটনা এটা। আবার পাশাপাশি হেফাজতের যে জমায়েত, এটাও আমার চট্টগ্রামে দেখার সুযোগ হইছে। আমি একটা এমবিএ কোর্স করতাম। ওখানে একটা অনুষ্ঠান চলতেছিলো, বাওয়া স্কুলের মাঠে। আমরা একটা ব্যান্ড দলও নিয়ে গেছিলাম। অনুষ্ঠান যখন শুরু করবো তখন দেখলাম, দলে দলে ছেলেপুলে এসে জমায়েত হচ্ছে বাইরে। তো আমি কাছে, তাদের ভেতরে গিয়ে দেখলাম, তাদের কয়েক জনের সাথে কথাও বললাম। এটাও খুব ভাব থেকে সবাই আসছে এমন না। অধিকাংশই আন্দোলন কী জিনিস সেটা না বুঝেই আসছে। দুইটা আন্দোলনের ক্ষেত্রেই এই কথা আমার কাছে সত্য মনে হইছে। এগুলা আসলে কোন কনক্রিট আন্দোলন না।

মোকাররম হোসাইন: আপনার যে আন্দোলনের উপর থেকে আস্থা চলে যাওয়া এইটা তো আন্দোলনের ভিতরে মানুষের কিছু কর্মকান্ডের কারণে। আন্দোলনের উদ্দেশ্যকেন্দ্রিক না। এর যে মূল দাবী, যেমন ফাঁসি, এর ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

রিফাত হাসান: স্বরূপের অবস্থানটা ইন্টারেস্টিং। আমারো অবশ্যই জানার ইচ্ছে আছে। আপনি প্রথম দিকে নিতান্ত হুজুগের বসে পত্রিকা করলেন আর যোগ দিলেন বলে জানাচ্ছেন। ইন্টারনাল কনফ্লিক্টরে গুরুত্ব দিচ্ছেন, লক্ষ্যটারে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছেন?

স্বরূপ সুপান্থ: দেখুন এখানে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করি, শাহবাগ একটা রাজনৈতিক আন্দোলন। কেউ না বললেও এটা বিশ্বাস করতে হবে। তারা যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় এভাবে আন্দোলন শুরু করার এটা আওয়ামি লীগের ইন্টারেস্টের সাথে মিলে যায়। আমি যেটা বলছি, যারা ওখানে গেলো তাদের আইডেনটিটি কী? আওয়ামী লীগ, বিএনপির কিছু উদারপন্থি যারা মনে করে যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করলে অসুবিধা নাই। আর বামপন্থীরা। তারা যেহেতু যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে বিচার চায়, তো এটা আওয়ামী লীগের ইন্টারেস্টের অনুকুল। এই শিকড় থেকে বলা যায় বা মানুষ বলবে, এটা আওয়ামী লীগের উস্কে দেয়া আন্দোলন। এই আন্দোলনে জামাত শুরু থেকেই অনুপস্থিত। আর এটাই স্বাভাবিক। এই ঘটনাগুলারে স্কিপ করে আমি কোথাও যাইতে পারবো না, কোন কনক্লুশনে আসতে পারবোনা। কারণ এই ঘটনাগুলো এখনো বিভিন্নভাবে চলমান এবং এর ইম্পেক্টগুলাও বর্তমান। রিফাত ভাই আওয়ামী লীগের মাহবুবুল আলম হানিফের রেফারেন্স ধরে বলছেন, শিবিরের ছেলেরাও যাতে যুদ্ধাপরাধের বিচার মানবে, মেনে নিবে, এই ধরণের সম্ভাবনা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রিফাত ভাই যেইটা বলছে, এইটা কোয়াইট ইমপজিবল। শিবির কখনোই নিজেদের অগ্রজ নেতাদের বিচার চাইবে না।

রিফাত হাসান: কিন্তু এইটা হইছে তো। যুদ্ধাপরাধিদের বিচার ইস্যুতে জামাতের ছাত্রসংগঠন শিবিরের মধ্যে ফ্রাকশন হইছিল। একটা গ্রুপ পদত্যাগ করছিল। এরকম নিউজ তো পত্রিকাতেই আসছে। তার মানে হচ্ছে এইটার একটা সম্ভাবনাও দাঁড়িয়েছিল।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ, এইটা শোনা গেছে। আমি খেয়াল করেছি। একটা পক্ষ কিন্তু অল টাইম সরকারের সাথে লিয়াজোঁ করছে।

রিফাত হাসান: এইটা কিন্তু লিয়াজোঁর প্রশ্ন না। একই সাথে নিজের দলের নেতাদের বিচার প্রশ্নে আপনি যেই কনসেনসাস অসম্ভব বইলা মনে করছেন, তার আলাপ। আপনি এই ধরণের ভাবনা সম্ভব না বলেছেন।

স্বরূপ সুপান্থ: যাই হোক, রিফাত ভাইয়ের কাছে প্রশ্ন। বাংলাদেশে বিচারের যে সংস্কৃতি, আফটার লিবারেশন, বিচার বিভাগের যে কার্যক্রমগুলো, রাজনৈতিক বলি বা অরাজনৈতিক বলি, সেই সব প্রক্রিয়ার মধ্যে শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধের বিচারটা কেন জাস্টিফায়েড হতে হবে? যেখানে টোটাল বিচার ব্যবস্থাটাই জাস্টিফায়েড না। বা, ইন জেনারেল একটা কথা আমাকে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থা কোন বিচারটার সুষ্টু সমাধান দিতে সক্ষম হইছে?

রিফাত হাসান: অতি সাধারণিকরণ হল না? ধরুন, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটা গলদ তো আছেই। এইটা সিস্টেমের সমস্যা। বা দুর্নীতি আছেই। এইসব নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। এগুলা তো আছেই। তাই বইলা আপনি ন্যায়বিচার বা বিচারের সমস্যা নিয়া কথা কওয়া বন্ধ করবেন? কথা কইবেন না?

স্বরূপ সুপান্থ: কিন্তু শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচারটাকে এক পাশে রেখে বিচার করবো কেন? এটাকে আলাদা করে দেখার কারণ আছে কি?

রিফাত হাসান: দেখেন, একটা সাধারণ অপরাধ আর যুদ্ধাপরাধ, চরিত্রগতভাবে এক জিনিস না। এইটা বুঝতে হবে সবার আগে। শুধু যে এক জিনিস নয়, তা না। আপনি যেভাবে বলছেন শুরু থেকে যে, হেফাজতের আন্দোলন বা গণজাগরণের আন্দোলন এইটা কোন আন্দোলনই না। এই না হওয়া সত্বেও আপনি বলছেন যে, ১৯৭১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বা আজকে থেকে আগামী চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত আমাদেরে এর ফলাফল ভোগ করতে হতে পারে। এই যে এইটার কারণেও এই বিচার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, আপনি এই গুরুত্ব ইগনোর করতে পারেন না। জাস্টিস তো ওভারঅল কনসার্নের বিষয়, সিস্টেমের আলাপ, কিন্তু আপনি যখন কোন স্পেসিফিক ইস্যু নিয়ে আলাপ করবেন, বলতে পারেন না যে, এটাই কেন শুধু আলাপের বিষয় হচ্ছে। কেন ওভারঅল জাস্টিস নিয়া আলাপ করেন না ইত্যাদি। দুইটা ক্যাটাগরিক্যালি আলাদা আলাপ, যদিও ওভারলেপ করে, রিলেটেড কনসেপ্ট হওয়ার কারণে।

স্বরূপ সুপান্থ: যুদ্ধাপরাধের বিচাররে অন্যান্য বিচারের থেকে আলাদা দেখার কারণ কি রাজনৈতিক?

রিফাত হাসান: না, শুধু রাজনৈতিক না। এইটার চরিত্রের কারণে এইটারে আলাদা করে বিচার করতে হবে। এই বইটাতেই এইটা নিয়ে একটা লম্বা আলাপ আছে, একজনের সাথে ফেসবুকের চ্যাট হিস্ট্রি আমি তুইলা দিছিলাম, তার অনুমতিক্রমে।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ, এইটা আমি পড়ছি, একটু একটু মনেও আছে।

রিফাত হাসান: তাইলে তো আপনার কিছুটা মনে থাকার কথা, এই বিষয়েই আলাপ। এই বিচারের চরিত্র অনেক কারণেই অন্য যে কোন বিচার থেকে আলাদা। প্রথমত এইটা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের, সৃষ্টির আগের ঘটনা। রাষ্ট্র গঠন মুহূর্তে যেসব ঘটনা আর অপরাধগুলা, সেই অপরাধগুলোর সাথে রাষ্ট্র গঠনের পরের ঘটনা ও অপরাধগুলোর চরিত্রগত পার্থক্য আছে। একটা হচ্ছে, আপনি একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের টেরিটরিতে বসে ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ভেতরে ও অধীনে অপরাধ করছেন। আরেকটা হচ্ছে, রাষ্ট্র গঠন কীভাবে হচ্ছে না হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনি এওয়ার না, সে অবস্থায় আপনি যা করছেন। ধরুন, অপরাধ মানে তো সংজ্ঞায়ন, আইনের সংজ্ঞায়ন। আইনের সংজ্ঞায়নের আগে এইটা কীভাবে অপরাধ হবে? আর আইন তো কর্তৃত্বের আগে না। আমি এইটারে দার্শনিক মুহূর্ত বলি। এটি অন্য কোন সাধারণ মুহূর্তের সাথে মেলে না।

মাসুদ জাকারিয়া: রাষ্ট্রগঠনের পরের অপরাধের ব্যাপারে?

রিফাত হাসান: হাঁ। রাষ্ট্রগঠনের পরের অপরাধ, মানে যে কোন সাধারণ ঘটনা, যেইটা কোন সার্বভৌমত্বের টেরিটরিতে সংগঠিত হইছে, তার ব্যাপারে আসা যাক। আপনি যখন বিচার করবেন কোন একটা ঘটনার, আইনের সাধারণ ম্যাক্সিম হচ্ছে কোন আইন দিয়ে বিচার শুধু সেই ঘটনারই করা যাবে, যা আইন তৈরীর পরে ঘটেছে, আগের কোন ঘটনা না। এর কারণ, এথিক্যালও। অপরাধ সংগঠনের সময়ে উনি এই আইন সম্পর্কে জানতেন না বা এইটার অপরাধ হওয়া বা কতটা অপরাধ হবে, তার সম্পর্কে উনার অজ্ঞান। ধরেন, প্রকাশ্যে মদ নিষিদ্ধ হল, এই নিষিদ্ধ হওয়ার আগে কেউ প্রকাশ্যে মদ খাইছে, এমন কারো বিচার এই নির্দিষ্ট আইনে করতে পারবেন না, এইটা এথিক্যাল প্রশ্ন। এই জন্য রেট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট বইলা একটা কথা আছে, কখনো কখনো আইনের মধ্যে বলা থাকে, যে, এই আইন অমুক দিন থেকে ইফেকটিভ বইলা ধরে নেওয়া হবে। যদি এমন লেখা থাকেও, এইটা একটা এথিক্যাল প্রশ্ন যে, আপনি এই ধরণের রেট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট দিয়ে কোন আইন করতে পারেন কিনা। এইটা আইনের একটা বেসিক তর্ক।

স্বরূপ সুপান্থ: তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে আপনার মূল বক্তব্য কী?

রিফাত হাসান: এইটা তো স্পষ্ট, আমি সব সময়ই বলেছি। এখানে, বিচার যে হতে হবে, এইটাও একটা এথিক্যাল প্রশ্ন। অপরাধ তো ঘটেছে, তার বিচার কীভাবে হবে, তার প্রশ্নে এইসব আলাপ। বিচার বন্ধ নিয়া এই আলাপ না। তো, সেই সময়ে দালাল আইন করা হইছিল এর জন্য, এটা নিয়ে তখনকার আওয়ামীলীগ নেতা আবুল মনসুর আহমেদের ক্রিটিক ছিল এরকম, নাগরিকদের ব্যক্তিগত ভোগান্তি ছাড়াও এ আইন গোটা জাতিকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘দেশদ্রোহী’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা এনেছিল, সেটা কোন দল বা শ্রেণীর স্বাধীনতা ছিল না, সে স্বাধীনতা এমনকি যাঁরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন তাঁদেরও স্বাধীনতা। কথাগুলো আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছরের। তো, আবুল মনসুর আহমদের এই মত ও ক্রিটিক গুরুত্বপূর্ণ। আমি যে বলেছি, দার্শনিক মুহূর্ত। দেখা যাচ্ছে, মি. আহমদও তাই মনে করতেন। ভদ্রলোক মনে করতেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কনসেনসাস তৈরী হতে পারে নাই, কারণ এইটা দ্রুত শুরু হয়ে শেষ হয়ে গেছিল। তিনি আরো আগ বাড়িয়ে বলেছেন, দুনিয়ার কোন দেশে স্বাধীনতার বিরোধিতা করার অপরাধে কাউকে শাস্তি ভোগ করতে হয় নাই, হয় না। কারণ, স্বাধীনতার আগে ওটা থাকে রাজনৈতিক মতভেদ। শুধু স্বাধীনতা লাভের পরেই হয় ওটা দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহিতার প্রশ্ন। সব স্বাধীনতা সংগ্রামের বেলাতেই এটা সত্য।

মোরশেদুল আলম: আবুল মনসুর আহমদের এই বক্তব্য তো মারাত্মক। কিন্তু এইটা তো স্বাধীনতার বিরোধীতা নিয়ে, অপরাধ নিয়ে না।

রিফাত হাসান: হাঁ, কিন্তু উনি তো ক্রিটিক করছেন দালাল আইনের। এইটা খেয়ালে রাইখেন। কারণ এই আইনে এবং এই বিচারের প্রকৃতিটাই এমন যে, স্বাধীনতার বিরোধীতা এবং অপরাধ সমার্থক এবং ওভারলেপ করছিল, তাই উনার এই ক্রিটিক। এই ধরণের আলাপ বা ক্রিটিক সেই সময়ে অনেকেই করেছেন। আবুল ফজলদের নামও শোনা যায়। কথা হল, বিচারকে তো আপনি অনেকভাবে ক্রিটিক করতে পারবেন, কিন্তু বিচার তো করতে হবে। অপরাধের। তাইলে কী করবেন? এখন, তার আগে প্রশ্ন করুন, বিচার ব্যাপারটা কী? আপনি কী মনে করেন?

মোরশেদুল আলম: রিমেডি?

রিফাত হাসান: নাহ। বিচারের অভিমুখ হল জাস্টিস নিশ্চিত করা। এই ব্যাপারে যদি আপনি পরিস্কার থাকেন, তাহলে ইনজাস্টিসের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকলে এইটারে নিয়া আপনার কথা বলতে পারতে হবে। আমাদের আলাপ এই জায়গা থেকে। আমি মনে করি, এই বিচারের যে ডিলে, প্রায় অর্ধ শতাব্দী, এইটা ভিক্টিম এবং অপরাধে অভিযুক্ত, উভয়ের প্রতি ইনজাস্টিসের কারণ হইছে। তাই এই ইনজাস্টিসের আলাপটা করেই যেতে হবে, জাসটিস সম্পর্কিত আমাদের ভাব ও রেসপন্সগুলোরে প্রশ্ন করতে হবে।

মোরশেদুল আলম: এখানে একটা বক্তব্য এরকম যে, যেটা আপনি বলছেন, যেহেতু যুদ্ধাপরাধ বিচারটা অন্যান্য বিচার থেকে আলাদা, এর বিচারের পদ্ধতিও, এখানে সাক্ষ্যগুলোও আলাদা পদ্ধতিতে নেওয়া হবে। খেয়াল করেছেন কি?

রিফাত হাসান: হাঁ। দেখা যাচ্ছে, ডিলের কারণে সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবের কথা বইলা আমাদের লিগেল সিস্টেমের স্কোপগুলোরেও এই বিচারে কম জায়গা দেওয়া হইছে, আবার সঠিক প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধীই শাস্তি পাচ্ছে না। কারণ, এখানে, আলাদাভাবে এই আইন তৈরীর উদ্দেশ্য, এদের বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ, তা যে কোনভাবে প্রমাণ যাতে সহজ হয়। দীর্ঘ ডিলের কারণে,ু অপ্রতুল প্রমাণ বা সাক্ষ্যের অভাবের কারণে প্রচলিত আইনে এটা কঠিন, তাই এইটারে সহজ করে নেওয়া, যাতে শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তো এইটা করতে গিয়েই, যেইটা করা হল, সাধারণ অবস্থায় প্রমাণ হিশেবে গণ্য হবে না এমন অনেক জিনিসরে প্রমাণ হিশেবে এডমিজিবল করা। মূলত, ডিলে নিজেই একটি ইনজাসটিস, তার থেকে অপরাপর ইনজাস্টিসের জন্ম নেয়।

জুরিস্টোক্রেসি, মানে বিচার বিভাগের অভিজাততন্ত্র। এইটা আমাদের বিচার ব্যবস্থায় জেঁকে বসছিল কিছুদিন ধইরা। টোটাল বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কথা বলছি। এবং বলি। এইটা নিয়ে আলাদা আলাপ আছে আমার। এই বইতেই। সংবিধান ও আইনের প্রক্রিয়া নিয়া আলাপ আছে। এই আলাপ তো সব সময়কার। আসলে কথা হচ্ছে কি, আমাদের কাজ তো সিস্টেম ঠিক করে দেয়া না। আমরা তো এটা পারবো না। সম্ভবও না। আমার কাজ হবে, ক্ষমতার ক্রিটিক করে যাওয়া।

স্বরূপ সুপান্থ: রিফাত ভাই, সেই কথাই, যেটা আমি প্রথমেই বলছি, বিচারব্যবস্থায় গলদ আছে। আমি তাই বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থার প্রতি আঙুল তুলছি, আলাদাভাবে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে কথা না বলে।

রিফাত হাসান: নাহ, এইটা বিচার ব্যবস্থার গলদের চেয়ে এই নির্দিষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা। তাও গুড। কিন্তু ধরুন, একজিস্টিং ব্যবস্থা বা সিস্টেমের যে সমস্যা, আপনি যেইটারে অনাচার বলতে চান, তা থাকলোই। কিন্তু তার ভেতরেই যেটুক সুবিধা পাওয়া সম্ভব একজন অপরাধীর, এই বিচারে তার থেকেও বঞ্চিত করার ব্যাপার থাকলে তা নিয়ে তাদেরে কথা বলতে দেবেন না? এক্সিসটিং ব্যবস্থার ভেতরে যে সুযোগ সুবিধা, তার থেকে তো তাদের বঞ্চিত করতে পারেন না আপনি। তার থেকে বেশি সুবিধা দেওয়া বা পুরো সিস্টেমরে ঠিক করে তারপরে তাদের বিচারের কথা আসতেছে না। কিন্তু বিচার যখন করবেনই, এই বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচারের যে মানদ-, তারে তো লঙ্ঘন করতে পারেন না। এটাই আমি বুঝাইতে চাচ্ছি। আপনার ইনটেনশন হচ্ছে ফাঁসি দেয়া, ঠিক আছে ফাঁসি দিয়ে দেন। কিন্তু আপনি যদি বিচার চান, তাহলে বিচারটাই করতে হবে। বিচার করলে শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তের এটা বলার, প্রশ্ন করার, জাজ করার স্কোপ থাকতে হবে যে, আমার বিচারটা শেষ র্পযন্ত ঠিকমতো হচ্ছে কিনা।

সরূপ সুপান্থ: আপনার সাথে এ ক্ষেত্রে আমার কোন ধরনের বিরোধ নেই। এই কারণেই তো স্পেশাল ট্রাইবুনাল। আমি তো আগে থেকেই বলতেছি, এটা একটা আওয়ামী লীগের এজেন্ডা।

রিফাত হাসান: আমি মনে করি না এদেরকে এসাসিনেশন আওয়ামীলীগের এজে-া ছিল।

স্বরূপ সুপান্থ: কীভাবে বললেন?

রিফাত হাসান: দেখুন, জামাতের সাথে কি আওয়ামী লীগের এই সম্পর্ক ছিলো? নেতাদের এসাসিনেশনের? আমি যতোটুকু দেখছি, আমার এলাকায়, জামাত-শিবির আর আওয়ামী লীগ একসাথে অস্ত্র হাতে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে জিহাদ করছে। এটাই তো তাদের রাজনীতি।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ, এইটা তো আমরা জানিই। সবাই দেখেছিও।

রিফাত হাসান: তার মানে হচ্ছে, বিচার এজে-া ছিল বটে, কিন্তু আওয়ামীলীগের এজেন্ডা এসাসিনেশন ছিল না। খেয়াল করবেন, প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী প্রতীকী বিচারের কথা বলেছেন। আমার মতে, আওয়ামীলীগ এর ইন্টারেস্ট ছিল, জাস্ট রাজনৈতিকভাবে সারভাইভ করা। এইটার জন্যে ফাঁসি জরুরি ছিল না। জেল জুলুম বা অন্য উপায়ে বরং আরো গুড পারপাস সার্ভ হইতো আওয়ামীলীগের। এখানে অন্য ইন্টারেস্ট দাঁড়াইছে। শাহবাগ এর শুরু এবং শেষও এই বিন্দুতেই। তার মধ্যে, ঐ যে বল্লাম, জামাতকে আদর্শিক ভাবে মোকাবেলার একটা ব্যাপার দাঁড়াইছে। মনে রাখবেন, আদর্শিক মোকাবেলা। এইটা আওয়ামীলীগের এজে-া ছিল না।

স্বরূপ সুপান্থ: কেন?

রিফাত হাসান: আওয়ামীলীগের জামাতকে আদর্শিকভাবে মোকাবেলার কিছু নেই। আওয়ামীলীগ তো আদর্শের রাজনীতি করে না, বলেও না। জাতীয়তাবাদি রাজনীতি। জামাতকে মোকাবেলার ব্যাপার আছে যারা আদর্শের কথা বইলা রাজনীতি করে, বা চর্চা করে। পাশাপাশি আরেকটা ঘটনা দাঁড়াইছে, আমি যেইটা মনে করি, যেমন ভাবুন, শাহবাগের ব্যাপারে পপুলার পারসেপশন হচ্ছে, জনপ্রিয়তা, জনসম্পৃক্তি ইত্যাদি। এর বাইরে যে ঘটনা ঢুকে গেছে সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্র ও বহিরাষ্ট্রের বিভিন্ন সিক্রেট এজেন্সিগুলোর তৎপরতা ও ইন্টারেস্ট। তাদেরও প্রজেক্ট ছিলো, এই প্রজেক্টগুলার কারণে এদেরকে এসাসিনেশনে এত তাড়াহুড়ো করা হইছে বইলা অনেকের অনুমান।

স্বরূপ সুপান্থ: রাইট। এইসবও তো আছেই। তার উপরে আমি যেইটা বলতেছিলাম, বাংলাদেশে আপনি বিচার ব্যবস্থার সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলা দরকার। এদেশের বিচার ব্যাবস্থার সিস্টেম, প্রক্রিয়া, ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট কথা বলার আছে। তো বাংলাদেশে বিচার বিভাগ সরকারের ইনটারেস্টের বাইরে যাইতে পারে না। ফলত, এখানে মানবতাবিরোধী বিচারে অনাস্থাটা স্বাভাবিক। এটা নিয়ে কথা বলতে গেলে তো, টোটাল বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ করতে হবে।

মোরশেদুল আলম: জুরিস্টোক্রেসি নামে একটা শব্দ বলেন না আপনি?

রিফাত হাসান: হাঁ। জুরিস্টোক্রেসি, মানে বিচার বিভাগের অভিজাততন্ত্র। এইটা আমাদের বিচার ব্যবস্থায় জেঁকে বসছিল কিছুদিন ধইরা। টোটাল বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কথা বলছি। এবং বলি। এইটা নিয়ে আলাদা আলাপ আছে আমার। এই বইতেই। সংবিধান ও আইনের প্রক্রিয়া নিয়া আলাপ আছে। এই আলাপ তো সব সময়কার। আসলে কথা হচ্ছে কি, আমাদের কাজ তো সিস্টেম ঠিক করে দেয়া না। আমরা তো এটা পারবো না। সম্ভবও না। আমার কাজ হবে, ক্ষমতার ক্রিটিক করে যাওয়া।

স্বরূপ সুপান্থ: রাইট। আমি এই জায়গাতেই কথা বলছি।

আলভি চৌধুরী: এই বিচারের আর একটা দিক বলি, রিফাত ভাইরা বিভিন্ন সময় বলেওছেন। জামায়াত নেতা সাঈদীর যখন রায় হয় তখন দুই থেকে তিন মাসের ভিতরে প্রায় কয়েকশ মানুষ মারা গেছে। ওরা প্রটেস্ট করতেছিল।

স্বরূপ সুপান্থ: আরো বেশি। এইটা তো মিডিয়ার হিশেব।

রিফাত হাসান: হাঁ। একটা কথা বলা হয় যে, পুরো পাকিস্তান পিরিয়ডে, পঁচিশে মার্চের আগ পর্যন্ত, বাংলাদেশে পাক বাহিনী এতো মানুষ হত্যা করে নাই, তিন মাসের এই প্রটেস্টে যতগুলা মানুষ মারা গেছে। এখন এই জীবনগুলোর মানে কী? এরা কি মেটার করে না কিছুই? মুজাহিদ বা সাইদীর জীবন কি একাই গুরুত্বপূর্ণ। এই মানুষগুলোর জীবন কি গুরুত্বপূর্ণ না?

মোরশেদুল ইসলাম: ঝিনাইদহে সাঈদীর মুক্তির দাবীতে গ্রামের নারীদের একটি মিছিল হয়। আপনি তখন নারীবাদ নিয়ে কথা বলেছেন।

রিফাত হাসান: হাঁ। আপনি খেয়াল করবেন, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নটাকে অনেকভাবে আনা হয়। তো, সেই সময়ে দেখা গেল কি, ঝিনাইদেহের হরিণাকুন্ডু গ্রামের প্রচুর নারী ঝাঁটা আর লাঠি নিয়ে মিছিল করেছে সাঈদীর মুক্তির দাবিতে, আর পুলিশের প্রতিরোধ ও পিটুনির সম্মুখিন হইছে। এই ঘটনারে সমস্ত মিডিয়া দেখাইছে জঙ্গি তৎপরতা হিশেবে। এইটাতে পুলিশ হামলা করল, নারীরা আহত, রক্তাক্ত হল, তখন আমি প্রশ্ন করছিলাম, এইটারে কেন নারী প্রশ্ন হিশেবে ডিল করে না নারীবাদিরা। এই ঘটনা অবশ্যই শুধুমাত্র সাঈদীর মুক্তির দাবীতে আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে না, দেখবেন গারমেন্টস শ্রমিকরা যখন পুলিশের পিটুনির শিকার হয়, তখন নারীবাদ আলাপ করে না। মানে নিন্মবর্গ। বাংলাদেশে নারীবাদীদের দুইটা অবস্থা পরিস্কার হয় এখানে। একটা, ওদের এলিট অবস্থা, যা গ্রাম্য বা নি¤œবর্গের নারী প্রশ্নরে নিজেদের প্রশ্ন মনে করে না, থোড়াই কেয়ার করে। আর একটা হল অরথোডক্স মৌলবাদিতা, যে, সাঈদীর ভক্ত বা অশিক্ষত গারমেন্টস শিল্পের নারীরা নারীবাদের আগ্রহের বিষয় হতে পারে না।

স্বরূপ সুপান্থ: এই জায়গা থেকে আপনার যে ক্রিটিকগুলা, আই অলওয়েজ সেলুট। তবে আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, এই কালচারটা আসলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তৈরী করে ফেলছি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিটারে। পারষ্পরিক অবিশ্বাস ও ঘায়েল নীতির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ যে কাজটা করছে সেটা ৭১ এর পর থেকে চালু। আমরা এটাকে ঠিক করে দিতে পারিনা, বড়জোড় ক্ষমতার ক্রিটিক করতে পারি।

রিফাত হাসান: ক্ষমতার ক্রিটিক তো গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজে মনে করি, আমার এই বইয়ের একটা কাজ হল, ক্ষমতার ক্রিটিক। এবং ক্ষমতার বিপরীতে, বাংলাদেশে চলমান অসহিষ্ণুতার, ইনটলারেনসের ভেতরে একটা আলাপের অবস্থা তৈরী করা। তারপরে আমি একটি গণমুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, সেটা হচ্ছে এই জায়গাটা, এখানে ওইরকম কোন চেতনা বা জাতীয়তাবাদের কোন ফেসিনেশন নেই। যেটা আছে সেটা হল, আমার উপর জুলুম হচ্ছে সেটার প্রতিকার, প্রতিরোধ। এটাই হচ্ছে গণমুক্তিযুদ্ধ, আমি মনে করি। আপনি যেইটারে বলতেছেন আনসারটেইন, এইটা হচ্ছে যথেস্ট সারটেইন একটা ব্যাপার। গণমুক্তিযুদ্ধের এই যে ভাব, এইটারে নস্যাৎ করছে নেতারা। ওদের সহযোগী হইছে বুদ্ধিজীবীরা, আমি প্রতিবিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সমাজ বলি এদেরে। গণমুক্তিযুদ্ধের দিক থেকে বাংলাদেশ বিপ্লবটাকে দেখার ব্যর্থতা হচ্ছে পুরো বাংলাদেশের ‘৭১-এর পরের ঘটনাগুলোর ব্যর্থতা। ‘৭১-এর পরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে বা যে নেতৃত্ব ছিল, তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে দুইটা ঘটনা ঘটেছে।  একটা হচ্ছে, হঠকারী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশে একটি প্রতিবিপ্লবী নাগরিক সমাজ তৈরি হয়ে গেল।  এই নাগরিক সমাজ তৈরি হয়ে যাওয়ার কারণে, হলো কী, বাংলাদেশ বিপ্লবের পর যেইটা সম্ভাবনা ছিল, তারুণ্যের মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, সাহিত্যের মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, অপরাপর ঘটনাগুলোর ভেতরে যে সম্ভাবনাগুলো ছিল, এই সম্ভাবনাগুলো থেমে গেল । এই প্রতিবিপ্লবী নাগরিকসমাজের প্রতিনিধি হিশেবে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণীর ভাবনা-চিন্তার একটা বড় স্রোত একাত্তর থেকে এ পর্যন্ত সুবিধাবাদী। আমাদের ভেতরে যেইটা বুদ্ধিজীবীতা, তা সবসময় এই যে প্রতিবিপ্লবী নাগরিক সমাজ কায়েম হয়েছিল, তাদের সাথেই তাল মিলিয়ে চলেছে এবং এই বুদ্ধিজীবীতা আসলে তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে সবসময়।  বুদ্ধিজীবীরা কখনোই, যারা গণমুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের প্রতিনিধি ছিল না।  সবসময় প্রতিনিধি ছিল তারা, যারা প্রতিবিপ্লবী হয়ে এই বিপ্লবর প্রতিপক্ষ হয়ে সব সময় কাজ করেছে, তাদের। ফলত, স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে মৌলিক ভাবনা ও বুদ্ধির চর্চা অনুপস্হিত এখানে।  আবার যারা এই সুবিধাবাদের বাইরে, তারা সিরিয়াসলি ভাবতে ইচ্ছুক নন, সরল ও অবিকশিত থেকে গেছেন।  যে যার রোমান্টিক জায়গায় সীমাবদ্ধ, কুপমণ্ডুক।  রাষ্ট্রের কোন ঐতিহাসিক পর্যালোচনা দাঁড় করাতে অক্ষম।  যার কারণে আমরা সব সময় অতীতচারি, স্মৃতিকথক, কোন বোঝাপড়ায় নেই।  এই শ্রেণীর রাষ্ট্রবাসনার জায়গায় যে গোলযোগ তৈরি হয়ে আছে, তার ফলে রাষ্ট্রের পরিণত, মৌলিক, গতিশীল ও অবজেক্টিভ ক্রিটিক দাঁড়ায় নাই।

স্বরূপ সুপান্থ: হাঁ, এরা সবাই মিলে একটা প্রচারণার অংশ হয়ে গেল যে, এইটাই মুক্তিযুদ্ধ এবং এইটাই এর চেতনা। এই জায়গা থেকেই বিচারটা হল, বাস, কথা তো এটাই।

রিফাত হাসান: হাঁ। এই যে মুক্তিযুদ্ধরে গণহিস্ট্রিয়া বানিয়ে নিল এরা, এইটার বাইরে বেরিয়ে ভাবতে হবে। আমি এইসবগুলোরে রিলেট সব সময় এক জায়গা থেকেই করি, জাস্টিস। জাস্টিস কোয়াশ্চেন। মূলত এইটাই গণমুক্তিযুদ্ধের টোন। এই ব্যাপারে আমি একটা কথা বলি সব সময়। মূলত বাংলাদেশের উত্থান মুহূর্তে ভূমিকা পালনকারী দৃশ্যমান দুটি শ্রেণী, বুর্জোয়া (সরলিকৃত অর্থে) মধ্যবিত্ত শ্রেণী-উদ্ভূত পলিটিক্যাল এলিট এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারী ইন্টালেকচুয়াল এলিট; উভয়ের পাকিস্তানি হেজিমনির বিরুদ্ধে যে দৃশ্যত অবস্হান ছিল, তা বাংলাদেশ-বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তার চরিত্রের মৌলিক কোন ট্রান্সফরমেশন ঘটাতে পারে নি।  এরা এই গণমুক্তিযুদ্ধের বাইরে থেকে গেছে। ফলে এই উভয়বিধ শ্রেণী বাংলাদেশ-বিপ্লবের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ- হাজার বছরের লড়াই, সংগ্রাম ইত্যাদির ভেতরকার নানা বাঁক, টানাপোড়েন ও শক্তির জায়গাগুলো- ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।  ফলত রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মরে সব সময়ই এই আইসোলেটেড জায়গা থেকে বিচারের পাল্লাটা ভারি। ধর্ম, ইসলাম বা ইসলামগন্ধের যে কোন কিছুরেই একরৈখিক স্কেল দিয়ে মাপতে অভ্যস্ত সবাই। মাপার স্কেল যেহেতু তাদেরই হাতে, তারা নিজেদের ইচ্ছেমতই মাপেন। এইটা মূর্খতা ও গোয়ার্তুমি বিশেষ। সমাজ থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা। অথচ সমাজ খুব সজীব জায়গা, রাষ্ট্রের বাইরে এইটার অন্য যে ডাইনামিকস ও শক্তিমত্তার জায়গা আছে, তা উনারা বুঝতে অক্ষম। ফলত জামাতে ইসলাম বলুন আর হেফাজতে ইসলাম, উনাদের কাছে সবই এক। যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রশ্নরেও ওরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের চেয়ে জামাত রাজনীতি বা ইসলামি রাজনীতিরে বিচারের টুলস হিশেবে নিয়েছে। অন্তত বুদ্ধিজীবীকুল। হেফাজত প্রশ্নেও তাদের অবস্থান অন্ধের হাতি দর্শনের মত। অথচ উভয়ই দুই প্রান্তের ব্যাপার। ফলত বাংলাদেশে সামাজিক মুভমেন্টেগুলোর ভেতরকার ডাইনামিকসগুলো ধরতে উনারা ব্যর্থ। এখন উনারা যে ভাষায় ওদের বিষয়ে কথা বলেন, তা অনেকটা ক্লাসিক্যাল এন্থ্রপলজিস্টদের একটি বিশেষ ঘরানার গবেষণা পদ্ধতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যা ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রাখা বা সম্প্রসারণের প্রয়োজনে যাবতীয় জ্ঞানীয় টুলস সরবরাহ করেছিল।

(চলবে)


Eprokash Feature

ফিচার

개발 지원 대상