মারুফ আদনানের ইন্টারভিউ

img

মারুফ আদনানের অনলাইন একজিবিশন শো ‘পৃথিবীর নুন’ চলছে ইপ্রকাশ ডট কমে, চলবে মাসব্যাপি। একজিবিশনসহ আর্টসংক্রান্ত বিষয়ে ইপ্রকাশের সাথে কথা হয় আর্টিস্টের সাথে। আসুন পড়ি মারুফ আদনানের ইন্টারভিউ।

ইপ্রকাশ আর্টস: ইপ্রকাশে চলছে আপনার প্রথম অনলাইন আর্ট একজিবিশন শো ‘পৃথিবীর নুন। একজিবিশন সম্পর্কে কিছু বলুন। 

মারুফ আদনান: হ্যাঁ, এটা আমার প্রথম অনলাইন একক প্রদর্শনী। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এরকম আয়োজন বেশ সহজ আর কার্যকরী। লোকজন ছবি দেখে, প্রতিক্রিয়াও করে। যারা ছবি আঁকছে তাদের সুবিধা এতে। 

ইপ্রকাশ আর্টস: একজিবিশনটির নাম ‘পৃথিবীর নুন’রেখেছেন কেন?

মারুফ আদনান: নামটা দিয়েছি দুই হাজার চৌদ্দতে নির্মিত Wim Wenders এবং Juliano Ribeiro Salgado’র তথ্যচিত্র  ‘Salt of The Earth’ এর নামানুসারে। পুঁজিবাদ মানুষের শারীরিক অস্তিত্ত্বকে কতো নির্মমভাবে ব্যবহার করে তাই সিনেমার মূল বিষয়। মানুষ শারীরিক অস্তিত্ত্বের শর্তে যাপিত জীবনে সময় ও স্থান অতিক্রম করে। আর সময় ও স্থানের মধ্যকার প্রভাবক সমূহের বিদ্রুপার্থক ব্যাখ্যার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত উপকরণের দিক থেকে এই সিনেমা ও তার নাম খুব মানায় বলেই মনে করি।

ইপ্রকাশ আর্টস: কয়টি কাজ নিয়ে এই একজিবিশন? 

মারুফ আদনান: মোট পনেরটা ছবি প্রদর্শনীতে আছে।

ইপ্রকাশ আর্টস:  কোন কোন মিডিয়া ইউজ করেছেন?

মারুফ আদনান: আমার মূলত ড্রইং’র দিকে ঝোঁক থাকায় কলম কালি এসবই বেশি ইউজ করি। তবে প্রদর্শিত ছবিগুলোতে কিছুটা কোলাজ ধর্মী গ্রাফিক্যাল কাজও করেছি।

ইপ্রকাশ আর্টস: কাজগুলোতে শীশুসুলভ ড্রয়িং এর ঝোঁক দেখা যায়। এই আর্টওয়ার্কগুলোর দর্শন সম্পর্কে ইপ্রকাশের পাঠক-পাঠিকার জন্যে কিছু বলুন।

মারুফ আদনান: এই প্রদর্শনীর ছবিগুলোর দর্শন আর আমার অন্যান্য কাজের দর্শন ওভাবে আলাদা করা যাবে না। একজন  শিল্পীর তো জীবন-যাপনে চর্চায় মননে একধরণের ব্যক্তিক নির্দিষ্টতা থাকেই, থাকতে হয়। ব্যাপারটা নন-আর্টিস্টদেরও থাকে, কিন্তু কোন কার্যকলাপে হয়তো প্রকাশ পায় না বলে বোঝা যায় না, তবে শিল্পীদেরটা (শিল্পের সব শাখার কথা বলছি) চোখে পড়ার কারণ হতে পারে তাদের এক্টিভিজম ও চিন্তাভাবনার একটা বস্তুগত বা ভাবগত উপকরণ সমাজের কোথাও না কোথাও প্রভাব রাখে। শিশুদের সমস্ত কার্যকলাপেই জানা না জানার কোনো ব্যাপার নাই। যুক্তির গলি খোঁজার তাড়া নাই। নেই কোনো অর্থবোধকতার চাপ। তাদের সরল স্বাভাবিক আর প্রিমেটিভ যে আচরণ তা আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে পরিবার সমাজ রাষ্ট্রের ভেতর বেড়ে উঠতে গিয়ে। যতো জানা হয় সব কিছু ততই কঠিন হয়। আসে অর্থ খোঁজার ও নির্মাণের দায়। এটাই বাস্তবতা। বস্তুত এই বাস্তবতার ভেতর মানুষ বেঁচে থাকে বটে তবে সম্পূর্ণ ইচ্ছাশূন্য অবস্থায়। আপনার হাঁটা, তাকানো, কথা বলা সবই অন্যের নিয়ন্ত্রনাধীন। এই শ্বাসরুদ্ধ অস্তিত্ত্বের ধারক হলো শরীর। এখানে শরীরই একমাত্র প্রাসঙ্গিক যার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে কতোদিন আপনি সারভাইভ করবেন। বৌদ্ধের দর্শন ছিলো অন্যের সেবার জন্যই নিজের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখা আর এখানে শরীর টিকিয়ে রাখা পুঁজির বৃদ্ধি সাধনে। আর সাথে সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে আছে রাজনীতি। পুঁজি আর ক্ষমতা চায় মানুষ মানসিক অনুভূতি ভুলে শারীরিক অস্তিত্বে মনযোগী হউক, এতে তাদের টিকে থাকা দীর্ঘায়িত হবে। প্রদর্শিত ছবিগুলোতে আমার ব্যক্তিক উপস্থিতিকে বিদ্রুপাত্বকভাবে দেখা গেছে। পাশাপাশি আরো কিছু এলিমেন্টস আছে যাদের অর্থ বা যৌক্তিকতাকে যতটা পারা যায় বিবর্জিতভাবে দেখানো হয়েছে।

ইপ্রকাশ আর্টস: কাজগুলো কখনকার করা?

মারুফ আদনান: সতেরো সালে করা। এই ধরণের কাজ করেছি টানা তিন মাসের মতো।

ইপ্রকাশ আর্টস: আপনার কাছে আর্টের মিনিং কি? শিল্প কি?

মারুফ আদনান: ‘শিল্প কী’ তা সঠিক বলা মুশকিল। আর্টের সংজ্ঞা তো খুব আপেক্ষিক। শিল্প হতে পারে একক কোনো ইমেজ বস্তু শব্দ আচরণ কিংবা প্রবণতা যা চেনা পরিচিত পরিবেশ বা স্বাভাবিকতাকে ব্রেক করে। আর যারা শিল্পচর্চা করে থাকেন কিংবা এ নিয়ে ভাবেন-পড়েন তাদের এক ধরণের সেন্স বা প্রবণতা তৈরি হতে পারে যার ফলে ‘ইমেজ বস্তু শব্দ আচরণ কিংবা প্রবণতা’ এ বিষয়গুলোর মৌলিকত্ব টুকু বুঝে নিতে পারেন। তবে আমি যেসব কথা বললাম তা কালে-স্থানে পাল্টেও যেতে পারে। আমাদের এই অঞ্চলের বড় একটা সমস্যা হলো  শিল্প চর্চার সাথে রিলেটেট মানুষ ছাড়া খুব কম মানুষই আছেন যারা শিল্পের মেজাজ নিজেরাই বুঝেন, এমন কী শিল্পের সাথে জড়িত অনেকে আছেন যারা সময় উপযোগী শিল্প চর্চার ব্যাপারটাকে ঠিক নিজেদের সাথে এক করতে পারেন না। তবে ঠিক যে কন্টেম্পোরারি আর্টের ব্যাপারে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন এখন। এখানে ফিল্ম মেকার, কবি-সাহিত্যিক বা মিউজিশিয়ান খুব কম লোক আছেন যারা ভিজুয়াল আর্টটাকে ভালো বোঝেন। আবার কেউ আছেন ফাইন আর্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের না হয়েও এক্ষেত্রে ভালো দক্ষতা আছে। 

ইপ্রকাশ আর্টস: বর্তমানে বাংলাদেশের  আর্ট কালচার নিয়ে কিছু বলুন।

মারুফ আদনান: আঞ্চলিকতা আছে এখানে। কাজের মুড বা টেনশন দেখে ঢাকা চিটাগং’র কাজ আলাদা করা যায়। নতুন মিডিয়ার প্রাকটিস হচ্ছে। গ্যলারী ভিত্তিক শো’র পাশাপাশি বেশি পাবলিক রিলেটেট মিডিয়া গুলোর চর্চা বাড়ছে।পারফরম্যানস আর্ট, সাইট স্পেসিপিক আর্ট, ল্যান্ড আর্ট, ভিডিও আর্ট, স্থাপনা শিল্প, সাউন্ড, ঘ্রাণ, আলো, আরো নিত্য নতুন বিষয় যোগ হচ্ছে শিল্পের জগতে। উত্তর আধুনিক বিহেভিয়ারের অন্যতম শর্ত শিল্পের পণ্যগুণ লোপ করা যা এসমস্ত শিল্পের ধরণে বেশ লক্ষণীয়। একাডেমি কেন্দ্রিকতা বোধয় কমছে, অন্যদিকে অনেকে আর্টকে প্রফেশনালি ইউজ করার উপায় বের করছে। বলা যায়  পুরুষ্কার কালচারটা ছাড়া আর্টের অন্যসব পরিবর্তন সময়ের বিচারে ভালোই।

ইপ্রকাশ আর্টস: আর্টের যে ডিজিটালাইজেশন- যেমন ভিডিও ইফেক্ট, ফটোগ্রাফি মেনুপুলেশন, সাউন্ড ইফেক্ট, অনলাইন একজিবিশন শো ইত্যাকার নতুন নতুন মিডিয়াগুলোকে আপনার কেমন লাগে?

মারুফ আদনান: প্রযুক্তির ব্যবহার আর্টে নতুন মাত্রা এনেছে। যদিও আর্টে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আর্টের জন্য সময়োগযোগীতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিজ্ঞান আর আর্টের সম্পর্কের নান্দনিকতা স্থাপত্যগুলোতে তো দেখা যায়ই। ইমেজ ফর্ম বিজ্ঞান নানা উপায়ের কোলাজ বেশ মজার। আমার নিজেরও কিছু প্রযুক্তি নির্ভর কাজ করার পরিকল্পনা আছে।

ইপ্রকাশ আর্টস: আপনার নেক্সট কি কি কাজ আমরা দেখবো?

মারুফ আদনান:  ড্রইং বেইজ কাজ তো করি। শো ভিত্তিক স্থাপনা শিল্পের কিছু পরিকল্পনা আছে। ভিডিও আর্ট করার প্ল্যানও আছে, দেখা যাক।

ইপ্রকাশ আর্টস: অনেক অনেক ধন্যবাদ ইপ্রকাশকে সময় দেয়ার জন্যে।

অনলাইন একজিবিশনটি দেখতে ক্লিক করুন।


Eprokash Feature

ফিচার

개발 지원 대상