ফটোগ্রাফার

img

তরুণটির সামনে দিগন্ত প্রসারিত শেষ বিকেলের সমুদ্র। সূর্য ইতিমধ্যে রক্তিম কুসুমের আকার নিয়ে ফেলেছে। ঐ পড়ন্ত সূর্যের দিকে  বিষণ্ণ তাকিয়ে সে, তবু মনে হয় আসলে কোনও কিছুর পানে চেয়ে নেই। হাতের সিগেরেটটি জ্বলে আছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই।
তার কাছেই জেলেরা ঘরে ফিরছে,
ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে,
কিছু পর্যটক সৈকতে নিশ্চুপ হেঁটে বেড়াচ্ছে,
সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কিছু কানে এসে পৌঁছে না।

হাত পা ছড়িয়ে সে বাঁধের পাথরগুলোর ‘পরে বসে আছে। ২৪/২৫ বছরের তরুণ সে। পাশে রাখা মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলে ফিরে সে, কিন্তু উপেক্ষা করে। একটা কামেরা’র ব্যাগ আছে। নোটবুক, কলম, ক্যামেরা’র অন্যসব গেজেটও তার ভিতরে নিশ্চয়।
একটা বালতি নিয়ে ছোট ছেলেটা এগিয়ে আসে। বালতি ভর্তি নানা ড্রিঙ্কস, বিস্কুট, রুটি নানা কিছু।

- স্যার, কোক-ফানটা কিছু লাগবো ?

তরুণটি  ফিরে তাকায়, চুপ থাকে। অনুরোধের সুরে আবার জিজ্ঞেস করে,

- চা বিস্কুট কিছু খাবেন স্যার?

- শুধু  চা নিয়ে  এসো, আর কিছু না।
ছেলেটি ফিরে যায়। তরুণটি সিগেরেটের নিভে যাওয়া অংশটি ফেলে দেয়। প্যাকেট থেকে আরেকটা বের করে, ধরাতে চায়। কিন্তু বাতাসের কারণে পারে না। তার সিগেরেটের অভ্যাস বেশিদিনের নয়। তাই, তীব্র বাতাস আগুন জ্বালানোর কৌশলটা রপ্ত হয়নি। ফোনটা আবার বেজে ওঠে,  স্ক্রিনে লেখা ‘অফিস’।

__________ 

একটা পাহাড় ধ্বসের এলাকার কাছে। লোকজন ছুটোছুটি করছে। একপাশে কেবল দুজন মানুষ।

- এইটা কোন কাজ হলো, শুভ ? 
শুভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, তার শরীর বৃষ্টি, কাদায় মাখামাখি। অন্যজন তখনো খুব রেগে আছেন।

- পুরা ইভেন্টাই তুমি শেষ করে দিলে।

- ধ্যাত্‌ !  নো নিউজ, নো কভারেজ। নাথিং । 

- খোকন ভাই, আসলে -  সে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। 

- আরে রাখো তোমার এক্সপ্ল্যানাশান, কি যুক্তি থাকতে পারে এর পেছনে ?? এগুলো  হলো তোমাদের বাহানা, বুঝলা কাজ না করার বাহানা - ফালতু সব সেন্টিমেন্ট - হাজার হাজার মানুষ এই পেশায় আছে তাদের তো কিছু হয়না, নাকি তারা  অমানুষ । তাদের মন-মানবিকতা বলে কিছু নাই  ?

- আমি তো তা বলিনি, তারা দুজনই কথা বলার কোনও ভাষা খুঁজে পায় না। উদ্ধারকারী লোকজন তাদের পাশ কেটে যাচ্ছে। দুর্ঘটনা, হই হুল্লোড়, বৃষ্টি সব মিলিয়ে কেউ তাদের দিকে উৎসাহ নিয়ে তাকালেও কিছু জিজ্ঞেস করে না।
খোকন যেন থামতে চায় না। ক্ষেপে যাওয়া কণ্ঠে সে বলে চলে, 

- তোমার পত্রিকায় কাজ করা পোষায় না -  এসব ছেড়ে দেয়া উচিত। তোমরা বিশাল পয়সাওয়ালা জ্ঞানী ছেলেপেলে- বিদেশ যাও - ফ্রি ল্যান্স ফটোগ্রাফী করো -  নিজেরও লাভ হবে, অন্যেরও ক্ষতি হবে না । কেন ভাই আমার মতো রিপোর্টারের পেটে লাথি মারো ?

- প্লিজ খোকন ভাই, আমি অতো কিছু ভাবিনি। (শুভ প্রায় কেঁদে ফেলে)

দুজনই আবার চুপ।  বৃষ্টি ‘র একটানা শব্দ আর কোলাহলই শুধু শোনা যায়।  

__________ 

সম্পাদক সাহেব নিজের টেবিলে বসা, সামনে একটা ল্যাপটপ খোলা। রুমটি আলাদা হবার কারণে, অফিসের বাইরের অংশের কোনও শব্দ ভিতরে প্রবেশ করে না। শান্ত চোখে তাই সম্পাদক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সংবাদ খোঁজেন। দরজার কাছে শুভ দাঁড়িয়ে। টিভিতে নিউজ চলছে, কিন্তু কোন কারনে শব্দহীন করে রাখা হয়েছে। সম্পাদক সাহেব ব্যস্ততা শেষে দরজা’র দিকে ফেরেন। 

- ও হ্যাঁ, শুভ তোমাকে ডেকেছিলাম যেন কেন? ( মনে করার চেষ্টা করেন)  বসো । (শুভ সামনের চেয়ারটায় বসে) তারপর, তোমার কাজ কেমন চলছে। 

- ভালো। 

- আসলে এতো ব্যস্ত থাকা হয়, তোমার সাথে তেমন কোন আলাপই হয়নি। কতদিন হলো এখানে তুমি ? 

- দেড় বছর । 

- তোমার ব্যকগ্রাউন্ড ছিল কি ? জার্নালিজম ?

- না । ইংলিশ। 

- ও   

সম্পাদক সাহেব অন্য কোনও সাবজেক্ট আশা করেছিলেন। তিনি আবার স্ক্রিনে চোখ দেন, কিন্তু শুভকে খেয়াল করার চেষ্টা করেন। খুব দ্রুত মূল কথায় আসতে চান তিনি। মনোযোগ দেন।  

- খোকন কি যেন বললো - তোমরা আজ ল্যান্ড স্লাইডিঙ্গের  নিউজটা কভার করতে পারোনি। সে বললো তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন। 

শুভ চুপ থাকে। স্ক্রিনে সম্পাদক সাহেবের চোখ তখন ভুমি ধ্বসের উপর বিভিন্ন  পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা ছবি সমূহ। চোখ না সরিয়ে তিনি বলেন, 

- সব এজেন্সী দেখি  ফটোগ্রাফস কালেক্ট করেছে। 

তিনি আরও ঝুঁকে পরে গভীর মনোযোগ দিয়ে ছবি গুলো দেখতে থাকেন। 

- আরে এদের কিছু ছবিতে তো তুমিও আছো। দেখেছো ? 

এবার তিনি শুভ’র দিকে চোখ ফেরান,  

- তুমি গত বছর ফটোগ্রাফী তে ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছিলে । আমরা তখন তোমাকে নিয়ে বেশ গর্ব করেছিলাম। আমি অবশ্য জানি না তোমার  এম্বিশানটা কি - খোকনও বেশ ক্ষেপে গেছে। তাই হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছে। 

তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন, এবার হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে শুভ’র পিছনে চলে যান। 

- তোমার ক্যারিয়ার বিষয়ে কিছু জানা দরকার। একটা সংবাদ প্রতিষ্ঠানে মূল অবলম্বন তার নিউজ। যে কোন উপায়ে সংবাদ বের করে আনতে পারাটা সব পত্রিকাওয়ালাদের কাজ। আর এই নিউজের শক্তিশালী সংযোজন হলো ফটোগ্রাফস্‌ । এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তো ছবি দিয়ে সত্য মিথ্যা অনেক কিছু এস্টাবলিশ করা সম্ভব।

পুরো রুম জুড়ে তিনি পায়চারি করেন। ফ্লাস্ক থেকে গরম পানি ঢালেন একটি কাপে। দুধ, চিনি ছাড়া  কফি বানিয়ে আবার নিজের চেয়ারে ফিরে আসেন, কিন্তু কথা থামান না। 

- আমাদের কাজ নিউজকে লিড দেয়া। যা ঘটছে তা জাতিকে জানানো, যা ঘটেনি বা ঘটতে পারে তাও জানানো। প্রয়োজনে নিউজ বানাতেও জানতে হয়, যদিও সে পর্যায়ে তোমাদের এখনো কাজ করতে হয়নি। কিন্তু ল্যান্ড স্লাইডিঙ্গ - ১১ জন মানুষের মৃত্যু - পুরো নেশন যেখানে এমন একটা নিউজের জন্য অপেক্ষা করছে – তখন তুমি জব ভূলে বোকার মতো উদ্ধার কর্মে লেগে যাওয়াটা আমার মনে হয় এটা একেবারে এমেচার-এর মতো কাজ করা হয়ে গেলো কি? আফটার অল, ওগুলো তো ডেড বডি ছিল, তাই না ?

একটু থেমে তিনি শুভ’র উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেন বলে মনে হল। 

- অবশ্যই তুমি একজন মানবিক মানুষ, যেমন আমরা সবাই। এধরনের পরিস্থিতির অনেক মুখোমুখি হতে হবে। এরপরও প্রফেশনালী তোমার রিপোর্টার্স কোড অফ ইথিক্‌স মেনে চলতে হবে ? দিস ইস মাস্ট, মনে থাকবে ? ( শুভ’র নীরবতা সম্পাদক সাহেবকে বিরক্ত করলো বলে মনে হল। ) এখন যাও, এবারের বিষয়টা হয়তো একভাবে ট্যাক্‌ল করে ফেলবো। কিন্তু আশা করবো আর কখনো যাতে এমন না হয়। 

শেষের কথা গুলো ভারি কণ্ঠে আদেশের মতো শোনাল শুভ’র কানে। সে রুম থেকে  বেরোবার আগে, তিনি হেসে উপদেশ দিয়ে চাইলেন, 

- ইয়ং ম্যান, the career of your job is to create NEWS, not to be a  part of the NEWS, I think you can understand.       

শুভ বেরিয়ে যায়। সম্পাদক সাহেবের পি,এ তরুণীটি প্রায় তার বয়সী। সে ডাকতে গিয়ে ব্যর্থ হয় শুভকে। প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যাওয়া এক ঝলক দেখে সে বুঝে নিয়ে চায় শুভ’র মনের অবস্থাটি। 

________

হাতের ক্যামেরাটি ব্যাগসহ খোকনের হাতে দিয়ে সে ভিড়ের দিকে ছুটে যায়। খোকন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাতাসে তখনো সাহায্যের আকুল আহ্বান। আশে পাশে টিভি ও পত্রিকার সাংবাদিকেরা চলে এসেছে। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। খোকন চিৎকার করে  শুভ’কে ডাকতে চায়। শুভ ফিরে চায় না। ফিরে চাওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করে না। লোকগুলোর মাঝে গিয়ে শুভ একটি কোদাল হাতে নেয়। অন্য একজন তাকে জায়গা করে দেয়। বাকিরা সবাই মাটি সরিয়ে ঠেলতে থাকে, ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’। সকলের সাথে শুভও এই ডাকে এক অসীম শক্তির অধিকারী হতে চায়। সেই শক্তি দিয়ে এই বিরাট মাটির পাহাড় উড়িয়ে বের করে আনতে চায় কেবল ছোট্ট সে হাত দুটো।

 

- স্যার, চা আনছি । পানি গরম ছিলনা, তাই দেরি হইয়া গেলো। বিস্কুট দেই স্যার ?

সম্বিত পেয়ে শুভ ছেলেটার দিকে ফিরে তাকায়। সম্মতি দিলে, ছেলেটা বেশ ঝটপট কয়েকটা টোস্ট তুলে এগিয়ে দেয় তার ছোট হাতে। হাত গুলোর দিকে তাকিয়ে শুভ আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। এরকমই ছোট হাত ছিল, হয়তো এমনটাই বয়স শিশুটির। পুরো শরীর দেখতে পায়নি শুভ। শুধু হাত দুটো কাদামাটির উপর বেরিয়ে এসে আকাশের পানে ছড়ান ছিল।

- স্যার বিস্কুট্ ?

শুভ কাঁপা কাঁপা হাতে বিস্কুট নেয়। এমন সময় ফোনটা আবার বেজে ওঠে রোমান্টিক সুরে। এবার স্ক্রিনে ‘রিমি’ নামটি দেখায়। অল্প বয়সী এক তরুণীর কণ্ঠস্বর, 

- হেই সুইটহার্ট, আমরা কোথায় বলোতো ? ওয়াটার ওয়ার্ল্ড-এ। সারাদিন পানিতে সুইমিং আর দাপাদাপি করছি। জানো, আজ না দারুন হয়েছে - জনি ক্লারাকে propose করেছে । জানো কিভাবে ?  He’s brought a Diamond, darling. - ওয়াও তুমি বিশ্বাস করবে না। 

শুভ কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়।  তার ভালো লাগছিলনা কথা বলতে। ওদিকে কথা চলতে থাকে, 

- …Moment –টা কি যে এক্সসাইটিং, ক্লারা খুব সারপ্রাইজড হয়েছে। She was crying - মানে খুশিতে, আর রিংটাতে এক ধরনের –

শুভ লাইনটা কেটে দেয়। তীব্র বেদনায় সে দু হাঁটুর মাঝে কান্না লুকোতে চায়। পাশে ছেলেটি বিস্কুট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

________

 

বাতাসে কান্না আর চিৎকার। গত রাতের তুমুল বৃষ্টিতে এই এলাকায় পাহাড় ধ্বসে অনেকগুলো ঘরবাড়ি চাপা পড়েছে। নিহতের সংখ্যা অনেক। পাহাড় মালিকেরা পাহাড় কেটে প্রাথমিক ভাবে একটা বস্তি বানিয়ে দেয়। পড়ে আস্তে আস্তে যে যার সুবিধা মতো, পাহাড় কেটে ঘর তোলে, আর খেতে শ্রমিকেরা সেই ঘর ভাড়া নিতে ঝাপিয়ে পড়ে। আর যাবেই বা কোথায় ? এই দামী শহরে কাছাকাছি থাকার একমাত্র আশ্রয়, এই পাহাড়ের গায়ের বস্তিগুলো। কয়েকবছর পরপর পাহাড়ের ধ্বসে কিছু মানুষ মারা যায় বটে, তাতে কি? ভয়ে তো আর এতো বড় এলাকা ফেলে রাখা যায় না। এই বিষয়ে আইন - প্রশাসন, সবকিছু  ম্যানেজ করা আছে। 

ধারনা করা হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতি এবার একটু বেশি হয়েছে। স্থানীয় লোকজন, প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন,ফায়ার ব্রিগেড-  সবাই মিলে উদ্ধার কর্মে ব্যস্ত। রাত থেকে এখনো বৃষ্টি থামেনি। জোয়ারে অনেক এলাকা প্লাবিত। শহরের বুকে এমন জায়গায় পানি উঠেছে, যা আগে কেউ কল্পনা করেনি। কেউ দশ দিচ্ছে মেয়রের, কেউ বা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের, আবার কেউ বা বলছে অপরিকল্পিত বিরাট দালান নির্মাণ। ডেভেলপারদের কারনে নালা-নর্দমা সব মাটিতে ভরে আছে। তবে যার দোষেই থাকুক, বলি’র পাঠা কিন্তু এই দিন মজুর পরিবার গুলো। তাই, তাদের লাশগুলো মাটি থেকে বের করতে তাদের মতো হাজারো মানুষ ছুটছে। তবুও যেন পর্যাপ্ত নয়, সবকিছু। 

সাংবাদিক আর টিভি ক্যামেরাওয়ালাদের ভীড় তখনো বাড়েনি। খোকন আর শুভ’কে দেখা যায় ছুটতে ছুটতে এলাকাটায় প্রবেশ করছে। শুভ জানতে চায়, 

- ঘটনাটা ঘটলো কখন ? 

- কাল শেষ রাতের দিকে । 

- আপনি জানলেন কিভাবে ? 

- আমার একটা সোর্স এখানে থাকে। এটা শহরের বহুত কুখ্যাত জায়গা । 

- কাসুয়ালটিজ কত ? 

- জানি না । শুনেছি দশ জনের বেশি। শিওর না। ভুমি ধ্বসের স্থানটাতে তারা চলে আসে, অনেক লোকের ভীড়, অনেকা চিৎকার আর কান্না।

(খোকন চিৎকার করে বলে) শুভ ছবি তুলতে থাকো - আমি খবরগুলোর ডিটেইল নিয়ে নিই।

শুভ ক্যামেরা হাতে এগিয়ে যায়। শাবল, কোদাল হাতে দুজন লোক দৌড়ে তাকে অতিক্রম করে। ছবি নিতে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়। আরও এগিয়ে যায়। ধ্বসে যাওয়া স্তূপের কাছে অনেকে দাঁড়িয়ে। তারা মাটি খুঁড়ে লাশ বের করতে চাইছে। 

একজন লোক চিৎকার করে ওঠে -  আরও মানুষ লাগবো, একটা লাশ দেখা যাইতাছে। 

আরেকজন আবার বলছে -  কোদাল, বাঁশ আরও বেশি লাগবো, মাটি সরাইতে হইব, এক পাহাড় মাটি। আসেন ভাই,জলদি আসেন। 

শুভ একা এগিয়ে যায়, এই লোকগুলোর ফাঁকে উঁকি দিয়ে কি আছে দেখতে চায়। আরও দুইজন মানুষ এসে হাত লাগায়। শুভ আবার ক্যামেরা সেট করতে চায়। লেন্সের ভিতর দিয়ে দেখা যায়, মাটির উপর উঠে আছে শুধু পা। শরীরটা এখনো চাপা পড়া। শুভ ফোকাস করতে গেলে ফোকাস সরে যায়। হাত দিয়ে শুভ ঘাম সরায় চোখে, আবার ক্যামেরা পজিশন নিতে চায়। ফোকাস হয়, দুটো নগ্ন পা উঠে আসে। একজন মহিলার। প্রাণহীন।   

কেউ যেন বলে ওঠে - আরে ভাই, ছবি পরে তুইলেন। আগে তো লাশগুলান বাইর করতে দেন ? 

শুভ তাকে পাশ দিয়ে পিছিয়ে আসে। আরেক পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পজিশন নেবার কথা ভাবে। ওখানে আরও কিছু লোক কোদাল কুপিয়ে মাটি সরাচ্ছে, অনেকে ‘আল্লাহ্‌-আল্লাহ্‌’ বলে ডাকছে। শুভ ক্যামেরা তাক করে। লেন্সটা বৃষ্টি’র কারনে ঝাপসা হয়ে গেছে। ফোকাস ঠিক করতে পারে না। টিশার্টে লেন্সটা মুছে আবার সাবজেক্টকে ফোকাস করে সে – দুটো হাত কেবল বেরিয়ে এসেছে মাটি ফুঁড়ে। শুভ জুম করে – ৫-৬ বছর বয়সী হাত, আদুরে নরম তালুতে তখনো মেহেদী আঁকা। হয়তো মায়ের কাছে, বা বুবু’র কাছ থেকে শখ করে দিয়েছিল। হাতদুটো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। চেয়েছিল তখনো, যখন দানব পাহাড় আছড়ে পরেছিল মাথার কাছে। 

শুভ ক্যামেরা নামিয়ে নেয়। পুরো এলাকাটা তার কাছে শব্দহীন হয়ে পড়ে। তার কাছে যেন সময়ের আরও কোনও অতিক্রম নেই। শুভ ক্ষণিকের জন্য সম্মোহিত হয়ে পরে যেন। হেলুসিনেশনের মাঝে লোকজন যেন চিৎকার করে চলেছে, কিন্তু তার কানে আসছে না। কেউ কাঁদতে কাঁদতে মন প্রান উজার করে খোদা’কে ডাকছে, সে কিছুই অনুভব করতে পারছে না। তার মনে হতে থাকে, সে একজন অদৃশ্য মানুষ। অন্য গ্রহ থেকে এসে, এই পৃথিবীর  মানুষদের যন্ত্রণা গুলো ধারণ করে নিয়ে যাচ্ছে। সে নিজে যেমন লাশের কেউ নয়, তেমনি এই উদ্ধারকর্মী মানুষগুলোরও কেউ নয়। শুভ এক অজানা স্থানে নিজেকে আবিষ্কার করে। তার যেন আর কোনও শরীর নেই, তাকে পাশ দিয়ে লোকজন ছুটে যাচ্ছে, ফায়ার ব্রিগেডের কর্মীরা হসপাইপের পানি দিয়ে মাটি সরাচ্ছে। কয়েকটা কুকুর খোঁড়া মাটিতে শুঁকে শুঁকে চলেছে । কয়েকজন মহিলা কাঁদছে। তার চোখে এখনো হাত দুটো উঠে আছে। ছোট দুটি হাতা আকাশের পানে। অস্পষ্ট কণ্ঠে কে যেন ডাকে, 

- আরো দুইটা লাশ , ও ভাই , আপনারা আসেন।  আরো মানুষ লাগবো তো , এই মাটির পাহাড়টা পুরাই সরাইতে হইবো । আসেন ও ভাই ।

ফিরে আসা খোকনের দিকে চোখ পড়তেই শুভ বাস্তবে ফিরে আসে। হাতের সিগেরেটের ফিল্টার ফেলে সে পুরা এলাকাটা আরেকবার নজর দিতে চায়। কিন্তু শুভ তাকে এই সুযোগ দেয় না। হাতের ক্যামেরাটি ব্যাগসহ খোকনের হাতে দিয়ে সে ভিড়ের দিকে ছুটে যায়। খোকন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বাতাসে তখনো সাহায্যের আকুল আহ্বান। আশে পাশে টিভি ও পত্রিকার সাংবাদিকেরা চলে এসেছে। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। খোকন চিৎকার করে  শুভ’কে ডাকতে চায়। শুভ ফিরে চায় না। ফিরে চাওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করে না। লোকগুলোর মাঝে গিয়ে শুভ একটি কোদাল হাতে নেয়। অন্য একজন তাকে জায়গা করে দেয়। বাকিরা সবাই মাটি সরিয়ে ঠেলতে থাকে, ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর’। সকলের সাথে শুভও এই ডাকে এক অসীম শক্তির অধিকারী হতে চায়। সেই শক্তি দিয়ে এই বিরাট মাটির পাহাড় উড়িয়ে বের করে আনতে চায় কেবল ছোট্ট সে হাত দুটো।

-------------------

সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষন। তবু দিগন্ত থেকে লাল আভা কাটেনি। শুভ’র হাতে চায়ের কাপ। পাশে ছেলেটি দাঁড়ানো। একই উৎসুক ভঙ্গীতে। মোবাইলটি আবার বেজে উঠে। স্ক্রিনে কার কল দেখে, শুভ রিসিভ করে। 

- জ্বি,মা- বোলো । 

(একজন প্রবীণ নারীর শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা যায়)

- শুভ ? তুমি কোথায় ? 

- এইতো মা, একটু দুরে আছি ।

- তোমার কি মন খারাপ ? 

- না মা , সব ঠিক আছে। 

- তোমার অফিসে ফোন করেছিলাম, আমি সব শুনেছি । 

- ও, আচ্ছা । (একটু থেমে)  একটা ভুল হয়ে গিয়েছে মা। 

- ভুল? তুমি যা করেছো সেটা খুবই ঠিক হয়েছে। জীবনে বেশিরভাগ সময় আমরা ঠিক মূহুর্তে সঠিক কাজটা করতে পারি না।

- থ্যাংকস্ মা। 

- এখন মন খারাপ করে বসে না থেকে চলে এসো তাড়াতাড়ি। তোমার বাবাও অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।

ফোনালাপ এখানেই শেষ। 

শুভ উঠে পরে, একটু হালকা বোধ হয় তার । ছোট ছেলেটার দিকে টাকা এগিয়ে দেয়। ছেলেটি হাসে। তার দিকে তাকায় শুভ। তার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ছুঁয়ে শিশুটির শরীরের উষ্ণতা টের পায় সে। এক সাথে দুজনই দুরপ্রান্তে এগিয়ে যেতে থাকে। সন্ধার আকাশে তখন অনেক ঘরে ফেরা পাখি। শান্ত বাতাসে কেবল সমুদ্রের ক্ষীণ গর্জন। 

--------------

পরদিন সকালে, পত্রিকা স্ট্যান্ডে লোকদের ভীড়। নানা পত্রিকা ঝুলে আছে, বিছিয়ে আছে হকারে’রা। সব পত্রিকায় বড় বড় করে হেডলাইন পাহাড় ধসে’র খবর। নানা গবেষণা, নানা মতামত। মালিক, প্রসাশন, এলাকার লোক-  সবাই নিজেদের নিরপরাধ রাখতে নানা ব্যখা দিয়ে চলছে। সরকারী দল- বিরোধীদল একে ওপরকে দোষারোপ করছে। এর মাঝে একটি পেপারে এলো ছোট্ট একটা নিউজ:

পেশাদারিত্ব  নাকি  মানবিকতা

সারা পৃথিবী জুড়ে যেখানে পেশাদারিত্বের আধিপত্য সেখানে আমাদের পত্রিকার তরুন আলোকচিত্রী ওয়াসিমূল বারী শুভ নতুন করে প্রশ্ন তুললো- পেশাদারিত্বের স্থান কি তবে মানবিকতারও উর্ধ্বে? গতকালের পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় নিজের পেশাকে পেছনে ফেলে  স্থানীয়দের সাথে উদ্ধার কর্মে ছুটে যান তিনি...


Rafiqul Anowar Russell

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল ১৯৯৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় তার সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, রাসেল ছাত্র থাকা অবস্থা থেকে বিভিন্ন ভূমিকায় চলচ্চিত্র চর্চায় সংযুক্ত। কখনো ফিচার লেখক, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, চিত্রনাট্য, কখনো প্রযোজনায় তিনি সংযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। পরবর্তী সময়ে অডিও ভিশুয়াল প্রতিষ্ঠান ‘অযান্ত্রিক’ গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ নির্মাতা রাসেলের আত্মপ্রকাশ ২০০৮ সালে, ১১ মিনিটের শর্ট ফিকশন ‘হাইজ্যাক’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। এরপর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ এন ব্রাদার্স প্রোডাকশনস থেকে ২০১২ সালে তিনি তৈরি করেন আরেকটি ছোট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ১১ মিনিটের ‘ফান।’ ২০১৪ সালে ‘দ্য অ্যাডভাঞ্চারার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রফিকুল আনোয়ার রাসেল জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। দেশ ব্যাপী নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা - শর্টফিল্ম’ বিভাগে ১ম স্থান লাভ করে। ২০১৫ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর সামুরাই মারুফ পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেসিডোনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা’র মধ্য দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি গল্প, ফিচার, ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালিখির কাজ করে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে বাস করেন।