ম্যাড সিটি : গণমাধ্যমের উন্মাদনা

img

ষাট দশকের পরবর্তী পৃথিবীব্যাপী রাজনৈতিক টালমাটাল সময়ে গ্রীস বংশদ্ভূত ফরাসী চলচ্চিত্রকার কনস্তান্তিন গাভরাস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে আবির্ভূত হন তার ‘Z’ (১৯৬৯)  ছবির মাধ্যমে। আধুনিক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে গ্রীসের কস্টা গাভরাস অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক। 

কস্টা গাভরাস স্নায়ুযুদ্ধের সময় দক্ষিন আমেরিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে হাজির হয়েছেন তার বিভিন্ন ছবিতে।  বিশ্বরাজনীতিকে ঘিরে তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন এবং ঘৃণ্য ভূমিকা তাঁর State of Seize (১৯৭২), Missing (১৯৮২) সহ নানা ছবিতে প্রায়শই প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু নব্বই  দশকের শেষে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ভাঙার পর স্নায়ু যুদ্ধ শেষ হলে, পৃথিবী এক নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে প্রবেশ করলো। একসময়কার এশিয়া, দক্ষিন আমেরিকার স্বাধীনতাকামী ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে বিশ্ব উৎকণ্ঠা এসে পৌঁছুল মধ্য প্রাচ্যের দিকে।  কস্টা গাভরাস এর মতো রাজনৈতিক পরিচালক গেলেন হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মাণে। হলিউড চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যেখানে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের শৌর্যবীর্যের শক্তিশালী মুখ্যপাত্র। যার আগ্রাসী ঝলমলে চলচ্চিত্রায়ন তার দেশের মতোই সর্বগ্রাসী। কষ্টা গাভরাস সেই হলিউডে গেলেন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে।

১৯৯৭ সালে ওয়ারনার ব্রাদার্স-এর প্রযোজনায় এবং কস্টা গাভরাস-এর পরিচালনায় মুক্তি পেল Mad City চলচ্চিত্রটি। এ চলচ্চিত্রে আমেরিকান চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা জন ট্রাভোল্টা এবং ডাস্টিন হফম্যান  চরিত্র রূপায়নে এলেন এবং সঙ্গে আরো নামকরা সব অভিনেতা -অভিনেত্রী । দর্শকদের আকর্ষণ শুধুমাত্র অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রতি নয়, চলচ্চিত্রের কাহিনী ও বিষয়ের ওপরও।

শুরুতেই দেখা গেলো ইলেক্ট্রনিক গনমাধ্যমের প্রধান হাতিয়ার ‘ক্যামেরা’র উপস্থিতি। যেনো কোন স্নাইপার শ্যুটার - রাইফেল তৈরি করে নিচ্ছে কারো আক্রমনের আগে । এই অংশটা খুবই তাৎপর্যপূর্ন - ছবির শুরুতে দর্শককে বুঝিয়ে দেয় ক্যামেরা এবং রাইফেল দুটো শ্যুট করতে জানে। দুটোই মানুষের ভাল ও মন্দ দুই কাজেই ব্যবহৃত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু জানা ক্যামেরা ও রাইফেল- এর পেছনের শক্তিটা কে বা কি ?

কস্টা গাভরাস কাহিনীর ঘটনাস্থল ঘটনাস্থল হিসাবে বেছে নেন অসাধারন একটি স্থান- ন্যাচারাল মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি। যাদুঘরের নির্বাহী লোকজন বেশ কিছুদিন সরকারী ফান্ড সমস্যায় ভুগছনে । এ ধরনের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিষয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে, তাই সরকারও এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থদান বা ভর্তুকি দেয়া থেকে সরে আসছে। ম্যাক্স ব্রেকেট (ডাস্টিন হফম্যান অভিনীত)  একজন টেলিভিশন সাংবাদিক। তাঁর ক্ষ্যাপেটে ও স্বেচ্ছাচারী স্বভাবের জন্য তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমালোচিত। তিনি এই বিষয়ে  মিউজিয়াম কিউরেটরের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে জানতে পারেন অর্থ সমস্যার কারনে  মিউজিযাম নিরাপত্তা গার্ডদের মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে এবং একজন গার্ড বর্তমানে কর্মরত আছেন। সেই ছাঁটাইকৃত গার্ড (স্যাম বেইলি) এসে কিউরেটরকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে হলেও তার চাকরিটা বহাল রাখার অনুরোধ জানান। কিন্তু এ বিষয়ে অপারগ এবং কোন কথা শুনতে না রাজী না হওয়ায় স্যাম বেইলি কিউরেটরের (মিসেস ব্যাংক) মুখে অস্ত্র ধরেন - বাধ্যতামূলক তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য। এখানেই ঘটনার নাটকীয়তা শুরু। মিউজিয়ামে তখন স্কুলের শিক্ষকসহ অনেকগুলো শিশু। এদিকে ম্যাক্স ওয়াশরুমে থাকা অবস্থায় এই ঘটনাগুলো লক্ষ্য করেন এবং তাৎক্ষনিক নিউজ চ্যানেলকে জানান সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য। ম্যাক্স ব্রেকেটের ধারা ভাষ্যে চ্যানেলের মাধ্যমে সারা দেশের লোকজন দেখতে পান এই জিম্মি নাটক। ঘটনাচক্রে স্যামের শটগানের গুলিতে আহত হয় তার বন্ধুসম গার্ড ‘ক্লিফ’। তাঁকে মিউজিয়ামের বাইরে থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অসহায় স্যাম একপর্যায়ে বুঝতে পারেন, তার পক্ষে আর এই চাকরী ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। বরং তিনি জেলে যাবেন এবং তার স্ত্রী সন্তানদের ভরণ পোষন করতে পারবেন না। একজন অসফল পিতায় পরিনত হওয়ার ভয়ে তিনি কী করবেন বুঝতে পারেন না। ইতিমধ্যে পুলিশ,সারা শহরের লোকজন এবং যাবতীয় গনমাধ্যমকর্মীরা এসে হাজির হয় ঘটনাস্থলে - ন্যাচারাল মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি।

ম্যাক্স ব্রেকেট সাংবাদিক হিসাবে তার ক্যারিয়ারে একটি বিশাল ব্রেক খুঁজছিলেন । তিনি স্যামকে জেলে যেতে হবে না এইমর্মে আশ্বস্ত করে বলেন, স্যাম যদি তাঁর কথা অনুযায়ী চলে তবে জনগন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য সহযোগিতা করতে পারে। ম্যাক্স তাকে বোঝায় যে, মিডিয়া এবং জনগন সবসময় কাছাকাছি আছে । মিডিয়া সবসময় জনগনের মতামতের মাধ্যম হিসাবে কাজ করবে। আর সেই জনগনের মতামত কি হবে এটা নিয়ন্ত্রন ও নিধারন করবে মিডিয়া। তাই একবার যদি মিডিয়ার সাহায্যে স্যামকে হিরো ও একজন সন্তানপ্রিয় দায়িত্ববান পিতা হিসাবে জনগনের মনে ধারনা তৈরী করে দেয়া যায় তাহলে আর কোন ভয় নেই। এরপর ম্যাক্স এর পরিকল্পনা মতে চলতে থাকে ঘটনা। কিন্তু স্যাম বড় একরোখা। তিনি ম্যাক্স কিংবা মিডিয়ার অত জটিল ম্যারপ্যাঁচ ধরতে না পেরে মাঝে মাঝে ভুল করে  এবং তাতে ম্যাক্স এর পরিকল্পনা ব্যহত হয়। 

এ নিয়ে মিউজিয়ামের বাইরের পৃথিবীতে শুরু হয় অন্যরকম ঘটনা । বৃহৎ ও শক্তিশালী মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলো স্যাম বেইলি’র এই জিম্মি ঘটনা বিষয়ে দারুন উৎসাহিত। তারা এই ঘটনাকে ম্যাক্স ব্রেকেটের একক নিয়ন্ত্রন থেকে নিজেদের দখলে নিতে সচেষ্ট হয়। স্থানীয় পুলিশের বাইরে এফবিআইয়ের বড় বড় কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। গনমাধ্যমকর্মীরা পুরো বিষয়টাকে না দিক থেকে নিজেদের মন গড়া দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তুলে ধরতে থাকেন। টেলিভিশনে সামনে হাজির হন স্যামের পরিবার। এদিকে জনগন স্যামকে কখনো হিরো কখনো কাপুরষ এবং অসুস্থ মনে করে। যেসব শিশু মিউজিয়ামের ভেতরের আটকে আছে তাদের পিতামাতারা  স্যামকে এক ভয়ঙ্কর খুনী হিসাবে দেখে। তারা চান, সরকার মানষিকভারে ভয়ংকর এ ধরনের খুনী এবং দুষ্ট লোককে যেন ছেড়ে না দেয়। এফবিআই কর্মকর্তারা স্যামকে ধরার জন্য স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স তলব করে।  এদিকে স্যাম-এর গুলিতে আহত ক্লিফ একজন কালো মানুষ। ফলে কেউ কেউ বর্ণবাদী আক্রমন হিসেবে তুলে ধরতে চায়। রাস্তার গায়কের দল ক্লিফ কে নিয়ে র্যা প গাইতে থাকে, কেউ স্যাম এর টিশার্ট বানিয়ে বিক্রি করে, আবার কেউ ঘটনাস্থলে নানা আয়োজন নিয়ে বসে পড়ে। এই ঘটনাকে ঘিরে সবাই যেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত।  দেখতে দেখতে পুরো শহর একটা সার্কাসে পরিনত হয় । 

ম্যাক্স ব্রেকেটের পুরোনো শত্রু ও মিডিয়ার শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব কেভিন হল্যান্ডার এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে আসেন এই ঘটনাটি কভার করতে। তিনি তাঁর ক্ষমতা খাটিয়ে ম্যাক্স এর তৈরি করা নিউজ কভারেজের সমস্ত ফুটেজ তার চ্যালেনের পক্ষ থেকে কিনে নেন। যেহেতু এই ঘতনা’র নিয়ন্ত্রন ম্যাক্স-এর কাছে তাই পুরনো শত্রুতা ভুলে ম্যাক্সকে তাঁর সাঙ্গে কাজ করতে বলেন। ম্যাক্স রাজী না হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। স্যাম বেইলি’র মতো একজন ভয়ঙ্কর মানুষকে মানবিক ভাবে দেখতে জনগণের মনে সহানুভূতি তৈরির জন্য ম্যাক্স কে তিরস্কার করেন। হল্যান্ডার আরও জানান, স্যাম বেইলিকে তার চেয়ে যত দ্রুত অস্বাভাবিক বদমেজাজি পেশাদার একজন খুনি  হিসাবে জনগণের মাঝে প্রমান করে তাকে আইনের হাতে তুলে দেয়াটাটা হবে গনমাধ্যম ও সকলের জন্য মঙ্গলজনক। ফলে নিউজ এবং ফুটেজগুলো সেভাবেই সম্পাদনা করা হলো। এবার জনগনের মতামত একেবারেই স্যামের বিপরীতে চলে গেলো। সবাই স্যামকে একজন অসুস্থ এবং এই ঘটনার জন্যে তাকে ক্ষমার অযোগ্য বলে ভাবলেন। ম্যাক্স ব্রেকেট বুঝতে পারলেন তার ক্যারিযারের চিন্তায় তিনি স্যাম-এর মতো একজন নিরীহ মানুষকে নিয়ে যে খেলায় নেমেছিলেন, তা ভেস্তে গেছে। বরং স্যামকে এখন অপরাধী হিসেবে  সবাই মনে প্রানে দেখতে চাইছে। ম্যাক্স ব্রেকেট নিজেও জানতেন, জনগণের মন নিয়ত পরিবর্তনশীল। মিডিয়ার বদৌলতে একটু আগে সে যাকে ‘হিরো’ ভাবছে, পরের মুহূর্তে তাকে ‘ভিলেইন’ ভাবতে সে অভ্যাস্ত।      

এদিকে মিউজিযামের ভেতরে বাচ্চারা স্যামকে নিয়ে ব্যস্ত এবং আনন্দে মেতে থাকে। যদিও স্যামই তাদের আটকে রেখেছে তবুও স্যামকে তারা ভালো জানে। তাদের খিদে পেলে সে নানা খাবার বের করে আনে। সে জানে এই মিউজিয়ামের কোথায় কি আছে। স্যাম তাদের শোনায় মিউজিয়ামে রাখা রেড ইন্ডিয়ান আদিবাসী ‘মিউওয়াক’ জাতির কথা । তাদের শেষ দলপতি ‘বিগজন’ কিভাবে তার জনগনকে সাদা মানুষদের হাতে মরতে দেখেছে। কিন্তু তিনি তাদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। একজন দলপতি জানেন কিভাবে তাদের মানুষকে রক্ষা করতে। বিগজনের মতো সব বস’দের উচিত নিজেদের লোকদের বিপদ থেকে উদ্ধার করা। যা তার বস (মিসেস ব্যাংক) করতে চান নি। মিউজিয়ামে রাখা বিগজনের ভাস্কর্যের কাছে দাঁড়িয়ে স্যাম শিশুদের জানায়, তারা যখন বিগজনকে খুঁজে পেয়েছিলো তখন তার হাত ছিলো নিচের দিকে। বাচ্চারা মনোযোগ দিয়ে এই গল্প শুনতে থাকে। স্যাম বলেন, এখন দলপতির হাত উপরের দিকে - ঠিক তখনই এক বাচ্চার চিৎকারে স্যাম গুলি’র হাত থেকে রক্ষা পান। এফবিআই স্পেশাল ফোর্স ছাদ থেকে এই গুলি ছোঁড়ে। তাতে স্যাম বেঁচে গেলেও ইন্ডিয়ান দলপতির হাতটা উড়ে যায়। স্যাম এতে ক্ষেপে যান এবং পুলিশ-প্রধানকে জানায় বাচ্চাদের নিরাপত্তার কথা। 

বাইরের মিডিয়া-জগতে তোলপাড় থামে না। বিভিন্ন টকশোতে স্যামকে নিয়ে চলতে থাকে নানা জল্পনা-কল্পনা । নিউজ মিডিয়ার খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ল্যারী কিং স্যামকে প্রশ্নোত্তর পর্বে আহ্বান জানান। বারবার ইন্টারভিউ এবং টেলিভিশন-কর্মীদের অত্যাচারে গুলিতে আহত ক্লিফের শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোর টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারেন না। মাত্রাতিরিক্ত কথা বলায় ক্লিফ মারা যায়। ঘটনা এবার স্যাম-এর পক্ষে একেবারেই থাকলো না। মিউজিয়াম এলাকায় সার্কাস আরো তীব্র হয়। সবাই কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে ভীড় বাড়াতেই থাকে এবং নিউজ নেটওয়ার্কের মালিকেরা এই ঘটনায় পুরো নিয়ন্ত্রন নিয়ে একে বিশাল Show Business এ রূপ দিতে চান। বিভিন্ন মহল থেকে ম্যাক্সকে অর্থ ও ক্যারিয়ারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ম্যাক্স’কে বাগে আনতে ব্যর্থ হলে একপর্যায়ে কেভিন হল্যান্ডার মিডিয়ায় প্রচার করেন,“ম্যাক্স ব্রেকেট মতো স্বার্থলোভী সাংবাদিকও এই ঘটনার জন্য স্যাম বেইলির’র মতো দায়ী”। 

স্যাম ও ম্যাক্স দুজনেই বুঝতে পারেন তাদের আর কিছুই করার নেই। তারা দুজনেই এবার কিউরেটর, শিক্ষক সহ সকল বাচ্চাদের বের করে দেন। বাচ্চা’রা বের হবার আগে স্যাম এর কাছে বিদায় জানায়। ম্যাক্স স্যামকে জানায়, এই বাচ্চাদের সাক্ষী বিচারে তাঁর অবশ্যই সহায়ক হবে। কিন্তু স্যাম তা বিশ্বাস করে না। সে ম্যাক্সকে এগিয়ে যেতে বলেন। ম্যাক্স মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে বাইরে অপেক্ষমান পুলিশকে জানান, স্যাম আত্মসমর্পন করবেন এবং বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু স্যাম আসে না। শূন্য মিউজিয়ামে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। স্যাম ডিনামাইট ফাটিয়ে নিজেকে ধ্বংস করে আবার নতুন করে শিরোনাম হন। এতে মারাত্বকভাবে আহত ম্যাক্স নিজেও সকলের কাছে পরিণত হন একটা নিউজ ইভেন্টে। সবাই তাকে ঘিরে ধরে, নানা কিছু জানতে – স্যাম তাকে কিছু জানিয়ে ছিল কিনা, স্যাম কেন  আত্মহত্যা করলো। যদিও তিনি সমস্ত নিউজ এবং মিডিয়া-কর্মীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছিলেন, we killed him , we killed him......কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনে না, শুনতে পায় না। 

কস্টা গাভরাস চলচ্চিত্রটিতে বর্তমান মিডিয়া-সম্রাজ্যের একটা আগ্রাসী রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যেখানে তুচ্ছ বা সামান্য বিষয় শুধুমাত্র উদ্দেশ্য এবং অর্থলগ্নীর কারনে অনেক বিশাল এবং ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। জনগন নানা সংবাদ জানতে চায়। আর একজন স্যাম বেইলি সংবাদ মাধ্যমে অনেক গুলোর মাঝে ব্যবহৃত টুলস মাত্র, সংবাদ বিক্রির উপকরণ। আবার একইভাবে ম্যাক্স ব্রেকেট - যে একজন ঝানু সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও বানিজ্যিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে তিনিও বিক্রি এবং পরাজিত হন। এক্ষেত্রে মিডিয়া এবং গনমাধ্যমের স্বর্গরাজ্য খ্যাত আমেরিকাকে নিয়ে পরিচালক অনেকটা ঠাট্টা করেন। হল্যান্ডর এর প্রশ্নের জবাবে এক ড্রাইভার বলেন -  This is America, it can make you crazy । ফলে এই উম্মাদনা আমেরিকার অংশ। তাদের শিকার সাধারন জনগণ, একজন দায়িত্বশীল অস্থির পিতা, যে চাকরি হারানোর ভয়ে শঙ্কিত। কিন্তু যারা এই উন্মাদনার পেছনের পরিচালক এবং প্রযোজক তারা কিন্তু উন্মাদ নন। তারা এই উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে শুধু মুনাফাই করেছেন। তবে এতে স্যাম বেইলির মতো একজন গার্ড আত্মহত্যা করুক, ম্যাক্স ব্র্যাকেটের ক্যারিয়ার ধ্বংস হোক কংবা যে কেউ বলির পাঠা হোক না কেন তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের লক্ষ্য কেবল অর্থ, বানিজ্যে এবং আধিপত্য প্রসারে।  বিশ্বব্যাপী আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতি’র তাই প্রভাবশালী সংযোজন - গণমাধ্যম। 

প্রথম লেখা ও প্রকাশ 
একুশে পত্রিকা ১০/০৪/২০১০
পুনর্লিখন
২৪/০৬/২০১৩
 


Rafiqul Anowar Russell

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

রফিকুল আনোয়ার রাসেল ১৯৯৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় তার সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, রাসেল ছাত্র থাকা অবস্থা থেকে বিভিন্ন ভূমিকায় চলচ্চিত্র চর্চায় সংযুক্ত। কখনো ফিচার লেখক, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, চিত্রনাট্য, কখনো প্রযোজনায় তিনি সংযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। পরবর্তী সময়ে অডিও ভিশুয়াল প্রতিষ্ঠান ‘অযান্ত্রিক’ গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যের এম এ নির্মাতা রাসেলের আত্মপ্রকাশ ২০০৮ সালে, ১১ মিনিটের শর্ট ফিকশন ‘হাইজ্যাক’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে। এরপর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ এন ব্রাদার্স প্রোডাকশনস থেকে ২০১২ সালে তিনি তৈরি করেন আরেকটি ছোট দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ১১ মিনিটের ‘ফান।’ ২০১৪ সালে ‘দ্য অ্যাডভাঞ্চারার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রফিকুল আনোয়ার রাসেল জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। দেশ ব্যাপী নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিযোগিতা - শর্টফিল্ম’ বিভাগে ১ম স্থান লাভ করে। ২০১৫ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর সামুরাই মারুফ পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেসিডোনা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা’র মধ্য দিয়ে পেশাদার চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া তিনি গল্প, ফিচার, ফিল্ম রিভিউ বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যেকোন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালিখির কাজ করে থাকেন। ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে বাস করেন।