কূল-অকূল-প্রতিকুল

img

ব্যানার: রাজীব দত্ত

‘সমাজ, ধর্ম, জাত-পাত আর সাংসারিক ধারণাবোধ সব একদিকে, আর অন্যদিকে আছি আমরা। আমরা দুজনে। আমাদের ভালোবাসা, আমাদের দূর্ণিবার আকর্ষণ আর আমাদের স্বপ্নীল হারিয়ে যাওয়া। আমরা সাংসারিক টানা পড়েনের মধ্যে পড়ি না করবী। আমাদের আলাদা কোনো পরিচয়ের দরকার নেই। আলাদা কোনো জগৎ আমাদেরকে টেনে নিয়ে যাবে সব পরিচয়ের বাইরে। মানুষ যেখানে একমাত্র সত্য। আর সত্য প্রেম। এতো বেশি চেনা আমরা পর®পরের। এতো বেশি পরিমান বেঁছে রয়েছি ভালোবাসার শূক্ষ্মতার মধ্যে, যেন এক অদৃশ্য স্বর্ণাভ জলে আমরা বাঁধা পড়ে আছি। এক অজানা স্রোতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছি। যেমন রক্তের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় মানুষের ইচ্ছার আর স্বপ্নের স্রোত। এখনো এমন কোনো যন্ত্র বের হয়নি যা দিয়ে মাপা যায় মানুষের ভালোবাসা, স্বপ্ন বা ইচ্ছার পরিমান। এরকমই এক যন্ত্রবিহীন জগতে বাস করি আমরা আর বাস করতে চাই সারাজীবন। কি তুমি পারবে না সব ক্ষুদ্রতা আর সংকীর্ণতা থেকে বের হয়ে আসতে? পারবে না তুমি? সব সামাজিকতা আর সংস্কারবোধ আর মানুষের মন গড়া সমস্ত তফাতকে সপাটে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলছি তোমায়, শুধু তোমাকে চাই, শুধুমাত্র তোমাকে। তোমার রোমকূপের প্রতিটি বর্ণ-স্বাদ-গন্ধ। তোমার অস্তিতে¦র, তোমার সর্বাঙ্গের আলেখ্যে ও আবেশে একটা গোটা শতাব্দী যেন ডুবে গেছে আমার। অসম্ভব ভালোবাসি যে তোমাকে..।’ 

চিঠিটা হাতে নিয়ে চিত্রার্পিতের মতো বসে আছে করবী, সেই কখন থেকে। যেন এক পা-ও নড়বার ক্ষমতা নেই তার। এই চিঠিটা যে কতবার পড়েছে সে, কত হাজার বার, তবু যেন প্রতিবারই নতুন। প্রতি মুহূর্তে যেন নতুন রূপে ধরা দেয় এটা। এই কথাগুলো যেন চীর-নতুন, কখনোই পুরনো হবার নয়। 
পুকুর পাড়টা ধরে সেই কখন থেকে একটা শালিক গম্ভীর ভঙ্গিতে হেলে দুলে হাঁটছে । পাখিদের এমন মানুষের ভঙ্গিতে হাঁটা দেখতে ভালো লাগে না। কিন্তু এই শালিক পাখিগুলো সুযোগ পেলেই মানুষের মতো হাঁটবে। কাকেরাও হাঁটে তবে লাফিয়ে লাফিয়ে, একটা পাখি সুলভ ভাব আছে। কিন্তু ওরা! এভাবে কেন হাটবে? এমনিতেই প্রবাদ আছে, একটা শালিক দেখলে নাকি কপালে দুঃখ আছে। তার ওপরে এমন গম্ভীর ভঙ্গিতে পায়চারি করছে, যেন করবীকে পাহারা দিচ্ছে। না জানি কি ঘটবে! তাহলে কী সে যে আশা নিয়ে বসে আছে সেটা সফল হবে না? তার পাঠানো কতগুলো নির্মম সত্যের জবাবে- তার জন্য, তার জীবনের জন্য কোনো ইতিবাচক  প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না? করবী সেই সকাল থেকে পুকুর ঘাটে বসে আছে তো আছেই। তাদের পুকুর ঘাটটা বাড়ি থেকে অনেকটা ভেতরের দিকে। বাড়ির মেয়েরা এখানে গোসল করে। এর চারিদিকে ঘন গাছের সারি। অনেকটা জঙ্গলের মতো, আর সেটাই তৈরি করেছে আড়াল বাইরের জগৎ থেকে। এখানে বসে থাকলে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মতো মনে হয়। যেন এর চারদিকে কিছু নেই, শুন-শান নীরব দ্বীপ-কান্ড। সেখানে মাঝে মাঝে পাখিদের ডাক। গরমের দুপুরে একটানা ঝিঝি পোকার ডাক। কোনো কোন সন্ধারাতে গাছ আলো করে জোনাকী পোকার নেভা-জ^লা; ছোট বেলায় ওরা বলত জোনাকীর বিয়ে। অবশ্য সন্ধা বেলায় একা পুকুরঘাটে আসা নিষেধ তার এখন। ইদানিং দিনের বেলায়ও তার ওপরে নজর রাখছে সবাই। কিন্তু আজ হঠাৎ কী হলো? হ্যাঁ, আজ বাড়িতে সবাই ভীষণ ব্যাস্ত। এদিকে কারো আসার সময় নেই। তবে, তাকে খুঁজতেও যে কেউ আসছে না এটা খুবই অদ্ভুত! আজ এই যে বিষয়টা নিয়ে সবার মধ্যে এতো ব্যস্ততা সে তো তাকে ঘিরেই। করবী ওখান থেকে বসে বসেই দেখতে পাচ্ছে, বাড়ির ভেতরে জলপাই গাছের ডাল ধরে ঝুলে রয়েছে জবাই করা খাসি। তার শরীর থেকে খসিয়ে নেয়া হচ্ছে চামড়া। পাশেই বড় ইটের চুলোয় ডেকচি বসিয়েছে বাবুর্চি। পেঁয়াজ, রশুন, শশা, টমেটো, গাজর কেটে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। অথচ তাকে কেউ খুঁজছে না কেন? নাকি এই সব কিছু, সব জোগাড়যন্ত্র, সব হৈ হুল্লোড় সব আয়োজন শুধু তাকে পার করে দেবার জন্যই? ভালোয় ভালোয় পার করে দিতে পারলেই জ^ালা যায়! এমন একটা ভাব। কিন্তু জ^ালা যাবে কোথায়? কিছুদূর গিয়ে আবার যদি ফিরে আসে তখন সেটা দাউ দাউ করে জ^লবে না দ্বিগুণ তেজে? অথচ সেই চিন্তাটা করছে না কেউ । 
পুকুরের পানিতে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করছিল এতোক্ষণ। এইমাত্র আবার মেঘ এসে ঢেকে দিল। ধূসর অকাশ কালো ছায়া ফেলেছে পানিতে। অজও বোধহয় বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি করবীর ভেতরে এক অন্যরকম অনুভূতি এক অন্য রকম শিহরণ নিয়ে আসে। বৃষ্টিই যেন ওর জীবনের সব পরিবর্তন ঘটাতে এক বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ। যেন প্রকৃতির সব রকম আয়োজনের সফল সূচনা বা সফল সমাপ্তি ঘটাতে বৃষ্টি আসে উপলক্ষ হয়ে। সেদিনও, ঐযে যেদিন বিলের ধারে, জীবন যেন অন্য এক রূপে ধরা দিয়েছিল তার কাছে । আর সেও ধরা দিয়েছিল সেই অমোঘ আহ্বানের কাছে..। 

বিপুল যেন কোনো সাধারণ মানুষ নয়। সে করবীর গোটা জগৎটাই যেন বদলে দিয়েছিল সেই কবে থেকে। তারপর একদিন, সেই যেদিন পড়া শেষ হবার পর বিপুলদের বৈঠকখানায় তুমুল বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল সে। বৃষ্টি অঝোরে ঝরছে, থামবার কোনো নাম নিশানাই নেই। সেদিন একা ছিল সে। আকাশ মেঘলা থাকায় ব্যাচের অন্য ছেলে মেয়েরা কেউ পড়তে আসেনি, বা কিছু কিছু ঘটনা ঈশ্বর ঘটাবার জন্য যেন সব পরিস্থিতি ফেঁদে রাখেন। সে ভীষণভাবে বৃষ্টি থামবার প্রতীক্ষায় আকুল হয়ে ছিল ঐ বৃষ্টির দিকে চেয়েই। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে বিপুল এসে বলল, তুই বোধ হয় আজ আর যেতে পারবি না করবী। 
বিপুল, তার অকাল প্রয়াত চাচাত ভাইয়ের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ওর বাবার কাছেই এখন পড়তে আসে করবী।
- তাই তো মনে হচ্ছে বিপুলদা। 
একটুও বিস্মিত না হয়ে জবাব দেয় করবী । বিপুলকে এখন এখানে দেখবে এটা যেন জানাই ছিল তার। একবার জানতেও চাইল না, তুমি কবে এলে ঢাকা থেকে? 
বিপুল একটু অবাক হলেও মুখে বলল না কিছু। তার ঠোটের কোনে হাসির রেখা বলল, এ বৃষ্টি থামতে সময় লাগবে, কী করবি এখন?
করবী অনিশ্চিত চোখে তাকায় বৃষ্টির দিকে। চেয়েই থাকে.. কিছু বলে না। 
- আজ তোকে পেয়েছি, এই  বৃষ্টির মধ্যে তুই পালাতেও পারবি না। আচ্ছা বলতো, আমাকে দেখলেই পালাস কেন তুই ?  - কই না তো! না- আসলে তা না, তুমি ভাইয়ার এতো বন্ধু ছিলে, ভাইয়া হঠাৎ মারা যাবার পর তোমার ভেতরে তার ছায়া দেখতে পাই। তোমাদের স্বভাবেও অনেক মিল ছিল। তোমাকে দেখলে পালাব কেন? 
ভাইয়া করবীর বড় চাচার বড় ছেলে বাবলু। ঢাকার হস্টেলে থাকতে হঠাৎ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। 
- তুই তো খুব  ঘুরিয়ে কথা বলতে শিখে গেছিস! আমি কি বলছি তুই বুঝতে পারছিস না? আমি যে সেবার তোদের বাড়ির লিচু গাছ থেকে পড়ে পা কেটে ফেললাম, তাই দেখে তুই অতো কেঁদেছিলি কেন? বললি না তো! যতবার প্রশ্ন করি ছুটে পালাস। কি বলবি না, কেঁদেছিলি কেন? 
- এমনি । 
- এমনি এমনি কেউ কাঁদে নাকি, তুই এখনো নিজেকে চিনতে পারলি না? 
করবী নিজেকে চেনে, আর চেনে বলেইতো ছুটে পালায়, একথা কি বিপুল জানে না? কিছু না বলে সে আবারও তাকিয়ে থাকে ঐ অঝোর ধারার দিকে। 
হঠাৎ বিপুলের ভেতর থেকে কে যেন এক অচেনা মানুষ বলে ওঠে, তোর চোখ দুটো খুব সুন্দর করবী। 
এই কথাটা যেন জীবনে কেউ প্রথম বলল তাকে। আর সেই বিস্ময় ভরা চোখ তুলে কোনোভাবে বিপুলের দিকে তাকিয়ে সে বলে, কই? কেউ বলে নাইতো কখনো ! 
বলে নাই? বলিস কি! এখন আমি বলতেছি শোন, সমুদ্রশীলার মতো মায়ায় জড়ানো আবেশ ভরা চোখ তোমার। 
এরপর করবীর হাত দুটো ধরে- চোখে চোখ রেখে গভীর স্বরে বিপুল বলল, আর তুমি সেদিন অতো কেঁদেছিলে কেন আমি জানি। আমি সেই থেকেই জানি..। 
কী বলবে করবী? এক অচেনা আবেশে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল যেন সে। আর সেই থেকে শুরু। এক দূর্ণিবার আকর্ষণ যেন করবীকে টেনে নিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। অথচ তার ভেতর থেকে প্রচণ্ড বাধা একই সাথে কাজ করে উজান বওয়ার মতো। কী তীব্র অস্বস্তির মধ্যে কাটছিল তার সময়, আর একই সাথে বিপুলের আকর্ষণ এড়ানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। শুধু করবী কেন? পৃথিবীর কোনো মেয়েই ওর প্রেমে না পড়ে পারবে না। এতটাই প্রেমময়, বুদ্ধিদীপ্ত এক সম্মোহনী শক্তি আছে তার। 
করবীর সব অনিশ্চয়তা যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করতে পারত বিপুলও। করবীও সমাজ, তাদের পারিবারিক রুচিবোধ ও চিন্তা চেতনাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে নিজেকে সংকুচিত করে রাখতে চেয়েছে। সারাক্ষণ মনে বেঁধে দিয়েছে বাঁধ। তারপরও ভালোবাসার তীব্র আকর্ষণ এড়াতে পারেনি কেউই। সমাজ, ধর্ম, সংসার সবকিছু ছাপিয়ে এক দুর্নিবার আকর্ষণে তারা ছুটে গেছে। 
তবে করবীর বাড়ির মানুষেরা তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না । তারা জেনে গেল। জেনে গেল সবটাই। কলেজে যাওয়ার পর মেয়েকে ইংরেজি বিষয়ে প্রাইভেট পড়াতে পাঠিয়েছিল ইংরেজির প্রফেসর বিমল দত্ত’র কাছে। আর তারই বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে বিপুল- যে কি না তাদের বাবলুরও বন্ধু। এ বাড়িতে কতো এসেছে, কতো খেলেছে, আর সে কি না! কবে বাড়ি এলো ছুটিতে, আর এমন একটা কা- ঘটে গেল! ছি ছি ছি! এ কথা পাঁচ কান হলে সমাজে মুখ দেখানোই দায় হয়ে পড়বে। মেয়ে যাবে হিন্দুর ঘরে! ধর্মে যে বিধান নাই। তবে পুরুষের বেলায় আছে, কিন্তু মেয়ে.., অসম্ভব! 

করবীর পা দুটো যেন গেথে যাচ্ছে মাটির সাথে, এক পা-ও যেন নড়বার শক্তি নেই । আজ তার পাকা দেখা। যাকে বলে পান-চিনি। বাড়ির ভেতরের সব আয়োজন সেই উপলক্ষকে ঘিরেই। তবে তার শরীরটা ক্রমশ অসাড় হয়ে যাচ্ছে কেন? সে কী ধীরে ধীরে একটা গাছ হয়ে যাচ্ছে? ইশশ্ যদি হতে পারত এই মুহূর্তে। বিপুলকে ছেড়ে থাকার চেয়ে প্রকৃতির একটা অংশ হয়ে যাওয়া তার কাছে স্বর্গের মতো। হে আল¬হ গাছ বানিয়ে দাও, গাছ বানিয়ে দাও আমাকে! বিুপুলকে সে কথা দিয়েছে যে কোন সহজ সমাপ্তি ঘটাবে না জীবনের। বিপুল তাকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে সব সময়, কখন কি করে বসে! এই ভয়টা তাকে নিয়ে সবারই আছে। শুধুমাত্র তার মায়ের কারণে...। 
সেদিন তো বিপুলের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়টা জানাজানি হবার পর ছোট চাচা দাদীআম্মাকে অভিযুক্ত করে বলছিলেন, ‘মায়ের মতো হইছে মেয়ে, প্রতিবাদী! নিয়ম ভাঙতে চায়। আগেই বলছিলাম, মেয়েদের অতো লেখা পড়ায় কাজ নাই। তা না, আমাগো মায়েরও হইছে বুদ্ধিনাশ। নাতনীরে সে পড়াবে। তার ভেতরে নাকি কি এক অপরাধ বোধ। এখন বুঝুক ঠেলা! অপরাধের পাল্লা দিন দিন ভারীই হইতাছে।’ 
দাদী আম্মা কোনো কথা বলেন নি, করবীও নির্বাক। সে দীর্ঘদিন ধরেই কোনো কথা বলে না কারো ওপরে। যখন থেকে সে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই। কী বলবে, কার সাথে? কেউ তো নেই কিছু বলার বা শোনার। কী-ই বা বলবে? তার সাথে যে কথা বলবে, তার সব আবদার যে শুনবে, সব মানে- সব! অভিমান, অহ্লাদ, আবদার, ভালোলাগা, মন্দলাগা সব উজাড় করে দেবে যার কাছে, সে তো নেই। সেই তিনি কবে তার কথা একবারও না ভেবে এক বুক অভিমান নিয়ে একা একা পাড়ি জমিয়েছেন। এক উথাল পাথাল ঢেউয়ের মতো মনের গভীরে গড়িয়ে যায় সেই মধুর ধ্বনি, ‘মা’। যখনই তার মনে এসে আছড়ে পড়ে এই শব্দটা ‘মা’- ঠিক তখনই এক তীব্র কষ্ট বুকের ভেতর থেকে ডেলা পাকিয়ে উঠে আসে কন্ঠনালি পর্যন্ত।  
তার মা এক তীব্র কষ্ট এক সুতীব্র অভিমান নিয়ে ছেড়েছেন সব কিছু। সব বন্ধন মুক্ত করে কোন সুদূরে, করবীর তখন আট মাস বয়স। সেই থেকে একলা বেড়ে ওঠা, একলা মনে। 
করবীর বিএ পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বিয়ের ঘটা অনেকটা তড়িঘড়ি করেই। বলতে গেলে সবার অলক্ষে সব গোপন কথা গোপন রেখে। জানাজানি হলে এ মেয়ে আর পার করা যাবে না। সে যে একটা কাজ করবে বা নিজের পায়ে দাঁড়াবে সেই সুযোগটা তাকে কেউ দেবে না। এক বিধর্মীকে ভালোবেসে সে যে আরো একটা অন্যায় করে বসেছে। বিপুল তাকে ভালোবাসে সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও তো ঠিক তারা কেউ কারো প্রতি কোন কমিটমেণ্ট রেখে যায়নি। বিপুল তাকে ‘নির্ভার আশ্রয়’ বললেও কখনো তাকে মুখে স্পষ্ঠ করে বলেনি কিছুই। তারপরও করবী জানে, সব কথা মুখে বলার প্রয়োজন নেই। কিছু কমিটমেণ্ট আছে, কিছু কথা আছে যা মুখে না বললেও চলে। ওর এই চিঠিটাই কি সব বলে দেয় না! এর চেয়ে স্পষ্ট করে আর কি জানাবার আছে! 

করবীর যখন সাত বছর বয়স তখন তার বাবাও একদিন চলে গেলেন। তারপর দাদীই তাকে আগলে রেখেছেন। তিনিই তার সব ভার নিয়েছেন। যে এক তীব্র অভিমান থেকে তার মায়ের চলে যাওয়া, যে এক সুতীব্র প্রতিবাদ জ^লন্ত অগ্নির মতো তিনি রেখে গিয়েছিলেন, সেটা যেন দাদীআম্মা সর্বান্তকরণে অনুভব করতে পেরেছিলেন। তার সেই উপলদ্ধি থেকেই করবীকে তিনি গড়তে চেয়েছেন বা গড়েছেন তার পরিবারের সকল প্রথা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে। এটা খুব অশ্চর্য শোনাবে তারপরও এটাই সত্যি যে, করবীই এবাড়ির প্রথম মেয়ে যে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। 
করবীর দাদা ছিলেন একজন কৃষক এবং তার পূর্ব পুরুষেরাও। নিজেদের জমি বলতে বিঘে দশেক তার ওপরে অন্যের জমি বর্গাচাষ করতেন তেভাগা হিসেবে। ধান চাষের মূলত দুটো পর্ব থাকে। একটা পুরুষের অন্যটা নারীর। চাষাবাদ থেকে মাড়াই পর্যন্ত পুরুষের কাজ। বাকি ধান ভানা ও সেদ্ধ, শুকনো করে চালে রুপান্তরিত করার কাজ বাড়ির মেয়েদের। তবে এই কাজে যে সব মেয়ে দক্ষ হবে, সবাই যে এই কাজের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে এমন কোনো কথা নেই। তবে তাদের বাড়ির লোকেদের মানসিক গঠন এমন ছিল যে, কেই কেউ যে এসব কাজে অদক্ষ হতে পারে সেটা ভাবার মতো মানসিকতা তাদের বাড়িতে তখনো কারো গড়ে ওঠেনি। এ বাড়ীর সব নারী যুগের পর যুগ ধরে যা পেরেছেন, যে সংস্কৃতি ও সংস্কার এর সাথে নিজেদের গড়েছেন বা বইয়ে নিয়ে গেছেন। সেই বহমানতায় যেন প্রথম উজানের সাক্ষাত ঘটাল করবীর মা জুলেখা। না এই কাজের প্রতি তার বিদ্বেষ ছিল না বিন্দুমাত্র, তবে তিনি এর সঙ্গে নিজেকে মানাতে পারেননি। আর পারেননি বলেই সব বিপত্তি। 
সেদিনও এমনি এক সকালে জুলেখা তার শিশু কন্যাকে ঘুম পাড়াতে ব্যাস্ত। মেয়েটার রাত থেকে গা গরম। কিছুতেই ঘুমাতে চায় না। সারারাত ধরেই কান্নাকাটি করেছে। ডাক্তার দেখানোর কথা বললে এ বাড়িতে কেউ গা করে না। সেটা এ বাড়িতে গত দুবছরে দেখেছে সে। ছোটদের অসুখ করলেই কী সব পাতা-পুতির রস করে এনে খাওয়ানো হয়। মেয়ে কেঁদেই চলেছে...। জুলেখা হতবিহ্বল।
ওদিকে উঠোনে বড় চার কোনা টিনের তৈরি তাফালে করে শাশুড়ী ও জা-এরা ধান সেদ্ধ বসিয়েছে। তেমনি বিশালাকার চার কোনা চুলো। তার দুই দিক থেকে মুখ। কাছে গেলে মনে হয় যেন হা করে গিলতে আসছে গনগনে অগুন। দুই মুখে কাঠ ছাড়াও কিছুক্ষণ পর পর ছুড়ে দেয়া হয় তুষ। আর ধান সেদ্ধ হয়ে গেলে তাফালের দুই পাশে দুটো বাঁশ দিয়ে উচু করে ধরে এনে সেই সেদ্ধ ধান ঢেলে দেয়া হয় গোবর লেপা ধবধবে উঠোনে। জুলেখার কাজ হলো সেই ধান ঠেলে ঠেলে সমস্ত উঠোনময় বিছিয়ে দিয়ে রোদে শুকোতে দেয়া। আর কিছুক্ষণ পর পর আবার উল্টে পাল্টে দেয়া ও হাঁস-মুরগী, পাখি তাড়িয়ে পাহারা দেয়া। রান্নাঘরের পাশ ঘেষে বড় উঠোন, একই সাথে রান্নার তদারকিও করতে হয় তাকে। দুটো চাল কুমড়ো ও কুঁচো চিংড়ি একই সাথে কুটে রেখেছে, বড় হাড়িতে বসবে সেই রান্না। কোথা থেকে যেন কতোগুলো রুই এর পোনা ধরে এনেছে, এদেরও কুটে ধুয়ে চড়াতে হবে। 
পাঁচ কেজি চালের ভাতের হাড়ি। এতোবড় হাড়ি দেখে জুলেখাতো প্রথমদিন প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল। প্রথম যেদিন তাকে ভাতের মাড় ফেলতে বলা হলো, ভয়ে তার গলা শুকিয়ে ঠোট সাদা হয়ে গিয়েছিল। এটা কি করে সম্ভব ! সে কি পারবে? জুলেখার অসহায় অবস্থা দেখে তার ননদ ফোড়ন কাটে, ‘উমম্ শিক্ষিত ঘরের মেয়ে আনিছো মা, এইবার বোঝবানে। সব কিছুতেই চোখ বেয়ে পানি গড়ানো ছাড়া আর তো কিছু পারতি দেখলাম না এহন পর্যন্ত।  যা-ই কবা দেখপা যে শুধু নব জন্ম পাওয়া মানুষের মতো এদিক ওদিক চায়।’ 
জুলেখার শাশুড়িও প্রচ্ছন্ন বিরক্তি দেখায়। ‘হলো গিয়ে বাজারের থলিতে ভইরে চাইল কিনে আনবে আর ঐ ফুটিয়ে খাওয়া। ঐ স্কুলে একটু বিদ্যে বেচে খায়। এই সব ধান-পান বড় ঘর গেরস্তি দেহিছে কোনোদিন? যা দ্যাহে তাতেই ‘টাউওর ছা’র মতো চাইয়ে থাহে। কতোদিন আর? এ্যান্নে ঘাড়ে পড়িছে যহন, করতিতো হবেই। ঢং-ঢাং কয়দিন! দেখ মুখ বুইজে।’ 
‘ঢং-ঢাং’ শব্দটা যেন জুলেখার বুকে তীরের মতো বেঁধে। সে যেন মরমে মরে যায়। সে কোনো ঢং করে না, এটা তার সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা। সে পারে না, জীবন বোধহীন শুধুমাত্র এক স্থুল জৈবিক জীবন ধারার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে। সত্যিই পারে না ঐ রাতের পর রাত ঢেকিতে পার দিতে, উঠোন ভরা ধান শুকোনো আর একই সাথে রান্নার তদারকি করতে। সে দূর থেকে তার বাবাকে করূণ অভিযোগ ছুড়ে দেয়। কেন, কী দোষ করেছিলাম যে এখানে বিয়ে দিলে? 
জুলেখা এসএসসি পাস করেছিল। তার বাবা বেসরকারী প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষক। তাঁর যা আয় তাতে সংসার চালানোই দায়। সেখানে মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য বাড়তি দুটো পয়সা জমানোর সাধ্য তার কোথায়? আর মেয়ের সংখ্যাওতো কম না, তিন তিনটে মেয়ে। তাই যখন এসএসসি পাশ করা মেয়ের জন্য এইট পাশ করা জমি জিরেতের মালিক গেরস্ত ঘরের ছেলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব এলো সেটা তিনি নির্দিধায় মেনে নিলেন। কারণ একটা একটা করে এভাবে পার করতে তো হবে। গ্রামঘাটে মেয়ে আর লেখাপড়া করে কদ্দূর যাবে। মাইল তিন চারের মধ্যে কোনো কলেজও নেই যে মেয়েকে তিনি সেখানে পড়তে পাঠাবেন। আর তার সেই সঙ্গতি-ই বা কোথায়? তিনি কন্যা পার করার সুযোগ পেয়ে যেন আত্মহারা হলেন, একবারও ভাবলেন না পরিবেশ পরিস্থিতি। কিছুই ভাববার সুযোগ পেলেন না তিনি। তার কন্যা যে মাস্টারের ঘরে গরীব হলেও এক শূক্ষ্ম জীবন বোধ নিয়ে বেড়ে উঠেছে। পিতার সান্নিধ্যে যে শিল্প সাহিত্যের রস আস্বাদন করেছে, সে কিভাবে, কেমন করে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে খাপ খাওয়াবে সেটা একবারও ভাবেননি তিনি। ভেবেছিলেন আর্থিক স্বাচ্ছন্দই সব অপূর্ণতা ঢেকে দেবে। তিনি অন্য সবার মতোই ভেবেছেন, মেয়ে তো! সর্বংসহা! সব সইতে পারবে, সব। পানির মতো মিশে যেতে পারবে। 
কিন্তু শরীর মানিয়ে গেলেও মন যে বিদ্রোহ করতে পারে সে কথা একবারও কেউ ভাবেনি জুলেখার জন্য। 
জুলেখা সরাদিনই হেসেলে ব্যস্ত। তার মেয়ে থাকে সারাদিন এর কাছে তার কাছে। উঠোনে রোদে মাটিতে গড়াগড়ি খায়। আর তাই সেদিন যখন ছোট্ট অসুস্থ মেয়ে আরো তীব্র জ^র নিয়ে কারো কোল থেকে নেতিয়ে পড়ে ছোট্ট বিছানায়...। জুলেখার সহ্য হয় না। আর সহ্য হয় না তার সন্তানের এমন অবহেলায় অযত্নে কুকুর বেড়ালের মতো বেড়ে ওঠা দেখে। তার সব প্রাক্ ভাবনাকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখে। এক তীব্র অভিমান এক সুতীব্র যন্ত্রণায় সে ফেটে পড়ে সব অসঙ্গতির বিপরীতে। মুহূর্তে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ছোটে হসপিটালে। আর সেখান থেকে যখন ফিরল তখন তীর্যক বাক্যবানে জর্জরিত করা হলো তাকে। তাকে প্রায় একঘরে করা হলো একাকী বাইরে যাবার অপরাধে। কেউ খেতে ডাকে না, কাজে ডাকে না। তাই সেদিন গভীর রাতে ঘুমন্ত মেয়েকে আদরে ভরিয়ে দিয়ে, ভেতর থেকে উঠে আসা তীব্র কান্নার গমক আঁচলে চেপে নিঃশব্দে ছুটে যায় ভাড়ার ঘরের দিকে। যে অন্ধকার ঠান্ডা ঘরটায় বড় বড় মটকি ভর্তি চাল, বস্তায় ঝোলানো পেঁয়াজ, মাটির হাড়িতে ঠেসে ঢোকানো শুকনো মরিচ, হলুদ, তেতুল ও তেজপাতার গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়ায়, তারই এক কোণে টং এর নীচে থাকে সেই বোতল গুলো। শক্ত করে ছিপি আটকানো মুখ, এই মাদকতা ছড়ানো ঘ্রাণের মাঝে তার অসহ্য ঘ্রাণময় অস্তিত্বের জানান দিতে ব্যর্থ। তারই একটা তুলে নিয়ে মুখে ঢেলে দেয় সে। এই তাবৎ যন্ত্রণা থেকে জন্মের নিস্কৃতি খোঁজে। মুখগহ্বর থেকে সেই তরল পৌছে যায় রক্তের কণিকায় কণিকায়..। 
যেন এক মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে সে। 

‘গেরস্ত’ যাদের আচার আচরণে কৌলিন্যের ছোঁয়া নেই। শিক্ষাও তাদের মানসিকতায় খুব একটা পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।’ এমনই ধারণা ছিল করবীর মায়ের। করবীর বিয়েটাও ঘটছে এমনই এক ধনী গেরস্ত ঘরে। পাশের গ্রামে বাড়ি তাদের। পাত্র কলেজে গিয়েছিল কিছুদিন কিন্তু পাশ করতে পারল কই? গঞ্জে বড় কাপড়ের দোকান আছে। করবী কলেজে যাবার সময় কিছুদিন দেখেছে তাকে। দোকানে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে শুধু রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকত। কলেজগামী স্কুলগামী মেয়েদের দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ আছে বলে মনে হয় না। এমন একটা মানুষ তার স্বামী হবে! তার জীবন সঙ্গি? ভাবতেই সারা শরীরে কাঁটা দেয় করবীর। কী জানে সে? এই পৃথিবী স¤পর্কে তার ধারণাই বা কি আছে। জীবনের কতগুলো গত বাধা সূত্রের বাইরে সে কীইবা ভাবতে পারে! ‘হয়তো পারে, মানুষকে এতো ছোট করে দেখো না করবী! ’ নিজেকেই নিজে বলে সে। মানুষ, তার মন আছে, জাবতীয় সাংসারিক ভাবনার বাইরেও সে ছুটে যেতে পারে অনেক দূর। কিন্তু সেই যাত্রাটা কতদূর? ওই লোকটার সেই যাত্রাটা কতদূর যেতে পারে? সীমা ছাড়িয়ে তো নয়। করবীর চেনা গণ্ডির বাইরে চিন্তার সেই বিশালতা শুধু বিপুলেরই আছে। বিপুলের মন এই পৃথিবী ছাড়িয়ে চলে যেতে পারে মহাজগতে মুহূর্তে। আর করবীর যে তাকেই চাই! মনে প্রাণে সর্বান্তকরণে। সে যে তার সর্বস্বই তাকে সমর্পণ করে বসে আছে। এর কোনো ব্যাত্যয় হতে পারে না। যদি এজীবনে তাকে নাও পায় তবু তার কোনো অন্যথা হবে না। বিপুল নামটা ভাবলেই করবীর সারা শরীরে এক অদ¢ুত শিহরণ বয়। যেন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে কোথাও। এমন এক আবেশ সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে যায়। সেই যে সেদিন, সবার অলক্ষে কলেজ ফাঁকি দিয়ে বিপুল তাকে নিয়ে গিয়েছিল শামুকডাঙ্গা বিলের রূপ দেখাতে। দিগন্ত বিস্তৃত জলাভূমি গাঢ় সবুজ শাপলা পাতায় ছাওয়া, মাঝে মাঝে সেই পাতার ফাঁকে স্বচ্ছ পানিতে সূর্যের আলো পড়ে ঝিক মিক করে উঠছে, আর তার ওপরে নীল, লাল ও সাদা রঙের শাপলা ফুল ফুলে এক অনন্য বিভা। চারদিকে কূল ঘেঁষে নারকেল বনের নির্জনতা। সে এক অপার্থিব রূপ প্রকৃতির, এক অপার সৌন্দর্য মেলে ধরে দাড়িয়ে আছে। এই সৌন্দযের্র সামনে সব কিছু কেমন ক্ষুদ্র মনে হয়। ঠিক তখনই এক ঝাক টিয়া পাখি সবুজ ডানা মেলে উড়ে চলে গেল যেন ঠিক করবীর উড়ন্ত চুল ছুঁয়ে। এতো কাছে থেকে, এতো নির্ভয়ে..। যেন কখনো কোনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি এখানে। একটা দুটো বক যারা খুব গ¤ভীর ভঙ্গীতে এতোক্ষণ দড়িয়ে ছিল বিলের তীর ঘেসে, এই মাত্র তারাও উড়াল দিল নীড়ের দিকে। কিসের যেন আয়োজন! আর দেখতে দেখতেই সোনালী  বিকেলটা ঝুপ করে রঙ বদলে সন্ধায় রুপ নিল। আর নিমেষে আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেল। একেবারেই কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই তুমুল ঝড়ের আভাস। প্রচণ্ড গর্জনে বিদ্যুৎ চমকালো কয়েকবার। প্রতিবারই এক তীব্র আতঙ্কে করবী চেপে ধরেছিল বিপুলের বাহু। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ব্যাকুল তখন দুজনেই। বিপুল মুহূর্তেই ওকে নিয়ে ছোটে বিলের মাছ পাহারাদারদের ছোট্ট টং ঘরের দিকে। পাহারাদার ঘর ছেড়ে কোথায় যেন কোন কাজে বেরিয়েছে বা পাশের হাটে আনতে গেছে তার বাজার-সদায়। বাইরে তখন ভীষণ বিদ্যুত চমকাচ্ছে। বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর। করবী ওভাবেই আকুল ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে বিপুলের হাত। যেন ছাড়লেই সে ভীষণ বাতাসে ভেসে যাবে। বিপুলও সেই হাত জড়িয়ে ধরে, জড়িয়ে নিয়ে অপলকে তাকায় ওর চোখের দিকে, তাকিয়ে থাকে সেই চোখের দিকে। যেন হাল খুলে যাওয়া এক নৌকোয় ভেসে যাচ্ছে দুজনে। তারপরেই বিদ্যুৎ ঝলক দিয়ে উঠল। এক তীব্র ঝড় উঠলো যেন দিগন্ত ছাড়িয়ে সুগভীর কোনো অস্তিতে¦র ভেতরে। দুজনের দৃষ্টিতে বিচ্ছুরিত প্রেম। কেউ যেন আর সাধারণ মানুষ নেই। যেন অন্য কিছুতে গড়া অন্য কোনো কেউ। করবী যেন স্বর্ণকন্যা, স্বর্ণ লতিকা, এই প্রথম মানবী জন্ম হলো তার। সেই আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে এক নিবীড় আলিঙ্গনে বিলীন হলো দুজনে। এক আবেশময় আনন্দের প্রস্রবনে অবগাহিত দুটি প্রাণ। যেন পৃথিবীর আদিমতম মানুষের মতো সবচেয়ে গোপনভাবে আবিস্কার করছে নিজেদেরকে এক নিবীড় ঘন আবেশময় অরণ্যের মধ্যে রহস্যঘণ অন্ধকারের ভেতর। আর যখন সম্বিত ফিরল তখন ঝড় থেমে গেছে। দিনের আলোস্পষ্ঠ। পৃথিবী তার জাবতীয় বাস্তবতা নিয়ে জেগে রয়েছে তখনো..। 

‘শুধু তোমার জন্য সারাটা জীবন থাকবো দেখ, তোমাকে ভালোবাসবো বলে..! কোথাও যাবো না, কোথাও হারাবো না, ভীতুর মতো টেনে আনবো না সহজ যবনিকা।’ এই কথাগুলো মনে মনে যতবার সে বলে বিপুলের উদ্দেশ্যে, ততবার যেন নিজেকেও। নিজেকেই যেন নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে সর্বক্ষণ। কারণ খুব হঠাৎ করেই ঘটে যাচ্ছিল সব কিছু। বিপুল তখন অনেক দূবে। তার সেমিস্টার ফাইনাল চলছে। করবী ওই মুহূর্তে তাকে বিব্রত করতে চায় না, জানাতে চায় না কিছুই। ওর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় এটা। করবীর দিক থেকেও যদিও এটা জীবন মরণের প্রশ্ন। তার পরও এই সমস্যার সমাধান সে নিজেই করবে। আর তাই প্রতি মুহূর্তে একটা সুযোগ খুঁজে গেছে প্রতিদিন। আর খুঁজে পেতে সে পেয়েও গিয়েছিল সেই বিশেষ সূত্রটা। যে সূত্রে ফেলে দিলেই সব ধ্বসে যাবে। এতোদিন ধরে যে বিষয়টা বাইরের মানুষের কাছে ওরা চাপা দিয়ে এসেছে। সেই বিষয়টা, যেটা করবীর মনেও একের পর এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অথচ সে মুখ ফুটে জানতে চায়নি কখনোই। সে জানে সবটাই। বলেনি কখনো কাউকে। বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর সেই অস্ত্রটাই প্রয়োগ করল সে শেষ পর্যন্ত। ওর মা-ই যেন শেষপর্যন্ত বাঁচিয়ে দিলেন ওকে। পুকুর ঘাটে বসেই টের পাচ্ছে করবী, ভেতরের সব আয়োজনে যেন পানি ঢেলে দেয়া হয়েছে। চাপা গুঞ্জন স্পষ্ট টের পাচ্ছে এখান থেকেই। বজ্রাঘাতের মতো মুখ নিয়ে ছোট চাচা বলছেন, ‘জানো না কি জন্যি ভেঙ্গে গেল বিয়েটা? ওর মা, ওর মা যে মইরে গিয়েও ছাড়তিছে না আমাগের, সে যে বিষ খাইয়ে আত্মহত্যা কইরেছিল, তার মেয়ের কি এতো সহজে বিয়ে হয়!’  
হয় না। আর হোক সেটা চায়ও না করবী। তার ভেতরের এক প্রবল শক্তি তাকে চালিয়ে নিয়ে যায়। সে এবার মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব বন্ধন ছিন্ন করে, তুচ্ছ করে সব সংস্কার, পুকুরের ওপারের ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে ঐ যেখানে দিগন্তে মিলেছে এক অসীম প্রান্তর, সেদিকে পা বাড়ায়। পেছনে পড়ে থাকে সব অপবাদের বোঝা, কানাকানি, চিৎকার চেচামেচি!


Gazi Tanzia

গাজী তানজিয়া

Creative Writer

জন্ম ১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৭। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় থেকে স্নাতক ও আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতোকত্তোর শেষে দুটো বহুজাতিক ক¤পানিতে স^ল্পকালীন কাজ করেন। বর্তমানে লেখালেখিকেই তিনি একমাত্র প্রকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জাতীয় দৈনিকে রাজনৈতিক নিবন্ধ রচনার মধ্যদিয়ে তাঁর লেখালিখির শুরু। একই সাথে লিখে চলেছেন গল্প, উপন্যাস ও শিশু সাহিত্য। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক পটভূমিকায় লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘জাতিস্মর’ আনন্দআলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১০-এ ভূষিত হয়। প্রকাশিত গ্রন্থ: জাতিস্মর (উপন্যাস) পৃথিবীলোক (উপন্যাস) বায়বীয় রঙ (উপন্যাস) কালের নায়ক (উপন্যাস) আন্ডারগ্রউন্ড (উপন্যাস) সবুজঘাসে মুক্তবেশে ( কিশোর গল্প সংকলন) অরক্ষিত দেশে অবরুদ্ধ সময়ে ( নিবন্ধ সংকলন)।